‘চল হকের জমি ছিনাই লিবি চল…’

৮ই মার্চ, ২০২১। টিকরি বর্ডার। হলুদ ওড়নার ভীড়। প্রাঙ্গন জুড়ে বসে আছেন কয়েক লক্ষ নারী কৃষক। মঞ্চে মেয়েরা স্লোগান তুলছেন, বক্তব্য রাখছেন তিনটি কৃষি বিলের বিরুদ্ধে। অনেকেই বলছেন পরিবারের কথা, এই বিল কিভাবে তাদের ‘চুলহা’ অর্থাৎ উনুনে আঘাত করেছে। আবার, অনেকেই বলছেন গ্রামের লড়াইয়ের কথা, আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যতের কথা, ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যাওয়ার কথা। তারই মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক মেয়েরা বলছেন জমির অধিকারের কথা… যে জমিতে তারা ভোর ৪টে থেকে রাত ১১টা অবধি কাজ করেন, সেই  জমি জান থাকতে আম্বানি আদানীকে দেবেন না। কৃষক আন্দোলনে মেয়েদের লড়াইয়ের ইতিহাস বহু পুরনো। সেখানে যেমন পাঞ্জাবের মুজারা আন্দোলনের মেয়েদের জমি দখলের কথা, নকশালবাড়ির মহিন্দর কৌর, কেবল কৌরের উত্তরাধিকার বহন করছেন আজকের আন্দোলনকারী মেয়েরা, তেমনই সেখানে আছড়ে পড়েছে তেভাগা, তেলেঙ্গানা, নকশালবাড়ি, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, লালগড়ের মেয়েদের সংঘর্ষে সামিল হওয়ার লড়াই, শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার লড়াই ও সর্বোপরি মেয়েদের কৃষক হিসেবে পরিচিতির লড়াই। এই চলমান ইতিহাসের গতিপথ, এই চলমান ইতিহাসের প্রেক্ষিত ও উত্তরাধিকারের চলাচলের মধ্যেই আছে লিঙ্গ রাজনীতির সঙ্গে কৃষক সংগ্রামের টানাপোড়েন, দ্বন্দ্ব, আদান প্রদান। সেই প্রসঙ্গেই ৫৪ বছর পরেও ফিরে দেখা প্রয়োজন সেই বসন্তের বজ্রনির্ঘোষের দিনগুলিকে।

নকশালবাড়ি আন্দোলনে মেয়েদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হলে প্রথমেই উঠে আসে সেই সাতটি নাম। ধনেশ্বরী দেবী, সিমাশ্বরী মল্লিক, নয়নেশ্বরী মল্লিক, সুরুবালা বর্মন, সোনামতি সিং, ফুলমতি দেবী, সামসরি সৈবানী। ২৫শে মে, ১৯৬৭-এ প্রসাধুজ্যোতে পুলিশের গুলি যাদের এক নিমেষে একটি শহীদ ফলকে পরিণত করেছিল। ধনেশ্বরী দেবীদের নাম ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিলেও তাদের রাজনৈতিক জীবনের প্রায় কোনো ইতিহাসই পাওয়া যায় না। ধনেশ্বরী দেবীর ছেলে, পবন সিং-এর সাথে কথা বললেও আন্দোলনে তার বাবার, তার নিজের গল্প শোনা যায় কিন্তু তার মায়ের স্মৃতি তার কাছেও ২৫শে মে-র শহীদ হিসেবেই রয়ে গেছে। ধনেশ্বরী দেবীর রাজনৈতিক জীবনের যেটুকু ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তা তার গ্রামের কমরেডদের ওই দিনটির স্মৃতি বিস্মৃতির টুকরো টুকরো জুড়েই… জানা যায়, আগেরদিন ইন্সপেকটর সোনাম ওয়াংডি কৃষকদের তীরে প্রাণ হারালে, গ্রামে ভয়াবহ পুলিশি সন্ত্রাস নামে। তারই প্রতিবাদে গ্রামের মানুষ পরের দিন মিছিলের ডাক দেন। সেই মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন ধনেশ্বরী দেবী, এক রাজবংশি মহিলা। পুলিশ আসার খবর পেয়ে, দা-কাঁটারি হাতে আসেপাশের গ্রামের মেয়েরাও সেই মিছিলে যোগ দেন। এই মেয়েদের অনেকেরই ওই দিন থেকেই রাজনীতিতে হাতেখড়ি। যেখানে গোটা গ্রাম যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল, সেখানে পক্ষ বেছে নেওয়া, সক্রিয় অংশগ্রহণ করা না করা অনেক সময়েই ‘চয়েস’ থাকে না, বেঁচে থাকার সংগ্রামেরই অংশ হয়ে যায়। ইস্কুলদাহির সাবিত্রী রাও, পার্বতী কারিগর, হাতিঘিসার শান্তি মুন্ডা, বুরহাগঞ্জের লীলা কিষান, ঘোচাইমল্লিকের সুনীতি বিশ্বকর্মা, তরাইয়ের এতোয়ারি রাজকোট, নোনি কিষান, গঙ্গ হাঁসদা – সেই সব মেয়েরা যাদের কথা ইতিহাসের ফুটনোট হয়েই থেকে গেছে, যাদের রাজনৈতিক অবস্থান, মতাদর্শ নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হয় না, সেই মেয়েরা যাদের পরিচয় ‘নকশালবাড়ির মেয়ে’ হয়েই থেকে গেছে, নারী কৃষক হিসেবে পরিচিতি মেলেনি, যাদের লড়াইকে গ্রামের লড়াই হিসেবেই দেখা হয়েছে, জমির অধিকারের লড়াই হিসেবে নয়, যাদের আন্দোলনের শ্রম শুধুমাত্র আনুষঙ্গিক হিসেবেই নথিভুক্ত হয়েছে আমাদের মননে, সৃজনে, ইতিহাসে… 

অথচ এই মেয়েরাই বেঁচে থেকেছেন একে অপরের স্মৃতি আঁকড়ে, নিজের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন অন্য মহিলা কমরেডদের কথা, যৌথ যাপনের কথা, সমষ্টিগত লড়াইয়ের কথা। সেই গল্পকথায় বারবার উঠে এসেছে কৃষি কাজের কথা, সেই গল্পে বারবার উঠে এসেছে গৃহশ্রমের কথা, সেই গল্পে বারবার উঠে এসেছে জমির সাথে তাদের সম্পর্কের কথা, তাদের রাজনৈতিক শ্রমের কথা। তাই বিনা দোষে জেল খেটে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার গল্প বলতে বলতে অবলীলায় লীলা কিষান বলে ওঠেন, “আল বাঁধতে পারে, রুপ্নি করতে পারে, বিছান ফেলতে পারে, খালি লাঙ্গলটা ধরতি পারবো না?” কিংবা পার্টির মিটিং-এ যাওয়ার কথা বলতে বলতেই সাবিত্রী রাও-এর বয়ানে উঠে আসে গৃহ শ্রমের কথা, লিঙ্গভূমিকার কথা, মাতৃত্বের শ্রমের কথাও,

“একবার মিটিং শেষ হতে অনেক দেরি হয়েছিল। ফেরার পথে আমার সাথে আসার কেউ ছিল না তাই আমি একাই ফিরেছি… বাড়ি ঢুকতে ১২টা বেজেছে। আমার বর জিজ্ঞেস করেছিল এত দেরি হল কেন? আমি বললাম, আপনারাই তো বলেন মিটিং-এ যেতে বাচ্চা রেখে। এখন মিটিং যখন শেষ হবে তখন তো আসব, নাকি অর্ধেক করে চলে আসব?…

আমি জীবনে বাবার বাড়ি কোন দিন যাইনি বাচ্চা ছেড়ে কিন্তু মিটিং-এ গেছি”। দ্রোহের উত্তাল আগুন যখন গ্রামে গ্রামে যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করেছিল, তখন পাবলিক আর প্রাইভেট বিভাজন ক্রমশ মুছে যাচ্ছিল, মুছে যাচ্ছিল শ্রমের ‘ঘর-বাহির’ লিঙ্গভিত্তিক গণ্ডিও। তাই গেরিলা যুদ্ধে তীর চালানোর গল্পের সাথেই মিলে মিশে যাচ্ছিল মাতৃত্বের শ্রমের কথা। ‘মেয়েদের চুলের সঙ্গে রাষ্ট্রযন্ত্র বাঁধা আছে’ বলেই তাই শান্তি মুন্ডার কথায় উঠে আসে, “পুলিশ চিরুনি তল্লাশি চালালে আমরা সবাই পালাতাম। আমার ছেলে মেয়েরা খুব ছোট ছিল, ওরা ক্ষেতে গিয়ে লুকোত। একবার আমার ১৫ দিনের মেয়েকে নিয়ে পালাতে হয়েছিল। অনেকক্ষণ দৌড়ে আমি দেখছিলাম মেয়ে বেঁচে আছে কি না…ভাবছিলাম বাচ্চা শেষ এত জার্কিং খাইছে…”।

আন্দোলনের তত্ত্বায়নে, আন্দোলনের ইতিহাসকরণে যে রাজনৈতিক কাজের এক রকমের অলিখিত স্তরভেদ চোখে পরে, সেই সরলীকরণও ভেঙ্গে যায় মেয়েদের স্মৃতিকথায়। রাইফেল ধরার অভিজ্ঞতার সাথে সাথেই সমান গুরুত্ব পায় ক্যুরিয়ার হিসেবে কাজ করার গুরুত্বের কথা, শেল্টার তৈরি করার গুরুত্ব – যে কাজগুলি না হলে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া সম্ভবপর হতো না। একই সাথে উঠে আসে একে অপরের যত্ন নেওয়ার কাজের কথা, একে অপরকে ভরসা দেওয়া, সাহস দেওয়ার কথা, ‘ইমোশনাল লেবর’-এর কথা, যে কাজগুলির ‘কাজ’ হিসেবে কোনো স্বীকৃতি না থাকলেও তা প্রবলভাবেই রাজনৈতিক কাজ। “আমার মতো অনেক মহিলাই যোগ দিয়েছিল। গলোশ্বরী, এতোয়ারি রাজকোট, নোনি কিষান, গঙ্গ হাঁসদা… যেখানেই যেতাম লোকেদের সংগঠিত করতাম। আদালত ঘেরাও করতাম, জমি দখল করতাম। আমি মহিলাদের তীর চালানো শেখাতাম। পুলিশ যদি গ্রামে আসে তা’লে যা পাবো… আমাদের তো আর বন্দুক ছিল না, তাই যা পাবো – ছুরি, কাটারি, কুড়াল তাই দিয়ে হামলা করব। পুলিশ গ্রেপ্তার করতে এলেই ঘেরাও করতাম, খবর ক্যুরিয়ার করতাম, শেল্টার জোগাড় করতাম, মিটিং-এর বন্দোবস্ত করতাম”, শান্তি মুন্ডার কথায় এর সাথেই উঠে আসে মেয়েদের কৃষি শ্রমিক হিসেবে অধিকারের প্রশ্ন, জমির অধিকারের প্রশ্ন, “আমাদের গ্রামে কোনো লোন ব্যবস্থা ছিল না, তাই আমরা সেই নিয়ে আন্দোলন করেছিলাম ঢেঁকির লোন, মুরগির লোন, গরুর লোন চেয়ে… মেয়েদের সমান অধিকারের কথা বলে ট্রাক্টরের দাবি করা হয়েছিল”। সুনীতি বিশ্বকর্মা বলেন গলোশ্বরি থারুর গল্প যিনি সে সময়ে নিজের ছেলের বউ ও গ্রামের আরো মহিলাদের নেতৃত্ব দিয়ে মাঠে হাল চাষ করেছিলেন।

হয়তো সেই সময়ের উত্তাল ‘বিপ্লবী পরিস্থিতির’ ফলেই অনেক সামাজিক নিয়ম শিথিল হয়েছিল, অনেক বিপ্লবী সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। জাতপাতের রাজনীতি, লিঙ্গ রাজনীতির ক্ষেত্রে । একই সাথে সামন্ততান্ত্রিক পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ক্ষণস্থায়ী হলেও প্রশ্ন উঠেছিল বিবাহ ব্যবস্থা আর পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধেও। তাই অনেক মেয়েদেরই স্মৃতিকথায় আসে বিয়ে না করে একসাথে থাকার কথা, প্রচলিত সামাজিক রীতি ভাঙ্গার গল্প, প্রথাগত পরিবারের বাইরে গিয়ে বন্ধুত্বের, কমরেডশিপের রাজনীতি গড়ে তোলার কথা। দুর্ভাগ্যবশত, পরবর্তীকালে বিপ্লবের কোলাহল শান্ত হয়ে এলে শিথিল হওয়া সামাজিক নিয়মগুলো আবারও প্রকট হয়ে আসে, এবং এই মেয়েদের অনেককেই এই দিনকতকের ‘রোম্যান্স’ কাটিয়ে ফিরতে হয় চার দেওয়ালের বেড়াজালে। সমাজ ‘স্থিতু’ হতে তাদের আবারও বোঝাপড়া করে নিতে হয়েছে সামাজিক নিয়মরীতির সাথে। তবু, এই নতুন বোঝাপড়া ছিল অন্যরকম। বিপ্লবের আগুন সমাজব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে ফেলতে না পারলেও, বদলে দিয়েছিল তাদের নিজেদের দেখার, বোঝার, এবং সেই সূত্রে সমাজকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। কাজেই যে মেয়েটি বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল, একই মানুষ ঘরে ফেরেনি। এত দিন যারা ছিল ছায়া মানুষ, যাদের চিন্তা, ভাবনা, মতামত কিছুই কেউ জানার প্রয়োজন মনে করেনি, এমনকি হয়তো বা কখনও আন্দোলনের কমরেড, নেতৃত্বও বুঝতে চায়নি, বিপ্লবের আঁচ এই খোপগুলো, এই বোঝাপড়াগুলোকে অনেকটাই ঘেঁটে দিয়েছিল, এই ছায়া মানুষদের অস্তিত্ব প্রকট করে তুলেছিল, নিজের কাছে, সমাজের কাছে, আন্দোলনের কাছেও।  

তাই যে লীলা কিষান, শান্তি মুন্ডা, সুনীতি বিশ্বকর্মা, গালোশ্বরী থারুরা নিজেদের কৃষি কর্মী, নারী কৃষক পরিচয় সেই ভাবে জাহির করে উঠতে পারেননি সমাজের কাছে, হয়তো বা নিজেদের কাছেও, যে জমির অধিকারের প্রশ্ন নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা হলেও তা নিয়ে সোচ্চার হতে পারেননি, সেই তৈরি হওয়া অধিকার বোধই কয়েক দশক পরে আবারও নন্দীগ্রামে জমি আঁকড়ে ব্যারিকেডে দাঁড়াতে সাহস দেয় স্বর্ণময়ী, রাধারাণী আড়ি, সুপ্রিয়া জানাদের। আর স্বর্ণময়ীদের ‘আমি যে জমি লিজ নিয়ে চাষ করি, সেই জমি বাঁচাতে এসেছি’ বলার প্রত্যয় আরো তীব্র করে দিল্লি সীমান্তে বসে থাকা নারী কৃষকদের। যারা সুপ্রিম কোর্টের বাড়ি ফিরে যাওয়ার নিদানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জাহির করতে শিখেছে নিজেদের  রাজনৈতিক সত্ত্বাকে, নিজেদের ভূমিহীন নারী কৃষক পরিচিতিকে। খুব অল্পভাবে হলেও বদলাতে পেরেছে আন্দোলনের মধ্যেকার লিঙ্গ ভূমিকাকে। কৃষি বিলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের গুরুত্বের কথা বলেও দাবী জানাচ্ছে উদ্বৃত্ত জমি মেয়েদের নামে করার, আন্দোলনের মধ্যে যৌন হেনস্থার অথবা পিতৃতান্ত্রিক শোষণের অভিযোগ উঠলে তা চেপে না গিয়ে দাবী জানাচ্ছে আন্দোলনের পরিসরে মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার।

উদ্ধৃত বয়ানগুলি ২০১৪ নভেম্বরে  নকশালবাড়ি আন্দোলনের মেয়েদের মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহ করতে  কিছু ব্যক্তিগত ইন্টারভিউ থেকে নেওয়া।

এই সংখ্যায় আরও পড়ুন

                 মাধবীলতা কমপ্লেক্স ও নকশাল আন্দোলনের লিঙ্গ রাজনীতি –  নন্দিনী ধর

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *