নিষিদ্ধ কথা আর নিষিদ্ধ দেশ

‘নিষিদ্ধ কথা আর নিষিদ্ধ দেশ’ দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত বই। মূলত এই লেখা থেকে যৌনকর্ম ভিত্তিক আলোচনা, ও তার সোভিয়েত কর্মসূচীকে সংক্ষেপিত আকারে তুলে দেওয়া হলো। লেখকের সময়ের সোভিয়েত আর নেই। নেই সেই সোভিয়েতের কর্মসূচী, নিয়মাবলী, দর্শন আর কর্মপন্থাকে বারবার ভেঙে দেখার পরিসর। তবুও, বিশেষত ভারতবর্ষে গোঁড়া বামপন্থী ধারার মধ্যে লিঙ্গচেতনা এবং যৌনতা সম্বন্ধীয় যাবতীয় সমস্যা সম্পর্কে যে সুতীব্র রক্ষণশীল ধারণার পরিচয় পাওয়া যায়, তার বিপ্রতীপে দেবীপ্রসাদের এই লেখাটি এক উল্লেখ্য উদাহরণ। স্পর্শকাতর বিষয়কে দূরে সরিয়ে রেখে বইয়ের পাতার নিটোল দর্শন নয়, বরং আমাদের রক্ষণশীল চিন্তাচেতনাকে ধাক্কা দিতে, আমাদের রাজনৈতিক ভাবনায় শাণ দিতে রইলো এই লেখার কিছু নির্বাচিত অংশ।

নরনারীর সম্পর্ক নিয়ে সোজাসুজি আলোচনা করবার চেষ্টা আমাদের দেশে সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ। আর সোভিয়েত দেশ আজো অনেকাংশে নিষিদ্ধ দেশ। সেদেশ নিয়ে সত্যভাষণের সম্মান প্রায়ই রাজদণ্ড। 

এই নিষিদ্ধ কথা আর নিষিদ্ধ দেশ নিয়েই এ-বই-এর আলোচনা। এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধ যতোখানি, ততোখানিই প্রয়োজন এ-আলোচনার। 

প্রথমত এই নিষিদ্ধ কথাটার কথাই ধরা যাক। 

বাস্তবকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টায় আর যাই থাক নির্মল বুদ্ধির পরিচয় নেই। এবং বাস্তবের দিক থেকে মানতেই হবে স্ত্রীপুরুষের সম্পর্ক নিয়ে নানান রকম সমস্যা আমাদের জীবনে অত্যন্ত গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ। 

কিন্তু সেই সঙ্গে সোভিয়েত দেশের কথা কেন? প্রথমত নিশ্চয়ই এই কারণে যে, সোভিয়েতের বিরুদ্ধে অপপ্রচার যতোই হোক না, ইতিহাসের অমোঘ সাক্ষ্য রয়েছে যে, এই দেশের মানুষ পৃথিবীতে নতুন পৃথিবী গড়তে এগিয়েছে। ‘যেখানে’ পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ঐতিহাসিক যজ্ঞের অনুষ্ঠান’ – রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, – যে দেশ না গেলে তাঁর ‘তীর্থদর্শন এ-জমের মতো অসম্পাত থাকতো’। তাই নিশ্চয়ই এপ্রশ্ন না তুলে উপায় নেই ওই নতুন পৃথিবী গড়বার সময় নরনারীর সম্পর্ককে কোন চোখে দেখবার চেষ্টা করা হয়েছে? যুগ যুগ ধরে যেসব সমস্যার কোনও সমাধান দেবার বদলে শুধু নিষিদ্ধ বলে নিন্দেই করা হয়েছে সেগুলির কোনো সমাধান কি সোভিয়েত সমাজে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়েছে? যদি হয়ে থাকে তাহলে তার দার্শনিক ভিত্তিটা কী রকম? বাস্তব কর্মপন্থাই বা কোন ধরনের? 

বাস্তব কর্মপন্থার কথাটা কম জরুরী নয়। কেননা ওরা না মানে কোনো যাদুমন্ত্র, না কোনো বিশুদ্ধ দার্শনিকতা – যে-দার্শনিকতার সঙ্গে মাটির পৃথিবীর আর রক্ত-মাংসে গড়া মানুষের যোগাযোগ নেই; আবার দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিটাকেও ওরা ছোট করতে রাজী নয়। কেননা, ওরা জানে, অন্ধ বিশ্বাসের নির্ভরে কোনো কাজ করতে গেলে সুফল পাবার আশা সংকীর্ণ। 

শুধু এই কারণেই, আমাদের ওই নিষিদ্ধ সমস্যাগুলির আলোচনার প্রসঙ্গ থেকে সোভিয়েতের অভিজ্ঞতাটা যদি বাদ দেওয়া যায় তাহলে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার অভিজ্ঞতাটাই বাদ পড়ে যাবে। 

নিষিদ্ধ কথা আর নিষিদ্ধ দেশ – নামকরণের তাৎপর্যটাকে আরও একভাবে ঘুরিয়ে বলা সম্ভব। 

প্রাচীনকাল থেকেই মানবসমাজ কতকগুলি মূল সমস্যার মুখোমুখী হয়েছে, কিন্তু সেগুলির সমাধান খুঁজে পায়নি। বিশেষ করে আমাদের দেশে, সমাধানের বদলে বরং শিষ্টাচারের নামে সেগুলিকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টাই চোখে পড়ে। কিন্তু বালিতে মুখ গুঁজে উটপাখী তো সত্যিই বাস্তব বিপদ উত্তীর্ণ হতে পারে না। তেমনিই, সমস্যাগুলি সম্বন্ধে উদাসীন থাকলে সমাধান-অভাবের গ্লানিটা আমাদের পীড়িত করবেই। তাই, সমস্যাগুলির কথা মুখে না আনায় প্রিয়-ভাষণের পরিচয় হলেও শ্রেয়-বোধের পরিচয় নেই। 

এই সমস্যাগুলিকে জীবনের বাকি সমস্যা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখবার চেষ্টাটা ভুল। এগুলি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বতন্ত্র কোনো সমস্যা নয়। জীবনের বাকি সব সমস্যার সঙ্গে এগুলির যোগাযোগ এতো গভীর যে, বাকিগুলি থেকে এগুলিকে আলাদা করে দেখতে যাওয়াটাই অবাস্তব। তাই, ঘুরিয়ে বললে বলা চলে, জীবনের মূল সমস্যার সার্থক সমাধান পাওয়া গেলে তারি সঙ্গে পাওয়া যায় এই সমস্যাগুলির সমাধানও। অপরপক্ষে, এগুলিকে আলাদা করে নিয়ে, শুধুমাত্র এগুলির সমাধান খোঁজার চেষ্টায়, বিফলতা অনিবার্য। 

সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনাতেই জীবনের ওই মূল সমস্যার সার্থক সমাধান। পৃথিবীতে এই পরিকল্পনা প্রথম বাস্তব রূপ পেয়েছে রুশ দেশে, আধুনিক যুগে। তাই, ও-দেশে সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনার কল্যাণ শুধুমাত্র মানুষের আর্থিক দুঃখটুকু দূর করেই নিঃশেষ হয়নি; সেই সঙ্গেই সক্ষম হয়েছে অনেকগুলি সনাতন প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর দিতে। তাই, সোভিয়েত সমাজের অভিজ্ঞতা বাদ দিয়ে আলোচ্য সমস্যাগুলির সমাধান খোঁজা নিষ্ফল। 

কথাটাকে এইভাবে পাড়তে গেলে শুরুতে দুটি প্রশ্ন তোলা দরকার। 

প্রথম প্রশ্ন হলো, যৌনজীবন সংক্রান্ত এই প্রশ্নগুলিকে ঠিক কতোখানি গুরুত্ব দিতে হবে? সমস্যাগুলি বাস্তব। সমস্যাগুলিকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টায় শুভবুদ্ধির পরিচয় নেই। কিন্তু তার মানেই কি এই যে, ওই জাতীর প্রশ্ন নিয়েই মাথা ঘামাতে হবে সবচেয়ে বেশি – যেন এগুলিই জীবনের প্রধান ও অন্যতম প্রশ্ন? এই রকমের একটা মতবাদ আছে বই কি। এমন কি, আজকের দিনে মতবাদটার বৈজ্ঞানিক মর্যাদা নিয়ে নামডাকও কম নয়। কিন্তু বিরুদ্ধ মতবাদও রয়েছে। আর তাই প্রশ্ন ওঠে, মতবাদটা কতখানি স্বীকার্য? এবং, এবিষয়ে সোভিয়েত সমাজের অভিজ্ঞতা কীরকম? 

দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনা ছাড়া এই সমস্যাগুলির প্রকৃত সমাধান যদি খুঁজে পাওয়া সম্ভব না হয় তাহলে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবার আগে পর্যন্ত কি এগুলি সম্বন্ধে আমাদের কিছুই করবার নেই? মানুষ কোনো আলাদীনের প্রদীপ খুঁজে পায়নি, রাতারাতি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সমাজতন্ত্র সংগ্রাম সাপেক্ষ; এ-সংগ্রাম সুদীর্ঘও হতে পারে। ততোদিন পর্যন্ত কি এগুলো সম্বন্ধে আমরা শুধুই উদাসীন থাকবো? 

সমস্যাগুলির প্রতি কতখানি গুরুত্ব আরোপ করবো? এই প্রশ্নের জবাব দেবার আগে প্রশ্নটাকেই ভালো করে যাচিয়ে নেওয়া দরকার। যৌনজীবনের সমস্যা বলতে কি শুধুই একটি ব্যক্তিগত মানুষের পক্ষে ব্যক্তিগত যৌন-পরিতৃপ্তি খোঁজবার সমস্যা? নিশ্চয়ই নয়। নানান কারণে তা হতে পারে না। প্রথমত পুরো সমজটার কথা বাদ দিয়ে কোনো ব্যক্তিরই নিজস্ব বাঁ ব্যক্তিগত জীবন বলে আসলে কিছু নেই। তাই যদিই বাঁ আমি বাকি সমাজটার কথা বাদ দিয়ে শুধু নিজের সমস্যার একান্তভাবে মশগুল থাকবার চেষ্টা করি – তাহলে আমার চেষ্টা নিষ্ফল হতে বাধ্য। সমাজের গ্লানি আমার ব্যক্তিগত জীবনে গ্লানি সৃষ্টি করবেই, সমাজের স্বাস্থ্য ছাড়া আমার ব্যক্তিগত জীবনকে সুস্থ করে তোলা অসম্ভব। আমাদের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় এই কথা কী ভাবে প্রকট রূপ ধারণ করেছিলো তাঁর স্মৃতি নিশ্চয়ই আমাদের মন থেকে মুছে যায়নি। একটা সময় গিয়েছে যখন কালোবাজার থেকে চাল না কিনলে, কালোবাজার থেকে ওষুধ না কিনলে, কলকাতা শহরে বেঁচে থাকাই দায় হয়ে উঠেছিলো। কালোবাজারকে প্রশ্রয় দেওয়া দুর্নীতির লক্ষণ; অথচ যাঁরা প্রশ্রয় দিতে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁরা যে সবাই দুর্নীতিপরায়ণ তা নিশ্চয়ই নয়। এঁদের মধ্যে অধিকাংশই ব্যক্তিগতভাবে সাধু ও সৎ। তবু দুর্নীতিকেই প্রশ্রয় দিতে হয়েছিলো। তাঁর কারণ, সামাজিক গ্লানির সামনে ব্যক্তিগত সাধুতার সেদিন চরম পরাজয়। তখন অবোধ্য দেশের দুঃসময় – সঙ্কটের সময়। কিন্তু সঙ্কটের সময়েই সত্যতা প্রকট হয়ে পড়ে। 

শুধুমাত্র স্বাভাবিক ও সুস্থ পারিবারিক জীবন গড়ে তোলবার মধ্যেই আলোচ্য পরিতৃপ্তি সম্ভবপর, কিন্তু বর্তমান সমাজের বাস্তব পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক ও সুস্থ পারিবারিক জীবন গড়ে তোলায় বাঁধা আছে। তাঁর প্রধান কারণ হলো, বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতিতে নারীজাতির স্থান। স্ত্রী-শূদ্রের বেদে অধিকার নেই – এমনতরো কথা সরাসরি বলতে অবশ্য আজ অনেকেরই রুচিতে বাধবে। কিন্তু এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মেয়েরা সামাজিকভাবে মুক্ত নয়। আমাদের দেশে তো ননই, এমনকি ইউরোপের ধনতান্ত্রিক দেশগুলিতেও নয়।

শ্রেণীসমাজের কাছে নারীজাতির পবিত্রতা রক্ষার প্রয়োজন অত্যন্ত গুরুতর। কেননা, শ্রেণীসমাজের ভিত্তিই হলো ব্যক্তিগত সম্পত্তি, আর তাই এই ব্যক্তিগত সম্পত্তির নির্ভুল উত্তরাধিকারী নির্ণয় করাই শ্রেণীসমাজের একটি বড়ো মাথাব্যথা। একই কারণে, শ্রেণীসমাজে নারীর জীবনের উপর অতি-সতর্ক নিষেধাজ্ঞা। নারী তাই দুর্লভ সামগ্রী, দুর্লভ বলেই লোভনীয়, লোভনীয় বলেই তার ছবির লোভ দেখিয়ে যে-কোনো পণ্যবস্তুকেই ব্যাজারে কাটানো সহজসাধ্য। ফলে অবস্থাটা মোটের উপর এক উৎকট পরিহাসের মতোই হয়ে দাঁড়িয়েছে; নারীজীবনের শুচিতা রক্ষা করার তাগিদই নারীকে আজ পরম পণ্যে পরিণত করছে। 

এই দিক থেকে নিষিদ্ধ কথার আলোচনা আর নিষিদ্ধ দেশের আলোচনা, এ-দু’-এর মধ্যে আরও যোগাযোগ চোখে পড়ে। কেননা দুরকম নিষিদ্ধতা জারির সঙ্গেই শ্রেণীশোষণের সম্পর্ক আছে, যদিও অনেক সময় তা অচেতন। সোভিয়েতের কথাকে নিষিদ্ধ করার পিছলে শোষকশ্রেণীর স্বার্থ অবশ্যই প্রকট। কিন্তু যৌনজিজ্ঞাসার বিরুদ্ধে যে প্রতিবন্ধ তাঁর পিছনে শোষকশ্রেণীর স্বার্থটুকু অতো প্রকট বা স্পষ্ট নয়। 

আজকের দিনে নরনারীর সম্পর্কে যে-গ্লানি, যে-ব্যর্থতা – আদিম শ্রেণীহীন সমাজে তার পরিচয় ছিলো না। এই গ্লানির সঙ্গে শ্রেণীসমাজের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক। 

শ্রেণীসমাজের গ্লানিটা ঠিক কী রকম? শ্রেণীসমাজ দেখা দেবার সময় থেকেই স্ত্রীপুরুষের স্বাভাবিক সত্তাকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির চাহিদার কাছে গৌণ করা হয়েছে। সমাজে প্রকাশ্যভাবে নরনারীর সম্পর্ককে যতটুকু স্বীকার করা হয় তা নিছক নির্ভুল উত্তরাধিকারী সৃষ্টি করবার জন্যে, সহজ সুস্থ জীবনের জন্যে নয়। শ্রেণীসমাজে এর বাইরে যৌনজীবনকে যতটুকু লুকিয়ে স্বীকার করা, তা সোজাসুজি নগদ মূল্যের বিনিময়ে। 

মোটের উপর, শ্রেণীসমাজে নারীর মুক্তি নেই বলেই নরনারীর সম্পর্কটা সহজ ও সুস্থ হবার সুযোগ পায়নি। যৌনপ্রবৃত্তি হয় উত্তরাধিকারী সৃষ্টি করায় নিযুক্ত, আর না হয় তো নগদ পণ্যের কারবারে পর্যবসিত। যৌনপ্রবৃত্তিকে এই যে সম্পত্তি রক্ষার কাজে নিয়োগ করা, বা নগদ মূল্যের পণ্য করে তোলা, এর মধ্যেও শ্রেণীশোষণের চিহ্নই বর্তমান। 

এইখানে একটা কথা খুব স্পষ্টভাবে মনে রাখা দরকার। সামন্ততান্ত্রিক সমাজের তুলনায় ধনতন্ত্রের ওই আওয়াজ – যৌনমুক্তির দাবি, ব্যক্তিগত যৌন প্রণয়ের দাবি – অনেক প্রগতিশীল। কিন্তু এই প্রগতিও আপেক্ষিক, চরম প্রগতি নয়। কেননা সামন্ততন্ত্রের তুলনায় ধনতন্ত্র স্বর্গ হলেও সমাজতন্ত্রের তুলনায় নরকই। যৌন সম্পর্কের বেলাতেও একি কথা। 

এই হলো এঙ্গেলস-এর বিশ্লেষণ যৌন মুক্তির আদর্শ পুঁজিবাদী সভতারই আদর্শ অথচ এই আদর্শকে বাস্তবে পরিণত করবার যে অনিবার্য শর্ত – স্ত্রী-পুরুষের মধ্যে সামাজিক সাম্যের প্রবর্তন – তা ওই ধনতান্ত্রিক সমাজের কাঠামোকেই সঙ্কটাপন্ন করতে চায়। এঙ্গেলস বলছেন, ধনতান্ত্রিক সমাজের গভীরে যে অন্তর্দ্বন্দ্ব তারি আণবিক সংস্করণ হলো আজকের নরনারী-সম্পর্কের অন্তর্দ্বন্দ্ব। 

পৃথিবীতে আর কোনো দেশে আর কখনো গণিকা-সমস্যা সমাধান করবার চেষ্টায় গণিকাদের এই দৃষ্টিতে দেখবার চেষ্টাই করা হয়নি (যেমনটা সোভিয়েতে হয়েছিল)। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে, এবং বিপ্লবের আগে পর্যন্ত রুশ দেশেও গণিকা-প্রথা উচ্ছেদ করবার যে সব চেষ্টা হয়েছে সেগুলোর প্রত্যেকটির বেলায় সরকারী হামলাটা গিয়ে পড়েছে গণিকাদের উপরি সবচেয়ে বেশি। সোভিয়েত পরিকল্পনায় প্রকাশ্য গণিকা আর তথাকথিত সাধারণ মেয়েদের মুক্তি-ব্যবস্থার মধ্যে এমন কোনো জাতিগত তফাত করা হয়নি। সামাজিক মেহনতের মর্যাদা ফিরে না পেলে মেয়েদের মুক্তি নেই, সাধারণ মেয়েদেরও নয়, গণিকাদের তো নয়ই। তাই গণিকা আর অ-গণিকা নির্বিচারেই সোভিয়েত সমাজে মেয়েদের মুক্তিসংগ্রাম।

১৯২৩শে সোভিয়েতে ‘গণিকাপ্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রামের ব্যবস্থা’ শুরু হলো। সেই ব্যবস্থায় মূল কথাঃ

ক) ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ‘শ্রমিক আত্মরক্ষা বাহিনী’ যেমন করেই হোক চাকরি থেকে শ্রমিক-মেয়েকে ছাড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা বন্ধও করতে বাধ্য হবে। কোনো অবস্থায় কোনো মেয়েকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করা চলবে না। 

খ) দেশে তখন দারুণ অর্থনৈতিক সমস্যা; তবুও অন্যথা মেয়েরা সবাই কাজ পাবে কেমন করে? এই সমস্যার আংশিক সমাধান হিসেবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে সমবায় কারখানা আর খামার খোলবার নির্দেশ দেওয়া হলো। 

গ) সমস্ত মেয়েই যাতে স্কুল ও ট্রেনিং সেন্টারে যোগ দেয় সেই উদ্দেশ্যে সবাইকে প্রচুর উৎসাহ দিতে হবে; কারখানার কাজে বা অন্যান্য পেশায় যোগ দেবার বিরুদ্ধে মেয়েদের যে কুসংস্কার তার বিরুদ্ধে প্রবলভাবে লড়বে প্রতিটি ইউনিয়ন। 

ঘ) যে সব মেয়েদের নির্দিষ্ট বাসাবাড়ি নেই বা যারা গ্রাম থেকে শহরে এসেছে তাঁদের প্রত্যেকের থাকবার জন্যে ‘বাড়ি সংক্রান্ত কর্তৃপক্ষ’ সোমবার বাসস্থান স্থাপন করবে। 

ঙ) অনাথ-অনাথা, শিশু এবং বালিকাদের রক্ষাব্যবস্থা যথাসম্ভব ভালো করে করতেই হবে। 

চ) রতিজ রোগ ও গণিকাবৃত্তির কুফল যে কতখানি এ-সম্বন্ধে জনসাধারণকে স্পষ্টভাবে সচেতন করবার জন্যে সাধারণভাবে অজ্ঞান ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে হবে, যাতে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে এগুলোকে দূর করবার ইচ্ছে জনগণের মধ্যে যথেষ্ট প্রবল হয়ে ওঠে। 

কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ কিছুদিনের মধ্যেই এই ক’টি ব্যবস্থার সঙ্গে আর তিনটি নতুন ব্যবস্থা যুক্ত করলেনঃ

১) জার আমলে গণিকাদের বিরুদ্ধে নানারকম শাস্তিমূলক আইন ও ব্যবস্থা ছিল; আইন এবং পুলিশী-কর্মপন্থা থেকে সেই সমস্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলতে হবে। 

২) যেসব পরজীবীরা গণিকা-ব্যবসা থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উপার্জন করে থাকে, দেশ থেকে তাদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলবার জন্য কঠোরতম ব্যবস্থা করতে হবে। 

৩) রতিজ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্যে দেশের সমস্ত ডাক্তার এবং চিকিৎসা-ব্যবস্থাকে বিনামূল্যে সকলের কাছে সুলভ করতে হবে। 

… জীবনের আসল সমস্যার গোড়া ধরে ওরা ঝাঁকানি দিয়েছে। তাই সমাধানের পথে এগোতে পেরেছে সবরকম সমস্যার। সব রকম সমস্যার মধ্যে যৌন-সমস্যাও। এই কথাটা না বুঝলে যৌন-সমস্যার সোভিয়েত সমাধানকে বুঝতেই পারা যাবে না। এই কথাটা না বুঝলে আমার বাংলার যে যৌন-সমস্যা তা সমাধান করবার আসল পথ খুঁজে পাওয়াই সম্ভব নয়। 

(শুধুমাত্র সোবিয়েৎ বানানকে সোভিয়েত-এ পরিবর্তিত করা ছাড়া লেখার সমস্ত বানান অপরিবর্তিত।)

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *