A sketch by Khytul Abyad. 1

ভিন্নীকরণ এবং কাশ্মীরি মহিলাদের আত্ম-পরিচিতি: কাশ্মীর অঞ্চলের ঐতিহাসিক ভ্রমণকাহিনী এবং লোকসঙ্গীত বিষয়ে একটি আলোচনা

গবেষক মির মিরান গুলজার এবং সৈয়দ উবেদুল রহমানের লেখা এই নিবন্ধটি ওয়ানডে ম্যাগাজিনে একটি নিবন্ধ সিরিজের মধ্যে প্রথম। ভ্রমণকাহিনী এবং লোকগানের বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঐতিহাসিকভাবে কাশ্মীর এবং কাশ্মীরি মহিলাদের উপর প্রাচ্য এবং ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির পর্যালোচনা করা হয়েছে এই নিবন্ধে। কীভাবে কাশ্মীর ভূখণ্ড এবং কাশ্মীরি নারী বারবার বিভিন্ন উপনিবেশিক এবং ক্ষমতাসীন শক্তির কাছে নিছকই সৌন্দর্য বা চাহিদার রূপক হিসাবে নির্মিত হয়েছে, সেই বার্তাই তুলে ধরেছে এই নিবন্ধটি। মুল লেখাটি পড়া যাবে  এখানেঃ https://www.wandemag.com/representation-kashmiri-women-travel-accounts-kashmir-folk-songs/
ছবি : খ্যিতুল আবিয়দ

বিশ্বের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে নিপীড়ক শক্তি আর শাসনের উপায় হিসাবে ঔপনিবেশিকতা, প্রায় সবসময়ই শুরু হয়েছে সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে। ঔপনিবেশিকতাবাদের শুরু শুধু যে উপনিবেশের জনগণের রাজনৈতিক ভাগ্যই নির্ধারণ করে তা নয়, বরং “উপনিবেশিকৃত অপর” হিসাবে তাঁদের পরিচিতি স্থির করে দেয়, তাঁদেরকে “অদ্ভুত, ব্যাখ্যাহীন, জংলি, অসভ্য” হিসাবে দাগিয়ে দেয়। ঔপনিবেশিকের দর্শনের প্রভাব “আত্ম” এর উল্টোদিকে “অপর” এর ধারণাকে কেন্দ্র করে এক স্বাভাবিকত্ব তৈরি করে দেয়। 

প্যালেস্তিনিয়-আমেরিকান লেখক এডওয়ার্ড সইদ তাঁর ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত বই ওরিয়েন্টালিজম-এ, এই “ভিন্নীকরণ”-এর প্রক্রিয়াকে বিনির্মাণ করে দেখান পাশ্চাত্য কীভাবে প্রাচ্যকে শুধু রাজনৈতিক, সামাজিক, সামরিক, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক আর অর্থনৈতিক দিক থেকেই জয় করেনি, বরং আরো গভীরে সাহিত্য, সিনেমা এবং কল্পনার দিক থেকেও জয় করেছিল। 

ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর সঙ্গে গলা মিলিয়ে সইদ বলেন, “সাহিত্য অরাজনৈতিক নয়, বরং এক ধরনের ‘ক্ষমতার ইচ্ছে’-র প্রকাশ। উপনিবেশীকরণের ‘সভ্য’ করে তোলার লক্ষ্যকে ন্যায্যতা দিতে হাতিয়ার হিসাবে যা ব্যবহার হয়।” তাঁর বইয়ের মূল কাঠামো তাই হয়ে ওঠে প্রাচ্যবিদদের লেখায় উপনিবেশিকৃত মানুষকে কী কী ভুল ভাবে দেখানো হয়েছে, তা তুলে ধরা। 

সাহিত্যে মহিলাদের পরিচিতি, তাঁদের কীভাবে দেখানো হয়েছে তা চিরকালই উত্তর-ঔপনিবেশিক নারীবাদী সমালোচকদের বিশ্লেষণেবিষয় হিসাবে উঠে এসেছে। সাহিত্যে মহিলাদের যে চিত্র উঠে আসে, তা সবসময়েই পুরুষের প্রেক্ষিত থেকে লেখা হয়ে এসেছে। এরকম পরিস্থিতিতে কাঠামোর ঊর্ধ্বে ক্ষমতার সম্ভাবনার জায়গায় বারবার “ক্ষমতাশালী” আর ক্ষমতাহীন” এই দ্বৈততাই প্রকট হয়ে পড়ে। 

তাত্ত্বিক এবং নারীবাদী সমালোচক গায়ত্রী স্পিভাক তাঁর “ক্যান দ্য সাব-অল্টার্ন স্পিক?” প্রবন্ধে সঠিকভাবেই বলেছেন মহিলাদের “দ্বিগুনিশ্চুপ, দ্বিগুণ প্রান্তিক” করে দেওয়া হয়েছে। প্রাকৃতজনদের ঐতিহাসিক শিকড়কে কীভাবে ছিঁড়ে ফেলা হয়, কীভাবে তাঁদের চুপ করিয়ে দেওয়া হয় – তার উপরেও তিনি আলোকপাত করেছেন। এই বিচারে নিম্নবর্গের পরিচয় ঔপনিবেশিক ছায়ার আড়ালে থেকে যায়। তার উপর পরিচয়ে মহিলা হলে তিনি থেকে যান গভীরতর ছায়ার অন্তরালে। 

এই বিচার থেকে, এই প্রবন্ধের সিরিজে আমরা কাশ্মীরি মহিলাদের নিয়ে মুঘল এবং ইয়োরোপীয় পর্যটকদের লেখা বিচার করে এই ধরনলেখায় “ভিন্নীকরণ”, “প্রাচ্যীকরণ” জাতীয় বিষয়গুলোকে নিয়ে আলোচনা করব। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে আমরা ভারতীয়দের বিবরণকেও বিচারের আওতায় আনব। আমরা দেখাব কীভাবে স্বাধীনতার পরেও কাশ্মীর এবং কাশ্মীরি মহিলাদের নিয়ে একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ধরে রাখা হয়েছে, তাঁদের নিজস্ব পরিচয়ের বৈশিষ্ট্য মুছে দিয়ে ভারতীয় পরিচিতির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ভারতের উপনিবেশ হিসাবে, কাশ্মীর এবং বিশেষত কাশ্মীরি মহিলারা এখনও ভারতীয়দের চিন্তার পরিসরে, ঔপনিবেশিক কল্পনায় “অদ্ভুত সুন্দর” হিসাবে বিরাজ করেন।

এই প্রবন্ধে আমরা দেখাব যে এই ধরনের শক্তিশালী অদ্ভুতের ধারণা তৈরির পিছনে যথেষ্ট পরিমাণে বস্তুগত বিনিয়োগ করা হয়েছে। আমরা এই প্রবন্ধের সিরিজে কাশ্মীরের একেবারে প্রথম ঔপনিবেশিক সাক্ষাতে থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককাল অবধি নানা লেখাপত্রের বিশদ বিবরণ দিয়ে এই নির্মিত “অপর” এর ধারণাকে উন্মোচিত করতে চাই। কিন্তু তার পাশাপাশি আমরা চাই কাশ্মীরি মহিলাদের ‘অচেনা’ কণ্ঠ (তাঁদের সম্পর্কে ভুল ধারণা ভাঙতে যা নিজেই যথেষ্ট) অনুসরণ করে এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যের তালিকাকে আরো বর্ধিত করা। এই ধারাকে অনুসরণ করলে কীভাবে কাশ্মীরি মহিলারা ঔপনিবেশিকদের হাতে ভুলভাবে চিত্রায়িত হয়েছেন, এবং এখনও হয়ে চলেছেন, তা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁরা নিজেদের যেভাবে তুলে ধরেছেন, তা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের লিঙ্গভিত্তিক “অপর”-এর ধারণা বা প্রাচ্যবাদী “অদ্ভুত”-এর ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীতে অবস্থিত। লোকগানের মাধ্যমে সাহিত্যে তাঁদের যে অবদান তা বারবার ছোট করে দেখানো হয়েছে। অথচ, তা মহিলাদের সম্পর্কিত নানা বিষয়ের উপর, এবং রাজনৈতিক প্রতিরোধ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারাভাষ্য। এই প্রবন্ধে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করব, যেমনঃ কাশ্মীর এবং কাশ্মীরিদের নিয়ে লেখা ঔপনিবেশিক বিবরণ কতটা বাস্তবসম্মত? এই ধরনের লেখাগুলোকে কি নিরপেক্ষ, প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে বিচার করা যায়? এই ঔপনিবেশিক বর্ণনায় কাশ্মীরি মহিলাদের অবস্থান কী? কাশ্মীরি মহিলাদের স্বর যদি থেকেই থাকে, তবে তা অচেনা থেকে যায় কেন? কেনই বা কাশ্মীরকে নিয়ে লেখা ঔপনিবেশিক বিবরণ কাশ্মীরকেই ছাপিয়ে যায়?

কেন কাশ্মীর, কেন কাশ্মীরি মহিলা?

আমি চাই আমার যাত্রাপথ নিয়ে যাব কাশ্মীর,

টমাস মুর যেথায় বলেছেন,

ভূস্বর্গ কোথাও যদি থেকে থাকে

তবে তা এখানেই! তবে তা এখানেই!

আশা করি এমন ছবি তুলতে পারব

ইংল্যাণ্ডে পাঠাতে যা লজ্জা পাব না।

(স্যামুয়েল বোর্ন, ফটোগ্রাফি ইন দ্য ইস্ট, ১৮৬৩)  

বিদেশী শক্তির সঙ্গে একেবারে প্রথম সাক্ষাত থেকেই কাশ্মীর ঔপনিবেশিক দৃষ্টির সম্মুখীন হয়েছে। মুঘলদের ক্রমাগত প্রচেষ্টায় ১৫৮৬ সালে কাশ্মীর মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। তার পর থেকে মুঘল সাহিত্য কাশ্মীরকে নিয়ে এক অদ্ভূত, রোম্যান্টিক চিত্র গড়ে তোলে। এই চিত্রকে পলায়নী ধর্মতত্ত্বর (escapism-theology) সঙ্গে মেলানো যায়। এই ধারণার মূল বক্তব্য অনুযায়ী মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিই হল এই জঞ্জালে ভরা পৃথিবী থেকে আমাদের আপন গৃহে, স্বর্গে, ফেরত যাবার। এই কারণেই মুঘল সম্রাটরা পবিত্র কুরানের স্বর্গের বিবরণ অনুসারে কাশ্মীরে নানা সাজানো বাগান নির্মাণ করেন। কাশ্মীর হয়ে দাঁড়ায় মুঘলদের ফিরদৌস (স্বর্গ), ভারতীয় সমতলভূমির নির্মম গ্রীষ্ম থেকে দূরে চিরশান্তির, বিরতির স্থল। কুরানে বর্ণিত স্বর্গ সুন্দর, মনোরম, ঐন্দ্রিক – এই ইসলামী স্বর্গের ধারণা দ্বারা চালিত হয়েই কাশ্মীরের বাগান বানানো হয়েছিল। পবিত্র কুরানে স্বর্গের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে  “চিরসুখের জায়গা” বলে (১৩ঃ২৩)। সেখানে রয়েছে “পুষ্পশোভিত বসন্ত” (৮৮ঃ১০-১৬),  “কলুষহীন বারিধারা” (৪৭ঃ১৫) যুক্ত “বহতা নদী” (৫ঃ১১৯)। কাশ্মীর যদি সেই স্বর্গ হয়, তাহলে কাশ্মীরের মহিলারা সেই স্বর্গের হুরী অপেক্ষা কিছু কম হলেন না। সুতরাং রোম্যান্টিক ভাবনা শুধু ভূপ্রকৃতিতে আটকে থাকল না, বরং ঔপনিবেশিক দৃষ্টি আরো প্রসারিত হয়ে গিয়ে পড়ল উপনিবেশীকৃত শরীরের উপর। কাশ্মীরি ঔপন্যাসিক এবং পণ্ডিত নিতাশা কৌল এই নিয়ে তাঁর “ইন্ডিয়াজ অবসেশন উইদ কাশ্মীরঃ ডেমোক্রেসি, জেন্ডার, (অ্যান্টি)-ন্যাশনালিজম” প্রবন্ধে তাই বলছেন, “কাশ্মীরের এলাকার অদ্ভুতীকরণের (exoticization) মধ্যে এক বিশেষ লিঙ্গভিত্তিক উপাদান রয়েছে, যার ফলে কাশ্মীরের ভূপ্রকৃতি, কাশ্মীরি শরীরের নারীকরণ ঘটে।”

কাশ্মীরের প্রকৃতির এই যে অদ্ভুতীকরণ, তা কাশ্মীরকে জয় করবার ঔপনিবেশিক ইচ্ছা জাগিয়ে তোলে। পাশাপাশি একইরকম সমস্যাজনকভাবে কাশ্মীরের নাগরিকদেরও স্রেফ সৌন্দর্যবর্ধক বস্তুতে পরিণত করে। অথচ পরবর্তী ঔপনিবেশিকরাও দ্বিধাহীনভাবে একই কাজ করে গেছে। কাশ্মীর আর কাশ্মীরের মহিলাদের অদ্ভূত সৌন্দর্য সম্পর্কে মুঘলদের তৈরি করা ধারণা ইয়োরোপীয় ভূখণ্ড অবধি পৌঁছে যায়, এবং ইয়োরোপীয়দের মধ্যে কাশ্মীরকে জানার আগ্রহ তৈরি করে। কিন্তু একইসঙ্গে প্রাচ্যে ইয়োরোপসুলভ কাশ্মীরের উপস্থিতি সৌন্দর্যের ইয়োরোপকেন্দ্রিক সংজ্ঞাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়, এবং পশ্চিমী দুনিয়ার কাছে সমস্যাজনক হয়ে ওঠে। ইয়োরোপীয় শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে তাই ইয়োরোপীয়রা কাশ্মীরে তৈরি করলেন এক নিকৃষ্টতর ইয়োরোপ। কাশ্মীর হয়ে উঠল “প্রাচ্যের ভেনিস”, কাশ্মীরের অধিবাসীদের উৎপত্তি নিয়ে থিওরি বানানো হল যে তাঁরা কোনো এক অতীতে পারসী আর গ্রীকদের  থেকে জাত। 

কাশ্মীর নিয়ে ভারতীয়দের বিবরণে আমরা দেখতে পাই কীভাবে কাশ্মীরিরা, আরো বিশেষভাবে কাশ্মীরি মহিলারা ঔপনিবেশিক দৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে হয়ে ওঠেন কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতিবিম্ব, পর্যবাসিত হন নীরব নান্দনিক বস্তুতে। কাশ্মীরি নারী হয়ে ওঠেন “কাশ্মীরের কুঁড়ি”, ঠিক ভূপ্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মতো ঔপনিবেশিক পর্যটকের সমাদরের বস্তু। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থেকে প্রবোধ, শান্তি লাভ করার ইচ্ছা বাড়তে বাড়তে এলাকার মানুষকেও গ্রাস করে ফেলে, তাদেরকে ঔপনিবেশিক কল্পনার বস্তুতে পরিণত করে দেয়।

মহিলাদের বাস্তব রূপান্তরিত হয় পুরুষদের ইচ্ছায় (ঔপনিবেশিক বা স্থানীয়)। আর এই চিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে একজন মহিলা তাঁর বৌদ্ধিক সত্ত্বা, তাঁর “প্রকৃত প্রবৃত্তি” থেকে আলাদা হয়ে পড়েন। তিনি তাঁর এই নির্মিত ভাবমূর্তি – সরলসাদা, দুর্বল, অপ্রয়োজনীয় – আত্মস্থ করে ফেলেন। উত্তর ঔপনিবেশিক তত্ত্বের উপর অনেকটা ভিত্তি করে লেখা “দ্য লাফ অব মেডুসা” প্রবন্ধে এলেন সিক্স্যু বলেছেন নারীর মন অনেকটা নিষিদ্ধ এলাকার মতো – এমন এক অন্ধকার ভূখণ্ড যেখানে তাদের নিজেদেরই ঢোকার অধিকার নেই। নিজের মন থেকে এই বিচ্যুতির ফলে তাঁর শরীর, তাঁর প্রকৃত পরিচয় তাঁর নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে ওঠে, তিনি পুরুষতান্ত্রিক ধারণার ফাঁদে পা দেন। এইরকম পরিস্থিতিতে একজন মহিলা, অন্য যে মহিলা পুরুষতন্ত্র নির্মিত বিবরণের সঙ্গে খাপ খান না, তাঁর প্রতি অসন্তোষ বোধ করতে থাকেন। তার ফলে মহিলারা নিজেদের সমাজ গড়ে তুলতে পারেন না, বিভক্ত থেকে যান, এই লিঙ্গভিত্তিক নির্মাণ চুরমার করে ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারেন না। সিক্স্যু আরো বলেন, মহিলারা নিজেদের “প্রকৃত সত্ত্বা” না বুঝতে পারা অবধি মেয়েলি লেখা উঠে আসা সম্ভব না। মনস্তত্বের বিচারে ভাবলে তাঁদের “প্রকৃত সত্ত্বা” এক্ষেত্রে অচেতনের মধ্যে অবদমিত হয়ে থাকছে। এই অবদমিত সত্ত্বা বেরিয়ে আসার পরেই নিজের দেহকে মেনে নেওয়া সম্ভব, নারীত্বর প্রকাশ ঘটানো সম্ভব। 

কাশ্মীরি সমাজের সমবেত কণ্ঠস্বর হিসাবে লোকগানের মধ্যে এই “দ্বিগুণ ঔপনিবেশিকীকরণ” ভেঙে বেরিয়ে আসার, প্রকৃত নারীত্ব পুনরুদ্ধার করার প্রবণতা রয়েছে। লোকগান আমাদের ইতিহাসের গভীর উৎস হবার পাশাপাশি অতীতের সমবেত স্মৃতি রক্ষা করে, অলিখিত ইতিহাসের ফেলে যাওয়া ফাঁকফোকর পূরণ করতে সাহায্য করে। ঔপনিবেশিক ইতিহাস শুধু যে বাস্তবের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলে তাই নয়, বরং আমাদের ইতিহাস, আমাদের প্রতিনিধিত্বকে ধ্বংস করে। এই পরিস্থিতিতে লোকগানের মাধ্যমে কাশ্মীরি মহিলাদের আত্মপরিচিতির প্রকাশ আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কাশ্মীরি মহিলার কণ্ঠ পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে চাপা পড়ে যাওয়া রণনাদকে জাগিয়ে তোলে, তাঁর শোষণকে জ্ঞাত করে তোলে। তিনি শুধু তাঁর অবদমিত ইচ্ছার কথাই বলেন না, বলেন নানা সামাজিক রাজনৈতিক সমস্যার কথা। তাঁর কণ্ঠ তাঁকে প্রতারিত-র তকমা থেকে তুলে বের করে আনে – তিনি প্রাচ্যবাদের যা মূল ভিত্তি, সেই শরীরের অদ্ভুতীকরণকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেন।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *