পিতৃতন্ত্রের হিংসা: যুদ্ধ, ধর্ষণ, নারী

এই লেখা যখন লিখছি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত আফগান সরকারকে যুদ্ধে হারিয়ে তখন সদ্য আফগানিস্তানের মসনদের দখল নিয়েছে তালিবান গোষ্ঠী। এই যুদ্ধ চলার সময়ে এবং যুদ্ধোত্তর রাষ্ট্র-গঠন প্রক্রিয়ায় মহিলা খেলোয়াড়, সাংবাদিক, পুলিশকর্মী থেকে শুরু করে গৃহবধূদের সামরিক, সামাজিক, ও যৌন হিংসার শিকার হওয়ার প্রসঙ্গ সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে রোজ। 

তবে আফগানিস্তান ব্যতিক্রম নয়। পৃথিবীর যে কোনও জায়গাতেই মহিলারা যুদ্ধবিগ্রহের একটা বড় শিকার হন। মহিলাদের ধর্ষণ করা সামরিক হিংসার একটা মাধ্যম হয়ে উঠেছে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে। এর উদাহরণ সুদূর অতীতের ক্রুসেডের যুদ্ধ (১১-১৩ শতক) ও মঙ্গোল আক্রমণ (১৩-১৪ শতক) থেকে শুরু করে হাল আমলের মার্কিন-ভিয়েতনাম সংঘর্ষ (১৯৫৪-১৯৭৫) ও বসনিয়ার যুদ্ধে (১৯৯২-১৯৯৫) ছড়ানো। এই ঘটনা কেন ঘটে, এর পিছনে পিতৃতন্ত্রের কী ভূমিকা, তারই উত্তর খুঁজব এই লেখার পাতায় আমাদের পরিচিত এক উদাহরণের মধ্যে দিয়ে – ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণ

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পশ্চিম পাকিস্তান (আধুনিক পাকিস্তান)-এর সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তান (আধুনিক বাংলাদেশ)-এর দুই থেকে চার লক্ষ বাঙালী মহিলাকে ধর্ষণ করেছিল। যুদ্ধ শুরু হলে পশ্চিম পাকিস্তানের ফৌজ গ্রামের পর গ্রামে অভিযান চালিয়ে এই ধর্ষণকাণ্ড চালায়। অনেক ক্ষেত্রে পাকিস্তানি সামরিক ছাউনিতে মহিলাদের নিয়ে এসে আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করা হয়। পাকিস্তান সরকারের তৈরী আধা-সামরিক আল-বদর, আল-শামস, ও রাজাকার বাহিনীও এই কাজে হাত মেলায়।

ধর্ষণের পর বহু মহিলাকে খুন করা হয়, আবার অনেক মহিলা লজ্জায় ঘৃণায় আত্মহত্যা করেন নিজেরাই। অনেকেই গর্ভবতী হয়ে পড়েন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের বেশ কিছু রাজনৈতিক নেতা ‘বীরাঙ্গনা’ বলে এই ধর্ষিত মহিলাদেরকে সামাজিক সম্মান দিতে চেষ্টা করলেও বেশীরভাগ ধর্ষিতা মহিলাকেই ‘বারাঙ্গনা’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করে আরও নির্যাতনের দিকে ঠেলে দেয় সদ্যজাত বাংলাদেশের সমাজ, যেন তাঁদের উপর দৈহিক নির্যাতনের জন্য তাঁরা নিজেরাই দায়ী। বহু ক্ষেত্রেই এই নির্যাতিত মহিলারা আর কোনও দিন নিজেদের পরিবার বা বাসস্থানে ফিরে যেতে পারেননি। বর্তমান বাংলাদেশে এই মহিলাদের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে রাষ্ট্রের দ্বারা সম্মানিত হলেও নিজেদের সমাজে কটুক্তি, দুর্ব্যবহার, ও ঘৃণার শিকার।

কেন এই যুদ্ধে এত বড় সংখ্যায়, এত বীভৎস ভাবে এই ধর্ষণকাণ্ড ঘটে? কেনই বা ধর্ষিত মহিলাদের প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশের সমাজ? এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে পৌরুষ ও নারীত্বের ধারণার মানে কী, আর তারপর ভাবতে হবে যুদ্ধে ধর্ষণকে কীভাবে ও কেন অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এর প্রথম ধাপ হিসাবে দেখা দরকার পিতৃতন্ত্র কীভাবে যুদ্ধের ক্ষেত্রে পুরুষ ও মহিলার জন্য আলাদা আলাদা ভূমিকা তৈরী করে দেয়।

যুদ্ধ ও লিঙ্গ-পরিচয়

যুদ্ধ করেন মূলতঃ পুরুষরা। আমরা এটা দেখতে এতটাই অভ্যস্ত, যে আমাদের কাছে অনেক সময়ই তা অস্বাভাবিক ঠেকে না। কিন্তু আসলে এর মধ্যে স্বাভাবিকত্ব নেই কিছুই; বরং তা পিতৃতন্ত্রের তৈরী করা লিঙ্গ-রাজনীতির একটা প্রকাশ। বিজ্ঞান বলে, গড়ে মহিলাদের গায়ের জোর পুরুষদের গায়ের জোরের থেকে সামান্য কিছু কম। আন্দাজ করা যায়, তাই হয়ত সভ্যতার প্রথম দিকে পুরুষরা লড়াইতে অংশগ্রহণ করতেন বেশী; তুলনামূলকভাবে মহিলারা অন্যান্য নানা দায়িত্ব সামলাতেন। কিন্তু ক্রমে সমাজে পুরুষতন্ত্র গড়ে উঠতে শুরু করলে এই ধরনের কাজের আলগা ভাগাভাগি পাকাপাকি ব্যবস্থা হয়ে উঠতে থাকে। এরই অংশ হিসাবে লড়াই করার কাজটাকে প্রায় পুরোটাই দখল করে নেয় পুরুষরা; মহিলাদের উপর তারা ন্যস্ত করে সংসার সামলানো, সন্তান মানুষ করা, রান্নাবান্না করার মতো বাড়ির অন্দরমহলের নানা দায়িত্ব। 

এই পাকাপাকি শ্রমবিভাজনের ফলে সামাজিক পরিসরে লিঙ্গ-পরিচয়ের ধারণা পুষ্ট হয়। একদিকে যেমন পৌরুষ প্রদর্শনের একটা উপায় হিসাবে চিহ্নিত হয় যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তি বা হিংসা প্রদর্শন, অন্যদিকে নারীত্ব সংজ্ঞায়িত হয় কোমলতা, সহ্যশক্তি, যত্ন করার মানসিকতা দিয়ে। ফলে ইতিহাসের বিভিন্ন যুদ্ধে রক্ষক ও আক্রমণকারীর ভূমিকায় বারবার প্রত্যক্ষভাবে অবতীর্ণ হন মূলতঃ পুরুষরা; যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে কম পারার ফলে মহিলাদের ভূমিকা হয়ে ওঠে মূলতঃ পরোক্ষ – হয় তাঁরা পুরুষদের দ্বারা রক্ষিত, নয় আক্রান্ত। যেহেতু প্রজননের মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যান মহিলারা, পিতৃতন্ত্র মনে করায় যে সমাজকে পবিত্র রাখার জন্য মহিলাদের পবিত্র রাখা জরুরি। সমাজের পবিত্রতা রক্ষা করার জন্য তাই নানা নিয়মের বেড়াজাল তুলে মহিলাদের শরীর, ভাবনা, ও জীবন নিয়ন্ত্রণ করা হয়। মহিলারা হয়ে ওঠেন রক্ষা করার বস্তু, পুরুষরা হয়ে ওঠেন তাঁদের রক্ষাকর্তা।

ছবি ১: Vintage WW1 postcard ‘Britannia with flag’ Thomas Campbell poem. Gale & Polden | Collectables, Postcards, Military। Source: Pinterest

পিতৃতন্ত্রের সংজ্ঞায়িত পুরুষ ও মহিলার এই আলাদা ভূমিকার একটা চেহারা ফুটে ওঠে যুদ্ধের শিল্পকর্মে, যা যুদ্ধের সময়ে বিভিন্ন রাষ্ট্র ব্যবহার করে সৈন্যবাহিনীতে যোগদান করার জন্য পুরুষদের অনুপ্রাণিত করতে। ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপিকা পার্ল জেমসের গবেষণার উপর ভিত্তি করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের থেকে কয়েকটা উদাহরণ দিই। ইংল্যান্ডের একটি পোস্টকার্ডে (ছবি ১) মহিলার চিত্রায়ণ হয় কাল্পনিক দেশমাতা রূপে, নিজেকে রক্ষা করার জন্য তিনি সেখানে তাঁর পুত্রসন্তানসম নৌ-সৈনিকদের ডাক দিচ্ছেন।

ছবি ২: ‘Remember Belgium. Enlist To-day’, 1914. Source: National Army Museum, Study collection.

অন্যদিকে একটি বৃটিশ পোস্টারে (ছবি ২) ফুটিয়ে তোলা হয় বেলজিয়ামে জার্মান বাহিনীর হাতে মহিলাদের লাঞ্ছনার ছবি; উদ্দেশ্য নিজেদের দেশের মহিলাদের সুরক্ষিত রাখার জিগির তুলে বৃটিশ পুরুষদের ফৌজে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করা। আবার মার্কিন একটি পোস্টারে (ছবি ৩) এক লাস্যময়ী তরুণীকে যৌনতার প্রতীক হিসাবে তুলে ধরা হয়, “অশ্বত্থামা হত, ইতি গজ”-এর মতো করে তাকে দিয়ে বলানো হয়, “আমি তোমাকে চাই, নৌবাহিনীর জন্য’। এই ধরনের পোস্টারে পিতৃতন্ত্রের ঠিক করে দেওয়া বিভিন্ন ভূমিকায় মহিলাদের ফুটিয়ে তুলে পুরুষদের সেই পিতৃতন্ত্রেরই নির্ধারিত পৌরুষের ধারণায় সুড়সুড়ি দেওয়া হয়। ফলে পুরুষ কখনও ফৌজে ভর্তির খাতায় নাম লেখাবার তাড়না অনুভব করেন আদর্শ নাগরিক-সন্তান হিসাবে রূপকথার দেশমাতাকে বাঁচাতে, কখনও বাস্তব জীবনের মা-বোন-মেয়েকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য, আবার কখনও আকর্ষনীয় নারীর কামনার বস্তু হয়ে উঠতে।

ছবি ৩: 1917. I want you for the Navy promotion for anyone enlisting, apply any recruiting station or postmaster: United States recruiting poster for women to enlist in the Navy, World War I. Source: Wikimedia.org

মুক্তিযুদ্ধ, ধর্ষণ, গণহত্যা

এবার ফিরে আসা যাক মুক্তিযুদ্ধে বিপুল সংখ্যক ধর্ষণের প্রসঙ্গে। মনে হতে পারে, যেহেতু সৈনিকরা প্রায় সব সময়েই পুরুষ, তাই পরাজিত গোষ্ঠীর মহিলাদের তারা আক্রমণ করবেই যৌন খিদে মেটাতে। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, এই ব্যাখ্যা সরলীকৃত। এর মাধ্যমে কয়েকটা বিক্ষিপ্ত ধর্ষণের ঘটনা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানী ফৌজের হাতে কয়েক লাখ বাঙালী মহিলার ধর্ষণের কারণ খুঁজতে গেলে অন্যভাবে ভাবতে হবে। এই বিপুল সংখ্যক ধর্ষণ ও যৌন অত্যাচারের ঘটনাকে আচমকা ঘটে যাওয়া যুদ্ধের একটা অনভিপ্রেত দিক হিসাবে না দেখে সুপরিকল্পিত ও সচেতনভাবে বেছে নেওয়া সামরিক সংঘর্ষের একটা অস্ত্র হিসাবে দেখা দরকার। 

সুজান ব্রাউনমিলারের মতে ধর্ষণের প্রধান লক্ষ্য এক মহিলার উপর এক পুরুষের ক্ষমতা ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। ইতিহাসের বেশীটা জুড়েই যেহেতু সৈনিকরা পুরুষ, তাই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিজয়ী পুরুষ পরাজিত গোষ্ঠীর মহিলাকে ধর্ষণ করার মাধ্যমে পরাজিত গোষ্ঠীর উপরে তার আধিপত্য কায়েম করতে চায়। খুনের তুলনায় ধর্ষণ আক্রমণকারীর পক্ষে নিরাপদ বেশী – ধর্ষণের ফলে প্রমাণ হিসাবে কোনও লাশ তৈরী হয় না, অনেক সময় ধর্ষণ হয়েছে কিনা প্রমাণ করা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়, এমনকি ধর্ষিত মহিলারা লজ্জার কারণে অনেক সময় স্বীকারও করেন না ধর্ষণের কথা। 

মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালী জনগোষ্ঠীর উপর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকবর্গ ও সামরিক মহলের জাতিবিদ্বেষ। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের আধা-মুসলমান বা সংকর মুসলমান ভাবতেন, কারণ পোশাকআশাক, ভাষা-সংস্কৃতি, ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের দিক থেকে তারা পূর্ব ভারতের হিন্দু জনগোষ্ঠীর কাছাকাছি। আর পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু সমাজকে তাঁরা দেখতেন সন্দেহের চোখে; অনেকেই ভাবতেন যে পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীনতার দাবীর ওঠার জন্য দায়ী এই হিন্দুরাই। যুদ্ধের শুরুতে তাই পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকমহল ও সেনাবাহিনীর একাংশ ঠিক করে, একদিকে পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু মহিলাদের ধর্ষণ করে হিন্দু সমাজকে ধ্বংস করে দিতে হবে, অন্যদিকে মুসলমান মহিলাদের ধর্ষণ করে তাদের সমাজকে গায়ের জোরে ‘প্রকৃত মুসলমান’ করে তুলতে হবে।

দুই ক্ষেত্রেই ধর্ষণের আরেকটা বাড়তি লক্ষ্য ছিল প্রজননের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত, ‘প্রকৃত মুসলমান’ এক প্রজন্ম তৈরী করা। যুদ্ধের শেষে পরাজিত এক পশ্চিম পাকিস্তানী সৈনিকের ভাষায়, তারা চলে যাচ্ছে, কিন্তু নিজেদের বীজ তারা রেখে যাচ্ছে বাংলাদেশে। এর থেকে স্পষ্ট হয়, পশ্চিম পাকিস্তানের ফৌজের কিছু অংশের উদ্দেশ্য ছিল ধর্ষণের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীর জাতিগত চরিত্র পালটে দেওয়া। লিসা শারলাখের মতে তাই এই ধরনের যুদ্ধকালীন ধর্ষণকাণ্ড গণহত্যার সামিল।  

যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজ ও দ্বিতীয় ধর্ষণ 

কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ধর্ষিত বাঙালী মহিলাদের প্রতি তাঁদের নিজেদের সমাজের যে অপমানের কথা আগে বলেছি, তার কারণ কী? আসলে ধর্ষণের মতো এর পিছনেও রয়েছে নারীর শরীরের বিষয়ে পিতৃতন্ত্রের তৈরী করা সামাজিক মনোভাব। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ও সেনাবাহিনী বিশ্বাস করত যে মহিলাদের ধর্ষণ করলে তাঁরা অপবিত্র হয়ে যান ও নিজেদের সমাজকে কলুষিত করেন। লাখ লাখ মহিলাকে ধর্ষণ করা তাই পশ্চিম পাকিস্তানী ফৌজের কাছে ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সমাজকে কলুষিত করে তার মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার একটা উপায়। কিন্তু এই একই পিতৃতান্ত্রিক ধারণা বাংলার সমাজেও বর্তমান। এই কারণেই যুদ্ধ শেষ হলে বাংলাদেশের সমাজ ধর্ষিত মহিলাদের সসম্মানে ফিরিয়ে না নিয়ে তাঁদের বেশীরভাগকেই অপবিত্র ‘বারাঙ্গনা’ বলে প্রত্যাখ্যান করে, যাতে তারা নতুন জাতিরাষ্ট্রের সমাজকে কলুষিত না করতে পারে। নয়নিকা মুখার্জির গবেষণা থেকে জানা যায়, নিজের সমাজের শুদ্ধতা রক্ষা করার জন্য সদ্যগঠিত বাংলাদেশী রাষ্ট্র একদিকে ধর্ষণের ফলে গর্ভবতী হয়ে পড়া বহু মহিলার গর্ভপাত করায়, আর অন্যদিকে ধর্ষণজাত যুদ্ধ-শিশুদের অনেককে আমেরিকা ও ইউরোপের নানা দেশে পাঠিয়ে দেয় দত্তক নেওয়ার উদ্দেশ্যে।

ছবি ৪: মুক্তিযুদ্ধের প্রায় অর্ধশতক পরে ২০১৯ সালে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়া কয়েকজন বীরাঙ্গনা
সূত্রঃ https://bangla.dhakatribune.com/

একভাবে দেখলে ধর্ষণের ঘটনার মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রের লড়াই জায়গা করে নেয় মহিলাদের শরীরে; তাঁদের শরীরই যেন হয়ে ওঠে বিজয়ী ও পরাজিত গোষ্ঠীর পুরুষদের লড়াইয়ের জায়গা। পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতায় মহিলাদের রক্ষা করার কর্তব্য পুরুষের; সেই কাজে ব্যর্থ হয়ে হার স্বীকার করে লজ্জায় মাথা হেঁট করেন পরাজিত গোষ্ঠীর পুরুষরা, আর পরাজিত মহিলাদের শরীরের উপর কর্তৃত্ব কায়েম করে সেখানে নিজের বিজয়পতাকা ওড়ায় বিজয়ী গোষ্ঠী। সুজান ব্রাউনমিলারের নজরে তাই এই যৌন হিংসার প্রত্যক্ষ লক্ষ্য ধর্ষিত মহিলারা হলেও পরোক্ষ লক্ষ্য তাঁদের সমাজের পুরুষরা। মহিলাদের রক্ষা করার লড়াইতে হেরে যাওয়া পুরুষদের কাছে ধর্ষিত এই মহিলারা হয়ে ওঠেন নিজেদের পৌরুষের হারের প্রতীক। জাতির সম্মান ফিরিয়ে আনার জন্য এবং পুরুষদের পৌরুষ ফের প্রতিষ্ঠা করার জন্য এই মহিলাদের প্রত্যাখ্যান করা জরুরি হয়ে পড়ে। এর ফলে ধর্ষিত মহিলাদের সারা জীবন ধরে যে বিদ্রূপ ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়, তা ভয়াবহ। লিসা শারলাখের মতে এ যেন শত্রুর হাতে একবার ধর্ষিত হওয়ার পরে নিজের সমাজের হাতে দ্বিতীয়বার ধর্ষিত হওয়ার বেদনার শামিল। 

যুদ্ধের পরিসরে মহিলাদের ধর্ষণের উদ্দেশ্য তাই বিবিধ হলেও তার আসল ভিত্তি একটাই – পিতৃতন্ত্র, যা বরাবরই মহিলাদের শরীর ও মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় সমাজে পুরুষের আধিপত্য কায়েম রাখার জন্য। পিতৃতন্ত্রকে সম্যকভাবে ধ্বংস না করলে তাই যুদ্ধে বারবার মহিলাদের আক্রান্ত হওয়া বা যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজে তাঁদের নির্যাতিত হওয়া, কোনওটাই ঠেকানো দুষ্কর।

 

উল্লেখপঞ্জিঃ 

  • Branche, Raphalle, and Fabrice Virgili (eds), Rape in Wartime (Basingstoke and New York: Palgrave Macmillan, 2012).
  • Brownmiller, Susan, Against Our Will: Men, Women and Rape (New York: Fawcett Columbine, 1975).
  • James, Pearl, ‘Images of Femininity in American World War I Posters’, in James (ed.), Picture This: World War I Posters and Visual Culture (Lincoln and London: University of Nebraska Press, 2009), pp. 273-311.
  • Mookherjee, Nayanika, ‘‘Remembering to Forget’: Public Secrecy and Memory of Sexual Violence in the Bangladesh War of 1971’, Journal of the Royal Anthropological Institute, vol. 12, no. 2 (2006), pp. 433-450.
  • Mookherjee, Nayanika, ‘Available Motherhood: Legal Technologies, ‘State of Exception’ and the Dekinning of ‘War-Babies’ in Bangladesh’, Childhood, vol. 14, no. 3 (2007), pp. 339-354.
  • Mookherjee, Nayanika, ‘Mass Rape and the Inscription of Gendered and Racial Domination during the Bangladesh war of 1971’, in Branche and Virgili (eds), Rape in Wartime, pp. 67-78.
  • Sharlach, Lisa, ‘Rape as Genocide: Bangladesh, the Former Yugoslavia, and Rwanda’, New Political Science, vol. 22, no. 1 (2000), pp. 89-102.

কভার ইমেজ: ফ্রান্সিসকো গোইয়া। No quieren (They do not want to). An elderly woman wields a knife in defence of a young woman who is being assaulted by a soldier. Source: Wiki.

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *