পিংকি গেল ইশকুলে

সুইডিশ লেখিকা আস্ত্রিড লিন্দগ্রেনের লেখা ‘পিপ্পি লংস্টকিং’-এর গল্প পড়ে আমি তো হতবাক। আহারে! এই মেয়েটা তো খুব চেনা চেনা! নামটা যেন পেটে আসছে মুখে আসছে না! কোথায় যেন দেখেছি? আমার তো যা ভুলো মন মাকে বলে ফেলি স্যার, স্যারকে বলে ফেলি পিসীমা! যাই হোক অনেক ভেবেচিন্তে তারপর মনে পড়ল, আরেহ! এ তো আমাদের সেই পিংকি তাগড়াইনাগড়াই। পিংকিকে তোমরা দেখেছো তো? আহা একটু মনে কর দিব্যি গড়গড়িয়ে সব মনে পড়ে যাবে। বড়রা হয়তো এইটে ‘আসল গলপ’ -র অনুবাদ না অনুরূপায়ন না অনুরূপের প্রতিরূপায়ন এইসব নিয়ে অনেক লম্বা চওড়া বক্তিমে ঝাড়তে পারে। তাই প্লিজ ওদের বিশেষ পড়তে টরতে দিও না। কিছু বলতে এলে বলবে – ‘এটা স্ট্রিক্টলি ছোটদের গল্প। প্রোহিবিটেড ফর এল্ডার্স। বড়দের পড়া মানা’।

ঘন্টা আর মিমি দুজনেই রোজ ইশকুলে যেত। সকাল আটটা বাজলেই তারা ভাইবোন হাত ধরাধরি করে বগলে বই-খাতা নিয়ে, পা টেনে টেনে, হাই তুলে তুলে, ইশকুলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ত। 

পিংকি সেই সময়ে হয় তার পোষা গরুটাকে জাবনা খেতে দিত, কিংবা ওর পোষা বাঁদর শ্রীমান নরেন্দ্রকে রংবেরঙের পোষাক পরিয়ে সাজাতে ব্যস্ত থাকত। কখনো বা ও সকাল সকাল খুউব মন দিয়ে  ব্যায়াম করত। কেমন ব্যায়াম করত? সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একটানা বিয়াল্লিশ বার ডিগবাজি খেত। তারপর ও শুনশান রান্নাঘরে পিঁড়ি পেতে বসে একবাটি চা আর নাড়ু-মুড়কি খেত। 

এদিকে ঘন্টা আর মিমি তো রোজ ইশকুল যাওয়ার পথে পিংকির বাড়ি “কুঞ্জ কুটির”-এর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জুলজুল করে দেখে। মনে মনে ভাবে ইশকুলে যাওয়ার বদলে যদি পিংকির সঙ্গে ওরা খেলতে যেতে পারত তবে কতই না ভালো হত। নিদেনপক্ষে পিংকি যদি ওদের সঙ্গে ইশকুলে আসত তাহলেও বেশ ভালো হত ব্যপারখানা।   

“শুধু ভাব পিংকি সঙ্গে থাকলে ইশকুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে কী মজাটাই না হত আমাদের,” বলল ঘন্টা। 

“সত্যি! শুধু ফেরার পথে নয়, যাওয়ার সময়ও দারুণ মজা হত!” বলে উঠল মিমি। 

তারা যত বেশি এই বিষয়টা নিয়ে ভাবে ততই তাদের মনখারাপ করে। শেষমেষ তারা ঠিক করল যে পিংকিকে বুঝিয়ে সুজিয়ে ইশকুলে আসতে রাজি করাতেই হবে। 

খুব বুদ্ধি করে ঘন্টা পিংকিকে বলল “জানিস, আমাদের দিদিমণি ভীষঅঅওণ ভালো”। ঘন্টা আর মিমি সেদিন বিকেলবেলা পড়াশুনা শেষ করে “কুঞ্জ কুটির”-এ পিংকির সঙ্গে খেলতে এসেছিল। “ইশকুলে খুব খুব মজা হয়। আমি ইশকুলে না যেতে পারলে তো দুঃখে পাগলই হয়ে যাই” ফুট কাটল মিমি। 

পিংকি এক গামলা জলে পা ডুবিয়ে একটা মোড়ার উপর বসেছিল। ওদের এইসব কথায় ও চুপ করে পায়ের আঙ্গুল নাড়িয়ে নাড়িয়ে চারিদিকে জল ছিটাতে লাগল। 

“আর তাছাড়া ওখানে বেশিক্ষণ থাকতেও হয় না” ঘন্টা বলেই চলল “মাত্র দুপুর দুটো অবধি”। 

“তাছাড়া গরমের ছুটি, পুজোর ছুটি, শীতের ছুটিও তো আছে”, যোগ করল মিমি।

পিংকি ওর ডানপায়ের বুড়ো আঙ্গুলটা মুখে পুরে ভাবতে লাগল কিন্তু মুখে কিছুই বলল না। তারপর হঠাৎ করে যেন ও মনস্থির করে ফেলল। গামলার গোটা জলটা হড়াস করে রান্না ঘরের মেঝেয় ও এমনভাবে ঢেলে দিল যে মেঝেতে বসে কুমকুমের শিশি নিয়ে খেলতে থাকা শ্রীমান নরেন্দ্রর প্যাণ্ট ভিজে ঝুপ্পুস! 

“এ কী ভীষণ অন্যায়” ভীষণ রেগে বলে উঠল পিংকি। নরেন্দ্রর কিচিরমিচিরে ও কোন পাত্তাই দিল না। “এই সব অন্যায় তো আমি সহ্য করব না! আমি তীব্র প্রতিবাদ করছি”। 

“কীসের বিরুদ্ধে?” জিজ্ঞেস করল ঘন্টা। 

“আর কয়েকমাস বাদেই পুজো, তোমরা সবাই তখন একটি গোটা মাস ছুটি পাবে। কিন্তু আমি? আমি কী পাব?” দুঃখী দঃখী গলায় বলতে থাকল পিংকি। “এক মাস তো কোন ছাড় একদিনের জন্যও পুজোর ছুটি জুটবে না আমার।” তারপর ঘোষণা করল “এর বিহিত একটা করতেই হবে। আমি কাল থেকেই ইশকুলে যাব”। 

সেই কথা শুনে ঘন্টা আর মিমি আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল। 

“বাহ রে বাহ! আমরা তাহলে কাল সকাল আটটায় তোর বাড়ির সামনে অপেক্ষা করব”।  

“ওরে বাবা না না,” পিংকি বলল “অত সকাল সকাল আমি যেতে পারব না বাপু। তাছাড়া আমি তো আর তোমাদের মত হেঁটে হেঁটে যাব না”।

যেমন কথা তেমন কাজ। পরেরদিন ঠিক সকাল দশটায় ও গরুটাকে গোয়াল থেকে টেনে বার করে আনল। আর তার খানিক পরেই ছোট্ট শহরতলির প্রতিটা বাড়ির প্রতিটা জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে সকলের চক্ষু চড়কগাছ। একটা খ্যাপা গরু কী দৌড়ানোটাই না দৌড়াচ্ছে। সবাই ভাবল গরুটা পাগল হয়ে দৌড়াচ্ছে কিন্তু আসলে ব্যপারটা মোটেও তা নয়। আসলে গরুটার পিঠে সওয়ার হয়ে পিংকি একটু চটজলদি ইশকুল যেতে চাইছিল। ওর অনেকটা দেরী হয়ে গিয়েছিল তো তাই। দুদ্দাড়িয়ে ইশকুল মাঠে ঢুকেই একলাফে গরুর পিঠ থেকে নেমে পড়ল পিংকি। তারপর একটা গাছের গায়ে বেঁধে দিল গরুটাকে। অবশেষে দড়াম করে ক্লাসঘরের দরজা খুলে, ঘন্টা, মিমি আর ওদের সব বন্ধুদের পিলে চমকে দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল পিংকি।  

“নমস্কার বন্ধুরা” চিৎকার করে বলল পিংকি ওর মাথার টুপিটা দোলাতে দোলাতে, “মাটিগণিত এর পড়া হয়নি তো এখনো? নাকিইই”? 

ঘন্টা আর মিমি ওদের দিদিমণিকে আগে থেকেই বলে রেখেছিল যে পিংকি তাগড়ানাগড়াই নামের একটা নতুন মেয়ে আজ ইস্কুলে আসবে। তাছাড়া পিংকির কথা দিদিমণি ছোট্ট শহরতলির অন্যান্য লোকের কাছেও শুনেছিলেন। তাছাড়া দিদিমণি খুবই চমৎকার ও নরম মনের মানুষ ছিলেন। তিনি ঠিকই করেছিলেন যেভাবেই হোক ইশকুলে পিংকিকে আপন করে নিতে হবে। 

কেউ কিছু বলার আগেই পিংকি ধপ করে একটা বেঞ্চে বসে পড়ল। তবে দিদিমণি ওর এই বেয়াদপিতে কোন পাত্তাই দিলেন না। তিনি খুবই মিষ্টি গলায় বন্ধুর মত বললেন “পিংকি, তুমি ইশকুলে এসেছ দেখে আমার খুবই ভালো লাগছে। আশা করি তোমারও খুব ভালো লাগবে আর অনেক নতুন নতুন জিনিস তুমি শিখতে পারবে”।  

“নিশ্চয়। আশা করি সবার মত আমিও একটা লম্বা পুজোর ছুটি পাব। আরে সেই লোভেই তো এলাম! ছুটি তো সবারই পাওয়া উচিত তাই না?”। 

“আচ্ছা সে হবেখন। তুমি আগে তোমার পুরো নামটা আমায় বল, তবেই তো আমি তোমায় ইশকুলে ভর্তি করে নিতে পারব” বললেন দিদিমণি। 

“আমার নাম পিংকিরাণী আগমনিয়া বাতায়ণে বিছরিমিছরি ইব্রাহিমবেটি তাগাড়ানাগড়াই। “সমুদ্রের সন্ত্রাস” ওরফে  ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম তাগড়ানাগড়াইয়ের একমাত্র মেয়ে আমি। তিনি অবশ্য এখন মানুষখেকোদের রাজা। পিংকি আমার ডাকনাম। বাবা আমায় পিংকি বলেই ডাকতেন”। 

 আচ্ছা বেশ, দিদিমণি বললেন, “তাহলে আমরাও তোমায় পিংকি বলেই ডাকব। কিন্তু আগে একটু দেখে নিতে হবে তুমি পড়াশুনা কতদূর কী জানো। আমরা বরং পাটিগণিত দিয়েই শুরু করি। আচ্ছা পিংকি বল তো সাতের সঙ্গে পাঁচ যোগ করলে কত হয়”? 

পিংকি একই সঙ্গে অবাক এবং বিরক্ত হয়ে তাকালো তারপর ঝাঁঝিয়ে বলে উঠল “এমা! তুমি নিজে যদি উত্তরটা না জানো আমি মোটেও তোমায় বলব না”।

সবাই শিউরে উঠে পিংকির দিকে তাকালো। দিদিমণি বললেন যে ইশকুলে এইভাবে দিদিমণিদের মুখে মুখে উত্তর দেওয়াটা নিয়ম নয়। এবং দিদিমণিকে “দিদি” বলে ডাকাটাই দস্তুর। 

সে কথা শুনে পিংকি বলল “সরি সরি আমি না আসলে এই নিয়মগুলো জানতাম না। আর আমি এরকমভাবে কথা বলব না”। 

“আমিও তাই আশা করি”, দিদিমণি বললেন “এবার শোনো – সাত আর পাঁচ যোগ করলে বারো হয়”। 

“তুমি তো উত্তরটা জানতে তাহলে আমাকে আবার জিজ্ঞাসা করলে কেন? এই যাঃ দেখেছ আবার তোমায় দিদি বলতে ভুলে গেলাম, ধুস” এই বলে পিংকি জিভ টিভ কেটে নিজেই নিজের কান মুলে নিল।

দিদিমণি এইসবে পাত্তা দিলেন না। তিনি বললেন, “আচ্ছা পিংকি বলত আট আর চারে কত হয়”? 

“বোধহয় ছেষট্টি” পিংকি আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ল। 

“ভুল। আট আর চার যোগ করলে হয় বারো” বললেন দিদিমণি। 

“দাঁড়াও দাঁড়াও মাসীমা এ কিন্তু তোমার বড্ড বাড়াবাড়ি, বলল পিংকি “এক্ষুনি বললে সাত আর পাঁচে বারো হয় এখন আবার বলছো আট আর চারেও বারো?! ইশকুলে কি কোন নিয়মকানুন মাথামুণ্ডু নেই? এইসব ছেলেমানুষী ঠাট্টায় যদি তোমার মজা লাগে তাহলে দয়া করে এককোণে গিয়ে নিজের মনে আঁক কষো আর আমাদের একটু কানামাছি খেলতে দাও। এবাবাআআআ তোমাকে দিদিমণি বলতে আবাআর ভুলে গেলাম,” চিৎকার করে উঠল পিংকি “এই শেষবার এবারের মত ক্ষমা করে দাও, আমি আসলে বারবার ভুলেই যাচ্ছি”। 

দিদিমণি ক্ষমা করে দিলেন ঠিকই কিন্তু তাঁর মনে হল পিংকিকে এক্ষুনি আর পাটিগণিতের প্রশ্ন করা ঠিক হবে না। তিনি অন্য ছেলেমেয়েদের প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। 

“ঘন্টা তুমি বল ”, তিনি বললেন “যদি লিপির কাছে সাতটা আম থাকে আর আসিফের কাছে নয়টা আম থাকে, তাহলে তাদের কাছে মোট কটা আম আছে?”

“হ্যাঁ ঘন্টা, শুনি শুনি তোমার উত্তরটা” ফোড়ন কাটল পিংকি “তাছাড়া এটাও বলো –  যদি লিপির চেয়ে আসিফের বেশি পেট কামড়ায় তাহলে দোষটা কার হল? আর তাছাড়া আমগুলো ওরা কার বাগান থেকে ঝেঁপেছিল?” 

দিদিমণি এমন ভাব করলেন যেন তিনি কিছু শুনতেই পাননি। মিমির দিকে ফিরে তিনি বললেন “আচ্ছা বেশ মিমি তুমি বল – গাবলু ওর ইশকুলের বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে গেল। ও পাঁচ টাকা নিয়ে বেরিয়েছিল আর দেড় টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরল। কত টাকা ও খরচ করেছিল?” 

“এই তো!” পিংকি বলল “আমিও জানতে চাই! সত্যিই তো, গাবলু এত খরুচে কেন ছিল? অতগুলো টাকা সব কি ও হজমি কিনেই উড়িয়ে দিল? বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে গাবলু খাওয়া দাওয়া করে বেরিয়েছিল তো?” 

এইবারে বাধ্য হয়ে দিদিমণি ঠিক করলেন পাটিগণিত শেখানো বন্ধই করে দেবেন। পিংকিকে বোধহয় পড়তে শেখানো ভালো হবে। তিনি একটা মিষ্টি খরগোশের ছবি বের করে দেখালেন। তারপর বললেন “খ” এ হয় খরগোশ।   

“এবাবা এটা আবার খরগোশ নাকি! ” বলল পিংকি “এটা তো দেখে মনে হচ্ছে একটা ডিমের মাথায় দুটো কান গজিয়েছে আর চোখ নাক ফুটেছে, এরম গুঁফো ডিম আবার হয় নাকি”?  

তখন দিদিমণি খরগোশের ছবি সরিয়ে অন্য একটা ছবি বের করলেন। ছবিটা ছিলো একটা সাপের। সেটা দেখিয়ে দিদিমণি বললেন “স” দিয়ে সাপ হয়। 

“সাপের সম্বন্ধে যেটা বলার” বলল পিংকি “আমি সেবার সুন্দরবনে একটা বিরাট সাপের সঙ্গে কুস্তি লড়েছিলাম। সাপটা খুবই সাংঘাতিক ছিল। চল্লিশ ফুট লম্বা আর রাগে গড়গড় করছিল। বললে বিশ্বাস করবে না প্রতিদিন সাপটা পাঁচটা করে মানুষ খেত, সঙ্গে মুখশুদ্ধি হিসেবে দুটো করে ছোট বাচ্চা”। 

“সে তো আমাকেই মুখশুদ্ধি করে খেতে চাইল- যেই না আমায় পেঁচিয়ে ধরল আমার হাড়গোড় সব যেন মড়মড় করে উঠল- কিন্তু আমি তো সাতসমুদ্র পার করেছি আমার সঙ্গে পেরে উঠবে কেন? লাগালাম মাথায় চটাস করে এক চাঁটি- যতই সে হিসহিস ফোঁসফাঁস করে – ততই আমি তাকে ঠ্যাঙ্গাই – চটাস পটাস- দুমদাম- তারপর ফুস করে সে ব্যাটা একেবারে মরেই গেল, ফুল অক্কা। তাহলে স দিয়ে বুঝি সাপ হয়? দারুণ ব্যপারটা তো”! 

এত কথা একসঙ্গে বলে পিংকি একটু দম নেওয়ার জন্য থামল। অগত্যা পড়াশুনার পাট চুকিয়ে দিদিমণি ছেলেমেয়েদের ছবি আঁকতে বললেন। মনে মনে তিনি পিংকিকে ভীষণই অবাধ্য ও দুষ্টু মনে করলেন। ভাবলেন এইবার অন্তত পিংকি নিশ্চয়ই চুপচাপ বসে ছবিটবি আঁকবে। সবাইকে কাগজ পেনসিল বের করে দিলেন তিনি। “যা ইচ্ছে করছে তাই আঁকো” এই কথা বলে উনি হোমওয়ার্কের খাতা দেখতে বসলেন। একটু পরে চোখ তুলে দেখেন পিংকি মেঝে জুড়ে ছবি আঁকছে এবং বাকি ছেলেমেয়েরা সব গোল করে পিংকিকে ঘিরে ওর কাণ্ড দেখছে। 

অধৈর্য গলায় দিদিমণি বললেন “একি পিংকি তুমি পাতায় না এঁকে মেঝেতে আঁকছ কেন”? 

“পাতাটা তো সেই কখোওওন শেষ হয়ে গেছে। আমি তো আমার গরুটার ছবি আঁকছি, ওটা তো ওইটুকু পাতায় আঁটলই না” বলল পিংকি “এখন তো কেবল সামনের পা দুটো আঁকছি লেজ টা আঁকতে আঁকতে বোধ হয় বারান্দায় গিয়ে উঠব”। 

দিদিমণি কিছুক্ষণ গভীরভাবে ভাবলেন। 

“আচ্ছা আমরা তো সবাই মিলে একটা গান গাইতে পারি, তাই না”? তিনি বলে উঠলেন। ছেলেমেয়রা গান গাওয়ার জন্য যে যার জায়গায় উঠে দাঁড়ালো। শুধু পিংকি মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে রইল। সে বলল “তোমরা বরং গান গাও, আমি একটু গড়িয়ে নেই। এতো পড়াশুনা করলে তো পালোয়ানদেরও হাতপা ঝিমঝিম করবে”। 

দিদিমণি এইবার একেবারে ধৈর্য হারিয়ে ফেললেন। তিনি পিংকির সঙ্গে আলাদা কর কথা বলবেন বলে বাকি সব ছেলেমেয়েদের মাঠে খেলতে পাঠিয়ে দিলেন। 

পিংকি এবার গুটিগুটি পায়ে দিদিমণির টেবিলের সামনে হাজির হল। 

তারপর সে বলল “বুঝলেন কিনা, আজ্ঞে ইয়ে কী জানি বলে… দিদিম…।। আমার এখানে এসে তোমাদের সঙ্গে মিশে খুবই ভালো লাগল কিন্তু মনে হয় আমি আর ইশকুলে আসব না। আমার দরকার নেই পুজোর ছুটির। এত আম আর খরগোশ আর সাপ-টাপ সব মাথার মধ্যে আমার তালগোল পাকিয়ে গেছে। তুমি কিছু মনে কোরো না প্লিজ”।  

দিদিমণি কিন্তু বললেন যে উনি বেশ আশাহত হয়েছেন। মূলত পিংকির ব্যবহারের জন্য। আর এইরকম ব্যবহার কেউ করলে তাকে তো ইশকুলে আসতে চাইলেও আসতে দেওয়া যাবে না। 

“আমি কি খুব খারাপ ব্যবহার করেছি”? পিংকি অবাক হয়ে বলল “আমি তো সে কথা বুঝতেই পারিনি” মুখ চুন হয়ে গেল ওর। ওকে বড্ড দুঃখী মনে হচ্ছিল সে সময়। 

তারপর একটুখানি চুপ করে থেকে ও কাঁপা কাঁপা গলায় বলল “আসলে আমার মা তো আশমানে তারা হয়ে গেছে আর বাবাও মানুষখেকোদের রাজা। আমিও তো সারাটা জীবন সমুদ্রে ভেসেই কাটিয়েছি। তাই এত মাটিগণি আর খরগোশের মধ্যে ঠিক কী করব বুঝতে পারছিলাম না”। 

তখন দিদিমণি বললেন যে তিনি সব বুঝতে পেরেছেন। তিনি আর পিংকির উপর রাগ করে নেই। বললেন – ‘আরেকটু বড় হয়ে তুমি অবশ্যই ইশকুলে এসো’। 

তখন একগাল হাসি নিয়ে পিংকি বলল “দিদিমণি তুমি খুব ভালো। তাই তোমাকে আমার একটা উপহার দিতে ইচ্ছে করছে”। 

এই বলে সে তার পকেট থেকে একটা সোনালী ঘড়ি বের করে দিদিমণিকে দিল। দিদিমণি বললেন এত দামী উপহার উনি নিতে পারবেন না।  

কিন্তু পিংকি বলল “নিতে তো তোমাকে হবেই নইলে আবার কালকে ইশকুলে এসে গোলমাল পাকাবো”। 

এই না বলে সে এক দৌড়ে মাঠে বেরিয়ে তড়াক করে তার গরুটার পীঠে চড়ে বসল। সব ছেলেমেয়েরা তাকে ঘিরে ধরে বিদায় জানাতে লাগল আর গরুটার গায়ে পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করে দিতে লাগল। 

“আরে আগরপাড়ায় ইশকুলগুলো এর চে ঢের বেশি ভালো” বুক ফুলিয়ে বলে চলল পিংকি। “একবার গিয়ে দেখতে পারো। সেখানে পুজোর ছুটির তিন দিন পরেই হয় শীতের ছুটি। আর শীতের ছুটির তিনদিন পরেই শুরু হয়ে যায় গরমের ছুটি। গরমের ছুটি আর পুজোর ছুটির মধ্যে অবশ্য দিন পনেরো ইশকুল থাকে তবু তখন বৃষ্টি পড়ে বলে ইশকুল হয় না। আর অল্প যেকটা দিন হয় সহ্য করে নেওয়া যায় কারণ হোমওয়ার্ক দেওয়া হয় না। আগরপাড়ায় হোমওয়ার্ক একেবারে নিষিদ্ধ। কেউ যদি খাটের নিচে বসে লুকিয়ে লুকিয়ে হোমওয়ার্ক করার চেষ্টাও করে, মায়ের কাছে ধরা পড়লেই বেদম বকা খায়। আর সেই ইশকুলে পাটিগণিতের বালাই নেই। কেউ যদি দিদিমণির সামনে মুখ ফস্কেও বলে ফেলে সাতের সঙ্গে পাঁচ মিলে বারো হয়, অমনি তাকে দেওয়ালের ধারে এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। আর কেবলমাত্র শুক্রবার বই পড়া হয়, যদি সাথে বই থাকে, সেটা অবশ্য কখোনোই থাকে না”। 

“তাহলে ইশকুলে তারা করে টা কী?” জিজ্ঞাসা করে একটা ছোট ছেলে। 

“লজেন্স খায়”, বলল পিংকি, “একটা লজেন্স কারখানা থেকে লম্বা পাইপে সারাদিন ক্লাসঘরে লজেন্স আসে, ছেলেমেয়েরা খেয়ে কুল করে উঠতে পারে না”। 

“কিন্তু দিদিমণি তাহলে কী করেন”? একটা মেয়ে জিজ্ঞাসা করে ওঠে। 

“আহা বুদ্ধুরাম, দিদিমণি লজেন্সের মোড়কগুলো ছাড়িয়ে দেয়। বাচ্চারা কী ওগুলো নিজেরা ছাড়াবে নাকি? দিদিমণিরা অনেকসময় নিজেরা না গিয়ে তাদের ভাইবোনদেরও পাঠিয়ে দেয়”।   

টুপিটা দুলিয়ে পিংকি খুশি মনে বলে “টাটা বাচ্চারা, এখন অনেকদিন আর তোমরা আমার দেখা পাবে না। শুধু আসিফ কটা আম খেয়েছিল সে কথা মনে রেখো কিন্তু, নইলে পস্তাবে, হা হা হা”। 

এই বলে মাঠের ধুলো উড়িয়ে, স্কুলবাড়ির জানলা কাঁপিয়ে হাসতে হাসতে পিংকি ইশকুল থেকে বেড়িয়ে পড়ে।

ছবি – ১ এবং ৩ উপাসনা চক্রবর্তী। ২ এবং ৪ স্নেহা বিশ্বাস

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.