একটি গান এবং…



 “ পালাই বহুদূরে/ ক্লান্ত ভবঘুরে…”

এমত অবস্থায় একখানা নির্জীব হৃৎপিণ্ড হঠাত ধ্বক ধ্বক করিয়া জানাইল “দীর্ঘস্বপ্নজ্বর” শব্দখানির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ এ ভুবনে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। আমি নদী খাইতে লাগিলাম কিন্তু নদীজাত ভূখণ্ডে কৃত্রিম পারিপাট্য দেখিয়া যন্ত্রণাকাতর আত্মকে কোনোরূপ সান্ত্বনা ছাড়াই পুরাতন ভাষ্যে নিক্ষেপ করিলাম। যদি কিছু মেরামত হইয়া আসে, যদি তাহার গাত্রে শূন্যতাকেও উৎসব বলিয়া মনে হয়। অযাচিত বারান্দা আমাকে নির্ঘুম হইতে ডাকিয়া তোলে । আমি তাহাকে আমার হস্ত পদের সকল সন্দেহ উপহার দিই। উপহার দিই ঈর্ষার সুগন্ধী যাহা চোখের অতিরিক্ত বুদ্ধির মৃতনাভী মাত্র। আমি তো তাহাকে তাহাদিগকে সহজিয়ার অহম দিই নাই । তাহারা তো আমার স্নায়ুজাত মগ্নতার গরল, একটি চিৎকারের চিৎকার মাত্র। সেইরূপ বলা যাইতে পারে … বলা যাইতে পারে… বলা কি যাইতে পারে? 

“ এমন যদি হত

   আমি পাখির মতো

   উড়ে উড়ে বেড়াই সারাক্ষণ”

কাতর … কাতর… বলিয়া সে ভাসিয়া যাইতে থাকে, আগুন আগুন বলিয়া ঝরিয়া যাইতে থাকে। মরিতে মরিতে বিকল্প জগতের ছায়ায় পা রাখিয়া নিশ্চুপে অনুভব করে বাঁচিবার স্তর সকল এবং মরিবার স্তর সকল কেহই তাহার যোগ্য নহে। সে ‘আমি আমি’ বলিয়া করতালি দিলে তাহার জানু হইতে ঘষিয়া মাজিয়া প্রণাম তুলিয়া দিই। হাসিতে হাসিতে শূন্য হইয়া উঠি। 

“বৃক্ষতলে শুয়ে

তোমার দুঃখ ছুঁয়ে

ঘুম আসে না ঘুমও স্বার্থপর”

সমস্ত সরলতা হত্যা হইয়া যায়। সমস্ত বিনম্র উড়িবার আলো শেষ হইয়া আসে। তাহার পর সবিস্ময়ে প্রত্যক্ষ হয় রোমকূপের অন্ধকারে প্রতিবন্ধী পাখিরা গান বাঁধিতেছে । যেসব ভাষা ব্যবহৃত হইতেছে , তাহাদের আমৃত্যু নদীস্পর্শ ঘটে নাই। নদীর ছায়াটুকু লইয়া তাহারা বুঝিতেছে কিছু সংখ্যা উলটাইয়া দিলে গানের ক্ষতিবৃদ্ধি তো হয়ই না উপরন্তু মহা সমারোহে বৃহৎ দুঃখের উদযাপন মধুর হয়। 

বৃক্ষতলে শুয়ে

বৃক্ষতলে শুয়ে

বৃক্ষতলে শুয়ে …

বৃক্ষ হইতে ঝিলিমিলি নামিয়া আসে, আচ্ছন্ন নামিয়া আসে। আশ্চর্য সংজ্ঞা বানাইব বলিয়া আমি অথবা সে অথবা তাহারা জীবনের ধর মুণ্ডু এক করি নাই। বরং সুপ্তির ভেতর নাচিয়া গাহিয়া বাতাস গায়ে জড়াইয়া বৃক্ষকে অক্ষর করিয়াছি । আদি অন্ত বিহীন একটি কালখণ্ড মাত্র করিয়াছি। বিষাদে টলমল টলমল সেই কালখণ্ডে একটি উচ্চারণ অপমানিত শব্দের গান হইয়া ভাসিয়া থাকে।

“তোমার দুঃখ ছুঁয়ে

বৃক্ষতলে শুয়ে

তোমার দুঃখ ছুয়ে”

আমি দুঃখের ভিতর নামিতে গিয়া সকল অক্ষর সরাইয়া দিলাম। সেটি একটি অবস্থানমাত্র হইল। সেইখানে শূন্য রচনা করিতে  হইবে। সে বড় সহজ নহে । তাহার চেয়ে আত্ম রচনা করা সহজ । আত্মকেই শূন্য বলিয়া মনে করিলাম। স্নায়ুতে স্নায়ুতে গরলের স্রোত আসিয়া গান হইয়া বাজিতে লাগিল। তুমি বৃক্ষ হইলে, আমি বৃক্ষ হইলাম । তুমি বৃক্ষপাখি হইয়া উড়িয়া গেলে। আমি বৃক্ষপাখি হইয়া শূন্য হইয়া গেলাম। নাকি আমার শূন্যে তুমি শূন্য হইয়া গেলে…

পালাই বহুদূরে 

ক্লান্ত ভবঘুরে

ফিরব ঘরে কোথায় এমন ঘর…

                                        

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *