চতুর্থ তোরণ

ডুবে যাচ্ছি স্বপ্নের মত কোন সমুদ্রে, রোজ ডুবে যাচ্ছি, কথা বলছি নিজেই নিজের সাথে সমস্ত কাজ, সমস্ত ব্যাধি, সমস্ত দায়িত্ব ভুলে এইভাবে তোমাকে অভ্যাস করছি, অথচ তুমি ভাবছ কিভাবে নেবে আমায়! এই তোমার পাঠপ্রবণতা!  আমি জীবনের মত শ্বাসরোধী ভালোবাসায় টেনে নামাবো তোমাকে এই নরকের রাজত্বে। দেখ প্রিয়তমা, বাড়াও আঙুল, ছুঁয়ে দেখ ভিন্ন এ রাজপথ একটিবারের জন্যে হলেও!

এ ঘোর বন্যা ছাপিয়ে দেখ সিসিফাস-সাঁতার। বিধ্বংসী কালজানিতে ভেসে যাওয়া শিশুদেহ পেরিয়ে দেখ, জানো ওদের কপালে পোলিও টিকাও জোটেনি, ভালই তো হয়েছে বল, ভেসে গেছে! তুমি বলবে, সরকারি ব্যবস্থা আছে, ওরা যায় নি, ওদের দোষ। ওদের নথি নেই, ওদের দোষ। 

ওরা মানুষ এটাই ওদের দোষ। অথচ দুয়ারে সরকার! অথচ হাজার গন্ডা কেন্দ্রীয়, রাজ্য প্রকল্প আর সীমান্তের কতটা কিলোমিটারে বাজবে জিপের আওয়াজ তা মেপে রাখা আছে! প্রতিটি তাঁতের সুতোয় একটানা লেখা হয়ে আছে সেই আঙুলধারীর নাম, যে ছিঁড়ে গেছে আগের রাতে তার স্বামীর প্রবল ভালোবাসায় আর পরেরদিন সেই যন্ত্রণা নিয়ে বুনে গেছে শাড়ি কি নিখুঁত মমতায়! আমি সেই শাড়ি তোমার জন্যে কিনতে গিয়ে হাউহাউ করে কেঁদেছি নিজের নিদারুণ অক্ষমতায়। সেই উপহার নেবে কি তুমি? নেবে কি আমার লজ্জা কিচ্ছু করতে না পারার, শুধু লিখে রাখা ছাড়া, শুধু দেখে যাওয়া ছাড়া! 

যেখানে উত্তুরে হাওয়া বয়, এমন তড়াগপথে

কে হেঁটে যায়, এই অবেলায়? 

একা বিষাদ প্রতিমা যেন, নিশ্চুপে উন্মাদপ্রায়!

তবু দেখ, আলো জ্বলজ্বল সারাটি কপালময়!

ভানুর চলে যাওয়া দেখি। পেছন থেকে ওর ঝুঁকে পড়া অপসৃয়মান শরীর দেখি। অদ্ভুত স্নেহ জাগে। সাইকেল তুলে নিয়ে ফিরতি পথে চলি। ভিড় পাতলা হয়ে এসেছে! ওফফফ! খুব একখানা লাটক হল বটে আজ! সরুবালাকে শেষপর্যন্ত সাতজন তাগড়া ছেলে মিলে বেঁধে ফেলতে পেরেছে। ওঝা অত্যন্ত পরিশ্রান্ত এবং আহত। কাল সকাল থেকে আবার শুরু করবে তার কাজ।  পাঁচিলহীন বাড়ি সরুবালাদের, ফলে সাইকেল থামিয়ে ধীরে ধীরে ওদের উঠোনে গিয়ে দাঁড়াই। সরুবালার স্বামী ওঝার খিদমৎ খাটতে ব্যস্ত আর তার মা মানে সরুবালার শাশুড়ি কোণের বারান্দায় নিঝঝুম, নিস্পৃহ। ওরা কেউই  খেয়াল করেনি আমায়। আমি একটু একটু করে ওদের বাড়ির পশ্চিমের আমগাছটার দিকে এগোতে শুরু করি যেখানে সরুবালাকে বেঁধে রাখা হয়েছে। ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াই। মাথা হেঁট, লোল গড়াচ্ছে মুখে, সিঁদূর লেপ্টে গেছে মুখে, সপসপে ঘামে ভেজা শরীর, মুখ লাল, যেন রক্ত ফেটে বেরোবে এখুনি, শুধু হাপরের মত শ্বাস উঠছে আর নামছে। সরুবালার স্বামী এতক্ষণে খেয়াল করেছে আমাকে, ইশারায় বলছে সরে যেতে, চলে যেতে। আমি সেইমত সরে যাব বলে ভেবে যেই এক পা পিছিয়েছি ঠিক তখনই সরুবালা মুখ তুলে সটান তাকাল আমার দিকে…

১০

কোন সুর নেই, কোথাও কোন সুর নেই শুধু একটানা কিটকিটকিটকিটকিটকিট আওয়াজে মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে। এই নিকষ নিকষ কালো, তল নেই শুধু প্রবল টানে তলিয়ে যাচ্ছি, থামতে পারছিনা আর  কোন নিস্তার নেই, এই অসহ্য শব্দ। ভাষা হারিয়ে যাছে, বোধ হারিয়ে যাচ্ছে, জিভে নুন, মুখে নুন, সমস্ত শরীর নোনা… কিটকিটকিটকিটকিটকিটকিটকিটকিটকিটকিটকিট

১১

“পটিতে পটি নিপটিতে টাং,

টাংসি টুংসি খুং খুং খাং খাং”।

এটা কি ভাষা আমি জানি না। বড়দি জানে, বড়দি মানে আমার বড়মাসির মেয়ে। বড়দির একটা পোষা ছাগল ছিল। কুড়িয়ে পেয়েছিল মাঠে। তার নাম ধলা। সাদা, ছটফটে একটা মিষ্টি ছাগল। ধলাকে পাড়ার ছেলেরা তুলে নিয়ে কেটে ফিস্টি করেছিল। বড়দি আমার কাজলকালো অপরূপা এক সুন্দরী শোলোক বলা দিদি। এখন প্রাইমারী স্কুলে পড়ায়। তো এই যে পংক্তি যা বড়দি শুনিয়েছিল আমাকে এর অর্থ হল- প্রতিমার সামনে থেকে সব সুন্দর, তাকে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়, পেছন থেকে দেখ শুধু কাঠামো আর এবড়ো খেবড়ো অসুন্দর, অযত্ন চোখে পড়ে যাবে। 

হইহই করে ঢাক বাজছে, প্রতিমা আসছে মন্ডপে আর আমি ভাবছি বড়দির বলা এই কথাগুলো আর ঢাক ছাপিয়ে এক অসম্ভব সুরেলা বাঁশি বেজে চলেছে। যেন কেউ নেই, কোন উৎসব নেই, শুধু এক অনন্ত বিসর্জনের ঘাটে এক টুকরো শেষ বিকেলের কনে দেখা আলো এসে থিতু হল। 

১২

সমস্ত শুকিয়ে যাচ্ছে এমন কোন গাছের দিকে তাকাও। দেখবে একটিমাত্র সবুজ পাতা নিয়ে তার কি প্রবল উচ্ছ্বাস৷ যেন এইমাত্র সে জন্মেছে আর ঘটনাপ্রবাহ সময়ের দরোজা খুলে দিয়েছে। ইচ্ছেমত তার অনুপ্রবেশ, ইচ্ছে মত তার ভ্রমণ। 

এইমাত্র সম্পূর্ণ হল এক আবর্তন। প্রতিটি শ্বাসের প্রক্ষেপে লেখা হয়ে যাচ্ছে দিস্তে দিস্তে ইতিহাস। অথচ সেই ইতিহাসে তুমি বা আমি কেউ নেই।

১৩

আশ্চর্য জলের গন্ধ! উঠছে নামছে কোলাহল পেরিয়ে। প্রতিটি মানুষ কি এভাবেই দেখে পরস্পরকে? 

১৪

ব্যা ব্যা ব্যা… 

অই কাজলাকালো মেয়েটির নাম শৈব্যা। 

-হেইডা কি ঠিক হইল কত্তা! আপনে তো কন নাই, আমিও আর যাই নাই অই ঠ্যারে ধান লইয়া। তার মইধ্যে জম্বুরা খাই লইছি, এ্যাহন কি যে ঢেক দিতেছে! কচু আনছি আপনার লগে বাইট্যা লন। 

-তোক কাটিয়া বাটিম। শালা আলসিয়ার ব্যাটা। 

ব্যা ব্যা ব্যা…

দিস্তে দিস্তে কাগজ ঝোলে বাঁশবাগানে লম্বা! 

-আমি ভানু রে, ঘুম থেকে উঠে পড়, পুকুরপাড়ে যাবি? 

– তুই? তুই এভাবে তো কথা বলিস না!  

তাহলে কিভাবে কথা বলি??? হাহাহাহাহা… 

ব্যা ব্যা ব্যা…

রক্তে রক্তে ভেসেছে আর কে বা? 

(চলবে)

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *