চতুর্থ তোরণ



১৫

-ওহে অতল জল, বল দেখি গুনে গুনে কজন হল?

-অগুনতি, হরি হে, অগুনতি!

– ওহে অতল জল, বল দেখি কজনের নাম জান?

– নামে কি যায় আসে, হরি হে, শরীর শুধু ডোবে!

– ওহে অতল জল, বল দেখি, খোঁজে কি তাদের কেউ?

– রাম রাম! খুঁজে কি হবে, কেউ কেউ খোঁজে, তারাও ডোবে, হরি হে, তারাও পোড়ে! 

১৬

এই দফায় তাহলে কোথায় বসি জানু পেতে? এই যে ‘ঘনঘোর উথাল পাথাল সময়’, পেছনের পথে ‘মরচে পড়ে যাওয়া আঁশবঁটি’ এইসব নাহয় কিছু উড়ো শব্দ, কিন্তু গল্পগুলো, জীবনগুলোকে ঠিক কোথায় বসান যায় বলুন তো! নেই ঠিকানার মানুষ যখন কোন পশুখামারে পৌঁছয় এবং তার আদৌ সেখানে কি প্রয়োজন সে নিজেও ঠিক জানে না, তাকে তখন কি বলে ডাকা উচিৎ? 

এইসব ভাবি আর ফুলের কাছ থেকে দু এক মুঠো হাসি নিয়ে আসি রোজ। এদিকে শহরে কারা যেন পথে পথে বেদম মার খাচ্ছে চাকরি নেই বলে। আমার পড়াশোনা এখনো শেষ হয়নি তাই গুছিয়ে রাখি লেখার কাগজ, খবর সরিয়ে দিই ফিডে এলে, বাগানে জল দিই আর কোথায় যেন মায়েরা বসে আছে সন্তানের গুলিবিদ্ধ শবদেহ নিয়ে। এইসমস্ত ঘটনা কাদের ভুলবশত যেন ঘটে যায়! দেশে স্মার্টফোন চলে যত দ্রুত, তত দ্রুত মাস চলে না মানুষের।  কিন্তু এসব আমার ভাবার কথা নয়, তাই আজকাল রোজ ফুলের কাছ থেকে দু এক মুঠো হাসি নিয়ে আসি। 

১৭

এত মেহনতের পর দাদা নিজেকেও আর চেনা যায় না, বুঝলেন কিনা! ভুখ লেগেছে মনমে ভি, আউর শরীরেও, বুঝলেন কিনা! এবার কিছু মাল পাঠান! ঘরে ঘরে তো অনেক। পয়দাকারনেওয়ালে কো ভি মালুম নেহি কিতনা পয়দা কিয়া হ্যায়! ওদের তো কাগজ বাগজ কুছ ভি নেই, তুলে আনুন! কে দেখতে যাবে! আর হাঙ্গামা হোলে তখুন দেখা যাবে, বুঝলেন কিনা! মাসের পর মাস এইখানে কি পচব বসে বসে! এঞ্জিন গরম রাখনা পড়েগা, বুঝলেন কিনা! 

১৮

ভবিষ্যতের মত উড়ে আসে আর জুড়ে বসে সে। গোল চত্বরের এই প্রগাঢ় বুদ্ধিবৃত্তির স্থানে ধীরে ধীরে মুছে যায় কবেকার ধলা নামের এক দুধসাদা ছাগলের স্মৃতি, তার বড়দির স্মৃতি, ভানুর সাদামাটা বিড়ি ফোঁকা। মরে পড়ে থাকে সময় নিস্তরঙ্গ ঝিলের পাশে। অদম্য হা হা হি হি, সুখের গান, নিরুচ্চারিত প্রেম, গিটার আর বইয়ের গন্ধে গন্ধে কত দূরের মনে হয় সদ্য কেটে আনা ধানের গন্ধ, দোফসলি জমি আর দুপুরের বাগানের ফুল। এদিকে সীমান্ত অথচ দেখ বেড়ে বেড়ে আজ মোহনার নদীর মত সুবিশাল। যে যায় মরে বেঁচে যায়, যে পড়ে থাকে রোজ বাঁচতে বাঁচতে মরে। মুখ বন্ধ, চোখ বন্ধ সময়ের এক পিঠে হাসি আর এক পিঠে শুধু সয়ে যাওয়া আর সইয়ে নিতে থাকা চির অন্ধকার। 

আজও চিৎকারের কোন বিনিময় প্রথা নেই। অতএব ভ্রান্তিময় কবিতা শুনে যাই। নিজেও কিছু লিখি। রাতে পাশ ফিরে শুই, তারপরে ওপাশ। 

১৯

সেই ঘটনার ঠিক তিনমাস পর সরুবালার লাশ পাওয়া যায় পুকুরপারে। এই তিনমাসের মধ্যে কোন ওঝা আর আসেন নি। তিনি পরের দিন সকালেই সরুবালার সমস্ত ভঙ্গর সারিয়ে দিতে পেরেছিলেন, শুধু সরুবালাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল দিনদশেকের জন্যে। ফিরে আসার পর সরুবালা গেরস্ত বাড়ির সুশীল বৌটির মত বেশ ছিল। শুধু মাঝে মাঝে পুকুর পারে দাঁড়িয়ে থাকত, আমরা খানিকটা দূরে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে লক্ষ্য করতাম। তবে কথা কিছুই হত না। তিনমাস পরে পুকুরপার ভিড়ে ভিড় সরুবালার জলে ফুলে ওঠা দেহ দেখতে।  

আগের দিন সন্ধ্যেয় ঝাঁপ দিয়েছিল। সকালে লাশ!  

২০

-উমরায় না কইল সেইদিন, তোমরা কিতা ভুলি গেইচেন?

– মন্নু বা! কুনদিন কইচে মোর তো ফমে নাই আর!

– মারি ফ্যালেয়া উত্তি ডাবরিত ফ্যালে থুইয়া গেইচে। 

 আন্ধারে ধান্ধারে ঘুরি বেড়াইচে, কাঙো জানে নাই কুত্তি কুত্তি গেইচে উঙায়! এদি ডোঙডোঙা মানষিলার এক লাশ হাতে আর এক লাশের নাইফাক্সালি কাথার মাঝত পড়ি মোর জিউ কাউলি উঠির নাগিচে। কত নাখানের ইতিহাস! সোউগপাকে ধ্যালধেলি! 

 

– তবে একটু অট্টহাস্য হোক  কেমন?-  

গেছে সন্ধ্যে নামার সময়,

সে তো কালরাত্রির কেউ,

প্রাণ ধুকপুকিয়ে বেরোয়,

যেমন গর্ত দিয়ে ঢেউ! 

 

– হেইডা একটা পদ্য!/?

– বাংলায় বাংলা পড়লে এমনই হয়! সস্তা টাইমের সস্তা হিউমার! 

– গান কই?

– গান গান ঢিস ঢিস ঢুই ঢুই ঢুই,

 বাঘে জলে নেমে খেল ছোট ছোট রুই! 

 

২১

-হ্যালো হ্যালো, টেস্টিং টেস্টিং, ভানু। 

– ইয়েস সার, প্রেজেন্ট সার, হ্যালো হ্যালো। 

 

বিড়ির ধোঁয়া

কয়েকটা লাশ 

জলের স্রোত। – এটা কবিতা এক, টেস্টিং টেস্টিং হ্যালো। 

 

রিক্সাওয়ালার ঘুম

সিপাইওয়ালার টনক

শীতের দুপুর। – এটা কবিতা দুই, টেস্টিং টেস্টিং হ্যালো।

 

দেশের হাঁড়ি

সাপের ফিসফিস

কমলা পসন্দ। – এটা কবিতা তিন, টেস্টিং টেস্টিং হ্যালো।

 

-ভাগ শালা, এসবের কোন মানে নেই! তুইও ফোট এখান থেকে মানে মানে! সঅব বিক্কিরি হয়ে যাওয়া পচা বিবেকের ছাল! দ্বিতীয় পর্ব থেকে আমরা মিষ্টি প্রেমের উপন্যাস কেমন?  টেস্টিং টেস্টিং…

 

(প্রথম পর্ব সমাপ্ত)

 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.