বহুমনরথ এবং অতিমারী: দুঃসহ সময়ের দুঃসাধ্য গল্প

(পলিয়্যামরিরএকটা জুতসই বাংলা কী হতে পারে সেটা ভাবতে ভাবতে মির্জা গালিবেরহাজারো খোয়াইশে য়্যাইসি কি হার খোয়াইশ পে দম নিকলেশুনছিলাম বহু বাসনার এই বন্দনাই আমার মনেবহুমনরথশব্দটা গেঁথে দিল সেই থেকে এটাই আমি ব্যবহার করি আরও অন্য শব্দ থাকতে পারে বাংলায়যেমন বহুকামী বা বহুপ্রেমীআবার নতুন শব্দ কেউ বানাতেও পারেন নানারকম শব্দ দিয়েই তো আমরা আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো বোঝার চেষ্টা করি এখনকার মত বহুমনরথ শব্দটাই আমার পছন্দ তাই সেটাই ব্যবহার করছি

“আমাদের তো একটা সামলাতেই প্রাণ যায় – তুই এতগুলো ম্যানেজ করিস কী করে?”

বা

“খুব ভাল কপাল করে এলে এমন হয় – আনন্দে মজা করলি, আর দুঃখে কেটে গেলি”

বা

“তোর তো ভারি সুখ – একটা গেলেও চিন্তা নেই – আরও আছে”

আমাদের মত মানুষদের বন্ধু বান্ধবের কাছ থেকে এসব কথা মাঝে মধ্যেই শুনতে হয় (শত্রুরা কী বলেন সে আর নাই বা বললাম) কারণ আমরা ‘একটা সময় একটি মানুষের সাথেই প্রেম’ অর্থাৎ ‘এককপ্রেম’ এ নয় – ‘বহুমনরথ’ – অর্থাৎ ‘এক সাথে অনেককে ভালোবাসার’ গল্পে বিশ্বাসী এবং সেভাবেই জীবনযাপন করি এই হাল্কা ঠেস মারা কথা শুনতে খারাপ লাগে ঠিকই, তবে এটাও বুঝি, যে আমাদের ভালবাসার ধরন ধারণ সম্পর্কে বহু মানুষের নানারকম কৌতূহল থাকা সত্ত্বেও তারা ঠিক আলোচনাটা করে উঠতে পারেন না আছে সমাজ, সংস্কার, সঙ্কোচ – আবার কারো হয়ত নৈতিকতায় বাধে তাই অনেকসময় আমরাই আমাদের কথা পাড়ি, বুঝবার এবং বোঝাবার চেষ্টা করি 

ধরুন এই যে এই ভীষণ সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী কোভিড অতিমারীটি আমাদের জীবন তছনছ করে দিচ্ছে আমরা সবাই তো এই নিদারুণ সময়ের মধ্যে দিয়ে খুব পা টিপে টিপে হাঁটছি আমাদের বিভিন্ন সম্পর্কগুলোর উপর ভয়ঙ্কর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে অসুখের আশঙ্কা ও মানসিক অবসাদ আমাদের প্রেম জীবনেও তার ছাপ ফেলছে যাদের সাথে ভালবেসেই আমরা বাসা বেঁধেছিলাম সেই বাসাতে তাদের সাথে অষ্টপ্রহর বন্দী থেকে আমাদের নাভিশ্বাস উঠছে কিন্তু এরই মধ্যে যারা আমার মত বহুমনরথী – একজনের সাথে থাকেন না – ভালবাসা ছড়িয়ে ছিটিয়ে, একটু গা আলগা করে বাঁচেন – তারা কিভাবে সামাল দিচ্ছেন? আসুন, তাদের জীবনের যুদ্ধগুলোর গল্প করি আজ 

আগে আমি একটু নিজের সম্পর্কে বলে নিই আমি বেঙ্গালুরুতে একার বাসায় একাই থাকি মা থাকেন কাছেই – দশ বছর আগে বাবাকে ক্যান্সারে হারিয়ে উনিও একা মাঝখানে দুটি লিফট এবং একটি বিল্ডিং নিয়ে এটি একধরনের দ্বৈত পরিবার – যা মূলত জীবনযাত্রার পছন্দ অনুসারে পৃথক মায়ের সারা জীবনের একমাত্র প্রেমিক এবং সঙ্গী ছিলেন বাবা এবং তাদের একত্রে আটচল্লিশটি টালমাটাল বছর ছিল আমার বয়স ঊনপঞ্চাশ এবং আমি বহুমনরথী মা আমার জীবনের অনেক ওঠা পড়া বোঝেন, খালি এইটে বোঝেন না মাঝে মাঝেই জিজ্ঞেস করেন “তোরা কিভাবে বাসিস এত জনকে ভাল? উজাড় হয়ে যাস না?” 

আমার ছোট্ট বাড়িটি আমার প্রেমিক, প্রেমিকা এবং বন্ধুদের জন্য সবসময়ে খোলা তারা বেশিরভাগই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন দেশ বিদেশ জুড়ে অনেকে ভাবেন বহুমনরথ মানে বুঝি প্রেম থাক বা না থাক, শুধুমাত্র অনেকের সাথে যৌন সম্পর্ক তৈরি করা এবং থেকে থেকে বিভিন্ন লোকজনের সাথে শোয়া এটা ঠিক ধারণা নয় না, আমি অনেকের সাথে যৌনতাকে একেবারেই ভুল বা খারাপ কিছু ভাবিনা সেটাও খুব আনন্দদায়ক হতে পারে কিন্তু সেটা বহুমনরথ নয় ‘বহুমনরথ’ কথাটায় ‘বহু’ শব্দটা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ‘মন’ শব্দটা ঠিক ততটাই জরুরি সুতরাং আমার মত বহুমনরথী মানুষ বিশ্বাস করেন যে আমাদের একই সাথে একাধিক মানুষের সাথে প্রেম করার অধিকার এবং সামর্থ্য আছে এদের মধ্যে এক এক জনের সাথে আমাদের ঘনিষ্ঠতা, শারীরিকতা, যৌনতা এবং মনের মিলের গভীরতা আলাদা হতেই পারে, কিন্তু সব ক’টি সম্পর্কই সৎ এবং সবার সম্মতি অনুসারে হয় আর এই সততা না থাকলে আমি অন্তত সেটাকে বহুমনরথ বলব না আমি এটা পরিষ্কার করে দিতে চাই প্রথমেই যাতে পরে গোলমাল না হয়ে যায় আরেকটা কথা বলে রাখা ভালো। আমি যে সম্পর্কগুলির আলোচনা করছি এখানে সেগুলি সবই বহুমনরথী সম্পর্ক – মানে যে কজন মানুষ জড়িত তারা সবাই একের বেশি মানুষের সাথে সম্পর্কে আছেন। মহিলা পুরুষ নির্বিশেষে, সমকামী, ভিন্নকামী এবং অন্য সবরকম সম্পর্কের কথা মাথায় রেখেই, আমার মনে হয় যে একজন বহুমনরথী মানুষের আরেক বহুমনরথী মানুষের সাথে সম্পর্ক হলেই সেটাতে একধরনের সাম্য থাকে। আমি দেখেছি যে অনেক সময় এককপ্রেমী মানুষ আর বহুমনরথী মানুষের মাঝে সম্পর্ক হয়ে যায় – কখনও না জেনে, আবার কখনও জেনে শুনে। দুই ক্ষেত্রেই পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কাঠামোর ভিতরে বসে সেটা কিন্তু খুব সহজেই একটা নিপীড়নের জায়গা হয়ে যেতে পারে – বিশেষত মহিলা এবং অন্যান্য প্রান্তিক মানুষের ক্ষেত্রে। অন্য সম্বন্ধগুলির মত এখানেও ক্ষমতার আধিপত্য নিয়ে প্রশ্ন থাকে এবং অসমান সম্পর্ক হলে সেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার হতেই পারে সেই জন্যেই বহুমনরথের সমস্ত উদ্রেক ও চাপ জেনেই এই সম্পর্কে নামা উচিৎ বলে আমার মনে হয়। এবং কোনরকম অসুবিধা বা উৎপীড়নের ইঙ্গিত পেলেই বেরিয়ে আসা দরকার তৎক্ষণাৎ।           

এবার দেখা যাক, এই বহুমনরথী মানুষদের জীবন কোভিড অতিমারীর প্রেক্ষাপটে দেখতে গেলে কী পাব? 

এই মুহূর্তে অনেকগুলো ভয় বাসা বেঁধেছে আমাদের বুকে রোগের ভয়, অজানার ভয়, ভবিষ্যতের ভয়, এবং একা একা মরে যাওয়ার ভয় যারা বহুমনরথী তাদের তো এমনিতেই সচরাচর চিন্তা থাকে যে তারা তাদের একাধিক সম্পর্কের কোনটার কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন; আর তাদের বিভিন্ন প্রেমিক প্রেমিকারাও ঠিক সেখানেই আছেন কিনা ভারসাম্য সামলে বাঁচবো না সমস্ত আশঙ্কা ছুঁড়ে ফেলে বিন্‌দাস, চুটিয়ে জীবন কাটাবো – এই দুই সিদ্ধান্তের মাঝখানে আক্‌সার আমরা ভেসে বেড়াই অতিমারীর এই দ্বিধাসঙ্কুল সময়ে এই ভয়গুলি আরও চেপে, গ্যাঁট হয়ে বসেছে বছর তিরিশের একজন বন্ধু সেদিন বলছিলেন, “আমি তো আগে কখনো জানতেই চাইনি ও কখন কী করে, কোথায় থাকে, কার সাথে থাকে যেমন প্রেমিক প্রেমিকারা সাধারণত করে থাকে একে অপরের সাথে আরকি তুমি তো জানো আমার সে প্রয়োজন নেই একেবারেই তবে এখন একটু অন্যরকম হয়ে গেছে ফোন করলে যদি ও দু তিন বারে না ধরে তাহলে মনটা খুঁত খুঁত করে কিছুটা উদ্বিগ্ন হতে শুরু করি বোকা যুক্তিহীন ভয় – ওর জীবনে আমার প্রয়োজন হয়ত কমে গেছে – এইসব ছাইপাঁশ ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়ি কিছু না পেতে পেতে তার প্রয়োজন তো ফুরিয়ে যেতেই পারে, তাই না?” ইনি একজন শিক্ষক এবং বহুমনরথী এটা শুনে আমার কষ্টই হয়েছিল। আমরা এতটাই পুরুষতান্ত্রিক, হেটেরোনরমেটিভ সমাজে বড় হয়ে, সেটাতেই অভ্যস্থ হয়ে যাই, যে যতই তার বাইরে ভাবার চেষ্টা বা বাঁচার চেষ্টা করি না কেন, বার বার কান ধরে আমাদের এই গণ্ডির ভিতরেই ফিরে ফিরে আসতে হয়। সময় কঠিন হলেই নিরাপত্তা খুঁজতে আমরা সেই চেনা জানা পরিবার বলতে যা বোঝায় তাই হাতড়াই। খুব সতর্ক না হলে পা পিছলে যায়। অবশ্য এই গণ্ডির বাইরে নতুন করে বাঁচাটাও তো আমরা সবে শুরু করেছি এখন তো নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষাই চলছে, নানাবিধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। তাই এখনও অনেক কিছু শেখানো বুলি ভোলা বাকি, অনেক কিছু অভ্যেস থেকে হাথ ছাড়ানো বাকি, অনেক ব্যাকরণে ভুল ধরা বাকি আশা করি এসব নিয়ে আরও ভাবনাচিন্তা, আরও কথা তর্ক হতে থাকবে।   

এই অতিমারীর জন্যে এখন যাতায়াতের ক্ষেত্রে নানারকম বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে আমরা, যারা নিজের ইচ্ছায় এবং আমাদের সঙ্গীদের সহমতিতে নানা নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলি, তারা এখন ভাবছি আমাদের যে সঙ্গীরা দূরে থাকেন তারা কি বাড়ির কাছেই নতুন সাথী খুঁজে নেবার যুক্তি দেবেন এবার? কোনটা কাছে কোনটা দূরে তার সংজ্ঞাটা তো সরকারের অতিমারী প্রভাবিত অঞ্চলগুলির পৃথকীকরণ এবং সংরক্ষণের নিয়মগুলির সাথে সাথে রোজ বদলাচ্ছে লকডাউনের বাজারে কোনটা কাছে – একই শহর, একই পাড়া, একই গলি, একই অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স, না একই বিল্ডিং? যাদের সঙ্গীরা অন্য শহরে থাকেন, তাদের তো এখন অদূর ভবিষ্যতেও শারীরিক ভাবে দেখা হওয়ার সুযোগ হবে না তাহলে কে কাছে আসছে, কে দূরে সরে যাচ্ছে তার সংজ্ঞাও কি বদলে যাবে? বহুমনরথী মানুষরা তো নিজের বা তার সঙ্গীদের দরজায় আগল দেন না সেভাবে – তাহলে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার বা গুরুত্বের মাপকাঠিগুলোর কী হবে? 

এই নানারকম কাছে দূরের হিসেব করতে গিয়ে আরেকটা কথা মনে হয় – যারা এককপ্রেমী তারা জানেন যে সেই একটি ব্যক্তি দরকারের সময় তাদের পাশে থাকবেন অন্তত একে অপরের কাছে সেরকম অঙ্গীকারেই এই সম্পর্কগুলি দাঁড়িয়ে কিন্তু বহুমনরথী মানুষের থেকে থেকে এইসময়ে মনে হচ্ছে, “আমাকে হাসপাতাল বা কবরস্থানে নিয়ে যাওয়ার দরকার হলে এদের কেউ কি থাকবে?” মা তো হামেশাই আমাকে বলে থাকেন, “জেনে রাখ, ভাগের মা গঙ্গা পায় না” আবার কখন কোনও বন্ধু অভাগীর স্বর্গ থেকে “ভাল তাহাকে অনেকেই বাসিত” বলে ওঠেকিন্তু যখন দেখি ভালবাসার মানুষেরাও আপ্রাণ চেষ্টা করছেন এইভাবে, নতুন ভাবে, সীমা এবং গণ্ডীর বাইরে দাঁড়িয়ে বাঁচতে, তখন সত্যিই মন ভরে যায় এই ‘এক’ ভাল না ‘অনেক’ ভালর দ্বন্দ্বে অনেক সময়ে ঘাসটা অন্য পারেই বেশি সবুজ দেখায়  

একটির বেশি মানুষকে ভালবাসার আরও একটি দিক হল সবার সাথে ঠিকমতন সময় কাটানোর সময় বার করা, তাদের ভাল মন্দের খবর রাখা, দরকারে অদরকারে পাশে থাকা এবং সবচেয়ে বড় কথা – তাদের আনন্দ এবং দুঃখের অংশীদার হওয়া জীবনের, মনের, সময়ের অনেকগুলো ভাগ করা কঠিন তো বটেই, আবার এর মধ্যে কার কাছে কোনটা জরুরী সেই সম্বন্ধে সজাগ থাকাটাও যথেষ্ট চাপের জুম, হোয়াটসঅ্যাপ, ফোন, বিভিন্ন চ্যাট উইন্ডোজ, সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে অনলাইন জীবনের ক্লান্তি এই অতিমারীকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে এবং তারই মধ্যে বেঁচেবর্তে থাকার এই যে বহুমনরথী ইচ্ছা – সেটা যে থেকে থেকে আমার আত্মসংহারী মনে হয় না, তা বললে মিথ্যে বলা হবে আবার সবকিছু অনলাইন করতে গিয়ে যদি একজনের সাথে আরেকজনের কথাবার্তা গুলিয়ে ফেলি, তাহলে তো এক কেলেঙ্কারি সোনার লঙ্কা ছারখার হতে হতে কতবার যে বেঁচে গেছি, সে গল্প থাক আরেক দিনের জন্যে পড়তে পড়তে হয়ত ভাবছেন এ আর নতুন কী, বিশেষ কী – এসব তো অনেক প্রেমেই হয়। সেটাই তো বলতে চাই। সব প্রেমই তো নিদারুণ গ্যাঁড়াকল। তাই সব রকম প্রেমেই অনেক কিছু একরকম। ব্যাথা পেলে মরে যাই, ভালবাসা পেলে লুটিয়ে পড়ি। কিন্তু তারি মধ্যে আবার কিছু কিছু জায়গায় তফাৎ আছে, নতুন করে ভাবার অবকাশ আছে। তাই যখন দেখি ভালবাসার মানুষেরাও আপ্রাণ চেষ্টা করছেন এইভাবে, নতুন ভাবে, সীমার বাইরে দাঁড়িয়ে বাঁচতে, তখন সত্যিই মন ভরে যায়

অনেকে জিজ্ঞেস করেন আমাদের বহুমনরথে হিংসে ব্যাপারটা হয় কিনা অবশ্যই হয় ছোটবেলা থেকে এককপ্রেমের জয়ধ্বনিই তো শুনে এসেছি, শিখে এসেছি – গল্পে, গানে, সিনেমায় আর সেই এককপ্রেম তো আরেকটি মানুষকে ভালবাসলে তাকে জমির মত দখল করতে শিখিয়েছে সেই জমিতে কেউ পা দিলে যুদ্ধং দেহি বলে লাফিয়ে পড়তেও শিখিয়েছে তাই মনে হিংসে হয় বইকি আমরাও তো এই সমাজেই মানুষ হয়েছি কিন্তু কিছু মনে হলেই যে সেটার দাসত্ব করতে হবে তার তো কোন মানে নেই এই যে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু দেখে রোজ আমার দুটো লোককে উত্তম মধ্যম দিতে ইচ্ছে করে – আমি তো সেটা রোজই কাটিয়ে উঠি বহু কষ্টে সেরকমই বহুমনরথে হিংসে আমদের হয়। দুঃখও পাই হিংসে হলে। কিন্তু আমরা মানি হিংসে হলে সেটা নিয়ে আমরা আলোচনা করব, একে অপরকে সেই হিংসের ক্ষুদ্রতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করব, এমনকি দরকার পড়লে বিশেষজ্ঞের পরামর্শও নেব – কিন্তু কিছুতেই হিংসেকে আমাদের সম্পর্কগুলোর জীবনে আঁচড় কাটতে দেব না একটি শব্দ আছে ইংরিজিতে – ‘কম্পারশান’ – এটার মানে হিংসের ঠিক উলটো – অন্য কাউকে আনন্দ পেতে দেখলে নিজে আনন্দ পাওয়া আমাদের মধ্যে এই শব্দটার খুব চল আছে বহুমনরথে আমরা বিশ্বাস করতে চাই যে আমাদের ভালবাসার মানুষেরা যদি অন্য কারো সাথে সুখ পান তাতে আমরাও সুখী হব, বা অন্তত চেষ্টা করব এটাকে বাংলা করে বললে ‘পরসুখেসুখী’ বলা যায় হয়ত এখানেও মনে হতে পারে যে এককপ্রেমের ক্ষেত্রেও তো হিংসে হলে আলোচনা হয়, বোঝাপড়া হয়। ঠিকই, কিন্তু মনে রাখতে হবে যে বহুমনরথের সম্পর্কে সমস্ত টানাপড়েন কিন্তু শুধু দুজন মানুষকে নিয়ে নয় – আছেন অনেকগুলি মানুষ। তাই যে কথাবার্তা এককপ্রেমে শুধু দুজনের মধ্যেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে এবং মধ্যস্থতা হয়, সেটাই এখানে আরও অনেক বেশি জটিল হয়ে দাঁড়ায় অনেকগুলি মানুষের সমান অধিকারে আলোচনায় থাকার জন্যে। 

বহুমনরথী মানুষেরা সাধারণত হিংসের মত দুর্বলতাগুলিকে ক্ষমা করে দেন, কিন্তু এই মহামারীর সময় তীব্র আবেগগুলি যেন আরও জাপটে ধরছে আমার আরেক বন্ধু যার দুজন প্রেমিকার মধ্যে বয়সের অনেকটা তফাত, তার স্বভাবতই এই সময়ে বয়স্কা প্রেমিকার জন্যে চিন্তা বেশি হয় বিভিন্ন কোমরবিডিটি থাকায় খেয়াল রাখাটাও তারই বেশি হয় এটা নিয়ে আমার বন্ধুর তার কম বয়সী প্রেমিকার সাথে একটু আধটু মনমালিন্য লেগেই থাকে আবার এই কম বয়সী প্রেমিকা তার প্রেমিকের জন্যে কোনও খাবার বানালে কিন্তু সব সময়ে অন্য প্রেমিকাটির সাথে ভাগ করে নিতে বলেন এখানে কিন্তু উনবিংশ শতকের ‘বড় বউ-ছোট বউ’ ধারণা থেকে বেরিয়েই ভাবতে হবে কারণ এইখানে দুই প্রেমিকারও কিন্তু আরও কিছু প্রেমিক বা প্রেমিকা থাকতে পারে। আর সেই বাস্তবতা, বা তার সম্ভাবনা বহুমনরথ কে একটা অন্য মাত্রা দেয়। এখানে কেউ কিন্তু কারো ওপর খুব অনায়াসে অতটা জোর চালাতে পারেন না, কারন সবাই জানেন যে একজন শুধুমাত্র আর একটি জনের প্রেম ও সম্পর্কের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল নন। এটা একটু ব্যবহারিক শোনালেও এটাই সত্যি প্রেম সম্পর্কে প্রচলিত ধ্যানধারণা একটু আধটু উলটে পালটে এভাবেই বাঁচি আমরা

এসব শুনে কেউ জিজ্ঞেস করতেই পারেন যে এত ঝঞ্ঝাট আমরা নিই কেন বাকি সবার মত একজনের সাথে প্রেম করলেই তো হয় এখানে দুটো কথা বলা প্রয়োজন প্রথমত – এমন কিন্তু নয় যে সব বহুমনরথী মানুষ সবসময়ে একজনের বেশি মানুষের সাথেই প্রেম করছেন অনেকে একজনের সাথে একটা সম্পর্কই রাখতে পারেন খালি দরজায় কৃত্রিম খিলটা আমরা দিই না মনটা খোলাই রাখি যে আর কাউকে যদি ভাল লাগে তাহলে সেটা লাগতে দেব, সম্পর্ক গড়তে চাইলে গড়ব আর সেটা যদি হয় তাহলে দুজনে ঘাবড়ে যাব না, ভেঙ্গেও পরব না, আবার একে অপরকে দোষারোপও করব না মিছিমিছি এটাকে জীবনের একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই ভাববো আর দেখব কিভাবে একসাথে কিছু ভালবাসা নিয়ে বাঁচা যায় এভাবে বাঁচাটা আমাদের খুব সহজ আর সুন্দর বাঁচা মনে হয় দ্বিতীয়ত – আমরা রোজ দেখি যে প্রচলিত, প্রথাসম্মত ভাবে বাঁচতে গিয়ে মানুষ নিজেকে এবং অপরকে কত দুঃখ দেয়, মিথ্যে কথা বলে, সত্যিটা লুকোয়, হিংসে এবং হীনমন্যতায় কত ছোট হয়ে যায় একে অপরকে ভীষণভাবে আগলে ধরে রাখতে গিয়ে সম্পর্কের দমবন্ধ হয়ে আসে, কাছের মানুষ দূরের হয়ে যায় সেসব থেকে বেরিয়ে, একটু অন্য ভাবে, একটু নতুন ভাবে বাঁচার চেষ্টাই বোধহয় করছি আমরা

সান্নিধ্যের সংকট নিয়ে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের একটি গল্প আছে শীতকালে অনেকগুলি শজারুকে একসাথে একটি জায়গায় রাখলে কী হয়, সেটা জানতে গিয়ে দেখা গেল – উষ্ণতার জন্য তারা কাছাকাছি আসতে চায় কিন্তু খুব কাছে এলে আবার একে অপরকে কাঁটা বিঁধিয়ে দেয় তাই কাছে দূরের মাঝামাঝি, নাতিশীতোষ্ণ কোনও একটি স্থান বেছে নিতে হয় তাদের এই অতিমারীর দুঃসহ সময়, আমরা বহুমনরথী মানুষেরা, এভাবেই আমাদের দুঃসাধ্য গল্পগুলি বুনে চলেছি 

চিত্রঋণঃ ফ্লেয়ার, কসমোপলিটান, অডান জরদি

শেয়ার করুন

1 thought on “বহুমনরথ এবং অতিমারী: দুঃসহ সময়ের দুঃসাধ্য গল্প”

  1. Sankalita Das

    Such a wonderful, fun and effortlessly eloquent writing on the subject!! Loved it totally.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *