আমার চোখে প্রীতিলতা

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বাংলার প্রথম মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামী, যিনি দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন। মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ‘মেয়েরাও নিজের দেশের জন্য লড়তে ও মরতে পারে, যেমন পারে পুরুষজাতি’। 

তাঁর জন্ম হয়েছিল ৫ই মে, ১৯১১ সালে, চট্টগ্রামে। জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার আর প্রতিভা দেবীর সংসার ছিল আড়ম্বরশূন্য এবং স্বদেশপ্রেমী। তার ছাপ পড়েছিল প্রীতিলতার মনেও। ছোটবেলা থেকেই তাঁর পড়াশোনার নেশা ছিল। দাদার পড়া হয়ে গেলেই বই নিয়ে ছুট্টে চলে যেতেন দাদার মাস্টারের কাছে। উৎসাহী ছাত্রীকে পড়াতে আপত্তি করতেন না মাস্টারমশাই। তবে লুকিয়ে চুরিয়ে বেশি দিন পড়তে হলো না তাঁকে। সাত বছর বয়সে মায়ের এবং তাঁর প্রবল আকাঙ্ক্ষায় তিনি স্কুলে ভর্তি হলেন।

সেখানেই তাঁর পরিচয় হলো কল্পনা দত্তের সাথে। তাঁরা একসাথে ব্যাডমিন্টন খেলতেন, সেই নির্জন কোর্ট থেকেই তাদের বন্ধুত্ব গাঢ় হয়। তাঁরা দুজনেই উঁচু ক্লাসে উঠে আলোচনা করতেন, “it is our duty to learn all the methods of the other side (the British). It will be useful to us for building up our own strength.” তাঁরা চেয়েছিলেন ‘to be loyal to God and the king emperor’- এই শব্দবন্ধটির বদলে প্রতিজ্ঞা হিসেবে ‘to be loyal to the God and Country’ ব্যবহার করতে। (কল্পনা দত্তর লেখা Chittagong Armoury Raiders: Reminiscences বই থেকে নেওয়া)

প্রীতিলতা স্বপ্ন দেখতেন বড় বিজ্ঞানী হওয়ার, কখনো বা বিশাল বড় বিপ্লবী। তাঁর আশা ছিল ‘প্রেমচাঁদ-রাইচাঁদ’ স্কলারশিপ পেয়ে কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় স্কলারশিপ না পেলে তাঁর পক্ষে কলকাতা গিয়ে পড়া সম্ভব নয়, পরিবারের অবস্থা তাঁদের সচ্ছল নয়। কিন্তু তাঁর অঙ্কে দুর্বলতার জন্য স্কলারশিপ পাওয়া হলো না, ঢাকা ইউনিভর্সিটিতে ভর্তি হতে হলো তাকে। আই.এ পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ড থেকে মেয়েদের মধ্যে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন উনিশশো তিরিশ সালে। তারপর তিনি বৈপ্লবিক কাজে জড়িয়ে পড়েন। উনিশশো বত্রিশ সালে বি.এ পরীক্ষার সময়ে ইংরেজি অনার্স তাঁকে ছেড়ে দিতে হয়। তিনি ডিস্টিংশনে বি.এ পাস করেন।

এই সময়ে আবার কল্পনা দত্ত এবং প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার দুজনেই শিখতে থাকলেন লাঠিখেলা আর তলোয়ার খেলা। ছুটিতে তাঁরা দুজন এবং আরো দুজন চট্টগ্রামের স্বদেশীদের সংস্পর্শে আসেন। তাঁরা ধীরে ধীরে অ্যাকশনে আসেন এক ধর্মঘটের সময়ে। চট্টগ্রামের সমস্ত স্কুল আর কলেজ বন্ধ থাকার কথা সেদিন। তাঁরা চারজনে অবরোধ করেন খাস্তগীর স্কুলের গেটে। তাদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। 

১৯৩০ সালে মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে অস্ত্রাগার লুণ্ঠন হয়। এই সময়ে প্রীতিলতা বিপ্লবীদের গোপন খবর আদানপ্রদান করতেন এবং চট্টগ্রাম ও কলকাতার ভেতর সংযোগ রক্ষা করতেন। রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের মৃত্যুতে প্রচন্ড আঘাত পান তিনি। তাঁর অজান্তেই চাঁদপুরের সাব-ইন্সপেক্টর তারিণী মুখার্জী হত্যা কান্ডের জন্য তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। 

১৯৩২ সালে বি.এ পাস করার পর তিনি চট্টগ্রামে ফিরে গিয়ে নন্দনকানন গার্লস স্কুলে প্রধান শিক্ষিকার পদ গ্রহণ করেন। ১৯৩২ সালের মে মাস। প্রীতিলতা দেখা করতে গেলেন মাস্টারদা সূর্যসেনের সঙ্গে। গোধূলি বেলায় হঠাৎ একটা পুলিশ ফোর্স এসে হাজির হয়, ক্যাপ্টেন ক্যামেরনের নেতৃত্বে। মেশিনগান চলে পুলিশের দিক থেকে, এদিক থেকে চলে অবিরাম রিভলভার। প্রীতিলতা গুলির সামনে ভয় পেতেন না, কিন্তু নিজের জন্য অন্যদের বিপদে ফেলতে পারতেন না কখনো। পুলিশ তাঁকে ধরেনি। তাঁকে সন্দেহই করেনি। তারা ভাবতেই পারেনি চুপচাপ শান্তশিষ্ট মেয়েটা বিপ্লবীদের সাথে মেলামেশা করে। 

সেই ঘটনার পর থেকেই পুলিশ কল্পনা দত্তের উপর নজর রাখতে শুরু করে। প্রীতিলতা তখন আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান, মাস্টারদার সাহায্যে। ৫ই জুলাই, যখন ডিআইবি ইন্সপেক্টর গ্রেপ্তার করতে আসেন তাঁকে, তখন তাঁকে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়। ইন্সপেক্টর বলেন, এত শান্ত মেয়ের পেটে পেটে এত কিছু ছিলো, তা তাঁরা ধরতেই পারেননি। তারপর তাঁরা কল্পনা দত্তকে অ্যারেস্ট করেন। 

প্রীতিলতা মাস্টারদার কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর আবার একবার ধাক্কা লাগে যখন তাঁর আরেকজন প্রিয় মানুষ নির্মলদা মারা যান। কল্পনা দত্ত জেলে থাকাকালীন প্রীতিলতার মৃত্যু হলেও, পরে তিনি মাস্টারদার কাছে শুনেছেন এই অতি নিকট দুজনের মৃত্যুই তাঁকে জীবন সম্পর্কে উদাসীন করে দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আত্মহত্যার পথ পছন্দ করি না। কিন্তু প্রীতি বিদায় নিতে এসে আমার কাছ থেকে জোর করে পটাশিয়াম সায়ানাইড নিয়ে গেছিলো। সে বলছিলো সে ধরা পড়ে গেলে কাজে লাগবে, আর এমন যুক্তি দেখাচ্ছিল, আমি না দিয়ে পারলাম না।’ যেই ঘটনার সময়ে প্রীতিলতা মৃত্যুবরণ করেন সেই আক্রমণে তাঁর পাশে কল্পনারও থাকার কথা ছিল, কিন্তু তিনি এক সপ্তাহ আগে গ্রেফতার হয়ে যান। 

উনিশশো বত্রিশ সালের চব্বিশে সেপ্টেম্বর প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নেতৃত্বে দশ-বারোজন কর্মী গিয়ে পাহাড়তলি ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করেন বোমা ও রিভলভার দিয়ে। ক্লাবের একজনের মৃত্যু হয়, কয়েকজন আহত হয়। কর্মীরা সকলেই অক্ষত দেহে মাস্টারদার কাছে ফিরে যান। কিন্তু প্রীতিলতা পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। ক্লাবের কয়েক ফুটের মধ্যে তাঁর দেহ পড়ে থাকল সারাদিন। পুলিশি নির্যাতনের মুখে প্রীতিলতাকে প্রকাশ্যে সম্মান জানাতে কেউ সেদিন আসতে পারেননি। শহীদ প্রীতিলতার শরীর দাহ হয়ে গেল। তাঁর তখন বয়স ছিল মাত্র একুশ বছর। 

তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর বাবা এবং মা খুবই কষ্ট করে জীবন কাটাতেন। তাঁরা খুব গর্ব করতেন মেয়ে দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন বলে। দুর্ভিক্ষ্যের সময়ে তাঁর বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার অনেক ত্রাণ কাজে নামলেও, শুধুই বলতেন আমার মেয়ে থাকলে আরও সাহায্য করতো সবাইকে। 

‘চট্টগ্রামের মানুষ প্রীতিলতাকে ভোলেননি কখনোই।’- লিখেছেন কল্পনা দত্ত। আসলে গোটা দেশই ভোলেনি তাঁকে।



শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *