জেলবন্দী প্রজাতন্ত্রে এক কয়েদীর স্ত্রী

নেহা দিক্ষিতের লেখা নিবন্ধটি ৬ অগস্ট, ২০২১-এ দ্য ওয়্যার পত্রিকায় ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয়। মূল লেখাটি পড়া যাবে এখানে

দিল্লি পুলিস তাঁর স্বামীকে গ্রেফতার করার পর এক মহিলার জীবনের ঘটনাগুলি – 

নয়াদিল্লিঃ সকালবেলায় উঠে অনেক কাজ- তিন ছেলেমেয়েকে ঘুম থেকে তুলে অনলাইন ক্লাসে বসানো। বিশেষ করে সাত বছরের বাচ্চাটাকে। প্রত্যেকের জন্য নির্দিষ্ট বসার জায়গার ব্যবস্থা করা। নজর রাখা যাতে ক্লাস চলতে চলতে ভিডিও গেম খেলতে বা মারপিট করতে না শুরু করে, বা ঘুমিয়ে না পড়ে। ১৭ মাস ধরে বাবা মা দুজনের দায়িত্ব একাহাতে  একাহাতে সামলাতে সামলাতে মাঝেমধ্যে গোটাটা বড্ড বেশিবেশি মনে হয়

***

১৪ বছর হল বিয়ে হয়েছে। ২০০৭-এ বিয়ের প্রস্তাব যখন এসেছিল, দুজনেই একবার অন্তত মুখোমুখি একান্তে আলাপ করতে চেয়েছিল। সেই সময়কার দেখাশোনা করে বিয়েতে ব্যাপারটা তখনও খানিক বিরল।

ঠিক হয়েছিল দিল্লির কনট প্লেসে নতুন পিৎজা হাট-টাতে গিয়ে দেখা করবে দুজনে। মেয়েটার বয়স কুড়ি, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ছাত্রী। ছেলেটা বছর পঁচিশের, পুণের সিম্বায়োসিস ইন্সটিটিউটে পোস্টগ্র্যাজুয়েট করে।

মেয়েটা মেট্রো চেপে এসেছিল, ছেলেটা গাড়ি চালিয়ে। “ওর মধ্যে অন্যান্য ছেলেদের মতো বেপরোয়া বা নাকউঁচু ব্যাপার ছিল না। বরং ও ছিল বিচক্ষণ, পরিণত। কিন্তু পাশাপাশি মজাও করতে জানত।”

“ও দুজনের পিৎজা থেকেই লঙ্কাগুলো খুঁটে খুঁটে তুলে আমাকে বলে কিনা এইবারে এগুলো খেতে হবে। ভাবুন কাণ্ড!” মেয়েটা বলে।

এমনকি খাবারের খরচটা পর্যন্ত মেয়েটাকে দিতে হয়। আজীবন সে বড় হয়েছে তার চারপাশের পুরুষ মানুষেরা সব খরচ খরচা দেয় দেখে। সেখানে তার কাছে এরকম একটা ব্যাপার ভারী অপ্রত্যাশিত ছিল, বিশেষত তার সম্ভাব্য স্বামীর থেকে। “কিন্তু আমার ভালো লেগেছিল, মনে হয়েছিল গোটা ব্যাপারটা আমার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”

কয়েক মাস পরে দুজনের বিয়ে হয়ে যায়। দুজনের জীবন খানিক গতে বাঁধা ছিল বটে, কিন্তু সুখেরও ছিল।

পরের কয়েক বছর কেটে যায় তিন সন্তানের খেয়াল রাখতে রাখতে। সবচেয়ে ছোটটা হয়েছিল বেশ ক’ বছর পরে। তাও তারা দুজনেই একটা মেয়ে চেয়েছিল বলে।

প্রাথমিকভাবে ছেলেটা বাবার সঙ্গে ফার্নিচারের ব্যবসায় কাজ করত। “কিন্তু ওর বিশেষ পছন্দ ছিল না কাজটা।” পরে ছেলেটা নিজেই তীর্থযাত্রা আয়োজন করে এরকম একটা ট্র্যাভেল কোম্পানি খুলে ফেলে। তবে নিজের কাজের বাইরে তার উৎসাহ ছিল চিরকাল।

রাস্তার নালা বন্ধ হয়ে গেলে, জল জমতে শুরু করলে সারাক্ষণ এদিক ওদিক ছোটাছুটি করত – কী না নালা পরিষ্কার করাতে হবে, সাফসুতরো করাতে হবে।

“আমি বিরক্ত হয়ে যেতাম। থাকি তো আমরা চারতলায়। নিজেদের আদৌ কোনো অসুবিধাই হচ্ছে না। তুমি এরকম ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে বেরোচ্ছ কেন?”

২০১১-১২ সাল নাগাদ ছেলেটা দুর্নীতি বিরোধী ইন্ডিয়া এগেইন্সট করাপশান আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে।

২০১২ সালে আম আদমি পার্টি যখন প্রথম গঠন হয়, সে সত্যিই বিশ্বাস করতে থাকে যে হ্যাঁ, এই নতুন দলটা একটা কিছু করতে পারবে।

“প্রতিবার ভোটের সময়ে নেতারা সব আসতেন আর বলতেন অমুক চিহ্ণে ভোট দিন – হাতি, ঘুড়ি, চামচ আরও কত কী। কিন্তু নর্দমা পরিষ্কার করানোর সময়ে কখন পাত্তা পাওয়া যেত না তেনাদের।” মেয়েটা বলে।

চারদিকে বেকারী, ভেঙে পড়া পরিকাঠামো আর একের পর এক অকাজের ভোট দেখে দেখে বিরক্ত হয়ে ছেলেটা কয়েক বছরের জন্য দলের হয়ে কাজ করতে শুরু করে।

বাড়িতে একটা বোঝাপড়া ছিল সবার মধ্যে। বাড়ির কেউ ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করবে না সারা সপ্তাহ সে কী করেছে। প্রতিদিন সে বাড়ি ঢুকত দেরি করে – একটা, কখনও দুটো। মাঝেমধ্যে তো টানা অনেকদিন একসঙ্গে খাওয়া পর্যন্ত হত না। কিন্তু সপ্তায় একদিন ছিল পুরোটাই পরিবারের জন্য বরাদ্দ। তাদের ছেলেমেয়েগুলো এখনও সেটাকে “ফ্রাইডে মস্তি” বলে ডাকে। তাদের সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে একসঙ্গে কাটানো সেইসব দিনগুলোর ছবি – শপিং মল, ওয়াটার পার্ক, বাগান, বা এমনিই গাড়ি চেপে ঘুরতে বেরনো।

***

২০১৭ সালের বাইশে জুন পনের বছর বয়সী জুনেইদ খান মথুরাগামী একটা ট্রেনে চেপে নিজের বাড়ি ফরিদাবাদ ফিরছিল। মাত্র কদিন পরেই ঈদ, সেই আনন্দে সে নতুন জুতোজামা কিনেছিল। বসবার সিট নিয়ে বচসাকে কেন্দ্র করে কয়েকটা লোক জুনেইদকে ছুরি মেরে খুন করে। তারা জুনেইদ আর তার বন্ধুদের উত্যক্ত করে, দাড়ি ধরে টানে, এবং অভিযোগ করে যে তারা গরু খায়। ফরিদাবাদের অসোতী স্টেশনে তারা জুনেইদকে ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। রক্তক্ষরণ হয়ে হয়ে জুনেইদ সেখানেই মারা যায়।

ততদিনে সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপর বেছে বেছে অপরাধ, গো রক্ষার নামে খুন ইত্যাদির দু বছর কেটে গেছে। রাষ্ট্রের আশকারা পেয়ে পেয়ে মৌলবাদীরা ক্রমশ আরো সাহসী হয়ে উঠেছে।

কিন্তু জুনেইদের পরিণতি সবাইকে দুঃস্বপ্নের সামনে এনে দাঁড় করায় –  কেউ অন্য এক সম্প্রদায়ের, স্রেফ এই পরিচয়ের জন্যই মৌলবাদীরা একজনকে খুন করে দিতে পারে।

পাঁচদিন পরে, আঠাশে জুন, সারা দেশ জুড়ে “নট ইন মাই নেম” বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়। লক্ষ্য, সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের পছন্দ অপছন্দের দোহাই দিয়ে এরকম টার্গেট করে ঘটানো অপরাধের বিরোধিতা করা।

গোটা ঘটনাটায় ছেলেটাও বিচলিত হয়ে পড়ে, দিল্লিতে আন্দোলনের কেন্দ্র জন্তর মন্তরে যায়।

সেইখানেই পুলিশ প্রথম তাকে আটক করে। “আমি তো ওকে পুলিশে গ্রেপ্তার করেছে শুনে ভারী ঘাবড়ে গেছিলাম।”

এই সূত্রেই মেয়েটা প্রথম গ্রেপ্তার আর আটকের মধ্যে পার্থক্য জানতে পারে।

ছেলেটা ছাড়াও আরো জনা দুই সেদিন পুলিশের হাতে আটক হয়েছিল। কয়েকদিন পর, তারা একসঙ্গে একটা গ্রুপ খোলে – নাম “ইউনাইটেড এগেইন্সট হেট” বা সংক্ষেপে ইউয়া (UAH)।

ইউয়া প্রায়শই মুসলিম, উপজাতি সম্প্রদায়ের খ্রিস্টান, বা শ্রীলঙ্কার খ্রিস্টানদের সমর্থনে বিক্ষোভ আন্দোলন আয়োজন করত। কেরালায় বন্যার পরে, বা এমনকি প্যালেস্তাইনের সমর্থনেও তারা কর্মসূচি আয়োজন করে। তারা নানকানা সাহিবের উপর আক্রমণের প্রতিবাদ করে, মিথ্যে এনকাউন্টারের বিরুদ্ধেও জনসভা সংগঠিত করে।

ইউয়া সাংবাদিক, গবেষক, আন্দোলনকর্মীদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে শুরু করে। ভারতের নানা জায়গায় তথ্য অনুসন্ধানী দল পাঠায় – অসমে নাগরিকদের ন্যাশানাল রেজিস্টার নিয়ে, বা উত্তরপ্রদেশের কাসগঞ্জ, বহরাইচ, বুলন্দশহরে হিংসার ঘটনার পরে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে তারা বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজন করে। প্রশান্ত কানোজিয়ার মতো সাংবাদিক গ্রেপ্তার হবার পরেও এগিয়ে আসে তারা। ক্রমে ক্রমে রাস্তার গর্ত বা বোজা নর্দমার থেকেও ঊর্ধ্বে, একটা বৃহত্তর নতুন দুনিয়া যেন ছেলেটার সামনে খুলে যাচ্ছিল। “ও যেন অবশেষে নিজের আসল জায়গা খুঁজে পাচ্ছিল”, মেয়েটা বলে।  

বছর দেড়েকের মধ্যে, ২০১৯ এর পনেরই জুলাই ইউয়া ঘৃণামূলক অপরাধের বিরুদ্ধে একটা হেল্পলাইন চালু করে। উদ্দেশ্য, যাঁরা এরকম অপরাধের মুখোমুখি হচ্ছেন তাঁদের পরামর্শ জোগানো, আইনি সহায়তা দেওয়া, তাড়াতাড়ি তাঁদের কাছে পৌঁছে যাওয়া।

ইউয়ার লোকবল ছিল এমনিই কম, তবে তা সত্ত্বেও তারা রোজ আরো বেশি বেশি নতুন কাজে জড়িয়ে পড়ছিল। ছেলেটা কখনও কখনও বাড়িতেই হেল্পলাইনের ফোনটা রেখে যেত, বলত প্রত্যেকটা ফোন ধরতে।

মেয়েটার কাছেও নানা এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে সাহায্য আয়োজন করার জন্য অনেকের নম্বর রাখা থাকত। মেয়েটা ভাবত, মানুষের যুক্তিবুদ্ধি মনুষ্যত্বের এ কী হাল হল।

একদিন মেয়েটার কাছে একটা ফোন আসে – ঝাড়খণ্ডের কোনো এক এলাকায় একটা লোককে গাছে বেঁধে রাখা হয়েছে, হয়তো এবার পিটিয়ে মেরা ফেলা হতে পারে।

“ফোন করেছেন ভালো কথা। কিন্তু চোখের সামনে একটা লোককে পিটিয়ে মারবে, আর আপনারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফোন করার বাইরে কিছু করতে পারছেন না? লোক জোগাড় করুন, থামানোর চেষ্টা করুন। আমরা লোক পাঠানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু ততক্ষণ হাত পা গুটিয়ে বসে থাকবেন না।”

সেইবারের মতো লোকটাকে সত্যিই বাঁচানো গেছিল।

মাঝেমধ্যে লোকে ফোন করে এরমও জিজ্ঞেস করত, “আপনারা কি শুধু মুসলিমদেরই বাঁচান?”

“আমি তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘২০১৮-র ডিসেম্বরে বুলন্দশহরে কী হয়েছিল মনে আছে?’”

২০১৮-র ডিসেম্বরে বুলন্দশহরে এক পুলিশ চৌকিকে লক্ষ্য করে ইঁট, পাথর ছোঁড়া হয়, আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, গুলি চলে। গুলি লেগে ইন্সপেকটর সুবোধ কুমার সিং আর সুমিত নামে এক বিক্ষোভকারী মারা যান। ডানপন্থী হিন্দুরা অভিযোগ করে যে পুলিশ অফিসাররা হিন্দুবিরোধী, শহরের এক প্রান্তে গোহত্যার ঘটনা ঘটে চলা সত্ত্বেও তাঁরা কিছু করেননি।

পুলিশ অফিসারদের একজন, সুবোধ কুমার সিং, দাদরি মামলার তদন্ত করছিলেন। ২০১৫-র সেপ্টেম্বরে দাদরিতে বছর পঞ্চাশের আখলাককে গরু খাবার অভিযোগে পিটিয়ে খুন করা হয়। সুবোধের পরিবার অভিযোগ করে যে এই ঘটনা তদন্ত করছিল বলেই সুবোধকে খুন করা হয়।

মৃতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে ইউয়া বুলন্দশহরে একটা দল পাঠায়।

“তবে আমি এও বলেছিলাম যে সংখ্যালঘু আর দলিতদেরই বেশি এরকম ঘৃণামূলক অপরাধের মুখোমুখি হতে হয়। এখানে মিছিমিছি সাম্যের ভান করে কোনো লাভ নেই।”

এতকিছুর মধ্যেও মেয়েটার সামাজিক জীবন বলতে ছিল কিন্তু সেই রান্নাঘর, চা বানানো, নতুন নতুন অতিথিদের জন্য জলখাবারের ব্যবস্থা করা। “বেশিরভাগকে আমি চিনতামও না, চেষ্টাও করিনি খুব একটা চেনার।”

একজন মহিলা ফোনে অপরিচিত কারোর সঙ্গে কথা বলছে, ব্যাপারটা ভারতবর্ষে খুব একটা ভালো চোখে সাধারণভাবে দেখা হয় না। কিন্তু এই অপরিচিতিই মেয়েটার আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে – মেয়েটা তর্ক করতে শেখে, সাহায্য, পরামর্শ দিতে, বা অন্যের কথা শুনতে শেখে। এরকম বিভিন্ন ক্ষেত্রে চলাফেরা করতে শেখে যা সে কোনোদিন ভাবতে পারেনি- প্রকাশ্যে, বা সামাজিক রাজনৈতিক পরিসরে।

 ***

এতদিনে অবশ্য ছেলেটা বাড়িতে সময় কাটানোও বন্ধ করে দিয়েছে। লম্বা সময় বাড়ির বাইরে থাকে, এমনকি রবিবারগুলো বাড়িতে কাটানোও বন্ধ হয়ে গেছে। মেয়েটার নিজেকে খানিকটা ফাউ বলে মনে হতে থাকে। “যেরম হয়েই থাকে আর কি”, সে যোগ করে।

মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে প্রায়ই তারা আর পুরোনো বন্ধুত্বগুলো টিকিয়ে রাখতে পারে না। তারা জায়গা পাল্টায়, পুরানো বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। “ও ছিল বিয়ের পরে আমার একমাত্র বন্ধু। আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিয়ে যেতে পারি। আমি সেগুলো মিস করছিলাম।”

২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর নাগরিক সংশোধনী বিল (সিএএ) যেদিন পাশ হয়, ছেলেটা ভেঙে পড়ে। সিএএ বিরোধী আন্দোলনে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করে, অন্যান্য আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়ানো শুরু করে।

“সত্যি বলতে গেলে, আমি সারা সপ্তাহ ধরে আন্দোলনে যেতাম ওর সঙ্গে আরো সময় কাটানোর জন্যে। গোটাটাই যে আসলে সবে নাটকের প্রথম অঙ্ক সেটা তখন বুঝিনি।” সে বলে।

সিএএ আইনের ভিত্তিতে মুসলিমরা আর শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নিতে পারবেন না। এর পরে আসবার কথা ছিল জাতীয় নাগরিকপঞ্জী – এনারসি। তার ভিত্তিতে যেসব মানুষরা তাঁদের পূর্বপুরুষদের ভারতে থাকার কোনো লিখিত প্রমাণ দেখাতে পারবেন না, তাঁদের আলাদা করে ফেলা যাবে।

“আমি ওকে বলতাম, তুমি দিল্লিতে জন্মেছ। আমিও তাই। আমাদের ছেলেমেয়েগুলোও তাই। তুমি এসবের মধ্যে নিজেকে কেন জড়াচ্ছ?”

ছেলেটা গরীব, প্রান্তিক মানুষের উপর সিএএ এনারসির প্রভাব বোঝায়। ইউয়ার রিপোর্ট তুলে বলে, অসমে কেমন করে কয়েক লাখ মানুষকে “বেআইনি নাগরিক” তকমা দিয়ে আটক করে রাখা হয়েছে।

তার পরে ২০১৯ এর ১৯ ডিসেম্বর প্রথম পুলিশ মেয়েটাকে একটা বিক্ষোভ চলাকালীন আটক করে। চারপাশের আত্মীয়স্বজনের থেকে অনেক ফোন আসে তাঁর কাছে। কেমন করে সে মা হিসেবে তার দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করছে না, তা বোঝায় সকলে।

“আমি তাদের বলি, আমি আমার ছেলেমেয়েদের অধিকারের জন্যেও আন্দোলন করছে। যাঁদের বাড়িঘর নেই, যাঁরা লোকের বাড়ি কাজ করেন, রোজ কোনোরকমে বেঁচে থাকতে গিয়ে যাঁদের কাছে ভারতীয় হবার প্রমাণ নেই তাঁদের সবার জন্য আমি আন্দোলন করছি।”

এইভাবে মেয়েটা ফোনে অপরিচিতদের পরামর্শ দেওয়া থেকে নিজের বাড়ির লোকের সামনে নিজের মতামত খুলে বলতে শুরু করে। তার পরিসরে কাজটা মোটেই সহজ নয়।

ছেলেটা ইতিমধ্যে পূর্ব দিল্লির খুরেজিতে আন্দোলনের সহ-সংগঠক হয়ে ওঠে। সময়টা জানুয়ারি ২০২০, সিএএ বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছে এক মাস।

এই আন্দোলনের প্রেরণা ছিল দক্ষিণ দিল্লিতে শাহিন বাগের আন্দোলন। খুরেজির আন্দোলনকারীরা তিরপল, তাঁবু নিয়ে  পতপরগঞ্জের পেট্রোল পাম্পের উল্টোদিকে এসে বসেন। মহিলারা ঘরকন্নার কাজ শেষ করে সন্ধেবেলা আসতে থাকেন। দূর দূরান্ত থেকে মানুষজন সংহতি জানাতে আসেন। মেয়েটাও নিয়মিত নানা মিছিলে অংশ নিতে থাকে, মাঝেমধ্যেই বড় রাস্তা ধরে বিক্ষোভের কেন্দ্র অবধি মিছিলে নেতৃত্ব দিতে থাকে।

এক মাস পরে ২০২০র ২৩শ ফেব্রুয়ারি উত্তর পূর্ব দিল্লিতে জাফরাবাদে সিএএ বিরোধী আরেকটা আন্দোলনের মঞ্চের কাছে দাঙ্গা বেঁধে যায়।

সেইদিন রাত্তিরে ছেলেটা বাড়ি ফিরে প্রার্থনা করে তবে ঘুমাতে যায়। ভারী বিচলিত দেখাচ্ছিল তাকে সেইদিন।

“আমাদের জগতে ছেলেদের তাদের লড়াই, সংগ্রাম, সমস্যা, অনুভূতি এসব তাদের বাড়ির লোকের সঙ্গে ভাগ করে নিতে শেখানো হয় না। তারা সারাক্ষণই যেন কোনো না কোনো একটা ভাবে বাড়ির লোকের কাছে ভান করে যাচ্ছে।” মেয়েটা বলে।

স্বামীর চিন্তার কারণ যে শুধুই দাঙ্গা নয়, সেটা তখন সে জানত না। জানত না, আন্দোলনের মঞ্চ ছেড়ে চলে যাবার জন্য ছেলেটির ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল পুলিস।

তিনদিন পরে, ২৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশ এসে আন্দোলনের মঞ্চ তছনছ করে দেয়, আন্দোলনকারীদের তাড়িয়ে দেয়, তারা যাতে ফিরে না আসতে পারে সেজন্য ব্যারিকেড খাড়া করে দেয়।

মেয়েটা খবর পায় যে তার স্বামীকে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে। কেউ একটা ভিডিও তুলে পাঠায় – ছেলেটা শান্তিপূর্ণভাবে পুলিশের দিকে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছে।

মেয়েটা প্রথমে অত ভাবিত হয় না, “আটক করেছে, সন্ধের মধ্যে ফিরে আসবে নিশ্চয়।”

কিন্তু ফেরে না। সেইদিন ছেলেটা ছাড়াও আরো সাতজনকে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়। তার মধ্যে কংগ্রেসের প্রাক্তন পৌর কাউন্সিলর ইশরত জাহানও ছিলেন।

তাদেরকে অস্ত্র আইন আর ভারতীয় দণ্ডবিধির নানা ধারায় অভিযুক্ত করা হয় – বিপদজনক অস্ত্র নিয়ে দাঙ্গা বাঁধানো, বেআইনি জমায়েত, সরকারী কর্মচারীদের কাজে বাধা দেওয়া, খুনের চেষ্টা। পাশাপাশি ছেলেটাকে সন্ত্রাস বিরোধী আইন বা ইউএপিএ (UAPA) তেও অভিযুক্ত করা হয়।

চোদ্দ দিন পরে ১১ মার্চ সে যখন স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে যায় – তখন ছেলেটা হুইলচেয়ারে, দু পায়ে আর ডান হাতের আঙুলে ব্যাণ্ডেজ বাঁধা। হেফাজতে থাকাকালীন পুলিশি অত্যাচারের ফল।

১৭ মাস হয় গেছে ছেলেটা জেলে।

পা ভাঙা অবস্থায় দেখার ১৩ দিন পরে, ২০২০র ২৪ মার্চ কোভিড অতিমারীর জন্যে সারা দেশ জুড়ে লকডাউন চালু হয়। রাষ্ট্রসংঘ সমেত নানা আন্তর্জাতিক সংস্থা বিভিন্ন রাজ্যের কাছে রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেওয়ার আবেদন রাখে।

ছেলেটার ডায়াবেটিসের সমস্যা, জেলে ভিড়ও কম নয় – ফলে চিন্তার যথেষ্ট কারণ ছিল। কিন্তু তবু তাকে ছাড়া হয় না।

এই সময়েই বাচ্চাগুলোর অনলাইন ক্লাসপত্রও শুরু হয়।

“আমার ইংরিজির জ্ঞান বিশেষ ভালো না। ও সবসময় বাচ্চাগুলোকে হোমওয়ার্ক করতে সাহায্য করত। আর এখন আমি একা তিনটে স্কুলের বাচ্চার সব অনলাইন ক্লাসের ঝামেলা সামলাচ্ছি।” সে বলে।

প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা ফোনের ব্যবস্থাও অনেকদিন ছিল না। সব কিছু গুছিয়ে আয়োজন করতে, একটা ছন্দে আনতেও অনেকদিন সময় লেগে গেছে।

মেয়েটা এখন নিজেই স্বশিক্ষিত সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার, ছেলেটার মুক্তির দাবিতে চলা আন্দোলনের প্রচারের। লকডাউনের সময়টা ব্যবহার করে নিজে নিজেই সে সবটা শিখেছে। “ও গ্রেপ্তার হবার আগে আমার কোনো সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত ছিল না।”

এখন সারাদিনের বেশ খানিকটা সময় মেয়েটার স্বামীর মুক্তির উদ্দেশ্যে পোস্টার, ভিডিও এসব বানাতে বানাতেই কেটে যায়।

বাচ্চাগুলো বোঝে বটে কেন তাদের বাবা বাড়ি নেই, তবু শেষ অবধি তারা তো বাচ্চাই। মেয়েটা বলে যে এক হিসাবে বাচ্চাগুলোকে ইশকুলে যেতে হচ্ছে না এতে সে খুশিই খানিক।

বাচ্চারা চারপাশের জগতের জটিলতা ভালো বোঝে না। “ওরা বলতে পারত না কেন ওদের বাবা জেলে রয়েছে, বাকি ছেলেপুলেরা ওদের সে নিয়ে অতিষ্ঠ করত।”

অতিমারি পর্বে বাড়ি বসে বসে বাচ্চাগুলো মাঝেমধ্যে বাবাকে চাই বলে বায়না করে। “তিনটে এরকম বাচ্চা ছেলেমেয়েকে নিয়ে তো সারাক্ষণ বাড়ি জুড়ে মুখভার করে বসে থাকা যায় না।”

স্বামীর নানা স্মৃতি সারাদিন জুড়ে ছড়ানো। বেড়াতে যাবার ভিডিও, ছবি – বিশেষ করে শেষবার ২০১৯-এ গোয়া যাবার ছবি। ছেলেমেয়েগুলোর প্রিয় টিকটক বন্ধ – তাই ইন্সটা রিলেই নেচে, সিনেমার ডায়লগ অনুকরণ করে সময় কাটে। মাঝেমধ্যে কম্পিউটার গেম খেলার অনুমতিও মেলে। একদিন ছেলেটার প্রিয় ডাল-গোস্ত খেতে বসে সবচেয়ে ছোটটা জিজ্ঞেস করে বসে – বাবাকে জেলে শুধু পটল খেতে দেয় কেন?

এই দেশ আর তার মানুষের প্রতি ওর বড্ড গভীর ভালোবাসা, মেয়েটা বলে ওঠে।

বলে, ছেলেটা কোনোদিন পক্ষ দেখেনি। ঈদের খাওয়া আয়োজন করলে দীপাবলির পার্টি করতেও ছাড়ত না। “ওর গ্রেপ্তারির পর, কত মেয়ে নিজেদের ছেলেপুলেদের ইশকুলের মাইনে নিতে এসেছে। ও কোন ধর্মের তা না দেখে কতজনকে টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য করত। আমি জানতামও না।”

গত দেড় বছরে মেয়েটা নিয়মিত নানা আন্দোলনের মঞ্চে যায়। তা সে হাতরাসে উচ্চবর্ণের পুরুষদের হাতে ১৯ বছর বয়সী দলিত মেয়ের ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলনই হোক, বা সাম্প্রতিক কৃষক বিক্ষোভ।

“আমি শিখেছি যে যারা যারা দেশের ভালো চায় তাদেরকে একসঙ্গে থাকতে হবে।” মেয়েটা বলে।

গত দেড় বছরে মেয়েটা আইনের ভাষার অনেক মারপ্যাঁচ শিখেছে, কোন পরিস্থিতিতে কী বলতে হয় তাও শিখেছে। সংহতি কীকরে জানাতে হয় তা যেমন জেনেছে, তেমনি পাড়া পড়শী আত্মীয়স্বজনের প্রশ্নের জবাব কী করে দিতে হয় তাও বুঝতে শিখেছে।  

কোনোদিন সাহায্য চায়নি, অসহায়তা দেখায়নি। এটা ঠিক একজন মেয়ের কাছ থেকে কাম্য নয়। তাই এই যে সে প্রথম নিজে বাড়ি থেকে বেরোচ্ছে, ইলেকট্রিক বিল জমা দিচ্ছে, সিলিণ্ডারে গ্যাস ভরছে, বাচ্চাদের দাঁতের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছে, নিজের পা দেখাতে ফিজিওথেরাপিস্টের কাছে যাচ্ছে – এতে তাকে ঠাট্টাতামাশার মুখে পড়তে হয়েছে।

বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে মেয়েটা যখন বাজারে যায়, তারা কিছু কেনার আগে জিজ্ঞেস করে, “মা এই জিনিসটার বেশি দাম নয় তো?” তাদের বাবা থাকতে তারা কোনোদিন এভাবে ভাবেওনি।

আর সব ট্র্যাভেল কোম্পানির মতো তাদের ব্যবসাও অতিমারির জন্যে এক বছরের উপর বন্ধ। সঞ্চয়ের সব টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। “ও না থাকতে আমি একটুআধটু অনেক কিছুই শিখেছি। ওর কোম্পানিকেও আস্তে আস্তে আবার দাঁড় করাতে শিখে নেব।” সে বলে।

একটা ব্যাপার অবশ্য সে এখনও শিখছে – বাচ্চাদের জন্য রোজ নিত্যনতুন নানা অজুহাত খাড়া করা।

সারাক্ষণ তারা জিজ্ঞেস করে, “মা, বাবা কবে বাড়ি আসবে?”

মেয়েটা তাদের কারোর একটা জন্মদিনের তারিখ বলে। সে জন্মদিন আসে যায়, তাও বাবা আসে না। তখন মেয়েটা পরের জন্মদিন হিসেব করে বলে। এরকম করে ছটা জন্মদিন কেটে গেছে।

বাচ্চাদের আশা জিইয়ে রাখতে হয়। তাই রোজ তাদের বাবা খালিদ সইফি বাড়ি ফিরলে কীভাবে অভ্যর্থনা জানানো হবে তার প্ল্যানপ্রোগ্রাম বানানো হয়।

সবচেয়ে বড় ইয়েশা বলে, “বাবাকে ছাড়লে আমি একহাতে চিকেন টিক্কা, আরেক হাতে চাইনিজ খাবার নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকব।”

“রকেট, রংমশাল, আরো নানা রকম রকম বাজি” ছোট ছেলে তাহা যোগ করে।

সবচেয়ে ছোট মারিয়াম বলে, “বাড়ির প্রতিটা কোণায় ফুল রাখব, আর খুব জোরে গান বাজাব।”  

“আমরা বসে বসে অনেক আড্ডা দেব, ছাড়বই না ওকে আর” ওদের মা নার্গিস সইফি যোগ করে। 

 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *