এসব লেখার শিরোনাম টিরোনাম হয় না

বিঃ দ্রঃ এই লেখাটি পড়তে তারাই সক্ষম যারা জীবনে অন্তত একবার মারিজুয়ানা সেবন করেছে। 

দুরন্ত ঘুর্ণি আর জলের বকবক শব্দ। একটানা। একটানা। বুক চিতিয়ে শুয়ে থাকা আকাশের দিকে একদৃষ্টে, অপলকে। আকাশ আসতে আসতে ভাঙছে। ঘন নীল থেকে কালো থেকে লাল হয়ে ধূসর থেকে সবুজে। দুরন্ত ঘুর্ণির মতো আকাশ ফাটছে রঙের বন্যায়৷ আহহ, লিখে রাখি বরং খাতার পাতায়। লিখে রাখি সব। কিন্তু অক্ষর সাজিয়ে হবে টা কি! ভুতের মতো ভর করে বসা ঝিমকে কিকরেই বা ধরবো অক্ষরে? আর লিখে হবেটাই বা কি? লিখতে বসলেই মাথায় আসে একগাদা ভাবনা। কার জন্য লিখছি, কেই বা পড়বে, ফেসবুকের ঝটতি হাততালি কুড়োনো লেখা নাকি সিরিয়াস সাহিত্য?  আচ্ছা, সিরিয়াস কে কবে হতে চেয়েছে। এই যে উঠতি বয়সে, ছোটবেলায় ডায়েরি পেলেই পাতার পর পাতা ভরাতাম, তার জন্য তো কোনো পাঠকের প্রয়োজন হয়নি। হয়েছিলো, ওই আশেপাশের দু একজন। এখন লেখার আগেই একরাশ চিন্তা জমে জমে যায়। লেখার পর? আরে ধুর মশাই, লেখাটা শুরুই হলোনা, লেখার পরের চিন্তা৷ আসলে এরকম হয়৷ আকাশ ভাঙছে।চাঁদের আলোর মধ্যে দিয়ে সূর্য্য উঁকি দিচ্ছে। ভালোলাগছেনা। আমরা যা বলতে চাই তা কি বলতে পারি কখনো? খালি অন্য কথা, অন্য অন্য কথা। মানুষ যা বলতে চায় তা বলে দিতে পারলেই আর তার যন্ত্রণা ছিলোনা কোনো। যা বলা হয় তা অনেক না বলা কথার বিচ্ছুরণ মাত্র। তাই তো এতো যন্ত্রণা। বোঝা হয়ে চেপে বসে, রাতে ঘুম আসেনা, ঘুমালে দিন আসেনা। শালা কেউ বুঝলোনা। এ জগতে প্রেমিকেরাও বুঝলোনা আমাদেরকে।  বোঝাতেই পারলাম না। কিকরেই বা বোঝাবো, ভাষা তো আমাদেরকে বুঝতেই পারেনা কখনো। চেনা চেনা কথা, একই একই কথার মারপ্যাঁচে আমরা হারিয়ে ফেলি। ঠিক যেমন আকাশের রং টা হারিয়ে যাচ্ছে বারবার। প্রাগৈতিহাসিক এক উড়ুক্কু প্রাণী ঘিরে ধরেছে ফাটা আকাশকে। আকাশের যে ফাটা অংশ থেকে রং চুঁইয়ে পড়ছিলো আমার বুকে সেখানটা জুড়ে কালো বাদুড়। আমার বুকের উপর কালো বাদুড়। কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে হৃৎপিন্ড। এ লেখার একটা লাইন ও বাদ দেওয়া বারণ। একটা লাইন ও পেরিয়ে চলে যাওয়া বারণ। যা মনে হচ্ছে যেভাবে মনে হচ্ছে পরপর লিখে যাও খালি। নইলে বাদুড়ের প্রসংগটা বাদ রাখা যেতো, বাদ রাখা যেতো প্রেমিকের প্রসংগ ও। অথচ জীবনে যা যা থেকে পালাতে চাই আমরা তাই আমাদের বেশী বেশী করে গ্রাস করে বসে। এই যে দিল্লীর ঘরছাড়া মানুষের গল্প, দেশজুড়ে ঘটে চলা ভায়োলেন্স, ভায়োলেন্সের ইমেজ, রাস্তায় শুয়ে মার খেতে খেতে লাশের জন্ম- এসব কি ভুলে যেতে চাইনি আমরা? ভাবতে চাইনি এসব সত্যি নয়? হয়তো দুঃস্বপ্ন, যা কেটে যাবে রাত ফুরোলেই। কিন্তু তা হয়না৷ আমরা ভুলে যাই, আমাদের স্মৃতিরা থেকে যায় অশরীরির মতো৷ তাই তো একা একা অন্ধকার রাস্তায় হাঁটতে গেলে প্রতিবার প্রতিটা ধর্ষণের গল্প  জ্যান্ত হয়ে গিলে খায় আমাদের৷ এই যে একা একা আকাশের দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছি, পিষে যাবোনা তো মাটিতে? মুহুর্তেই লাশ হয়ে যেতে পারি, আমার লাশ তৈরির ভিডিও কাল ভাইরাল হয়ে যেতে পারে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে৷ এই যে সোশ্যাল মিডিয়া। এও তো এক প্যারালাল রিয়েলিটি। বাস্তবতার কোন স্তরে আছি তা নিয়ে ভাবনা কতখানি বাস্তবোচিত? এই যে আকাশের রং এখন গোলাপি, তা তো আমার আকাশ, আমার নিজস্ব আকাশ। কারো আকাশের রং মিশমিশে ধূসর ও হতে পারে, কে ঠিক করে দেবে? এক বাস্তবে থেকে আরেক বাস্তব অচেনা লাগে, যার আকাশ ধূসর সে কেমন করে রং বদলানো আকাশের খোঁজ পাবে? এই যে আমি লিখছি, যে কখনো লেখেনি তার সম্বন্ধে আমি কতটুকু জানি? আর যে সারাদিন শহরের ট্রেনে বাদাম বিক্রি করে সেই বা কতটুকু জানে আমাকে? আমরা কি কেউ কাউকে বুঝতে চেয়েছিলাম কোনোদিন? না, চাইনি বলেই তো ছুঁয়ে গেছি কেবল, স্পর্শ করতে পারিনি কখনোই। আমার লেখার একটা লাইন ও কোট করার মতো নয়, একটা লাইন ও সাহিত্য নয়। তাই বলে কি আমি এখানেই লেখা থামিয়ে দেবো? আমি হয়তো লেখা থামালাম, কিন্তু তাহলেই কি লেখা বন্ধ হয়ে যাবে? বন্ধ তো কিছু হয়না, থেমেও যায়না। স্তিমিত হয়ে থাকে, ভেতর ভেতর তীব্র হয়ে বাড়তে থাকে, হঠাৎ করে জেগে ওঠে – যেমন বাতাস পেলে আগুনের ফুলকি, যেমন বিদ্রোহ, যেমন প্রেম। এখানে আমাদের থামতে হবে। এতোক্ষণের স্বগতোক্তি আর জলের বকবক খুঁতিয়ে দেখতে হবে। কতগুলো বানান ভুল হলো, কতগুলো দাঁড়ি কমা পড়লোনা ঠিক করে। আরে! সেসব থাক। সাহিত্য হলো কি? কি হবে ছাইপাশ লিখে যদি সাহিত্যই না হয়! ভাষার উপর একটা ঠিকমতো দখল না থাকলে লেখা হয় নাকি! আরে সুবিমল পড়োনি, একি একি সন্দীপন ও না! তাহলে হবেনা। বাংলায় এক লাইন একটু অন্যরকম লিখতে গেলে এদের লেখা পড়তেই হবে। আজকেই পড়ে নাও, এক্ষুনি। তাহলেই অনেক ভালো হবে তোমার লেখা। নিশি উঠে পড়ে। আমার সন্দেহ হয়। সেও ওঠে৷ লুকিয়ে দ্যাখে দরজা ফাঁক করে। বাথ্রুম থেকে নিশি সোজা ঢোকে রান্নাঘরে। হয়ত যা ভাবছি আমি তা নয়, নিশি কিছু একটা বলার জন্য ঢুকেছে, যেমন ‘কেমন আছেন’ বা ‘এতক্ষণ এসেছি, একবার এলেনই না ঘরে’, আমি কৌতুহল চাপতে পারিনা, এগিয়ে যাই৷ রান্নাঘরে ময়লা বালবের ঠিক নিচে, ঘরের মাঝখানে হাসি ও নিশি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, নিশি পা ফাঁক করে ঈষৎ ঝুঁকে, কিন্তু হাসির জড়োসড়ো ভাব আমার মোটে ভালোলাগেনা, যেন সে এতোক্ষণ রান্নাঘরে বাঘের ভয়ে লুকিয়ে ছিল, সে আরো সাবলীলভাবে কেন দাঁড়িয়ে নেই?  কারণ আকাশের রং বদলাচ্ছিলো, এখন ওই জ্বলন্ত লাভার মতো ফাটা জায়গাটা দিয়ে কিলবিল করে বেরিয়ে আসছে পিঁপড়ে৷ সবার এখন একটা সিনেমার কথা মনে পড়বে৷ ফাটা বাঁশের মতো রেফারেন্স খুঁজবে সব জায়গায়। কোথায় দেখেছি, কোথায় শুনেছি, তারই মতো লাগলো কিনা, আরে ঝেপে দিলো না তো! সব এক এক কথা, এক এক মুখ, এক এক এক এক চর্বিতচর্বণ। হাসি কিকরে সাবলীলভাবে দাঁড়াবে তখন? আগে শালা ওকে চলতে দিন, তারপর এসব মারাবেন৷ হাসি আমাকে ঢুকতে দ্যাখে! নিশি পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে, দেখতে পায় না। হাসি নিশিকে আমার ব্যাপারে কোনো ইশারা করে না। হাসিকে দেখে মনে হয়, সে চায় আমি সাক্ষী থাকি সমস্ত ব্যাপারটার- যদি নিশি কিছু বেয়াদপি করে আমি তা স্বচক্ষে দেখি ও তাকে তার উচিত শিক্ষা দিই। এ জন্যিই নিশিকে সে সাবধান করে দেয় না মনে হয়। নিশিও জানে না, তার জানার আগ্রহ আর আছে বলে মনে হয় না। এখান থেকে আমরাও এবার আগ্রহ সরিয়ে নিতে পারি৷ হাসি নিশির থেকে আকাশ দেখা অনেক মজার। এ আকাশ কি আর রোজ পাবো? পিপড়ের সারি বেয়ে নেমে আসে রংধনু৷ কত রঙ, রামধনু হয়ে আমার শরীর জাপটে ধরে। শিরা থেকে শিরায়, ধমনী বেয়ে ধমনী হয়ে ছড়িয়ে পড়ে রঙমশাল। হার্টবিট শুনতে পাচ্ছি, ভীষণ জোরে, ভীষণ ভীষণ জোরে। উপুড় হয়ে শুই। ঘাড়ের কাছে ঠোঁট ঘষে দেয়। দেখতে পাইনা তো। চোখ বুজে ফেলি। ঘাড় থেকে পিঠে নেমে আসে স্পর্শ, জাদুকাঠির মতো ছুঁতে ছুঁতে যায় আমায়। এতোক্ষণ আমার শব্দেরা কথা বলছিলো, এখন কথা বলে ওঠে শরীর৷ যৌনতার বর্ণনা আমার আগের লেখায় আছে। এ লেখায় শরীর দিয়ে শরীরকে বুঝবো, শব্দ দিয়ে নয়। চোখ খুলে এ লেখা পড়তে থাকলে আপনিও বুঝবেন না, বরং চোখ বুজে বিরাম নিন, শরীরকে ভাবতে দিন, তারাই কথা বলবে৷ যৌনতা শেষ হলে পড়ে থাকে বিষাদ। নীল হয়ে যায় শরীর, মৃত্যুর আগের রাত্তিরের মতো। দেওয়ালে ঠেসে ধরে বলেছিলে নিয়ে যাবে অন্য কোথাও। এখানে আর না। আমাদের অন্য কোথাও যাওয়া হয়নি, ঝর্না দেখা হয়নি, পাশে বসে কথাও বলা হয়ে ওঠেনি কখনো। এতো এতো প্রেমের কবিতা খালি প্রেমকে বর্ণনাই করে গেছে। কেউ বলেনি, শান্ত হয়ে বোসো, চোখ বুজে ভেবে নাও তোমার প্রেমের আখ্যান৷ শালা কেউ বলেনি, সবাই খালি চেনা ভাষা দিয়ে ভাষা দিয়ে ভাষা দিয়ে ভরিয়ে গেছে দিস্তার পর দিস্তা। অব্যর্থ প্রেম আর ব্যর্থ প্রেমের কাব্য। লেখা হচ্ছে না, রাজনীতি হচ্ছেনা, প্রেম ও হচ্ছেনা ঠিকমতো। লেখা দিয়ে হয় টা কি? কি হয় সাহিত্য করে? প্রেমে কি সুখ? কি সুখ দিন বদলের স্বপ্নে? দিন বদলাবে না জেনে উঁচু ছাদ থেকে টপাটপ ঝাঁপ দিয়ে দিয়েছে আমার পূর্বপুরুষেরা। পূর্বজন্মের কথা মনে পড়লেই টানটান হয়ে বসি। একটা রাস্তা, সেই রাস্তার বাঁক দিয়ে প্রতিদিন হেঁটে যেতাম আমি। কোথায় যেতাম জানিনা। ওই রাস্তাটাই দেখি কেবল। রাস্তার দুধারে ম্যাগাজিনের দোকান আর দেওয়াল ভরা গ্রাফিতি। দুদ্দাড় করে লোকজন চলছে, দেওয়ালে ঠেস দিয়ে জাপটে ধরে আছে প্রেমিক প্রেমিকারা। হলদে পাতা ঝরে পড়লো ওদের ওপর। এই ঝরে পড়লো কোমল ফুলের পাপড়ি। ওটুকুই জীবন, এই যে জীবন থেকে দাঁড়িয়ে পড়ে পরস্পরকে চুমু খাওয়া। ওখানেই সব। ওটুকুতেই সময় চিরকালীন হয়ে স্থির হয়ে গেলো। ম্যাগাজিনের দোকান, ব্যস্ত মানুষের ঢল, রাস্তার গ্রাফিতি, গাছ ফুল পাতা.. আজ সারাদিন এই সময়ের জন্যই অপেক্ষা করে ছিলো, অপেক্ষা করেছিলো এই মুহুর্তের। আমার পূর্বজন্মের স্মৃতি বলতে এটুকুই। এই সামান্য একটা রাস্তার সামান্য একটা ফুটপাথ। অথচ কি রহস্যময়, কি বিপুল। অপার রহস্যের সামনে মাথা নত করে বসতে হয়। এতো প্রশ্ন করতে নেই। আমাদের মনের কতটুকুই আমরা জানতে পারি এক জীবনে? আকাশের রং বদলাচ্ছে আবার৷ উপুড় হয়ে ঢেলে দিচ্ছে শত শত রঙের মণিমুক্তো, লক্ষ লক্ষ রঙের  ক্রিস্টাল কণা। ঝলমল করে উঠছে চারিদিক। চাঁদ আর সূর্যটা একসাথে চমকাচ্ছে। সারা আকাশ বেয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে বিন্দু বিন্দু তারা। এক্ষুনি এরা সবাই  আমার উপর নেমে আসবে, এক্ষুনি আমার কান দিয়ে নাক দিয়ে মুখ দিয়ে শোঁ শোঁ শব্দে ঢুকে যাবে তারাগুলো। আবার হার্টবিট শুনতে পাই। এবার আগের থেকেও জোরে। বিশাল একটা ঝড় আসছে এখানে। উঠতে পারছিনা আমি। উঠলেও এক পা এগুতে পারবোনা। ঝড় হয় হোক, সারা আকাশ ভেঙে পড়ুক এভাবেই। বকবক শব্দ বকবক শব্দ আসতে থাকে খালি। 

আমি চোখ বুজি। 

সুতরাং, আমার লেখা শেষ হয়। 

আসলে লেখা চলতে থাকে,

অনন্তকাল জুড়ে, অসীমে। 

যার খোঁজ কেউ কখনো পাবেনা… 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.