কেয়ারের রোজনামচা

যে প্রশ্নটা আমাদের প্রায়শই ভাবায় তা হল, রোম্যান্টিক ঘনিষ্ঠতাকে ধারণ করে রাখার জন্য বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটি (cis1-heterosexual) এখনও কেন প্রাথমিক এবং একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়ে যায়। একটি আদর্শ ব্যবস্থা হিসাবে বিবাহ প্রতিষ্ঠানটি প্রসারিত হয়েছে, ভেঙেছে, মধ্যস্থতায় গেছে এবং টিকেও আছে। তা সে বহুগামিতার ক্ষেত্রেই হোক অথবা এককগামিতা, বেশুমার কাঠামোগত বৈষম্যের সৃষ্টি করেও দাম্পত্য জীবনের প্রতিলিপি হিসেবে বিবাহের দৃঢ় উপস্থিতি অব্যাহত থাকছেই। আপাতদৃষ্টিতে বৈবাহিক গার্হস্থ্যতার সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি হল প্রত্যয়িত সাহচর্য এবং বয়েসকালে কেয়ার2 পাবার নিশ্চয়তা। আর তাই বিবাহ এবং এর উপজাতক, অর্থাৎ বংশধর, যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসে তা হল এই যে বার্ধক্যের সময় প্রশ্নাতীত সমর্থন থাকবে এবং যত্নের ত্রুটি হবে না। বিবিধ সামাজিক ও আইনি ব্যবস্থার দ্বারা এই স্বপ্ন প্রশমিত করা হয় এবং এর মাধ্যমে বিবাহ প্রতিষ্ঠান আরও জোরের সঙ্গে বিদিত হয়3

আমরা যারা বিবাহিত জীবনের অর্থনীতির বাইরে থাকার সচেতন সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তাদের সকলকেই বয়েস বা সামাজিক অবস্থান (locus standi) নির্বিশেষে, “বয়েস হলে কে দেখবে তোকে”? প্রশ্নটির সম্মুখীন হতেই হয়। বয়েস হলে কেউ দেখার নেই, এই যুক্তিতে এবং আমার জীবনকে চালনা করতে পারা ও নিজের দায়িত্ব নিতে পারার ক্ষমতাকে অস্বীকার করার জায়গা থেকেই আমার জন্মগত পরিবার প্রায়শই আমার জীবন নিয়ে কৌতূহলী হয়ে পড়ে, হস্তক্ষেপ করতে চায়, আমার ভালো খারাপের ঠেকা নিয়ে নেয়। আমার ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবার মাতো স্বামী এবং আমার যত্ন নেবার মতো সন্তানদের অনুপস্থিতিই তাদের উদ্বেগের উৎস। এই উদ্বেগের মধ্যে তারা যেটা মাথায় রাখে না সেটা হল বেশিরভাগ হেটেরোনরমাটিভ (heteronormative) এবং বিসমকামী পরিবারে কেয়ার ওয়ার্ক কাঠামোগতভাবেই মহিলাদের শারীরিক শ্রম, যৌন শ্রম এবং emotional labour4 শোষণের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে। গতানুগতিকভাবে মহিলারাই সেবা প্রদান করে থাকেন, যেন “চব্বিশ ঘণ্টার, “অন কল” দায়িত্ব নিয়ে আছেন। জন্মগত অথবা বিবাহসূত্রে পাওয়া, তা যে কোন ইউনিটেই হোক না কেন, মহিলারা প্রেমের শ্রমের বেতনহীন শ্রমিক যারা নিরলস পরিশ্রম করে সেবাযত্ন প্রদান করে যান (তা সে প্রাত্যহিক চাহিদার জায়গা থেকে হোক অথবা শুশ্রূষার প্রয়োজনীয়তায়)। যত্ন নেওয়া, সেবা করা, দরদী হওয়া এই মহিলাদের অন্তরঙ্গ পৃথিবীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। এই বেতনহীন গার্হস্থ্য কেয়ার ওয়ার্ক নারীদের করে যেতে হয় বাড়ির বাইরের বেতনভিত্তিক কাজের সাথে সাথে। নয়তো, এটাকে এমন অগ্রাধিকার দিতে হয় যাতে গৃহকর্মের দায়িত্বগুলোকে কেন্দ্রে রেখে বাড়ির বাইরের কাজকে সাজানো যায়। এমনকি প্রয়োজনে বাড়ির বাইরের কর্মসংস্থান বাতিলও করতে হতে পারে। তার উপর, পারিবারিক কাঠামোর ভেতরে সেবাযত্ন পাবার বিষয়টির মধ্যেও থাকবন্দীকরণ রয়েছে। কে কেয়ার পাবেন সেটা শুধুই বয়েস এবং লিঙ্গ পরিচিতির ওপর নির্ভর করে না সবসময়। বরং কে বেশি পারিবারিক খরচায় টাকা দিতে পারছেন, কে কতটা মানসিক অথবা শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে পরিবারে আছেন, কে একা, কে অসুস্থ ইত্যাদি এবং আরও অনেককিছুর ওপর নির্ভর করে কে কতটা কেয়ার পাবেন। উদাহরণস্বরূপ ভাবা যেতে পারে, একজন বয়স্ক পুরুষ সদস্য বাড়ির একজন বয়স্ক মহিলা সদস্যের চেয়ে সেবাযত্ন পাবার ক্ষেত্রে সবসময়ই বেশি যোগ্য। অথবা বাড়ির একজন সক্ষম শরীরের বেতনভুক্ত পুত্রসন্তান তার অক্ষম (disabled) ভাইয়ের, যে কিনা পারিবারিক রোজগারের ওপর বেশি নির্ভরশীল, চেয়ে বেশি সেবাযত্ন পাবে5

প্রচলিত ধারনায় আছে, রক্তের সম্পর্ক এবং বৈবাহিক আত্মীয়তার ঘেরাটোপের বাইরে জীবনযাপন করলে তা যৌবনে এবং বৃদ্ধ বয়সে সাহচর্য ও সেবাযত্নের ক্ষেত্রে প্রতিকূলতা বাড়িয়ে তুলবে। এই ধারনার বিপরীতেই গড়ে উঠেছে বন্ধুত্ব, সংহতি এবং কমিউনিটির মধ্যে বসবাসের ধারণা। এরকম ক্যুয়ার (queer) ভালোবাসা এবং ক্যুয়ার যাপন, সংবেদনশীল সম্পর্ক (affective relationalities) এবং যৌথ কেয়ারের (collaborative care) ধারণাকে এমনভাবে অন্তর্ভুক্ত করে যা হেটেরোনরমাটিভ পারিবারিক আত্মীয়তাকে অতিক্রম করে যায়।

সময়ের সাথে সাথে অন্তরঙ্গতার যাপনযাত্রায় ও বোঝাপড়ায় যে পরিবর্তনগুলি ঘটে এসেছে তা এককগামি দাম্পত্যের ভীত নাড়িয়ে দেয়। শিক্ষার এবং জীবিকার আকাঙ্ক্ষা-বাধ্যবাধকতার ফলে শ্রেণি, বর্ণ, লিঙ্গ এবং যৌন পরিচয় নির্বিশেষে অনেক মানুষই তাদের জন্মগত ও বৈবাহিক পরিবার থেকে আলাদা বসবাস করে। এই মানুষেরা যৌথ যাপন (cohabitational living) এবং একত্র গার্হস্থ্যতায় (shared domesticity) নিযুক্ত থেকে দৈনন্দিন যাপন ও বিপদে আপদে সাহায্যের জন্য অ-পারিবারিক সাপোর্ট নেটওয়ার্কগুলির উপর নির্ভর করে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে হাউসমেট, প্রতিবেশী এবং সহকর্মীদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ বৃত্ত তৈরি করে একে অপরের সঙ্গে আবেগগত, আধ্যাত্মিক এবং বৈষয়িক ভালো থাকার এক সুরক্ষা-জাল বুনে নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। সঙ্কটের সময়ে তারাই পাশে থাকে এবং তাদের ওপরই নির্ভর করা যায়। এহেন যাপিত বাস্তবগুলি তথাকথিত দাম্পত্যের বাইরেও ঘনিষ্ঠতা এবং সম্পর্কের কল্পনাকে উস্কে দেয়।

দাম্পত্যের চিরাচরিত অভ্যেসকে সচেতনভাবে ভাঙলে যে বিবিধ বন্ধনের সম্ভাবনা উঠে আসে তাকেই আমি “affective relationalities”6 বলছি। দাম্পত্যের সমালোচনার মানে এটা নয় যে রোমান্টিক সেক্সুয়াল পার্টনারশিপ affective relationalities-এর ভাবনাকে সীমিত করে। আবার দাম্পত্যকে উন্মোচিত করতে হলে বহু-যৌনতার অভ্যাস করতেই হবে এমনও নয়। আমাদের মধ্যে অনেকেই সচেতনভাবে এককপ্রেমে স্বচ্ছন্দ। কারণ এককপ্রেম/এককগামী সম্পর্কেও দাম্পত্যের প্রতীকীগুলোর সঙ্গে জুড়ে থাকা এনটাইটেলমেন্ট, একচেটিয়া অধিকার এবং বাধ্যতামূলক আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অন্তরঙ্গতাকে প্রেম, পরিবার, বন্ধুত্ব পরপর এই অর্ডারে থাকবন্দী করতে আমরা অভ্যস্ত। এই সম্পর্কগুলোর অন্তর্নিহিত আবেগ এবং কেয়ারের আদানপ্রদানের নির্দিষ্ট স্তরভেদের মাধ্যমেই এই থাকবন্দীকরণ সম্ভব হয় – হেটেরোনরমাটিভ পরিবারে আত্মীয়তা যেমনটা দাবি রাখে।

রক্তের সম্পর্ক ও আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ থাকা হেটেরোনরমাটিভ কেয়ারের বিপরীতে আমরা খুঁজে পাই ক্যুয়ার7 কেয়ারের রোজ নামচা। affective relationalities এবং যৌথ যাপনের চলাচলের মধ্যে থেকেই তৈরি হয়  ক্যুয়ার কেয়ার। affective relationalities-এর মধ্যে দিয়ে নির্মিত এই যৌথ কেয়ার সেখানেই সম্ভব যেখানে এটা কোন (নিওলিবারাল পণ্যের মতো) চুক্তির আকার নেবে না। অথবা মায়ের সন্তানের প্রতি কেয়ার ওয়ার্কের মতো এটাকে জৈবিক এসেনশিয়ালিজমের মানদণ্ড দিয়ে বিচার করা হবে না। এখানে যৌথতা (collaboration) হল জোট বাঁধার একটি সচেতন, সক্রিয়, গতিশীল, রাজনৈতিক অনুশীলন। এই যৌথ কেয়ার থেকে উদ্ভূত আত্মীয়তা বাণিজ্যিক (পারস্পরিক আদান-প্রদান) বিনিময়ের ভিত্তিতে নয়, রাজনৈতিক বিনিময়ের দ্বারা গড়ে উঠবে। তৈরি হবে এমন এক আদান-প্রদানের সম্পর্ক যেখানে ক্ষমতার ভাগাভাগি হবে, ক্ষমতার থাকবন্দীকরণ থাকবে না, থাকবে কথোপকথনের পরিসর। সহযোগ অথবা কোলাবরেশন সমমনস্ক, অভিন্ন, এবং একই অবস্থানের মানুষদের মধ্যে হবে না বরং তাদের মধ্যে হবে যারা বিভিন্নতাকে, মতপার্থক্যকে নিয়ে চলার অভ্যাস রাখে। বিভিন্নতার সঙ্গে পথ চলাই থাকবন্দীহীন, আত্মসমালোচক এবং কথোপকথনের পরিসর তৈরি করে, যা প্রতিমুহূর্তে প্রশ্ন করতে থাকবে নিজেকে, রোজকার অভ্যেসকে, সম্পর্কের মধ্যেকার ক্ষমতার ভাগাভাগিকে। দ্বন্দ্ব, বিশৃঙ্খলা, অগোছালতা কেয়ার ওয়ার্কের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। কেয়ার-কে নিশ্চিতরূপে ধরে না নিয়ে এই ক্যাকাফনির সম্মুখীন হতে পারা এবং পাল্টা তর্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পারাই কেয়ার অনুশীলনকে ক্যুয়ার হয়ে উঠতে সাহায্য করে।

কেয়ার কে এখানে সমতার আদান-প্রদান অর্থে কল্পনা করা হচ্ছে না – যেমন, “তুমি আমার কেয়ার নেবে এবং আমি তোমার কেয়ার নেব” – বরং ভাবা যেতে পারে যে আগে থেকে নির্ধারিত কোন দিশা অনুসরণ না করে কেয়ার বিভিন্ন দিশায় তার শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে দেবে। এই বিভিন্ন শাখাপ্রশাখা কখনো অন্তর্মুখী হবে কখনো বহির্মুখী, আবার বিভিন্ন সন্ধিস্থলে আবেগের আদান-প্রদান এবং কোলাবরেটিভ কেয়ারের মধ্যে জট তৈরি করবে। অনেকটা আদার মতো। গাছের মতো সোজা, লম্বা, থাকবন্দী নয়, আদার মতো রাইযোমেটিক যাপন (rhizomatic)8 যা  কিছুটা এবড়ো খেবড়ো, নানা দিকে ছড়ানো, জড়ানো, থাকবন্দীবিহীন ও জটিল। কোলাবর‍্যাটিভ কেয়ার ঠিক এই আদার মতোই ছড়ানো জড়ানো, জটিল এক রূপরেখা যা আমাদের ছড়ানো ছেটানো দৈনন্দিন যাপনের ও অস্বাস্থ্যের এবং বার্ধক্যের সময়ের পাথেয় হতে পারে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *