আত্ম(বি)নির্মাণের লড়াই

বিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকে নারীবাদী আন্দোলন লিঙ্গ/যৌনপরিচয়, যৌনতা, যৌনসঙ্গী নির্বাচন ইত্যাদি বিষয়গুলি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা সামাজিক চিন্তাধারাকে আঘাত করতে শুরু করে। সাম্প্রতিক কালে ‘অপ্রচলিত’ (অর্থাৎ অ-দ্বিকোটিক) লিঙ্গ/যৌনপরিচয়ের স্বীকৃতির দাবীতে সারা বিশ্বে গড়ে ওঠা নানা লিঙ্গ-রাজনৈতিক আন্দোলন, ‘প্রাইড প্যারেড’-র মতো স্বাধিকার উদযাপনের কর্মসূচি নাড়িয়ে দিয়েছে যুগ যুগ ধরে গেঁড়ে বসা সমাজ ব্যবস্থার শিকড়। এই দাবী আসলে সমাজ-নির্ধারিত লিঙ্গ/যৌনপরিচয়ের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে এসে নিজের পছন্দমতো লিঙ্গ/যৌনপরিচয় বেছে নেবার অধিকারের দাবী। সমাজের পরিয়ে দেওয়া শৃঙ্খল থেকে নিজেকে মুক্ত করার স্বপ্ন। এই লড়াই শেষ পর্যন্ত এক স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম, আত্মনির্ধারণের গল্প। সামাজিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে আমাদের ব্যক্তিসত্তার এক আবশ্যিক শর্ত হল লিঙ্গ/যৌনপরিচয়। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে মানব শিশুর লিঙ্গ/যৌনপরিচয় 1 নির্ধারিত হয়ে যায়। বর্তমানে প্রযুক্তির কল্যাণে এমনকি শিশু ভূমিষ্ঠ হবার আগেই ভ্রূণের লিঙ্গ/যৌনপরিচয় কী তা জেনে নেওয়া সম্ভব। কোন নিয়মে, কিসের ভিত্তিতে লিঙ্গ নির্ধারণ করা হবে তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। মানব শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণের প্রক্রিয়া এখন ভ্রূণাবস্থা থেকেই ক্রোমোজোমের গঠন পরীক্ষা করে সম্পন্ন হতে পারে। যদিও এখনও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশু ভূমিষ্ঠ হবার পর তার জননাঙ্গের নিরিখে লিঙ্গ/যৌনপরিচয় স্থির হয়ে যায়। এরপরে সেই পরিচয় অনুসারে তার নামকরণ হয়। পরবর্তী পর্যায়ের সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়াও ওই লিঙ্গ/যৌনপরিচয়ের ভিত্তিতেই শুরু হয় এবং চলতে থাকে – শিশুটির পোশাকবিধি, তার দেহভঙ্গিমা, কথা বলার ধরন, তার চলাফেরা, আচার-আচরণ সব কিছুই ধীরে ধীরে সমাজ-প্রচলিত ছাঁচে ঢেলে তার ব্যক্তিসত্তা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। আজও সমাজের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাধারণ ভাবে মোটাদাগে সব মানুষকে হয় ‘নারী’ অথবা ‘পুরুষ’ এই দুই বর্গের যেকোনও একটার অন্তর্ভুক্ত করার প্রচলিত রীতিই মেনে চলা হয়। কেবল মাত্র দুটি লিঙ্গ/যৌনপরিচয় স্বীকৃত বলে একে (বাইনারি)দ্বি-কোটিক লিঙ্গ/যৌনপরিচয় ব্যবস্থা বলা যায়।

জগতজোড়া আধুনিক সভ্য সমাজে এই দ্বি-কোটিক লিঙ্গ/যৌনপরিচয় ব্যবস্থারই আধিপত্য। তাই সেখানে নারী-পুরুষের অতিরিক্ত কোনও লিঙ্গ/যৌনপরিচয়গত অবস্থানের সম্ভাবনার স্বীকৃতি কয়েক দশক আগেও ছিল না। সাম্প্রতিক কালে লিঙ্গ-রাজনৈতিককর্মীদের আন্দোলনের চাপে দুইয়ের অতিরিক্ত লিঙ্গ/যৌনপরিচয়ের বিকল্প নানা দেশে আইনগত স্বীকৃতি পেতে শুরু করেছে। এখনও পর্যন্ত ভারতবর্ষ সহ পৃথিবীর প্রায় ১৪টি দেশে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ নামে একটি অতিরিক্ত লিঙ্গ/যৌনপরিচয় বর্গ সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়েছে। মাত্র কয়েক বছর আগে পর্যন্ত সারা পৃথিবীতেই আধুনিক রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে প্রাপ্য মৌলিক অধিকার থেকেও তাঁরা বঞ্চিত ছিলেন। স্বাধীন ভারতও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তবে দীর্ঘ লড়াইয়ের শেষে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ২০১৪ সালের ১৫ই এপ্রিল ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিরা রাষ্ট্রের চোখে ‘নারী’ এবং ‘পুরুষে’র অতিরিক্ত ‘তৃতীয় লিঙ্গ’-পরিচয়ধারী ভারতীয় নাগরিক হিসেবে মর্যাদা লাভ করেন। আক্ষেপের বিষয় হল, ২০১৯-এ নানা বিতর্ক এবং প্রতিরোধ পার হয়ে অবশেষে দ্য ট্রান্সজেন্ডার পারসন্স (প্রোটেকশান অফ রাইটস) অ্যাক্ট তৈরি হলেও ২০১৪ সালের রায়ে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের আত্মনির্ধারণের অধিকারের স্বীকৃতির যে কথা বলা হয়েছিল তা সার্বিকভাবে রক্ষিত হয়নি।    

[এখানে বলা প্রয়োজন যে ‘ট্রান্সজেন্ডার’-এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে ‘রূপান্তরকামী’র ব্যবহার এখন প্রায় সর্বজনগ্রাহ্য। কিন্তু ইংরেজি এবং বাংলা শব্দ দুটি যথার্থই অভিন্নার্থক নয়। ‘ট্রান্স-’ শব্দটির বিবিধ অর্থের ভিত্তিতে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দের একটি ব্যাপক এবং আরেকটি সঙ্কীর্ণ প্রয়োগ আছে। সঙ্কীর্ণ অর্থে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ (যখন ‘ট্রান্স-’ এর অর্থ changing) রূপান্তরকামী বোঝালেও ব্যাপক অর্থে (যখন ‘ট্রান্স-’ মানে beyond) তথাকথিত নারী/পুরুষ লিঙ্গপরিচয়ের ‘বাইরে’ যাঁরা তাঁদের সামগ্রিকভাবে বোঝাতে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কাজেই ‘রূপান্তরকামী’র তুলনায় ‘ট্রান্সজেন্ডার’-এর অর্থ ব্যাপকতর। সমাজস্বীকৃত লিঙ্গ/যৌনপরিচয়-বর্গবহির্ভূত (ট্রান্সজেন্ডার) অংশকেই ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ বা ‘অপর লিঙ্গ’ বলে চিহ্নিত করা হয়। আর রূপান্তরকামীরা হলেন লিঙ্গ/যৌনপরিচয়-বর্গবহির্ভূত (ট্রান্সজেন্ডার) ব্যক্তিদের একটি অংশমাত্র। ১৯৬৫ খ্রীঃ-এ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোচিকিৎসক John F. Oliven প্রথম ‘ট্রান্সসেক্সুয়াল’-এর বদলে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ কথাটি ব্যবহার করেন আক্ষরিক অর্থে রূপান্তরকামীদের বোঝাতে। Leslie Feinberg ১৯৯২ সালে “Transgender Liberation: A Movement Whose Time Has Come” শীর্ষক একটি প্যামফ্লেট প্রচার করেন। সেই প্যামফ্লেটে ঘোষণা করা হয়, ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দটি সমস্ত ধরনের অ-প্রচলিত লিঙ্গপরিচয়ের বোধক হবে। সেই থেকে রূপান্তরকামী ছাড়াও আরও অনেক ধরনের লিঙ্গপরিচয়ের সম্মিলিত নাম হিসেবে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ ব্যাপক অর্থে গৃহীত ও ব্যবহৃত হয়।]

কাজেই আত্মনির্ধারণের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের এখনও অনেক অধ্যায় বাকি আছে। সেই লড়াই একদিকে যেমন রাজনৈতিক, তেমন অনেকাংশে সামাজিকও বটে। এই ‘অন্য রকম’ মানুষগুলোকে সমাজ এখনও ‘বিশেষ’ চোখেই দেখে, সমাজের সহজ-স্বাভাবিক অংশ তাঁরা এখনও হয়ে উঠতে পারেননি। এর নেপথ্যে যে মানসিকতা রয়েছে তা বদলের জন্যে চাই লিঙ্গ/যৌনপরিচয়গত অবস্থান সম্পর্কে বোধ এবং দৃষ্টিভঙ্গির বদল। খুব ধীরে এবং সীমিত পরিসরে হলেও সেই বদলের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন সারস্বতচর্চা কেন্দ্রের গবেষণায়, পঠনপাঠনে, নানা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সক্রিয়তায় এই বিষয়ের গুরুত্ব এবং প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে মানুষের মনে সচেতনতা জাগছে। সমকালীন সাহিত্য, চলচ্চিত্র, নাটকে অদ্বিকোটিক লিঙ্গ/যৌনপরিচয়গত অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট সংকট, সমস্যা, সাফল্য, ব্যর্থতার ছবি প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন অনেকেই এই বিষয়ে কৌতূহলী, জানতে আগ্রহী। অনেকেই এখন এই বর্গের মানুষদের সহ-নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত। তবু এখনও অনেক পথ হাঁটা বাকি। কারণ সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে এই ‘অন্য রকম’ যৌনতার মানুষদের নিয়ে এখনও কাজ করে জড়তা, অবজ্ঞার মনোভাব। তার সঙ্গে রয়েছে এঁদের বিষয়ে অজ্ঞতা। সেই সব কিছু মিলেমিশে জন্ম নেয় এই ‘অন্য রকম’ মানুষগুলোর প্রতি অসংবেদনশীলতা।‘নারী’ এবং ‘পুরুষে’র অতিরিক্ত অন্য যেকোনো লিঙ্গগত অবস্থান বোঝাতে যখন ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ শব্দবন্ধটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ও গৃহীত হয়, তখন এই অসংবেদনশীল মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ‘নারী’ আর ‘পুরুষে’র পরিচিত ছকের বাইরে যাঁরা, তাঁদের সবাইকে মোটা দাগে একটা মাত্র অভিধায় ব্যক্ত করার মধ্যে আছে সংবেদনশীলতার অভাব। 

আসলে লিঙ্গ/যৌনপরিচয়ের চালচিত্রটি নানা রঙে সমৃদ্ধ, শুধুই সাদাকালো নয়। দ্বিকোটিকের বিপ্রতীপে আছে অ-দ্বিকোটিক বা বহুকোটিক ব্যবস্থা। দ্বিকোটিক কাঠামোয় ‘নারী’ ও ‘পুরুষ’ এই দুটি মাত্র লিঙ্গ-বর্গ থাকে, এবং এরা পরস্পরের বিপরীত এই অর্থে যে কোনও ব্যক্তি একটি বর্গের সদস্য হলে তিনি আর অপর বর্গের সদস্য হতে পারবেন না – সামাজিক বিধান এমনই। যে ব্যক্তি যে লিঙ্গের ধারক তাঁকে সেই লিঙ্গের জন্যে সমাজ নির্দেশিত ভূমিকা পালন করতে হয়, পোশাকবিধি, বাকরীতি, দেহভঙ্গী অভ্যাস ও অনুসরণ করে চলতে হয়। নাহলে ‘মেয়েলি পুরুষ’ বা ‘পুরুষালি মেয়ে’ বলে ঠাট্টাতামাশা, পরিহাসের পাত্র হতে হয়। এই রকম ব্যক্তির সামাজিকভাবে কোণঠাসা বা একঘরে হয়ে পড়ার দৃষ্টান্তও কম নেই। এমনকি সমাজের পীড়ন সহ্য করতে না পেরে অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। পাশাপাশি অ–দ্বিকোটিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে দুইয়ের বেশি লিঙ্গ/যৌনপরিচয় বর্গের স্বীকৃতি থাকায় বৈচিত্র্যময় লিঙ্গ/যৌনপরিচয়ধারী মানুষদের স্বতন্ত্র অবস্থান দাবি এবং প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

তাত্ত্বিক বিচারে অ–দ্বিকোটিক লিঙ্গ/যৌনপরিচয় ব্যবস্থার প্রেক্ষিত থেকে দেখলে আমরা পাই লিঙ্গ/যৌনপরিচয়ের একটি বর্ণালি। এই ব্যবস্থা মেনে নিলে এক ব্যক্তির মধ্যেই তথাকথিত ‘নারী’সুলভ বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে একই সাথে তথাকথিত ‘পুরুষ’সুলভ বৈশিষ্ট্য উপস্থিত থাকা যে সম্ভব, সেই বাস্তবতা সামাজিক পরিসরেও স্বীকৃত হতে পারে। লিঙ্গ/যৌনপরিচয় বিষয়ে এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলে সমাজ মানসে ঔদার্য, সহনশীলতা, সমমর্মিতা অর্জন করা সহজতর হয়। অ–দ্বিকোটিক লিঙ্গ/যৌনপরিচয় ব্যবস্থা শুধু যে নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ লিঙ্গ/যৌনপরিচয়ের স্বীকৃতি দেয় তাই নয়, এই ব্যবস্থায় লিঙ্গ/যৌনপরিচয়ের দিক থেকে চলমানতা অর্জন করাও সম্ভব। অর্থাৎ এই ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তির লিঙ্গ/যৌনপরিচয়টি ধ্রুব নয়, সারা জীবন ধরে একটি মাত্র লিঙ্গ/যৌনপরিচয় বহন করা বা লিঙ্গ-ভূমিকা পালন করা বাধ্যতামূলক নয়; বরং সময়, পরিস্থিতি এবং ব্যক্তির পছন্দ সাপেক্ষে তা পরিবর্তিত হতে পারে। এখানে লিঙ্গ/যৌনপরিচয় বর্গের অনেক প্রকার থাকার ফলে এবং তাদের ভেতর চলাচল স্বীকৃত হওয়ায় সমাজের অনুশাসন অনেকখানি শিথিল হয়ে পড়ে। লিঙ্গ/যৌনপরিচয়ের ক্ষেত্রে আত্মনির্ধারণের অর্থাৎ নিজের লিঙ্গ/যৌনপরিচয় নির্ধারণ করার অধিকার ব্যক্তি অর্জন করতে পারে। 

এই সূত্রে অ-দ্বিকোটিক/‘অন্য রকম’ লিঙ্গ/যৌনপরিচয়ের সামাজিক অবস্থানটি বুঝে নেওয়া যাক। মূলস্রোতের সমাজে এঁরা কোণঠাসা, প্রান্তস্থ। সমস্ত প্রান্তিক অবস্থানে থাকা মানুষকেই নানা সঙ্কটের শিকার হতে হয়। এই সঙ্কটের চেহারা বুঝতে গেলে সমাজের ‘কেন্দ্র’ এবং ‘প্রান্ত’ এই দুই প্রেক্ষিতেরই বিশ্লেষণ প্রয়োজন। সমাজের কেন্দ্রে যাঁরা থাকেন, সামাজিক মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধে এবং ক্ষমতা যাঁরা ভোগ করেন, প্রান্তিক মানুষগুলোর প্রতি তাঁদের মনোভাব কেমন? কীভাবে সামাজিক পরিসরে ‘অন্য রকম’ ব্যক্তির প্রান্তিকীকরণ ঘটে? 

খেয়াল রাখতে হবে যে, কোনও ব্যক্তি যখন লিঙ্গ/যৌনপরিচয়ের ক্ষেত্রে আত্মনির্ধারণের অধিকার প্রয়োগ করতে চান, অর্থাৎ সমাজ নির্ধারিত এবং/অথবা নির্মিত দ্বিকোটিক লিঙ্গ/যৌনপরিচয়কে অস্বীকার করে অ-দ্বিকোটিক লিঙ্গ/যৌনপরিচয় বেছে নেন এবং প্রকাশ্যে নিজের নির্বাচিত পরিচয় জ্ঞাপন করেন, সেই মুহূর্তে তাঁর নিজের পরিবারের মানুষদের (যাঁরা তথাকথিত নারী বা পুরুষ) সাপেক্ষেও তিনি প্রান্তিক অবস্থানে পৌঁছে যান। পরিবারের মানুষগুলোর সঙ্কটও কম নয় – একদিকে বৃহত্তর সমাজের ভয় আরেক দিকে প্রিয়জনের প্রতি মমত্ব, আবার তার সঙ্গে নিজের মনের সংস্কারের টানাপড়েন শুরু হয়ে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জয় হয় সামাজিক সংস্কার আর ভয়ের। চাপা পড়ে যায় মমতা, দরদ। পরিবারের ভেতর থেকেই শুরু হয়ে যায় প্রান্তিকীকরণের প্রক্রিয়া।

কিন্তু যাঁরা অ-দ্বিকোটিক ব্যক্তিদের প্রতি বিদ্বেষ বা ঘৃণা পোষণ করেন তাঁদের মধ্যে যে সবসময় ব্যক্তিগত কোনও প্রণোদন কাজ করে তা কিন্তু নয়। কোনও অ-দ্বিকোটিক ব্যক্তিকে চেনেন এবং তাঁকে মনে মনে ঘৃণা করেন এমন মানুষ অনেকে আছেন নিশ্চয়; কিন্তু কোনও অ-দ্বিকোটিক ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় নেই, তবু সামাজিক সংস্কারের দ্বারা চালিত হয়ে সব অ-দ্বিকোটিক ব্যক্তির প্রতিই বিদ্বিষ্ট এমন মানুষই সংখ্যায় বেশি। অনেক তথাকথিত শিক্ষিত আলোকপ্রাপ্ত মানুষকেও দেখা যায় ‘অন্য রকম’ মানুষগুলোকে নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করতে। তাঁদের কথা বলার ধরন, চলনভঙ্গী নকল করা এবং তা উপভোগ করার বিনোদন মূল্য শুধু অন্তরঙ্গ বৈঠকেই নয়, চলচ্চিত্র, গণমাধ্যমের মতো প্রকাশ্য পরিসরেও স্বীকৃত। এসবই প্রান্তিকীকরণ এবং অপরায়নের নানা প্রক্রিয়া।

সামাজিক বৃত্তের ‘কেন্দ্রীয়’ পরিসরে যাঁরা আছেন, তাঁদের মধ্যে যাঁরা অ-দ্বিকোটিক ব্যক্তিদের সামজিক মর্যাদা, অধিকারের দাবি, সামাজিক ন্যায় ইত্যাদি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা পালনের জায়গায় আছেন, অর্থাৎ যাঁরা দেশের আইনপ্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িত তাঁদের মধ্যেও যে প্রান্তিক যৌন ও লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষদের প্রতি বিশেষ আন্তরিকতা বা দরদ নজরে পড়ে না। নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি সুরক্ষিত করার উপায় হিসেবে অ-দ্বিকোটিক ব্যক্তিদের দাবী পূরণের অনেক প্রতিশ্রুতির ঘোষণা হয়তো তাঁরা করে থাকেন, কিন্তু তাতে তাঁদের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণের অভিপ্রায় থাকে না। লিঙ্গ/যৌনপরিচয়ের দ্বিত্ব বজায় রেখে ঐ কাঠামোয় ‘অন্য রকম’ যাঁরা, তাঁদের সবাইকে ‘তৃতীয় লিঙ্গে’ অন্তর্ভুক্তিকরনের মধ্যে আসলে আন্তরিকতা এবং সমর্মিতার অভাবই  ফুটে ওঠে। সমাজের প্রচলিত কাঠামোয় খাপ না খাওয়া মানুষগুলো সবাই এক রকম নয় – তাঁদের মধ্যে লিঙ্গ/যৌনপরিচয়গত অবস্থানে যেমন পার্থক্য আছে, তেমনি আছে মানসিকতা, জীবনবোধের বৈচিত্র্য। প্রত্যেক লিঙ্গ/যৌনপরিচয়গত অবস্থানের চাহিদা, প্রয়োজন, দাবিদাওয়া এবং সঙ্কটের স্বরূপও আলাদা আলাদা। সেই সব স্বাতন্ত্র্য ও বিভিন্নতা অস্বীকার করে সবাইকে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’-এর তকমা এঁটে আবার তাঁদের ঠেলে দেওয়া হয় লিঙ্গ-মানচিত্রের এক কোণে। এও আরেক রকম প্রান্তিকীকরণ, মোড়কটাই যা একটু আলাদা। 

অ-দ্বিকোটিক ব্যক্তিরা নানা ভাবে নানা দিক থেকে সমাজে এই যে প্রান্তিকতার আবর্তে বাঁধা পড়ে রয়েছেন – একটু ভেবে দেখলে বোঝা যায়, আসলে ‘কেন্দ্র-প্রান্ত’ বিন্যাসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রান্তিকীকরণের পুনরাবর্তনের শিকড়। ভারতীয় সমাজের মূলধারায় অ-দ্বিকোটিক ব্যক্তির যে প্রান্তিক অবস্থান ছিল, ২০২১ সালেও কিন্তু সেই সামাজিক প্রান্তিকতার অবসান ঘটেনি। বরং তাঁরা আরেক প্রস্থ প্রান্তিকীকরণের শিকার হয়েছেন। কারণ সমাজে প্রচলিত এবং আইনে স্বীকৃত দ্বিকোটিক লিঙ্গ/যৌনপরিচয় ব্যবস্থাকে অক্ষত রেখে তার মধ্যেই নারী ও পুরুষের অতিরিক্ত অন্যান্য বিভিন্ন লিঙ্গগত অবস্থানকে ‘তৃতীয়’ বা ‘অপর’ লিঙ্গ/যৌনপরিচয় রূপে কেবল আইনের পরিভাষায় জায়গা করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ একটি প্রচলিত রাষ্ট্রীয়-সমাজ ব্যবস্থায় এযাবৎ ‘অনুপস্থিত’ একটি বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে মাত্র। যে কোনও অন্তর্ভুক্তির প্রকল্পেই যে প্রশ্নটি অনিবার্য হয়ে ওঠে তা হল নতুন অন্তর্ভুক্ত হওয়া বিষয়ের সঙ্গে (এক্ষেত্রে ‘তৃতীয়’ লিঙ্গবর্গের সঙ্গে) প্রচলিত (দ্বিকোটিক লিঙ্গ/যৌনপরিচয়) ব্যবস্থার সম্পর্ক কেমন হবে? এই প্রশ্নকে এড়িয়ে গেলে প্রান্তিকতার সংকট নির্মূল করার সম্ভাবনা দূর অস্ত। 

লিঙ্গরাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য তাই ক্ষমতার ‘কেন্দ্র-প্রান্ত’ বিন্যাস ছেড়ে বেরিয়ে বিকল্প ক্ষমতা বণ্টনের বিন্যাসের অনুসন্ধান করা। সমাজে বিভিন্নতা এবং বৈচিত্র্য সমাদৃত হলে এবং ক্ষমতার সুষম বণ্টন অর্জিত হলেই একমাত্র লিঙ্গ/যৌনপরিচয় নির্ধারণের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। পথ প্রশস্ত হতে পারে লিঙ্গ-সাম্য এবং স্বাধীনতা অর্জনের।

শেয়ার করুন

1 thought on “আত্ম(বি)নির্মাণের লড়াই”

  1. Shirsho Basu.

    Angana di, thanks for writing this. Thanks for your nuanced understanding of gender politics that includes all marginal identities situated beyond the realm of gender binarism. Hope, your politics of including trans* life-histories and realities within your discourse reaches more number of people. Glad that you talked about reconceptualisation of power, which is almost iindispensable for realising the social inclusion of trans identities in standard social and political discussions, which are otherwise bereft of these marginal identities. The vagaries of marginality are always like the shape of a manifold. And, thanks to you that it cannot be understood from single-axis perspectives.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *