রাজিয়া সুলতানকে নিয়ে একটি বিতর্ক

রাজিয়া সুলতানকে নিয়ে পড়েছি আগের বছরই, দিল্লি সালতানাত পড়ার সময়ে। শামসুদ্দিন ইলতুৎমিসের ব্যাপারে পড়েছি, মেয়েকে রাজত্ব দিয়েছিলেন শুনে খুশি হয়েছি খুবই। এই রাজত্ব দেওয়া ইত্যাদি ঠিক হয়েছিল কিনা, ভাবিনি অতশত। তবে এটাও ঠিক, বেশ কদিন মুগ্ধ ছিলাম রাজিয়ার বীরত্বের কথা পড়ে। ‘রাজিয়া সুলতানা’ সে রাখেনি নিজের নাম। কারণ ‘সুলতানা’ শব্দটির অর্থ সুলতানের স্ত্রী। সে নিজেকে ‘সুলতান’ বলত। স্কুল থেকে না বললেও বাড়িতে আমি চার্ট বানিয়েছি রাজিয়াকে নিয়ে। 

স্কুলে পড়ানোর বেশ ক’দিন পরে আমার বন্ধু বিদিশা ঠিক করল, প্রত্যেকদিন বিকেল পাঁচটায় ভিডিও চ্যাটে ডিবেট হবে। সেই ডিবেট পর্বে একদিন ঠিক হল, ‘রাজিয়া সুলতানকে সিংহাসনে বসানো উচিত হয়নি’ — এ বিষয়ে বিতর্ক হবে। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার, পক্ষে যেতে হল আমাকে আর বিদিশাকে। বিপক্ষে গেল তাঞ্জাম আর শুভশ্রী। 

তাঞ্জাম আর শুভশ্রী বলল একই কথা, ‘ইলতুৎমিসের তো আর কোনও যোগ্য উত্তরসূরী ছিল না। তাছাড়া মেয়েরা যে রাজ্য চালাতে পারে না, এই ভুল ধারণাও তো ভাঙ্গা দরকার ছিল।’

ওদের কথা মনে মনে সমর্থন করলেও, আমাকে তো আবার অন্যভাবে দেখতে হবে। পড়লাম মহা মুশকিলে। কোনোভাবে শুরু করলাম। ‘আমি বলছি রাজিয়া সুলতানকে সিংহাসনে বসানো উচিত হয়নি। সেটা যে সময়ের ব্যাপার, তখন মেয়েদের রাস্তাঘাটে দেখা যেত না। সে সময়ে এক রানির (বাংলায় এই শব্দটিকে শুধু রাজার স্ত্রী হিসেবে ব্যবহার করা হয় না) হঠাৎ অভ্যুত্থান সাধারণ মানুষকে অবাক করেছিল। মানুষ তার প্রতি খুব জাজমেন্টাল হয়ে পড়েছিল। সে কাকে বিয়ে করবে, কার সঙ্গে মেশে, কোথায় সময় কাটায় — এসব নিয়ে মানুষের মাথাব্যথা ছিল। সে কেমন শাসন পরিচালনা করছে, তা নিয়ে নয়। মানুষ যেমন করেছিল নূরজাহানের সময়ে। একটা বইতে পড়েছি, সে সময়ে রাস্তায় লোকের আলোচনার বিষয় ছিল, শাহেনশা জাহাঙ্গীরের এই দশা হল কী করে? নতুন করে বিয়ে করলেন কিনা বছর বত্রিশের বিধবাকে? তিরিশের উপরে তো মেয়েরা বুড়ি হয়ে যায়! কিন্তু তাদের খেয়াল ছিল না, নূরজাহানের আগমনে দিল্লির সিংহাসনের পিছনে হয়ে গেল কত অদলবদল। 

যাকগে, যা বলছিলাম, তা বলি। রাজিয়ার ক্ষেত্রে মানুষ জাজমেন্টাল হয়ে তো পড়লই, তার সাথে সভাসদরাও মেনে নিল না যে তাদের মাথার উপর একজন মেয়ে রাজত্ব করবে। এগুলো যে তার রাজত্বকালে সময়ে বিপদ আনতে পারে সেটা ইলতুৎমিস এবং রাজিয়ার আগেই বোঝা উচিত ছিল। তাছাড়া তখনকার দিনে মেয়েদের স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য বিশেষ উপকরণ ছিল না, যা রাজিয়াকে প্রত্যেকদিনের নানা রকম কষ্ট থেকে মুক্তি দিতে পারত। সুতরাং তার ক্ষেত্রে হয়তো অন্দরমহলে মা-ঠাকুমাদের সঙ্গে থাকাই ভাল ছিল।  কারণ সেখানে আরামের নানা বন্দোবস্ত ছিল। সেখানে থাকলে তার এই পরিণতি হত না।

এছাড়াও রাজিয়াকে সিংহাসনে বসানোর জন্য এবং তার প্রতি সভাসদদের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য, প্রচুর পরিমাণে ক্ষতি হয় দিল্লির রাজকোষের। একজন মেয়ের শাসনে না থাকতে চেয়ে সৈন্যদের মধ্যে আসে প্রভুর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার মতলব। সভাসদরা তার এক সৎ ভাই-এর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে যুদ্ধ ডাকে। রাজিয়াকে মেরে ফেলার পরে সভাসদরা প্যাঁচে ফেলে মারে সৎ ভাইকেও। তারপর বহু বছর সিংহাসন থাকে সভাসদদের দখলে। সুতরাং নানাভাবে দেখা যাচ্ছে, পরে কী ঘটতে পারে সে সব না ভেবে রাজিয়াকে সিংহাসনে বসানোটা উচিত কাজ হয়নি।’ 

ডিবেটে এই ছিল আমার বক্তব্য। ডিবেটের নিয়ম অনুযায়ী আমাকে কিছু কথা অন্যভাবে ভেবে বের করতে হল। এক রকম কথা আমার মনের মধ্যে উঁকি মারলেও, বেরোল আলাদা কিছু ভাবনা-চিন্তা। কিন্তু পুরোপুরি সহমত নই যা বলতে হল তার সঙ্গে। যেমন ‘মানুষ জাজমেন্টাল হতেই পারে’, সে বিষয়ে সহমত নই। বা মানুষ যা যা বিষয় পছন্দ করবে না, তা তা কখনই করা যাবে না, সে বিষয়েও সহমত নই। একেবারেই সহমত নই সভাসদদের বিশ্বাসঘাতকতার সঙ্গে, যেটা কদর্য ভাবে প্রকাশ পেয়েছিল যখন একটা ‘সামান্য মেয়ে’ রাজত্ব করতে এসেছিল। রাজিয়াকে সুলতান করার সিদ্ধান্তটি হয়ত বাস্তবসম্মত ছিল না, কিন্তু কখনও কখনও এরকম সিদ্ধান্ত আমি সমর্থন করি। 

নাহ, ডিবেট করা খুবই কঠিন! এমন কিছু কথা আনতে হয় মুখে, যা এমনিতে ভাবতেও পারি না। যাক গে, একা আমার কষ্ট না, বেচারা বিদিশাকেও বলতে হয়েছিল রাজিয়ার সিংহাসনে ওঠার বিপক্ষে। সে আবার শুরুই করেছিল এইভাবে: ‘আমি যা বলছি তার এক বর্ণও বিশ্বাস করি না!’

চিত্রঋণঃ মিন্ট মিডিয়া

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *