এদ্রিয়ান রিচ -কে মনে রেখে

উৎসর্গ (Dedications)

এদ্রিয়ান রিচ 

আমি জানি তুমি এই কবিতা পড়ছো

দিনশেষে, অফিস ছাড়ার আগে

নিয়ন আলোয়, অন্ধকার হয়ে আসা জানলায় 

ভিড় শেষের ক্লান্ত ঘরের স্তব্ধতায়

আমি জানি তুমি এই কবিতা পড়ছো

সমুদ্র থেকে দূরে এক বইয়ের দোকানে দাঁড়িয়ে

বসন্তের এক ধূসর দিনে

তোমার চারপাশের শূন্যতায়

হালকা আলোর কণা 

আমি জানি তুমি এই কবিতা পড়ছো

সেই ঘরে যেখানে তোমার সহ্যের বাঁধ ভেঙেছে বহুবার 

বিছানায় ছড়ানো জামা কাপড়ের স্তূপ, খোলা সুটকেসটা

পালাবার কথা বললেও 

তুমি এখনও ছেড়ে যেতে পারছো কই

আমি জানি তুমি এই কবিতা পড়ছো

যখন মেট্রো রেল স্টেশন ছুঁই ছুঁই

সিঁড়ি দিয়ে উঠে 

নতুন প্রেমের দিকে ছুটে যাওয়ার ঠিক আগে

যে প্রেম তোমার জন্য নিষিদ্ধ

আমি জানি তুমি এই কবিতা পড়ছো

টেলিভিশন স্ক্রিনের আলোয়  

চলতে থাকা শব্দহীন ছবি

তুমি অপেক্ষায় ইন্তিফাদার খবরের

আমি জানি তুমি এই কবিতা পড়ছো

কোনো এক ওয়েটিং রুমে 

চোখ মেলা না মেলার

অপরিচিতর পরিচিতির মাঝে

আমি জানি তুমি এই কবিতা পড়ছো

তীব্র ফ্লুরোসেন্ট আলোয় 

বাদ পরে যাওয়া

ফুরিয়ে যেতে চাওয়া

যুবদের একঘেয়েমিতে, ক্লান্তিতে

আমি জানি তুমি এই কবিতা পড়ছো

ক্ষীণ হতে থাকা দৃষ্টিতে

মোটা কাঁচে অক্ষরের মানে বুঝতে কষ্ট হচ্ছে

তবু পড়ে যাচ্ছো

কারণ অক্ষর মাত্রই অমূল্য

আমি জানি তুমি এই কবিতা পড়ছো

স্টোভ এ দুধ গরম করতে করতে

কাঁধে ঘুমন্ত শিশু, অন্য হাতে বই 

কারণ জীবন ক্ষণিকের, আর তৃষ্ণার্ত তুমিও

আমি জানি তুমি এই কবিতা পড়ছো

অচেনা ভাষাতেই

কিছু শব্দ আন্দাজ করে, কিছু পড়ার তাগিদে 

আমি জানতে চাই সেই শব্দগুলো কী

আমি জানি তুমি এই কবিতা পড়ছো

মরিয়া হয়ে কিছু শোনার আকাঙ্ক্ষায়

তিক্ততা আর আশার দোলাচলে 

আবার সেই কাজে ফিরে যাওয়ার আগে

যে কাজগুলি করতেই হয়

আমি জানি তুমি এই কবিতা পড়ছো

কারণ আর কিছুই তো পড়ার নেই বাকি

সেখানে, যেখানে এসে দাঁড়িয়েছ

যেভাবে, বিবস্ত্র হয়ে

‘শিল্প ও ন্যায়ের মধ্যেকার সম্পর্কের কোন সহজ ফর্মুলা না থাকলেও এটা জানি যে আমার ক্ষেত্রে সেই সব কবিতার শিল্পের কোন মানে নেই যা শুধুই ক্ষমতাশীলের কুক্ষিগত ডিনার টেবিলে সাজান থাকে। আমেরিকার সম্পদ ও ক্ষমতার বন্টন ক্রমেই আরো বীভৎসতার সাথে অসম হয়ে উঠছে। প্রেসিডেন্ট কখনই কিছু টোকেন শিল্পীকে সম্মান দিতে পারেন না যখন বাকি মানুষেরা এত এত অসম্মানে রয়েছেন’। ১৯৯৭-এ ক্লিন্টন সরকারের পদক ফিরিয়ে দিয়ে একথা লিখেছিলেন এড্রিয়ান রিচ। ১৯শে মে, ১৯২৯ এ জন্ম এই নারীবাদী কবি ও আন্দোলনকর্মীর। রিচ-এর কলম চিরকালই শাসকের বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে পক্ষ নিয়েছে, রেখে গেছে সেই সমস্ত প্রশ্ন যা বরাবরই স্থিতিশীলতাকে প্রশ্ন করেছে। ১৯৬০-এর দশকে, রিচ, আমেরিকার নিউ লেফটের সাথে যুক্ত হয়ে যুদ্ধ-বিরোধী, কৃষ্ণাঙ্গ, ক্যুয়ার মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৮০-তে তার লেখা প্রবন্ধ ‘কম্পালসরি হেটেরোসেক্সুয়ালিটি অ্যান্ড লেসবিয়ান কন্টিনিউম’ নারীবাদী আন্দোলনের বিসমকামী কেন্দ্রিকতাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, প্রশ্ন তুলেছিল আমাদের সম্পর্ক, যৌনতা, আকাঙ্খা, বন্ধুত্বকে বোঝার, দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে। তার কবিতায় যেমন প্রেম ও বিদ্রোহ একে অপরের পরিপূরক হয়ে প্রকাশ পেয়েছে, তেমনই উঠে এসেছে মেয়েদের জীবনের দৈনন্দিন সংগ্রাম, প্রতিরোধের ছবি। তাঁর লেখায় রিচ ক্ষমতা কাঠামোকে আক্রমণ করেছেন বারবার। আইডেন্টিটি রাজনীতি, প্রান্তিক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের রাজনীতির সমস্ত জটিলতাকেই ধরে যুথবদ্ধ যাপনের কথা বলেছেন, রাজনৈতিক যাপনের কথা বলে গেছেন বারবার। তাই নিজের ইহুদী পরিচয়ের জটিলতা, নিপীড়নের জটিল ইতিহাস যেমন জায়গা পেয়েছে তার কবিতায় তেমনই জায়নবাদীরাষ্ট্রের ফিলিস্তিন দখলের বিরুদ্ধে নির্দ্বিধায় অবস্থান রেখেছেন, সোচ্চার হয়েছেন প্যালেস্টাইনের মুক্তির দাবীতে। আজ যখন দক্ষিনপন্থী রাজনীতি চতুর্দিকে মাথাচারা দিয়ে উঠেছে, বিভিন্ন প্রান্তিকতাকে একে অপরের সাথে লড়িয়ে দিতে চাইছে, তখন রিচের তীব্র রাজনৈতিক যাপন, মানিয়ে না নিয়ে, আপোষহীন ভাবে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে যাওয়ার দৃঢ়তাই আমাদের লড়াই জারি রাখার শক্তি যোগাবে। 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *