বিজে উলুম ইয়োক: হেলিন বুলেকদের মৃত্যু হয় না

গত বছরের ১১ মার্চ। তুরস্কের ইস্তানবুল শহরের উপকণ্ঠে কুসুক আর্মাটলুর একটি বাড়িতে রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী হানা দিল। ইস্তানবুলের নগর-ইতিহাসে এই জায়গাটার একটা মাহাত্ম্য আছে। দেশি-বিদেশি পুঁজিপতিদের কাছে অতি লোভনীয় জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই শ্রমিক মহল্লার অধিবাসীরা তিন দশক ধরে উন্নয়নের নামে উচ্ছেদ রুখে আসছে। এই লড়াইয়ের কেন্দ্র হল একটি টিনের চাল দেওয়া একতলা বাড়ি, যেখানে বারবার অনশনে বসেছে, শহিদও হয়েছে, স্থানীয় মেয়েরা। এর নামই হয়ে গেছে ‘হাউস অভ রেজিসট্যান্স’ — প্রতিরোধের বাড়ি। এখানেই হানা দিয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনী তুলে নিয়ে গেল দুই যুবক-যুবতীকে। মেয়েটির নাম হেলিন বুলেক আর ছেলেটির নাম ইব্রাহিম গুকসেক। তারা কি সেই বাড়িতে বসে কোনও সন্ত্রাসবাদী ষড়যন্ত্র করছিল? না, তারা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে অনশন করছিল, যা সশস্ত্র বাহিনী (বিশেষ ক্ষমতা) আইনের বিরুদ্ধে মণিপুরের ইরম শর্মিলার অনশনের মতই হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্রের চক্ষুশূল।

ছ’দিন ধরে তাদের ওপর জোর করে খাওয়ানোর অত্যাচার চলার পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হল। হেফাজত থেকে ফিরে এসে তারা ঘোষণা করল, তাদের এই অনশন আমরণ, এবং দাবি না মেটা পর্যন্ত তা তুলে নেওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না।

প্রথমে হেলিন তার কথা রাখল। টানা ২৮৮ দিন অনশন চালিয়ে যাওয়ার পর ৩ এপ্রিল ২০২০ সে সমস্ত অত্যাচারের সীমার বাইরে চলে গেল। ইব্রাহিম তার সঙ্গী হল ৩২৩ দিনের মাথায়, ওই বছরেরই মে মাসের সাত তারিখে।

এই মরণজয়ীদের পরিচয় কী? কী ছিল তাদের দাবি?

হেলিন আর ইব্রাহিম দুজনেই ছিল ‘গ্রুপ ইওরুম’ নামে এক বিপ্লবী গানের দলের সদস্য। হেলিন ছিল তার একজন ‘লিড সিঙ্গার’। ইব্রাহিম চলে যাওয়ার পর তুরস্কের প্রধান সংসদীয় বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি)-র সাংসদ সেজগিন তানরীকুলু তার দাবিকে একটি বাক্যে প্রকাশ করেছিলেন এইভাবে: “সে স্বাধীনভাবে গান গাইতে চেয়েছিল।” বিশদে বললে, তাদের দাবিগুলো ছিল এইরকম:

  • ইদিল সংস্কৃতি কেন্দ্রের ওপর অবিরাম হানাদারী বন্ধ কর
  • গ্রুপ ইওরুম-এর সদস্যদের ওপর থেকে সমস্ত হুলিয়া তুলে নাও
  • গ্রুপ ইওরুম-এর কনসার্ট-এর ওপর তিন বছর ধরে চলতে থাকা নিষেধাজ্ঞা বাতিল কর
  • গ্রুপ ইওরুম-এর সদস্যদের বিরুদ্ধে সমস্ত মামলা প্রত্যাহার কর
  • গ্রুপ ইওরুম-এর সমস্ত বন্দি সদস্যদের মুক্তি দাও

হেলিন আর ইব্রাহিমের অনশন চলাকালীন একটাও দাবি মানা হয়নি, তারা মারা যাওয়ার পরেও না। একের পর এক গ্রুপ ইওরুম সদস্যের নাম ‘সন্ত্রাসবাদী’ তালিকায় যুক্ত হয়েই চলেছে, তাদের মাথার দাম ঘোষণাও হয়ে গেছে। এই জনপ্রিয় ব্যান্ড প্রকাশ্যে কোনও অনুষ্ঠান করতে পারে না। ইদিল সংস্কৃতি কেন্দ্র, যা তাদের গান-বাজনার সুরে গমগম করত, রাষ্ট্রীয় হানাদারীর পরাক্রমে ক্রমশ জনশূন্য, ভাঙাচোরা বাদ্যযন্ত্রের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।

চিত্র ঋণ- Free Grup Yorum ব্লগ

গ্রুপ ইওরুম-এর ইতিহাস তুরস্কের বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। আজ সেই ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে গাঁথা হয়ে গেল হেলিন আর ইব্রাহিমের নাম। ১৯৮৫ সালে একদল ছাত্রছাত্রী যখন এই গানের দল গড়েছিল, তখন তারা বোধহয় ভাবতেও পারেনি তা এত জনপ্রিয় হবে, তুরস্কের সীমানা ছাড়িয়ে ইউরোপের দেশে দেশে গণ-আন্দোলনকে দোলা দেবে, যেখানেই তার কনসার্ট হবে সেখানেই ছুটে যাবে হাজার হাজার সাড়া-দেওয়া শ্রোতা, একটু একটু করে অসীম পরিশ্রম আর ভালবাসায় গড়ে তোলা ইদিল সংস্কৃতি কেন্দ্রকে ঘিরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাতাসে ভাসিয়ে দেবে মুক্তির কোরাস, আর মানুষের এত ভালবাসা পাওয়ার জেরেই হয়ত, রাষ্ট্রের বুক কাঁপিয়ে দেবে। যেমন ষোড়শ শতকের তুর্কী সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল মানবমুক্তির চারণকবি পীর সুলতান আবদাল-এর গান আর কবিতা, যার জনপ্রিয়তা দেখে তার কণ্ঠরোধ করতে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল অটোমান শাসকরা। হ্যাঁ, গ্রুপ ইওরুম নিজেদের আবদালেরই উত্তরসূরী বলে।

সরকার বলে, এই গানটান সব ভড়ং, আসলে এরা সবাই সন্ত্রাসী, বিপ্লবী গণমুক্তি পার্টি/ফ্রন্ট (ডিএইচকেপি/সি)-র কর্মী। তুরস্কের এই নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট বিপ্লবী গোষ্ঠী স্বদেশে ছাড়াও ইউরোপীয়ান ইউনিয়ান, আমেরিকা, ব্রিটেন আর জাপানের সন্দেহের তালিকায় রয়েছে। তার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ গ্রুপ ইওরুম-এর বিরুদ্ধে বারবার ওঠে, যদিও  তার প্রমাণ মেলেনি। শুধু বারবার “অস্ত্রের খোঁজে” ইদিল সংস্কৃতি কেন্দ্রে অসংখ্য বুটপরা পা দাপাদাপি করেছে, তাদের বাজনাগুলো লাথি মেরে ভেঙেছে, তুলে নিয়ে গেছে একের পর এক সদস্যকে, আর নির্যাতনের পর তাদের ভরে দিয়েছে ‘এফ-টাইপ’ জেলখানার ভয়াবহ অন্ধকারে। কিন্তু হেলিন আর ইব্রাহিমের মত শিল্পীদের মনোবল ভাঙতে পারেনি।

দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের কুর্দ অধ্যুষিত দিয়ারবাকির শহরে হেলিনের জন্ম ১৯৯২ সালে। পশ্চিম তুরস্কের সানাক্কালে শহরে পড়াশোনা করার সময়ে বিনামূল্যে সর্বজনীন শিক্ষার দাবিতে ছাত্র আন্দোলনে অংগ্রহণের মধ্যে দিয়ে তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি। তারপর গানের টানে গ্রুপ ইওরুম-এ আসা। ২০১৪ সালে ইসরায়েলি আক্রমণের বিরুদ্ধে প্যালেস্তাইনের জনগণের সংহতিতে আন্তর্জাতিক ‘মানুষের ঢাল’ গড়ে তোলার কাজে যোগ দেয়। অসামান্য কণ্ঠের অধিকারী এই মেয়েটি কেবল গায়িকা হিসেবেই নয়, কুর্দ এবং তুর্কি ভাষায় গীতিকার হিসেবেও খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। তার ভালবাসা অবশ্য ছিল লোকসঙ্গীত। অনশন ও নির্যাতনে হেলিন যখন গুরুতর অসুস্থ, তার মা আয়গুল বিলগি এক আবেদনে বলেছিলেন, “আমি চাই আমার মেয়ে আবার লোকগান করুক। আমি চাই না আমার সন্তান মারা যাক। তোমরা কি এই উজ্জ্বল ছেলেমেয়েদের আবার মঞ্চে দেখতে চাও না?”

তাঁর আশা পূরণ হয়নি। তাঁর মেয়ের শেষযাত্রায় যখন লাল ফুলে ঢাকা কফিন কাঁধে করে বয়ে নিয়ে আসছিল মেয়েরা, হাজার হাজার লাল পতাকা ওড়ানো সেই মিছিলে তাঁকেও বুকে একরাশ ব্যথা চেপে হাঁটতে দেখা গিয়েছিল রাজনৈতিক বন্দি, নিখোঁজ আর শহিদদের মায়েদের সংগঠন তায়াদ-এর সদস্যদের সঙ্গে।

সেই মিছিলে হেলিনের অনশন-সঙ্গী ইব্রাহিমও ছিল, হুইলচেয়ারে। তার অনশনের তখন ২৯১ দিন। তার বউ সুলতান গুকসেকও তখন জেলে। সেও গ্রুপ ইওরুম-এ গান গাইত। আর ইব্রাহিম বাজাত বেস গিটার। সে ছিল হেলিনদের চেয়ে বয়সে কিছুটা বড়, জন্ম ১৯৮০ সালে।

আর্মাটলু থেকে হেলিনের শেষযাত্রা বেরনোর পর বাধা দেওয়ার অনেক চেষ্টা হয়েছিল, অবশ্য আটকানো যায়নি। কিন্তু সেই জনোচ্ছ্বাস দেখে বোধহয় রাষ্ট্রের রক্ষকরা ভয় পেয়েছিল। তাই শবযাত্রীদের ওপর আক্রমণ করে, কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে ইব্রাহিমের কফিন পুলিশ ছিনিয়ে নিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তাকে তার বাসভূমি কায়সেরিতে সমাধিস্থ করা হয় বটে, কিন্তু উগ্র জাতীয়তাবাদীরা এই ‘সন্ত্রাসীর’ দেহ খুঁড়ে তুলে পুড়িয়ে ফেলার হুমকি দেয়, যদিও তারা তা করতে পারেনি।

অবশ্য, করলেই বা কী হত? হেলিনের সমাধিক্ষেত্রে হাজার হাজার মানুষ গান গেয়েছিল, “বিজে উলুম ইয়োক” — আমাদের মৃত্য নেই। হেলিনের সহগায়ক সেহের আদীগুজেল বলেছিলেন, “আজ, হেলিন আমাদের ওপর আস্থা রেখে চোখ বুজেছে। আমরা তাকে কথা দিলাম, আমাদের লড়াই আমরা জিতবোই।”

হেলিনের মৃত্যুর এক বছর পর, ৫ এপ্রিল ২০২১, প্যারিসে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের শেষদিনে সবাইকে চমকে দিয়ে আগের মতই সমারোহে কনসার্ট করলো গ্রুপ ইওরুম। ইন্টারনেটে সারা পৃথিবী দেখলো সেই কনসার্ট। দেখলো, এত দমনপীড়নের মধ্যেও মঞ্চে হাজির একগুচ্ছ তরুণ-তরুণী, যাদের গলায় হেলিনদের  গান, হাতে ইব্রাহিমদের বাজনা। ব্যাকড্রপে শহিদ শিল্পীরা উপস্থিত বিশাল প্রক্ষেপণে। আর ঘোষণা শোনা গেল, “হেলিনরা মরেনি। তারা ব্যর্থও হয়নি। এই নতুন ছেলেমেয়েরাই আজকের হেলিন, আজকের ইব্রাহিম। এদের মাঝেই তারা বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে।”

হেলিনের শেষযাত্রার সেই গানের কথাগুলো বৃথা হয়নি। তার উত্তরসূরীদের মধ্যেই সে বেঁচে আছে। আর বেঁচে আছে তার লেখা, সুর দেওয়া সেই গান, ‘আর্নে পেশ’ — এগিয়ে চলো:

এগিয়ে চলো, এগিয়ে চলো

সোনা ভাই আমার

মুক্ত মাতৃভূমির দিকে।

আর কতবার ডাকতে হবে?

তোমরা যদি না আসো তবু

মেয়েদের তো এগোতেই হবে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *