মহাবীর নারওয়াল: নাতাশার বাবা, আমাদের সবার কমরেড

ভাষান্তর- জিগীষা ভট্টাচার্য

‘এক দীর্ঘ নম্র জীবনের যে অবশেষ অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর মেয়ের স্পর্শ এবং আলিঙ্গনের জন্য আকুল হয়ে অপেক্ষা করেছে, সেই সহজ শান্ত শেষ ইচ্ছাকেও এভাবে অস্বীকার করা হবে?

আমরা যারা জনদরদী মানুষের উপর এই নিষ্ঠুরতম আক্রমণের সাক্ষ্য বহন করছি প্রতিনিয়ত, কষ্ট আর হতাশা ছাড়া কি আমাদের কিছুই করণীয় নেই?  

এ কোন পৃথিবী যা এহেন অমানবিক দুঃস্বপ্ন জিইয়ে রাখে?’

এক শোকাহত বন্ধু এই উপরের লাইনগুলি লিখেছে। অত্যন্ত ভারী হৃদয়ের সাথে আমরা সবাই নিজেদেরকে বাধ্য করেছি এই ঘটনার অপরিহার্যতা মেনে নিতে, এবং স্বীকার করতে যে আমাদের প্রিয় মহাবীর কাকা আর নেই। মৃত্যুর ঠিক আগের দিন পর্যন্ত আমরা সকলেই আশা করেছিলাম যে নাতাশা নারওয়াল তার বাবার সাথে পুনরায় মিলিত হতে পারবে। এক সপ্তাহ ধরে করোনাভাইরাস-এর বিরুদ্ধে লড়াই করা মহাবীর কাকা নিজের মেয়েকে একবার অন্তত দেখতে পাবেন। শুক্রবার ইউএপিএ আইনে অভিযুক্ত তিহার জেলের রাজনৈতিক বন্দী নাতাশার আইনজীবীরা করোনা-আক্রান্ত অসুস্থ বাবার পাশে থাকার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের আবেদন করেন। কিন্তু এই আবেদন মহামান্য আদালতে তালিকাভুক্ত হয়নি। এই মুহূর্তে বাবার অন্তিমকার্যে যোগদানের অনুমতি চেয়ে অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের আবেদন তালিকাভুক্ত করেছেন নাতাশার আইনজীবীরা1

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আশ্চর্য বাস্তবতা হলো, যে সময়ে আমরা একে অপরের কাছাকাছিও যেতে পারছি না, সেই সময়ে এই সমস্ত মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছি আমরা। চেষ্টা করছি এই শোককে স্বীকার করতে, মৃত্যুর অপরিহার্যতা মেনে নিতে। অতিমারীর এই তীব্রতার প্রভাবে আমাদের কাছে সময় যেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মৃত্যু যে আসলে এই স্থিরতার থেকে আলাদা এক চিরস্থায়ী দূরত্ব, সে কথা বোঝার ক্ষমতাও আমাদের মধ্যে অবশিষ্ট নেই আর। এই স্থির সময়ে যে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আমরা উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছিলাম, দীর্ঘ নীরবতার পর হঠাৎ ঝড়ে যেন সেই দিগন্তেই আছড়ে পড়েছি আমরা। মহাবীর কাকার মৃত্যু সংবাদ আমাদের বজ্রপাতের মতো আঘাত করেছে। কমরেড মহাবীরের স্মৃতিচারণা করে আমরা এই শোক মেনে নিতে চাইছি, আমাদের একা হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাইছি আমরা। নাতাশার কারাবাস তাঁদের দুজনের মধ্যে যে অপরিসীম দূরত্ব তৈরি করেছিল, তাঁর মৃত্যুর সময়েও সেই দূরত্ব কমানো গেল না। নাতাশা আর মহাবীরের যন্ত্রণা, তাঁদের লড়াইয়ের অদম্য ইচ্ছা আমাদের শক্তি যোগায়।

যারা জানেন না তাদের উদ্দেশ্যে বলি, নাতাশা নারওয়াল নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সি-এ-এ)-এর প্রতিবাদ অবস্থানে যোগদান করার জন্য “সন্ত্রাসবিরোধী” আইনে মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত। নাগরিকত্ব সংশোধন আইন ভারতবর্ষের অগণিত মানুষের থেকে তাঁদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেবে, এবং কোনওরকম রাজনৈতিক স্বীকৃতি বা আইনী সুরক্ষা থেকে তাঁদের বঞ্চিত করবে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তর পূর্ব দিল্লিতে কয়েকশো মুসলিম পরিবারের উপর রাষ্ট্রীয় মদতে সন্ত্রাস নেমে আসে। তাঁদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়, প্রিয়জনদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্তদের উপর থেকে নজর সরিয়ে নেওয়ার জন্য, ‘দিল্লি-দাঙ্গা’র মিথ্যা মামলায় নাতাশাকে “ষড়যন্ত্রকারী” হিসাবে অভিযুক্ত করা হয়। অন্যান্য সমস্ত মামলায় জামিন পাওয়ার পরেও ইউএপিএ আইনে জামিন প্রত্যাখ্যান করা হয় নাতাশার। ভুলে যাবেন না, শুধু মিথ্যে মামলাই নয়, অন্যায় আইন দ্বারাও তার অসুস্থ বাবার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয় নাতাশাকে! বেআইনী ক্রিয়াকলাপ প্রতিরোধ আইন (ইউএপিএ) হচ্ছে এমন এক ধারা যেখানে শুধুমাত্র অনুমানের ভিত্তিতেই আইনী শাস্তি সম্ভব।

নাতাশার পরিস্থিতি আলোচনা করার সময়ে আমরা সবাইই প্রচণ্ড রেগে যেতাম এই ব্যবস্থার উপর। একমাত্র মহাবীর কাকা কখনো সরকারের এই শীতল উদাসীনতায় বিরক্তি প্রকাশ করেননি। যে সরকার যেনতেনপ্রকারেণ তাঁর মেয়ের উপর ‘দাঙ্গাকারী’র মিথ্যে তকমা লাগাতে চেয়েছে, তার উপর রেগে না গিয়ে সবসময়েই তিনি বলতেন – যারা কষ্ট পাচ্ছে, যারা অভিযুক্ত, তাঁদের কষ্ট থেকে শিক্ষা নাও। চোখের জল আটকে রেখে তিনি বলতেন, “আমি বলব ভিন্নমত অত্যন্ত জরুরি। শুধুমাত্র মতবিরোধের মাধ্যমেই ব্যক্তি অধিকার রক্ষা করা যায়। মানবাধিকার রক্ষার আর কোন উপায় নেই। আমাদের এমন ভবিষ্যতের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত যেখানে আমার তোমার মতবিরোধের অধিকার আর থাকবে না … ।” ডঃ মহাবীর নারওয়াল হরিয়ানায় জনগণের বিজ্ঞান আন্দোলন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান আন্দোলনের শুরুর দিন থেকেই সেই আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি শেষ সময় অবধি প্রগতিশীল রাজনীতির আদর্শে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন, এবং বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।

আমরা বেআইনী হিংসার কথা ভাবি। মহাবীর কাকার জবানিতে আমরা আইনী হিংসার চিত্র পাই। নাতাশার আইনী লড়াইয়ের কথা বলেন কমরেড মহাবীর, “প্রথম এফআইআরটি জাফরাবাদ পুলিশের কাছে অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছিল, যার ফলে ২৪শে মে নাতাশাসহ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়। এতে প্রায় দশটি নাম ছিল। অথচ নাতাশার নাম এই এফআইআর-এ কোথাও নেই। এদের সবাইকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরের দিন আদালতে হাজির করা হয় এবং আদালত তাদের জামিনে মুক্তি দেয়। তবে এদের মুক্তি দেওয়ার ঠিক আগে আরেকদল পুলিশ আদালতে যায়, এবং জামিনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের আবার গ্রেপ্তার করা হয়। এবার ইউএপিএর অধীনে।” কমরেড মহাবীরের এই শান্ত ব্যাখ্যা সম্ভবত শ্রেণিবৈষম্য, বর্ণবৈষম্যে জর্জরিত এক সমাজে আইনের বাস্তব প্রকৃতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা থেকেই এসেছে। তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শই তাঁকে শিখিয়েছে, বৃহত্তর স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য বিচ্ছিন্ন লড়াই ততক্ষণ জয়লাভ করতে পারেনা, যতক্ষণ না সমাজের সমস্ত মানুষ তাঁদের মৌলিক অধিকার লাভ করবেন, এবং স্বচ্ছন্দে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারবেন। 

আপনারা কেউ কেউ হয়তো মহাবীর কাকাকে মনে রেখেছেন ওনার ভিডিও সাক্ষাৎকারগুলি থেকে। এইসমস্ত সাক্ষাৎকারগুলিতে তিনি শুধু আইনী ব্যবস্থার জটিলতার কথাই বলছেন না, বরং খুব ধীর স্থির ভাবে আমাদের আইনের বাইরের জগতের স্থায়ী সংগ্রাম আর শোকের বাস্তবতার কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন। 

তাঁদের পরিস্থিতি সত্ত্বেও, তাঁরা দুজনই নিয়ত নতুন আশা নিয়ে বেঁচে ছিলেন। পৃথিবীর থেকে দুজনেরই অনেক প্রত্যাশা ছিল, পৃথিবীর প্রতি দুজনেই অনেককিছু দেবার পরিকল্পনা করেছিলেন। অথচ দুজনে একে অপরের সাহচর্যে থাকার সহজতম আনন্দ থেকে বঞ্চিত থেকে গেলেন। কারাগারের বন্দীদের জন্য নির্ধারিত ‘ই-মোলাকাত’-এর মাধ্যমে বাবা আর মেয়ে তাঁদের যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। এমনকি এই ই-মোলাকাতের অধিকারও সহজে আসেনি, এসেছে বন্দীদের অধিকার অর্জনের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। দেবাঙ্গনা কলিতা এবং নাতাশা নারওয়াল কর্তৃক দায়ের করা আবেদনের (নাতাশা নারওয়াল বনাম রাজ্য) প্রতিক্রিয়া হিসাবে, দিল্লি হাইকোর্ট তিহার জেল কর্তৃপক্ষকে বন্দীদের টিকা দেওয়ার নির্দেশ দেয়; এর সাথে সাথে ভিডিওকলের মাধ্যমে ই-মোলাকাত ব্যবস্থা শুরু করারও নির্দেশ দেয়। অন্যান্য দাবীর মধ্যে আদালত বন্দীদের মাসিক টেলিফোন কলের জন্য ধার্য মাসিক মূল্যও মকুব করে। 

কোভিড-১৯ অতিমারীর সবচেয়ে তীব্র ঢেউ যে সময়ে আছড়ে পড়েছে আমাদের দেশে, বিশেষত সেই সময়ে জেলের ভিতর আর বাইরের বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা যে সমস্ত অধিকারকে আমাদের প্রাপ্য অধিকার হিসাবে ধরে নিই, জেলের ভিতরে সেগুলির জন্য চলে প্রতিযোগিতা এবং টানাপোড়েন। জেলখানার ভিতরে এমনিই এক সন্ত্রাসের পরিবেশ বিদ্যমান। সেই সন্ত্রাস যে অন্যান্য প্রান্তিক বন্দীদের ক্ষেত্রে আরও অনেক বেশি তীব্র আকার ধারণ করে, সে বিষয়ে তাঁরা সচেতন ছিলেন। অন্যান্য বন্দীরা যে তাঁদের মৌলিক অধিকারগুলি থেকে বঞ্চিত, সেই বাস্তবতাও তাঁরা কখনই অস্বীকার করেননি। তাঁদের একে অপরের সাথে কথাবার্তা চালিয়ে যেতে পারা যে আসলে তাঁদের অবস্থানগত একধরনের বিশেষ সুবিধা, সে বিষয়ে নাতাশা এবং মহাবীর কাকা দুজনেই ওয়াকিবহাল ছিলেন।

মহাবীর কাকা কখনই নিজের কষ্টকে অতিরঞ্জিত করে দেখেননি, বরং সবসময়েই নিজের কষ্টকে তুচ্ছ করেছেন। শুধুমাত্র কখনো কোনও বিরল মুহূর্তে হয়তো তিনি স্বীকার করেছেন নাতাশার জেলে থাকার জন্য তাঁর বয়সজনিত উৎকণ্ঠা। তিনি প্রবলভাবে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে নাতাশা কারাগারে নিশ্চিতভাবেই টিঁকে থাকতে পারবে। কিন্তু, জেলে কাটানো এই দীর্ঘ সময় যা নাতাশা বাইরে থেকে অতিবাহিত করতে পারতো, সময় এবং জীবনের এই অপচয় সম্পর্কেও তিনি ওয়াকিবহাল ছিলেন। নাতাশাকে আর কখনো হয়তো তিনি মুক্তি পেতে দেখতে পাবেন না, একথাও তিনি সাক্ষাৎকারে খুব সহজভাবে স্বীকার করেছিলেন। এই মুক্তি তাঁর কাছে প্রধানত কারাগারের চার দেয়াল থেকে মুক্তি হলেও, আসলে ছিল সব ধরনের বেড়াজাল থেকেই মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।

তিনি জানতেন যে, ধুমধাম আড়ম্বরের যে ছবি যত্ন করে তৈরি করা হয়, সে পরিসরের বাইরের পৃথিবীতে রয়েছে গভীর দুর্দশা এবং শোষণ। শ্রমজীবী শ্রেণির শোষণের উপর ভিত্তি করে যে ব্যবস্থা টিঁকে আছে, সেই ব্যবস্থার বিরোধিতা করার কঠিন মূল্য সম্পর্কেও মহাবীর কাকা অবগত ছিলেন। তিনি জানতেন যে, সমাজবদলের স্বপ্ন যারা দেখেন, বিভিন্ন দমনমূলক আইনের মাধ্যমে তাঁদের জেলের ভিতর বন্দী করে ফেলা যায়। “জেল কোনও আতঙ্কজনক স্থান নয়। একে ভয় করা উচিত নয়। অন্যরা যেভাবে জেলের ভিতরে বাঁচে, নাতাশাও সেভাবেই বাঁচবে। আজকাল যেমন ও জেলের লাইব্রেরির দেখাশোনা করছে, তাই আমি বলেছিলাম যে আমরা তাহলে লাইব্রেরির জন্য বই উপহার দেব।” 

মহাবীর কাকা সমাজের প্রান্তিক মানুষের উপর ঘটে চলা নিপীড়নের স্বরূপ সম্পর্কে অবগত ছিলেন। ফলে, নিজের প্রতিকূল অবস্থার কথা বলার সময়ে তিনি সবসময়েই নিজের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে সম্যক বোঝাপড়াও সামনে রেখেছেন। আমার মনে হয়েছে, মহাবীরকাকা এভাবে নিজেকে সামাজিক প্রেক্ষাপটে একারণেই দাঁড় করাতে পেরেছিলেন কারণ, সংগ্রামী প্রতিরোধ এবং বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে তিনি মনপ্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করতেন। এইসমস্ত আন্দোলন যে সত্যিকারের সমাজবদলের ক্ষমতা রাখে, সে বিষয়ে তাঁর ভরসা ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন তাঁর নিজস্ব শোক সমাজের শোষিত জনগণের দুঃখকষ্টের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যেসব মানুষ লড়াই করছেন, তাঁদের লড়াইয়ের থেকে নিজের লড়াইকে কখনো বড় বা আলাদা করে দেখেননি মহাবীর কাকা। বরং, তিনি বিশ্বাস করতেন যে এই সমস্ত লড়াই-ই একদিন মানুষের মুক্তির পথ দেখাবে।  

এভাবেই বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক প্রবণতা যেন কমরেড মহাবীরের কাছে সমন্বয়ের অবকাশ পেয়েছিল। তিনি আমাদের সবার কমরেড হতে পারতেন। আমরা অনেকেই আমাদের সারাটা জীবন কাটিয়ে দিই নিজের সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে, আর অন্যের পরিস্থিতিকে ছোট করে। কিন্তু মহাবীর কাকার ছিল মানুষের প্রতি বাঁধহীন ভালবাসা আর শ্রদ্ধা। একথা স্বচ্ছন্দে বলা যায়, তিনি যা কিছু করেছেন, তা নিঃস্বার্থভাবে করেছেন সমাজের জন্য। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত প্রাণবন্ত ছিলেন। নিজের করোনা-আক্রান্ত পরিস্থিতিকে উপহাস করে তিনি আমাদের সবার উদ্বেগ কাটানোর চেষ্টা করতেন। তিনি বলেছিলেন, তাঁর প্রাণবন্ত মনের জোর দিয়েই তিনি করোনার প্রতিটি আঘাত কাটিয়ে উঠবেন। 

নিজের ভিতরের কান্নাকে চেপে রেখে তিনি আমাদের এই বলে সান্ত্বনা দিতেন যে, এই ঝড়ঝাপটা শেষ হলে পিঁজরা-তোড়ের2 সমস্ত মেয়ে এসে তাঁর বাড়িতে আড্ডা দিতে জড়ো হবে। যে শোক আমরা আজ অনুভব করছি, তা শুধু মহাবীর কাকাকে ব্যক্তিগতভাবে জানার কারণে নয়। আসলে, আমাদের বেশিরভাগ বন্ধুবান্ধব, সাথীরা তাঁকে প্রত্যক্ষভাবে চিনত না, বা তাঁর সাথে কখনো তাদের সরাসরি কথা হয়নি। অথচ, এই চেনাজানার গণ্ডীর বাইরে সবার জীবনকে ছুঁয়ে যাওয়াই তাঁকে আমাদের সবার কাছের মানুষ করে তুলেছিল। ক্লান্তিহীনভাবে তিনি যে কাজ করে গেছেন, তাঁর সাক্ষাৎকারে তিনি যেভাবে নিজের শোক ব্যক্ত করেছেন, নাতাশার সংহতিতে পাঠানো প্রতিটি মেসেজের উত্তরে তিনি যেভাবে ধন্যবাদ জানাতেন – এই সমস্ত টুকরো টুকরো স্মৃতি থেকেই আমরা তাঁকে নিজেদের মনে গড়ে নিতে পারি। 

খুব সহজ এক আত্মবিশ্বাস ছিল কমরেড মহাবীরের। কে জানে সে বিশ্বাস জনসমষ্টির মধ্য থেকে উঠে এসেছিল বলেই হয়তো তিনি তাঁর মেয়ের স্বপ্নের সাথে এতটা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন। তিনি শুধুমাত্র এরকম একজন ‘উদার’ বাবা ছিলেননা যিনি “তাঁর মেয়েকে নিজের পথে চলতে দিয়েছেন।” সকলের মুক্তির লক্ষ্যে সংগ্রামের যে পথ তাঁর মেয়ে বেছে নিয়েছিল, তিনি ছিলেন সেই পথে মেয়ের সাথী। তাঁর মেয়ের স্বপ্নকে তিনি নিজের স্বপ্নের থেকে আলাদা করে দেখেননি। “যেখানেই মানুষের উপর দমনপীড়ন দেখা যায়, সেখানেই আমার মেয়েকে দেখতে পাবেন আপনারা। তবে তা এইজন্য নয় যে আমার মেয়ে সবচেয়ে বেশি দুঃখকষ্টের জীবন কাটিয়েছে। কিন্তু, সবচেয়ে কঠিন সময়েও আমার মেয়ে সবসময়ে মানুষের লড়াইয়ে অংশ নিয়েছে, তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছে, এবং এজন্যই আমি নাতাশার জন্য গর্বিত।” 

এই অসম লড়াইয়ের মধ্যেও মেয়ের কথা বলতে গিয়ে মহাবীর কাকার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠতো। “আমাদের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের মেয়েরা আরও বিকশিত হবে … যখন আমরা জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলাম, তখন মানুষ আমাদেরকেও উগ্রপন্থী বলতো। কিন্তু সেইসমস্ত মানুষকে ইতিহাস কীভাবে মনে রেখেছে? যারা সেই সময় জেলে গিয়েছিল তাদের আজ উগ্রপন্থী হিসাবে দেখা হয় না। আমি জরুরি অবস্থার সময় জেলে গিয়েছিলাম (১৯৭৫) আর আমার মেয়ে অন্য এক জরুরি অবস্থার সময় জেলে গেছে।”

মহাবীর কাকা জানতেন, মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস সমাজে প্রচলিত ধারণার, বা মানুষের ভাবনার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। আজকে যারা ক্ষমতার আস্ফালনের কাছে বন্দী, চিরকাল তাঁদের একইরকম দুর্দশা থাকবেনা। সব মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে সমাজবদলের যে লড়াই, সে লড়াইয়ে অটুট আস্থা রাখার পাশাপাশি বাস্তবের প্রতিটি মুহূর্তে মর্যাদা অর্জনের জন্য মানুষের যে লড়াই, সেই লড়াইয়েও সামিল ছিলেন তিনি। তিনি তাঁর কষ্ট-দুর্দশার জন্য শোকে ডুবে যাননি, তাঁর রাজনীতিবোধ থেকে শক্তি অর্জন করেছিলেন। আমাদের অজস্র আক্ষেপের মধ্যে সবথেকে বড় আক্ষেপ, আমরা মহাবীর কাকার জন্য অবলম্বন হয়ে উঠতে পারিনি। নাতাশার মুক্তির নিরলস প্রচেষ্টায় তাঁর নিদ্রাহীন, দুর্বল শরীর ক্রমশই অসুস্থ হয়ে পড়ে। নাতাশার আইনী লড়াইয়ের এই অবিচ্ছিন্ন শ্রম থেকে যদি আমরা তাঁকে অব্যাহতি দিতে পারতাম, তাহলে হয়তো তাঁর বার্ধক্যপীড়িত দেহ একটু স্বস্তি পেত। কমরেড মহাবীর প্রত্যেক মুহূর্তে কমরেড নাতাশার পাশে হেঁটেছেন; একসাথে দুঃখকষ্ট ভাগ করে নিয়েছেন, সমস্ত সমস্যা হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন; জীবনের সমস্ত খুশির মুহূর্ত একসাথে উদযাপন করেছেন। নাতাশার জীবনের প্রকৃত পরিপূরক ছিলেন মহাবীর কাকা। আমাদের প্রত্যেককে প্রত্যক্ষভাবে না চিনেও এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে কমরেড মহাবীর আমাদের প্রত্যেকের জীবনকে ছুঁয়ে গেছেন। 

এই লেখা শেষ করছি পিঁজরা তোড় থেকে উঠে আসা প্রশ্নের সাথে, “বর্তমান সময়ে অতিমারী যে আকার ধারণ করেছে সেই সুগভীর সঙ্কটের সময়ে দাঁড়িয়ে কমরেড মহাবীরের মৃত্যুর শোক আমরা সবার শোকের সাথে ভাগ করে নিতে চাই। এই শোকের সময়ে আমাদের সরকারের কাছে প্রশ্ন, ‘রাষ্ট্র কীভাবে মানুষের এই বিপুল পরিমাণ ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দেবে?'” এই অপূরণীয় ক্ষতির দায় কে নেবে? 

তুমি কি তোমার শোককে তোমার আওয়াজে পরিণত করতে পারবে? নাকি নীরবতা পালন করবে? এই মুহূর্তে যা বলা সম্ভব, সেই সবকিছুই কি আমরা আগে বলিনি? রাষ্ট্রের কাছ থেকে আমরা আমাদের সমস্ত প্রশ্নের জবাব চাই।

(মূল ইংরাজি লেখাটি পড়তে পারবেন এখানে)

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *