রুকু আর ওর ফ্রেন্ড সত্যজিৎ

“সত্যজিৎ রায় মেয়েদের জন্য গল্প লেখে না, সিনেমা বানায় না।”

ডাম্বল এই কথাটা চোখ বুজে বলার পর ভাবছিল ক্যাডবেরি চাটতে চাটতে বেরিয়ে যাবে। তবে চোখ খোলার আগেই রুকুর হাতে চটাস করে একটা থাপ্পড় খেয়ে তারস্বরে কান্না জুড়ে দিল। এতে রুকুর এক ঢিলে অনেকগুলো পাখি মারা হল – একে ডাম্বল ভীষণ ঘ্যানঘ্যানে, তাও ওর মা সপ্তাহে তিনদিন ওকে টিফিনে ক্যাডবেরি দেয় আর ডাম্বল শেয়ার করে না বলে রুকুর বিরক্তিকর লাগে। ডাম্বলকে সে মাঝে মাঝেই পেটায়। এই দফায় আরেকবার পেটানো গেল, ক্যাডবেরিটাও গেল ছিটকে আর দুই মিলিয়ে কাঁদানো গেল – এতে রুকুর বেশ তৃপ্তি হল। এইবার প্রিন্সিপাল ওকে ডাকবে, ডাম্বলের মা এসে ফোঁস ফোঁস ঘোঁত ঘোঁত করবে, পেরেন্ট কল হবে – এইগুলি অতঃপর খুব একটা ঝামেলার না।

ব্যাপারটা শুরু হল কারণ ক্লাসে মরাল সায়েন্সের মিস সবাইকে জিগ্যেস করেছিল যে তারা বড় হয়ে কী হতে চায়। তাতে রুকু বলেছিল যে সে সিনেমা বানাবে। ‘ইন্টারেস্টিং’, বলে মিস যখন জিগ্যেস করল কেন এটা সে বলছে তখন সে বলেছিল যে সত্যজিৎ রায় সিনেমা বানায় বলে। ব্যস! তারপর ‘সিনেমা বানাতে গেলে কী করতে হয়?’, ‘কেন সিনেমা – সত্যজিৎ রায় তো ছোটদের গল্পও লিখতেন’ ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর দিতে রুকুর ইচ্ছে করছিল না।

রুকু অত ভেবেচিন্তে উত্তর দেয়নি। “আচ্ছা বলো তো, তোমার নামে সত্যজিৎ রায়ের কোন ছবিতে একটি চরিত্র আছে?” প্রশ্ন করায় সে ঠিক উত্তর দিল আর মিস বলল “কিন্তু সেটা তো ছেলের নাম, রুকু তো মেয়ে নয়!” আর ক্লাসের সবাই হাসল। রুকুর বলতে ইচ্ছে করলো “মরালও সায়েন্স নয়”, কিন্তু সে গম্ভীর ভাবে বলেছিল – “ছেলেটার নাম রুক্মিনী, আমার নামও রুক্মিনী” – এতে ক্লাস এবং মিস দুজনেই থমকে গেছিল। তারপর সায়ন্তনীকে প্রশ্ন করার পর সে বলল যে সে বড় হয়ে পরিবেশবিদ হতে চায়, প্রসঙ্গ ঘুরে গেল।

রুকু অত ভেবেচিন্তে উত্তর দেয়নি। রাঙামামা আরো বড় হয়ে (ওর বয়স ২২) ফিল্ম বানাতে চায়; ফিল্ম স্টাডিজে এম এ করার চান্স পায়নি বলে “ওরা কিছু জানে না” বলে খালি গম্ভীর হয়ে কম্পিউটারে সিনেমা দ্যাখে আর সত্যজিৎ রায়ের ছবি দেখার সময়ে রুকুকেও ওর সঙ্গে দেখতে বলে। রুকুর বেশ লাগে, আর নিজে সত্যজিৎ রায়ের লেখা গল্প পড়তে শুরু করেছে বলেও দ্যাখে (তবে ওর বাস্টার কিটন দেখতে বেশি ভাল লাগে)। আসলে হয়েছে কী – প্রথমে ওর একটু কনফিউশন হয়েছিল। যে ফেলুদা লেখে সেই সিনেমা বানায় কেন? যেমন ওর কনফিউশন হয়েছিল, যে কৃষ্ণ কংসকে মেরেছিল সেই মহাভারতে অর্জুনের রথ চালায় নাকি। অমর চিত্র কথা দেখে ওর এটাও বুঝতে অসুবিধে হয়েছিল যে কৃষ্ণ মেয়ে না ছেলে। যাই হোক – যে সিনেমা বানায়, সেই যে ফেলুদা আর শঙ্কু লেখে এই গোলমালটা ক্লিয়ার করার জন্য ও ঠিক করেছিল যে দুটোতে কোথায় মিল সেটা বুঝতে হবে।

রাঙামামা সহজে উত্তরটা দেওয়ার চেষ্টা করল যে এই দ্যাখ যে ‘সোনার কেল্লা’ লিখেছে, সে ‘সোনার কেল্লা’ বানিয়েছে। তখন রুকু জিগ্যেস করল যে তাহলে কি একই মানুষ ‘পথের পাঁচালী’ও লিখেছে? তখন রাঙামামা – উফ্‌ফ! বলে গম্ভীর মুখে ছবি দেখতে আরম্ভ করল।

যাই হোক। রুকু বুঝেছে যে দুজন সত্যজিৎ একই লোক কারণ দুজনেই ফানি। এইখানে অন্য মুশকিল। রাঙামামা বাস্টার কিটন আর গুগাবাবা দেখে হাসে, কিন্তু রুকু বোঝাতে পারে না যে সত্যজিৎ রায়ের সব ছবিই আসলে ফানি। যেমন ‘শাখা প্রশাখা’ আর ‘আগন্তুক’-এর সবচাইতে বুড়ো লোক দুটো মজার, ‘নায়ক’-এর দাদুটা মজার, সত্যজিতের সব বুড়োই আসলে কম বেশি মজার। যেমন ‘দেবী’ দেখতে শুরু করে সে তো হেসে কুটিপাটি কারণ ছবিতে যে মিষ্টি দাদুটা আছে সে খালি ‘মা’ বলে। এক সময়ে যখন রুকু ‘মা’ গুনতে আরম্ভ করল তখন রাঙামামা ওকে ঘর থেকে বের করে দিল। তো রুকু ঘরে গিয়ে খাতা বের করে একটা কোয়ালা বিয়ার আঁকতে আরম্ভ করল (ওর মনে হয়েছিল ছবি বিশ্বাস কোয়ালা বিয়ারের মত দেখতে) আর তার নাম দিল সিনেমামা সিং মাত্যবিশারদ এম এ। এটা দেখে  রাঙামামা ভাবল রুকু তাকে নিয়ে ঠাট্টা করছে। বাড়ি ভর্তি লোক তারপর থেকে রাঙামামাকে রুকুর সিনেমামা বলে ডাকে।

এভাবেই রাঙামামা রুকুর সবচাইতে প্রিয় হওয়া সত্ত্বেও ওর সঙ্গে বিবিধ ঝগড়া বাঁধে। রুকু যখন সত্যজিৎ রায় পড়তে শুরু করে বাবা বলেছিল এই ‘বেঙ্গলি’-টা ওর পক্ষে ‘টাফ’। কিন্তু মোটেও সেরকম হয়নি। রুকু সান্ডে সাসপেন্স চালিয়ে দিয়ে বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে পড়ত। মুশকিল হল, ও ফেলুদা পড়ার আগেই ছোটগল্পগুলো পড়তে শুরু করেছে। তাই ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি পড়ার সময়ে বলেছিল – “বুঝেছি। ফেলুদা ফটিকের মত।”

“কোন ফটিক?” তারপর ‘শিবু আর রাক্ষসের কথা’ বলাতে রাঙামামা বলল – “তার সঙ্গে ফেলুদার কী সম্পর্ক?”

“ফটিকেরও তো অবজারভেশন আর ডিডাকশনের স্কিল আছে” – রাঙামামা যে শব্দগুলো ব্যবহার করেছে রুকু সেগুলো ঠিকঠাক উচ্চারণ করে বলল – “ফটিক বলল না, দেখা আর লক্ষ্য করা এক জিনিস নয়? ও ইনভেস্টিগেট করল যে জনার্দনবাবু রাক্ষস। আর রহস্য সমাধান করল। আর শিবুকে যে কথায় কথায় বকে? একদম ফেলুদার মত!”

“ধুর! তুই উল্টোপাল্টা তুলনা করিস!” – রাঙামামা বিরক্ত হয়ে গেছিল।

রুকুর মতামত এভাবে কারুর সঙ্গেই মেলে না। যেমন রুকু দোকানে ক্যাপ্টেন স্পার্ক আর প্রখর রুদ্রর বইয়ের খোঁজ করায় সবাই হেসেছিল। তারপর ফিরতি পথে রাঙামামা ওকে আসল বই আর কল্পিত বইয়ের তফাত বোঝানোর সময়ে রুকু বলল যে সত্যজিৎ রায় আসলে জটায়ু আর অক্রুর নন্দীর মত গল্প লিখতে চান, কিন্তু রাঙামামার মত গম্ভীর লোকেদের জন্য লেখা হয় না। আবার রাঙামামা ভুরু কোঁচকালে ও বোঝালো –

“কেন? জটায়ু ‘হন্ডুরাসে হাহাকার’ লিখল আর সত্যজিৎ রায় ‘কৈলাসে কেলেঙ্কারি’।”

“তো?”

“সত্যজিৎ রায়ের ওরকম জায়গার নামের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে গল্পের নাম দেওয়ার খুব ইচ্ছে; কিন্তু ফেলুদাকে সব জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায় না।”

“উফ্‌ফ! ফেলুদা যৌক্তিক আর জটায়ু অযৌক্তিক!”

এইটা বললে রুকুর খুব রাগ হয়ে যায়। ফেলুদাকে নিয়ে কিছু একটা বলে লালমোহনবাবু সেটা নয় বললেই ওর রাগ হয়ে যায়। ও বিস্তারিত বোঝাল যে ‘সাহারায় শিহরণ’ আসলে প্রোফেসর শঙ্কুর মরুরহস্য।

“ধুর! তুই উল্টোপাল্টা অ্যানালিসিস করিস!” অ্যানালিসিসের মানে  জানতে রুকুর আধ ঘন্টা দেরি হয়েছিল কারণ ও রাঙামামার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল। তারপর মানেটা জানার পর রুকু বুঝেছিল অ্যানালিসিস ওর বিশেষ ‘স্কিল’।  ওর আরেকটা স্কিল হল চেনা বিষয়কে অচেনা নাম দেওয়া। যেমন ফিজিক্সের বাংলা পদার্থবিজ্ঞান হলে মরাল সায়েন্সের বাংলা অপদার্থবিজ্ঞান; বা জিওগ্রাফির বাংলা ভূগোল হলে ইতিহাসের বাংলা কালগোল (বড়ঠাম্মা বারবার ‘কালে কালে কত কী দেখব’ বলতে থাকায় ও কাল মানে যে শুধু আগামীকাল নয় এটা বুঝেছিল); বা বানানো গল্পের ইংরেজি ফিকশন হলে কুড়িয়ে পাওয়া গল্প হল পিকশন।

সে যাই হোক। রুকুর কাছে সত্যজিৎ রায় শুধুই ফানি নয়; ওর সবচাইতে প্রিয় ডায়লগ হল “আমার হাসি পাচ্ছে না”। তাই ও বড়দের বলতে ভালবাসে যে ওর এখন কুমোরপাড়ার গরুর গাড়ি আবৃত্তি পাচ্ছে না, এখন ‘মাই হার্ট উইল গো অন’ গানটা পাচ্ছে না, ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়া নেই মানা’ গানের সাথে বাল্ব খোলা আর লাগানোর নাচ পাচ্ছে না। একবার ‘ইন্ডিয়া কেন গ্রেটেস্ট’ ডিবেট পাচ্ছে না বলে স্টেজ থেকে নেমে গিয়ে সবাইকে হতাশ করে রুকু খুব তৃপ্তি পেয়েছিল। তবে বাবা তাতে এত ঝামেলা করল সেটা  ওর মনে হল বাড়াবাড়ি হচ্ছে। আর ও বিরক্ত হয়েছিল এটা দেখে যে মার খুব হাসি পাচ্ছে, কিন্তু হাসি চাপছে।

রুকুর কাছে সত্যজিৎ রায় শুধুই ফানি নয়। ‘সোনার কেল্লা’ দেখার পর ও ঠিক করেছে যে ওকে জাতিস্মর হতে হবে। সত্যজিৎ রায়ের কুসংস্কার নিয়ে এইসব বাড়াবাড়ি ইত্যাদি বলে শুকনোজ্যেঠু (কারণ উনি রসগোল্লা শুকনো করে খান) বাবাকে বলে গেল রুকুকে ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ দেখাতে। রুকু দেখল, কিন্তু ছবির ছেলেটাকে ওর খুবই পাকা আর ডাম্বলের মত লাগল। ছবিটা ভাল লাগেনি, তবে ‘নতুন নতুন গাছে’ গানটা ওর খুব ভাল লেগেছিল, আর জহর রায়কে।

যাই হোক; জাতিস্মর হতে হবে। জাতিস্মর হতে গেলে দুটো জিনিস প্রয়োজন – আগের জন্মের জন্য একটা ভাল জায়গা, আর আগের জন্মের জন্য ভাল ইতিহাস, অর্থাৎ ভাল কালগোল। রুকু এই দুটো এখন খুঁজে চলেছে।

সত্যজিৎ রায় আপাতত রুকুর ফেভারিট ফ্রেন্ড। রুকু বুঝেছে যে উনি ছোটদের ব্যাপারে সিরিয়াস আর বড়দের ব্যাপারে ফানি। আর ডাম্বলকে আরেকটা গাট্টা মারার জন্য ও সত্যজিৎ রায়ের গল্পে একটা ভাল মেয়ে পেয়ে গেছে। মেয়েটার নাম বিবি। বিবি দাদুর ফেভারিট, যেমন রুকু দাদুর ফেভারিট, ঠিক যেমন রুক্মিনীকুমার ঘোষালও দাদুর ফেভারিট ছিল। কিন্তু ওর দাদু সিক্রেট ভাষা জানে না। তাই রুক্মিনী ঠিক করেছে যে সেই দায়িত্বটা ওকেই নিতে হবে। তাই কালগোল, পিকশন আর ‘খেলানিসিস’ মানে কী – আর সবাইকে বলা যাবে না।

চিত্রঋণ – সত্যজিৎ রায়ের অলংকরণ থেকে 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *