উল্গুলানের শেষ নাই: হুল মনে রেখে

১৮৫৫। দামান-ই-কোহ এলাকা। সাঁওতালদের নিজেদের দেশ। রাতের অন্ধকারে শত্রু ক্যাম্পে ঝাঁপিয়ে পরে হামলা করে দুই সাঁওতাল মেয়ে। কুঠার দিয়েই হত্যা করে ২১জন সেনাকে। সেই দুই মেয়ে যাদের ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই হয়নি। যাদের নিয়ে কোনো গল্প, গান, কবিতা লেখা হয়না। সেই ফুলো আর ঝানো মুর্মু। সেই সময় ছোটা নাগপুর আর গোটা সাঁওতাল পরগণার এলাকা জুড়ে আদিবাসী মানুষদের বাস ছিল।  তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর আহ্বান জানান সেখানকার বন জঙ্গল কেটে চাষ যোগ্য করার। আজীবন উচ্ছেদ হয়ে আসা মানুষগুলি মনে করলেন এবার বুঝি শেকড় গাড়া যাবে। কিন্তু এক বছর বিনা খাজনায় চাষ করতে দিলেও বছর ঘুরে সেই রাজস্ব এসে দাঁড়ায় আটান্ন হাজারে। একই সাথে ব্রিটিশ সরকারের পুষ্ট মহাজনরা আঘাত হানে এই মানুষগুলোর এত বছর ধরে চলে আসা বিনিময়ের অর্থনীতিতে। এত দিনের স্বশাসিত জনজাতিকে কোম্পানির ক্রীতদাসে পরিণত করা ও তাদের সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক কাঠামোয় এ হেন আঘাতে গর্জে উঠলেন সাঁওতাল মানুষেরা। সিধু, কানোর নেতৃত্বে জাহির করলেন, যে জমি তারা নিজেরা খেটে খুটে চাষ যোগ্য করেছেন তার মালিকানা তাদেরই। ডাক দিলেন স্বাধীন সাঁওতাল রাজত্ব স্থাপন করার। তাদের দাবি, সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর উপর চলতে থাকা দীর্ঘমেয়াদী নিপীড়নের জবাব দিতে হবে স্থানীয় সাঁওতাল কোর্টে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের থেকে জবাব না আসায়, ভগ্নাডিহি থেকে কলকাতা মিছিলের ডাক দেন। ৩০শে জুন, ১৮৫৫, সিধু, কানু, ফুলো, ঝানো, চাঁদ, ভৈরবরা এলাকার মানুষদের সংগঠিত করেন। ‘দিকু’দের (অত্যাচারী মহাজন, জমিদার, জোতদার ও তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ব্রিটিশ সরকারের) বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ে শুধুমাত্র তীর, ধনুক, টাঙি সম্বল করেই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। শুরু হলো হুল বিদ্রোহ যা রাষ্ট্রীয় সমস্ত শক্তি দিয়েও দমন করতে নাভিশ্বাস উঠেছিল ব্রিটিশ সরকারের। আদিবাসী মানুষদের নিজেদের জমির অধিকারে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে জল জঙ্গল জমিনের এই জান কবুল লড়াই আগামী দিনের বহু সংগ্রামের পথ তৈরি করে গেছে। এই লড়াই তাই পুঞ্জিভূত হয়ে আছড়ে পরে ১৮৫৭-এর মহাবিদ্রোহে, ১৮৯০-এর নীল বিদ্রোহে, পরবর্তী কালের কৃষক আন্দোলনে। তাই ছোটা নাগপুর টেনান্সি এক্টে বদল আনতে গেলেই পাথালগাড়ি আন্দোলন হয়। বেদান্ত, আদানিরা জল, জঙ্গল, জমি লুট করতে গেলেই আজও তীর, টাঙি হাতে আদিবাসী মানুষ রুখে দাঁড়ান বস্তারে, ঝাড়খণ্ডে। ফুলো মুর্মু, ঝানো মুর্মুর প্রতিরোধের ইতিহাসই বহন করে নিয়ে যায় সোনি সোরি, মাকদম হিড়মেরা। বার বার মনে করিয়ে দেয়, উল্গুলানের শেষ নাই।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *