অন্ধ্রের কম্যুনিস্ট মেয়েরা

ভাঙড় আন্দোলনে রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে খ্যাত হওয়ার অনেক আগে থেকেই কমরেড শর্মিষ্ঠা চৌধুরী ছিলেন কমিউনিস্ট গণ-আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী ও নেত্রী। ছাত্রজীবনে প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রথমে পিসিএসএ দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তারপর সিআরএস দল করতেন। তারও আগে থেকে তিনি নারীবাদী মতাদর্শে নিজেকে দীক্ষিত করেছিলেন ও ছাত্রজীবনে নারীবাদী পত্রিকা প্রকাশ করতেন। তাঁর ছাত্রাবস্থা নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত। যেমন, কাউকে না পেয়ে একবার প্রায় একাই মিছিল করা কিংবা প্রিন্সিপালের শ্লেষযুক্ত ‘এলেন আমার মার্গারেট থ্যাচার’ মন্তব্যের জেরে বন্ধুমহলে তাঁর আদরের নাম ‘থেচু’ হয়ে যাওয়া। প্রেসিডেন্সি থেকে দর্শনে স্নাতক হয়ে ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতার স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করে তিনি প্রথমে দ্য টেলিগ্রাফ-এ সাংবাদিকতার চাকরি নেন। রাষ্ট্রীয় শোষণ ও রাষ্ট্রের মদতে নারী নির্যাতন নিয়ে তিনি সব সময় সরব ছিলেন। সেই উদ্দেশ্যে কখনও নন্দীগ্রামে, কখনও বাস্তারে ছুটে গেছেন। চাকরি-জীবনের দু বছরের মধ্যে তিনি চাকরি ছাড়েন এবং অনেক পারিবারিক দোলাচল কাটিয়ে, মায়ের আপত্তি অগ্রাহ্য করে সিপিআই (এমএল) রেডস্টারের হোলটাইমার হয়ে বাড়িও ছাড়েন। 

পরে সিপিআই (এমএল) রেড স্টারের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হয়ে উঠেছিলেন শর্মিষ্ঠা চৌধুরী। ছিলেন সেই দলের নারী শাখা AIRWO-র সাধারণ সম্পাদক। ইংরাজি ও বাংলা দুই ভাষাতেই মার্ক্সীয় বা মার্ক্সীয় নারীবাদী তাত্ত্বিক লেখা অনায়াসে লিখতে পারতেন। ভাঙড়ের পাওয়ার গ্রিড-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী ছিলেন শর্মিষ্ঠা। ভাঙড়ের গ্রামে গ্রামে তিনি অত্যন্ত প্রিয় মুখ। ভাঙড় আন্দোলনের জেরে তিনি গ্রেপ্তার হন ও তাঁকে ইউএপিএ ধারায় অভিযুক্ত করা হয়৷ আমৃত্যু তা বহাল ছিল ও তিনি জামিনে মুক্ত ছিলেন। অন্যদিকে খড়দায় লুমটেক্স কারখানার শ্রমিক আন্দোলনেরও নেত্রী ছিলেন তিনি। 

জীবনের শেষ দিনগুলোয়,  পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন, ২০২১-এর আগে তিনি ফ্যাসিবাদ বিরোধী ‘নো ভোট টু বিজেপি’ প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ‘ফ্যাসিস্ট আরএসএস বিজেপির বিরুদ্ধে বাংলা’ মঞ্চের অন্যতম আহ্বায়ক। ২০২১ সালে ১৩ই  জুন শর্মিষ্ঠা চৌধুরী সকল কমরেড, বন্ধু, সহকর্মীকে হতবাক করে পিজি হাসপাতালে হৃৎযন্ত্রের বিকলনে মারা গেলেন। কোভিড থেকে সেরে উঠলেও কোভিড পরবর্তী জটিলতাতেই তাঁর মৃত্যু হল বলে চিকিৎসকরা মনে করছেন। ১৪ই  জুন গণ-আন্দোলনের কর্মীরা, বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক কর্মীরা, ভাঙড়ের কৃষকেরা, লুমটেক্স কারখানার শ্রমিকরা মিছিল করে মরদেহ হাসপাতাল থেকে অ্যাকাডেমির সামনে নিয়ে আসে। কমরেড শর্মিষ্ঠার ছোট স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। তারপর দেহ তাঁর ইচ্ছানুসারে ব্যাবচ্ছেদ-শিক্ষার্থে দান করা হয়। 

কমরেড শর্মিষ্ঠার অকালে চলে যাওয়া কমিউনিস্ট গণ-আন্দোলনে অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু তাঁর আদর্শ ও লড়াকু তেজ আমাদের পাথেয় হোক। অন্ধ্রপ্রদেশের নারী আন্দোলন প্রসঙ্গে শর্মিষ্ঠা চৌধুরীর নিচের লেখাটি আসলে অসমাপ্ত। তা তাঁর ফেসবুক লেখনী থেকে পাওয়া। বেশ কয়েকটি কিস্তি লিখবেন বলে কথা দিয়েও দুটি কিস্তি লিখেছিলেন তিনি ২০২০ সালের অক্টোবরে। দুটি কিস্তি একসঙ্গে ‘বামা’ প্রকাশ করল। অন্ধ্রপ্রদেশের চল্লিশের দশকের কমিউনিস্ট আন্দোলনে নারীর ভূমিকা ও নারীর প্রতি কমিউনিস্ট আন্দোলনের দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা নিয়ে তিনি যা বলেছিলেন, তা পশ্চিমবঙ্গের তেভাগা বা পরবর্তী কালে  নকশালবাড়ি আন্দোলনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

১৯৪০-এর দশক। অন্ধ্রপ্রদেশে কমিউনিস্ট পার্টি সিদ্ধান্ত নিল আরও বেশি বেশি করে মেয়েদের সমস্ত আন্দোলনে আনতে হবে। সে সময়, মেয়েদের রাস্তায় বেরনো তো দূরের কথা, স্কুলে পর্যন্ত যাওয়ার বিশেষ চল নেই, বাল্য বিবাহই প্রথা। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, কোনও স্বাধীনতাই নেই। সেই অবস্থায় পার্টির উদ্যোগে দলে দলে মেয়েরা ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল, পার্টির কাজে বিপুল উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

মণিকোন্ডা সূর্যবতী, তাপী রাজাম্মা, কোন্ডাপল্লী কোটেশ্বরাম্মারা রাস্তায় বেরিয়ে পার্টির মুখপত্র ‘প্রজাশক্তি’ বিক্রি করছেন। ছেলেরা টিটকিরি মারছে, নানাভাবে উত্যক্ত করছে, কিন্তু কমিউনিস্ট মেয়েদের কিছুতেই দমানো যায় না।

প্রজা নাট্য মন্ডলী তৈরি হল। নাটকের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছানো হবে। দুঃসাহসী প্রস্তাব এল — নারী চরিত্রে ছেলে নয়, মেয়েরাই অভিনয় করবে। লোকলজ্জার ভয়ে মেয়েরাই ইতঃস্তত করতে লাগল। পার্টির নেতারা বললেন, কেন তোমরা অভিনয় করবে না? বাংলায় দেখো খোদ রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়া দেবিকা রাণী নাটক-সিনেমা সবেতে অভিনয় করছে। অবশেষে মেয়েরা জড়তা কাটিয়ে রাজি হল। নাটক দারুণ সফল হল। তারপর বহু জায়গায় নাটক মঞ্চস্থ করে যে টাকা উঠল, তা সংগ্রহ করে বাংলার মন্বন্তরের ত্রাণকার্যে দান করা হল।

মহিলা সঙ্গম তৈরি হল। মেয়েদের সাধারণ পরাধীনতা ও জীবনের নির্দিষ্ট সমস্যা নিয়ে কমিউনিস্ট মেয়েরা গ্রামে গ্রামে প্রচার শুরু করল। বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে, বিধবা বিবাহের পক্ষে, মেয়েদের সম্পত্তির অধিকারের পক্ষে, শৌচালয় ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা, ইত্যাদি নারী-জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয়গুলি নিয়ে প্রচার। তার সঙ্গে পার্টির সাধারণ লাইনের প্রচার তো আছেই। 

ডাঃ কোমারাজু আছামাম্বা (সম্ভবত অন্ধ্র মহিলা সঙ্গমের প্রথম সভানেত্রী হয়েছিলেন)-র নেতৃত্বে নারী এবং পুরুষ কমরেডদের স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হল। ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে সন্তান প্রসবের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তিনি পার্টি কমরেডদের মধ্যে তো বটেই, গ্রামেগঞ্জেও প্রচার করে বেড়াতেন। ডাঃ আছামাম্বার মতো নারীকে, নেত্রীকে, কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টি রাখতে পারেনি। তিনি পরবর্তীতে কংগ্রেসে যোগ দেন এবং ১৯৫৭-র সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেসের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ওয়াড়া কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন।

৪০-এর দশকে ভারতে নারী আন্দোলনে মেয়েদের সম্পত্তির অধিকারের প্রশ্নটা সামনে আসতে শুরু করে। সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে বিষয়টা নিয়ে যান রেণুকা রায়। ফলস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার বি.এন. রায়ের নেতৃত্বে একটা কমিটি গঠন করে বিষয়টা খতিয়ে দেখার জন্য। কমিটির প্রতিনিধিরা যখন অন্ধ্রে গিয়ে হাজির হয়, তখন মহিলা সঙ্গমের পক্ষ থেকে তাদের ৫০,০০০ সই-সম্বলিত স্মারকলিপি দেওয়া হয়, যার মূল বক্তব্য ছিল মেয়েদের সমানাধিকার ও সম্পত্তিতে অধিকার। এরপর কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ব্রিটিশ সরকার স্ত্রীদের সম্পত্তির অধিকারের পক্ষে আইনে কিছু পরিবর্তন আনে। সেটা ছিল অন্ধ্র মহিলা সঙ্গমের এক উল্লেখযোগ্য জয়।

অন্ধ্র মহিলা সংগঠনের কার্যাবলী ও বিবর্তনের বিবরণ দেওয়া এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। এত কিছু লিখলাম এটা দেখাতে যে ৪০-এর দশকে কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে নারীদের সমস্যা নিয়ে কত গভীর ভাবে, আন্তরিক ভাবে ভাবনাচিন্তা করা হয়েছিল। 

ভাবা যায়, এ-রাজ্যে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারের শেষ বছরগুলোতেও গ্রামাঞ্চলে শৌচাগারের প্রশ্ন তো বাদই দিলাম, কলকাতা ও সংলগ্ন শহরাঞ্চলের কোনও জুটমিল মহল্লাতে স্যানিটারি টয়লেট তৈরি হয়নি, স্রেফ খাটা পায়খানা ছিল? আর ৪০-এর দশকে অন্ধ্রের প্রত্যন্ত গ্রামে কমিউনিস্ট নারীরা ঘুরে ঘুরে শৌচালয়ের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে প্রচার করেছেন!

স্ত্রীদের সম্পত্তিতে অধিকারের বিষয়টা তো আগেই বললাম। মহিলা সঙ্গম জমির কাজে নারীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করেছে। সংগঠকরা নিজেরা জমিতে নেমে কাজ করেছে যাতে তাদের দেখে অন্য মেয়েরা এগিয়ে আসতে সাহস পায়। সেই সময়কার পিছিয়ে থাকা এলাকার গৃহবন্দী মেয়েদের, যাদের শিক্ষা-চাকরির সামাজিক অধিকার ছিল না, তাদের মুক্তির অন্যতম দিশা হিসাবে চাষের কাজের সাথে যুক্ত করা, অর্থাৎ সামাজিক শ্রমের সাথে যুক্ত করা, ছিল এই পদক্ষেপের পেছনে কারণ।

মণিকোন্ডা সূর্যবতী ১৯৪৭ সালে অন্ধ্র মহিলা সঙ্গমের প্রথম রাজ্য সম্পাদক নির্বাচিত হন। পায়ে হেঁটে গ্রামকে গ্রাম চষে ফেলতেন। পার্টি নিষিদ্ধ হওয়ার পর জেলেও গেছেন।১৯৫০-এর দশকে টানা তিনবার নন্দামুরু গ্রামের পঞ্চায়েত সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁর নিজস্ব জমির ২৫℅ তিনি দান করেছিলেন গ্রামের মেয়েদের জন্য শৌচালয় বানানোর জন্য। ৫০-এর দশকেই তিনি বিধান পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এমএলসি হিসেবে যে ভাতা পেতেন তা পুরোটাই পার্টিকে দিয়ে দিতেন। পার্টি যে সামান্য মাসোহারা দিত, তাতেই তাঁর চলত।

তখনকার কমিউনিস্ট নেতাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সূর্যবতী নিজের সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি করে সেই টাকা পার্টিকে দান করেন। আমরা বরাবর বিভিন্ন কমিউনিস্ট নেতার বাড়ি থেকে নিজের সম্পত্তির অংশ বুঝে নিয়ে তা পার্টিকে দান করার গল্প শুনে এসেছি। রাজেশ্বর রাও থেকে সুন্দরাইয়া থেকে স্নেহাংশু আচার্য থেকে সীতারামাইয়া, সকলেই তাই করেছেন। কিন্তু ছ’সাত দশক আগে, মেয়েদের পক্ষে এই কাজটা করা ঠিক কতটা কঠিন ছিল? মেয়েদের তো পৈতৃক সম্পত্তির ওপর আইনি অধিকারই ছিল না — সেই অবস্থায় নিজের সম্পত্তির ভাগ বুঝে নিয়ে তা পার্টিকে দান করা কি অসামান্যতার দাবি রাখে না? 

অথচ এই অসামান্য কাজটাই মণিকোন্ডা সূর্যবতী, লীলা সুন্দরাইয়ারা অক্লেশে করেছেন। দুজনেই পার্টির হোলটাইমার ছিলেন। সূর্যবতীর যখন ১৬ বছর বয়স তখন তাঁর মা-বাবা সুব্বারাওয়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেন। সুব্বারাওয়ের হাত ধরেই সূর্যবতীর বামপন্থী রাজনীতিতে প্রবেশ। কিন্তু অচিরেই সুব্বারাওয়ের হাত ছেড়ে তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে শুরু করেন। ক্রমে দুজনেই পার্টি হোলটাইমার হিসাবে কাজ করেন। লীলা সুন্দরাইয়াও পি. সুন্দরাইয়ার সাথে বিয়ের পর চাকরি ছেড়ে পূর্ণ সময়ের রাজনৈতিক কর্মী হয়ে যান এবং আজীবন হোলটাইমার হিসাবেই কাজ করেন।

এঁরাই তো আমাদের ইতিহাস, আমাদের ঐতিহ্য। তাহলে কেন ঘটল পশ্চাদপসরণ? কোথা থেকে এল স্বামী-হোলটাইমার-স্ত্রী-চাকুরে এই ব্যবস্থা? সমগ্র বাম আন্দোলন জুড়ে? সিপিআই-সিপিএম তো বটেই, এমনকি নকশালপন্থীদের মধ্যেও কীভাবে ঘটতে শুরু করল এর ব্যাপক অনুশীলন? আর কীভাবেই বা নারীদের নির্দিষ্ট সমস্যা ও মুক্তির দিশা কেন্দ্রিক নারী সংগঠন পরিবর্তিত হল পার্টির অ্যাজেন্ডা তুলে ধরে পার্টির মুখপত্র হিসেবে কাজ করা ফ্রন্টাল অর্গানাইজেশনে?

পার্টিতে পুরুষ আধিপত্যের কথা বলতে গিয়ে কোন্ডাপল্লী কোটেশ্বরাম্মা তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন: “আমাদের পার্টি সমতার ধারণার সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। তারা আমাদের বলেছিল, একজন পুরুষ, একজন নারী বা একজন দলিত, সকলেই সমান। তারা আমাদের বাড়ি থেকে বার করে প্রকাশ্য ক্ষেত্রে নিয়ে এসেছিল। পার্টি নারীদের যে স্বাধীনতা দিয়েছিল, তার জন্যই আমরা যা করেছিলাম তা করতে পেরেছিলাম। কিন্তু যখনই মেয়েরা ছেলেদের কোনও কিছুতে ছাপিয়ে যেত তখনই মেইল শভিনিজম দেখা দিত। নির্দিষ্টভাবে কোনও বৈরিভাব বা দমন যে ছিল তা না, কিন্তু একটা অটোম্যাটিক প্রতিক্রিয়া। আসলে আমাদের পার্টির পুরুষরাও কি একই সমাজ থেকে আসেননি? তাই পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বের এই ধারণাগুলো যেতে সময় লাগবে। পার্টি বিশ্বাস করত, সমতা ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই এই ব্যাপারগুলো আপনা-আপনি চলে যাবে।”

পার্টির এই যে চিন্তার কথা কোটেশ্বরাম্মা উল্লেখ করেছেন, তা পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে সচেতন লড়াইয়ের ক্ষেত্রে দ্বান্দ্বিক চিন্তাপ্রক্রিয়ার বিপরীতে যান্ত্রিক চিন্তাপ্রক্রিয়াই শুধু নয়, এক বিরাট প্রতিবন্ধকতা। কোনও এক সুন্দর দিনে সমতা ভিত্তিক সমাজ তৈরি হয়ে গেল আর নারী-পুরুষ বৈষম্য অবলুপ্ত হয়ে গেল, এটা কোনও বৈজ্ঞানিক চিন্তা নয়। নারী-পুরুষ বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং সমতার লক্ষ্যে সচেতন লড়াই ছাড়া সমতা ভিত্তিক সমাজটাই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। রাশিয়াতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর তৈরি হয়েছিল জেনোৎদেল— রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির নারী-বিভাগ। জেনোৎদেলের কাজের দুটো দিক ছিল— বিপ্লবোত্তর রাশিয়ায় নারীদের নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট হওয়া এবং পার্টির মধ্যে নারীদের সমস্যাগুলোকে সামনে তুলে এনে সেই অনুযায়ী পার্টি ও সরকারের পলিসি ফ্রেম করানো।

আসলে নারী প্রশ্নটা যে একটা স্বতন্ত্র তত্ত্বগত প্রশ্ন, যার তত্ত্বগত এবং প্রায়োগিক সমাধানের কাজটা হাতে নেওয়া একটা অনিবার্য বিপ্লবী কাজ, এই সহজ সরল সত্যটার উপলব্ধি ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে অন্তত বড়ই কম। এঙ্গেলসের ‘পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি…’ তাই কখনোই মার্কসবাদ-লেনিনবাদের অন্যতম আকর গ্রন্থ হিসেবে গণ্য হল না; বেবেলের ‘উইমেন ইন দ্য পাস্ট, প্রেজেন্ট অ্যান্ড ফিউচার’ তো কোথায় হারিয়ে গেল!

মার্কসবাদ সাম্যের দর্শন। তাই নারী-পুরুষ সাম্যের বিষয়টা কমিউনিস্ট পার্টিতে অস্বীকার করা হয় না, বা করা যায় না। কিন্তু সাম্য মানে তো শুধু পুরুষের পাশে নারীকে জায়গা দেওয়া না — সেটা আবশ্যক, কিন্তু যথেষ্ট নয়। ঐতিহাসিক ভাবে পিছিয়ে রাখা অবস্থান থেকে, ঐতিহ্যগত বৈষম্য থেকে, অবহেলা-নিপীড়নের বিবিধ রূপ থেকে নারীকে মুক্ত করার দিশা যদি না থাকে, তাহলে নারী-পুরুষের সমানাধিকার সদিচ্ছার সীমানা টপকাতে পারে না।

স্ত্রী শক্তি সংগঠন দ্বারা প্রকাশিত ‘উই ওয়্যার মেকিং হিস্ট্রি’ বইটিতে তেলেঙ্গানার গণসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া নারীদের বয়ানে দুটো আপাত পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যায়: ১) পার্টি আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছিল, ২) পার্টি আমাদের ব্যবহার করেছিল।

এস. সুগুনাম্মা। ৯ বছর বয়সে পার্টির কার্যকলাপের সাথে পরিচিত হন এবং যোগ দেন। ১৪ বছর বয়সে তিনি রীতিমতো নির্ভরযোগ্য কুরিয়ার। ঘরবাড়ি ছেড়েছেন আগেই। পার্টির নানা ‘ডেন’-এ থাকেন। মেম্বারশিপের জন্য আবেদন করলেন। তখন ১৬ বছরের আগে পার্টিতে সদস্যপদ দেওয়া হত না। কিন্তু তাঁর কর্মকান্ডের জেরে তাঁর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। ‘উই ওয়র মেকিং হিস্ট্রি’-তে সুগুনাম্মা বলছেন, “বাড়িতে তাদের যে দুর্দশায় দিন কাটাতে হত, তা সহ্য না করতে পেরেই নারীরা প্রায়শ আন্দোলনে যোগ দেন। পার্টি বাকি দুনিয়াকে দেখাতে চাইত যে নারীরাও পার্টিতে আছে। তাই পার্টি ঘোষণা করত, বিয়েতে পণ নেওয়া চলবে না এবং সম্পত্তিতে নারীদের সমানাধিকার দিতে হবে। পার্টিতে নারীদের সমান চোখে দেখা হত। কিন্তু পার্টি কখনোই নারীদের সমস্যাকে রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত প্রশ্ন— যার আলোচনা ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন— সেই হিসেবে দেখত না। ব্যাপারটা ছিল অনেকটা আনুষ্ঠানিকতার মতো।”

বহু বছর বহু কমিউনিস্ট কর্মীর আন্ডারগ্রাউন্ড যাপনের পর যখন তেলেঙ্গানার সংগ্রাম প্রত্যাহৃত হল, পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠল, তখন বহু নারী কমরেডের মতোই সুগুনাম্মাকেও বাড়ি ফিরে যেতে বলা হল। কিন্তু একজন পুরুষের কাছে বাড়ি ফেরা আর একজন নারীর কাছে বাড়ি ফেরা কি কখনো এক হতে পারে? বিশেষ করে যে নারী বিদ্রোহী, বহু বছর অজানা আস্তানায় কাটিয়েছে, বহু মানুষের সঙ্গে মিশেছে, বহু ধরনের কাজে লিপ্ত থেকেছে, তার পক্ষে ‘বাড়ি ফিরে যাওয়া’ বিরাট বিপরীত যাত্রা ছাড়া আর কী?

সুগুনাম্মা বলছেন, “বাসবপুন্নিয়া আমাকে বললেন — ‘বোন, তুমি কী করতে চাও? আমাদেরই তো কোনও কাজ নেই! যাও, গিয়ে বাড়িতে থাকো।’ আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আমাদের এত দিন ব্যবহার করে এখন বলছে ‘বাড়ি গিয়ে থাকো’! বাড়ির অবস্থাটা কী সেটা ওরা কী করে বুঝবে? আমি ওদের বলবই বা কী করে? কী যন্ত্রণা! কী মানসিক নির্যাতন!”

সুগুনাম্মার মতো অভিজ্ঞতা আরও তেলেঙ্গানা সংগ্রামের, কমিউনিস্ট আন্দোলনের, বহু বহু নারী যোদ্ধার।

রেগাল্লা আছামাম্বা। ১০ বছর বয়সে বিয়ে এবং স্বামীর মাধ্যমে পার্টির সংস্পর্শে আসা। এরপর অকস্মাৎ স্বামীর গ্রেপ্তারি। রেগাল্লা পার্টিকে আঁকড়ে থাকলেন। সামান্যই লেখাপড়া জানতেন। পার্টি কিশোরী মেয়েটিকে পাঠাল একজন ডাক্তার পরিচালিত মেডিক্যাল ট্রেনিং ক্যাম্পে। সেই শিক্ষা রেগাল্লাকে পার্টির কাছে এবং গেরিলা যোদ্ধাদের কাছে অপরিহার্য করে তুলল। এরপর রেগাল্লার লাগাতার স্কোয়াড জীবন। ইঞ্জেকশন দিতে, সাধারণ অসুখ-বিসুখে ওষুধ দিতে, ক্ষত সেলাই করতে, তাঁর জুড়ি নেই। জঙ্গলে বাঘের আক্রমণে জখম কমরেড থেকে গুলিবিদ্ধ যোদ্ধা, তাঁর চিকিৎসার অভিজ্ঞতা অনেক নামজাদা ডাক্তারকেও হার মানাবে। তিনি এতটাই অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলেন যে যখন এক ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে যাতায়াত করতেন, তখন সঙ্গে দুজনকে দেওয়া হত তাঁর নিরাপত্তার জন্য। এহেন রেগাল্লা আছামাম্বাকে ‘চরিত্রহীনতার’ অভিযোগে অভিযুক্ত করে পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হল। কপর্দকশূন্য অবস্থায় জঙ্গলের ভেতর দিয়ে তিনি মাইলের পর মাইল হেঁটে যাচ্ছেন, পরণের শাড়ি শতচ্ছিন্ন, না আছে যাওয়ার জায়গা, না আছে কিছু। এই অবস্থায় জঙ্গলের মধ্যেই পার্টির আরেকটা ক্যাম্পে তিনি পৌঁছান। সেখানকার নেতৃত্ব তাঁর কথা শুনে, অন্য নেতাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে, তাঁকে পার্টিতে ফেরানোর ব্যবস্থা করেন। ঠিক হয়, তাঁর বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের কারণে প্রথম কয়েক সপ্তাহ তাঁকে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে, তারপর তাঁর আচরণ সন্তোষজনক হলে তাঁকে সদস্যপদ ফিরিয়ে দেওয়া হবে। যে নেতা তাঁর হয়ে সওয়াল করেন, তিনি বলেন, “ওকে তাড়ানো দুধেল গাইকে তাড়ানোর সামিল। ওর জায়গা কে নেবে? ওর কাজগুলো কে করবে?” যাইহোক, এসব ‘সম্মানজনক’ চিন্তাভাবনা থেকে রেগাল্লাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয় এবং তেলেঙ্গানা সংগ্রাম প্রত্যাহার হওয়া অবধি তিনি স্কোয়াডে স্কোয়াডে, জঙ্গলে জঙ্গলে, গ্রামে গ্রামে, শুধু কমরেডদেরই নয় সাধারণ মানুষেরও চিকিৎসা করে বেড়ান। তাঁর স্মৃতিচারণায় তিনি বলছেন, লড়াকু কোয়া উপজাতির মানুষদের মধ্যে একধরনের মারাত্মক ঘায়ের প্রকোপ দেখা দেয়। রেগাল্লা আবিষ্কার করেন যে পেনিসিলিন ইঞ্জেকশন আর একটা বিশেষ মলম ব্যবহার করলে সেই ঘা সেরে যাচ্ছে। এইভাবে তিনি কোয়াদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। সেই যে তাঁর স্বামী গ্রেপ্তার হয়েছিল, তারপর তার আর কোনও খবর নেই। পার্টি থেকে রেগাল্লাকে পরামর্শ দেওয়া হল আবার বিয়ে করে নিতে — একা মেয়ের ‘চরিত্র’ রক্ষা করা যে দুঃসহ কাজ। রেগাল্লা তাঁর নেতৃস্থানীয় মোহন রাওকে বিয়ে করলেন। সেই বিয়ে তাঁর কাজে তখনো কোনও বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি, কারণ তখন তেলেঙ্গানার সংগ্রাম জোরকদমে চলছে, রেগাল্লা সেই সংগ্রামে একজন অতীব প্রয়োজনীয় ব্যক্তিত্ব।

কিন্তু সংগ্রাম প্রত্যাহার হওয়ার পর? তাঁরা আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে বেরিয়ে এলেন। তাঁর স্বামী রাজনীতিতে থাকলেন আর রেগাল্লা সংসার সাগরে ভেসে গেলেন। যে জ্ঞান, যে অভিজ্ঞতা তিনি আহরণ করেছিলেন, যা হতে পারত অন্ধ্রের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল জুড়ে পার্টি বিস্তারের কাজে অমূল্য সম্পদ, তা বৃথা গেল। যে রেগাল্লার হাত ধরে গড়ে উঠতে পারত কমিউনিস্ট আদর্শে দীক্ষিত গ্রামীণ চিকিৎসাকর্মী বাহিনী, সেই রেগাল্লাকে (এবং নিশ্চিতভাবে তাঁর মতো আরও বহু নারীকে) পার্টি সংসারের ঘেরাটোপে ফেরত পাঠিয়ে দিল।

উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। একথা অনস্বীকার্য যে, তেলেঙ্গানা সংগ্রাম প্রত্যাহারের পর, কমিউনিস্ট পার্টি আইনি হওয়ার পর, যোদ্ধা মেয়েদের ঘরে ফিরে যাওয়ার ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটেছে, পার্টির নির্দেশে ঘটেছে। যোদ্ধা ছেলেদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে, কিন্তু ওই যে আগেই বললাম, ছেলেদের বাড়ি ফেরা আর মেয়েদের বাড়ি ফেরার মধ্যে আকাশপাতাল পার্থক্য আছে। প্রথমটার মানে, নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার অবসর, আর দ্বিতীয়টার মানে, দাসজীবনে প্রত্যাবর্তন। 

ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে এই সমস্যাটা শুরু থেকেই আছে। এম.এন রায়ের এভলিন ট্রেন্ট-রায়কে ছেঁটে ফেলার ঘটনায় — বিনা সমালোচনায়, বিনা বিরোধিতায় — আমি যাচ্ছি না, সে নিয়ে পরে লেখা যাবে’খন। কিন্তু বাস্তব হল, পার্টিতে মেয়েদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গিতে একটা কায়িক শ্রম-বৌদ্ধিক শ্রম বিভাজন বরাবর দেখা গেছে। লড়াই-আন্দোলন, মিছিল-মিটিংয়ে মেয়েদের আনা হয়েছে, রাখা হয়েছে। বহু সামাজিক বাধা, কুসংস্কার চূর্ণ করে, মুক্তির আস্বাদ দিয়ে, এই কাজটা করা হয়েছে। কিন্তু তারপর? যখন অবস্থাটা মুখোমুখি লড়াইয়ের নয়? যখন অবস্থাটা চিন্তাভাবনাগুলো সাজানোর, লড়াইটা গড়ে তোলার পৃষ্ঠভূমি রচনার? কাজটা যখন অনেকাংশে বৌদ্ধিক? সেই অবস্থায় মেয়েদের অংশগ্রহণ সম্পর্কে কী ভাবনা ছিল কমিউনিস্ট পার্টির?

কিছুটা আঁচ পাওয়া যায় মাল্লু স্বরাজ্যমের কথায়। পি. সুন্দরাইয়ার ‘তেলেঙ্গানা গণসংগ্রাম ও তার শিক্ষা’ বইটিতে যে নারী কর্মীদের উল্লেখ আছে, স্বরাজ্যম তার অন্যতম। বইটি প্রকাশ হয় সম্ভবত ৭০-এর দশকের গোড়ায়। সুন্দরাইয়া তাতে গর্ব করে স্বরাজ্যমের কথা লিখেছেন, যে তিনি এখন পার্টির (সিপিএমের) নালগোন্ডা জেলার গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের মধ্যে একজন, তাঁর স্বামী অন্ধ্র রাজ্য কমিটির সদস্য। ৭০-এর শেষ – ৮০-র শুরুতে স্বরাজ্যম দুবার এমএলএ নির্বাচিত হন। সুন্দরাইয়াই জানিয়েছেন যে স্বরাজ্যম ছিলেন অসাধারণ বাগ্মী এবং দক্ষ সংগঠক।

যেটা সুন্দরাইয়া বলেননি — বিষয়টি নিয়ে তিনি বা তাঁরা আদৌ চিন্তাভাবনা করেছেন কি না সন্দেহ — সেটা হল, এই স্বরাজ্যমকেই তেলেঙ্গানা সংগ্রামের শেষে সংসারে ফিরে যেতে হয়। তিনি লড়েছিলেন, পার্টিকে বলেছিলেন যে তিনি পার্টির হয়েই কাজ করতে চান। কিন্তু পার্টি সাফ জানায় যে স্বামী-স্ত্রী দুজনকে পূর্ণ সময়ের কর্মী হিসেবে রাখাটা সম্ভব নয়। এবং স্বাভাবিকভাবেই, স্বরাজ্যমকে স্বামীর জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে হয়। সংসার চালানোয় মনোনিবেশ করতে হয়। চীন-ভারত যুদ্ধের সময়, যখন কমিউনিস্টদের ব্যাপক ধরপাকড় চলছে, তখন পার্টি স্বরাজ্যমকে ডেকে নেয়, বলে — এই কঠিন সময় তোমায় এগিয়ে আসতেই হবে। স্বরাজ্যমও বিনা বাক্যব্যয়ে ছেড়ে-আসা জীবনে ফিরে যান। তাঁর কথায়, “আমি রাজনীতিতে যদি এতদিন টিঁকে থাকতে পেরে থাকি, সেটা কিন্তু অর্ধেক স্বরাজ্যম, গোটা স্বরাজ্যম নয়। আমার যতটুকু দেওয়ার ক্ষমতা ছিল, আমি কখনোই তার পুরোটা দিতে পারিনি। তার কারণ হচ্ছে, আমার পরিবার। পরিবারের দায়িত্ব কে নেবে?”

যখন মুখোমুখি সংঘর্ষ নয়, ধরে ধরে গড়ে তোলার পর্ব, তখন মেয়েদের কীভাবে কর্মহীন করে দেওয়া হয়, বা নিজের ‘ভাগ্যের’ হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, সে প্রসঙ্গে স্বরাজ্যমের ভাষ্য দিয়ে আজকের পরিচ্ছেদ শেষ করব। তেলেঙ্গানার সংগ্রাম শেষে, স্বরাজ্যম বলছেন, “মেয়েদের নিয়ে আমরা কী করব, এটা হয়ে দাঁড়ালো প্রশ্ন। যখন সংগ্রাম শেষ হয়ে গেল ওরা [পার্টি নেতৃত্ব] ঠিক করল অবিবাহিত মেয়েদের বিয়ে করে নেওয়া উচিত আর বিবাহিতাদের নিজেদের পরিবারে ফিরে যাওয়া উচিত। ছেলেরা আইন নিয়ে পড়তে পারে। আমাদের কোনও মতামতই ছিল না। ততদিন অবধি আমরা পরিবার করার কথা, বাচ্চা নেওয়ার কথা বা বাচ্চা মানুষ করার কথা ভাবিই নি। ওরা বলল আমাদের পক্ষে পার্টি কমান্ডার বা এরিয়া অর্গানাইজার হওয়া সম্ভব নয়। তাই ওরা আমাদের বলল ‘গুছিয়ে নিতে’ আর আমরা মর্মাহত হলাম। সংগ্রাম যেই মোড়টা নিল, সেখানে এটা ছিল একটা ভুল। সশস্ত্র সংগ্রাম রূপ বদলেছে। তাই ওরা আইনি আন্দোলনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যাডারবাহিনীকেই রাখল। কিন্তু সেই আন্দোলনটাই বা কী হবে, তখনও তো তার সিদ্ধান্ত বা রূপায়ণ কিছুই হয়নি। ওরা শুধু মেয়েদেরই ফিরে যেতে বলেনি, ছেলেদেরও ফিরে যাওয়ার বিকল্প দিয়েছিল। কিন্তু ছেলেদের পড়াশোনা করে সমাজে কাজ করার সুযোগ ছিল। মেয়েদের তো আর সেই সুযোগ ছিল না।” 

লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে দলে দলে মেয়ের ঘরে ফিরে আসা, ফিরে আসা নতুন কিছু গড়তে নয়, যে পুরনোকে প্রত্যাখ্যান করে যাওয়া হয়েছিল, সেই পুরনোর দাস হয়ে ফিরে আসা — এই বিপরীত যাত্রা গোটা কমিউনিস্ট আন্দোলনের কতটা ক্ষতি করেছিল, তাই নিয়ে কোনও পর্যালোচনা হয়েছে কি?

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *