“খাঁচায় পুরে দিলেও তো পাখি গাইতে পারে”- ফাদার স্ট্যান স্বামী এসজে

৮৩ বছরের এক জেসুইট পাদ্রী, যাকে রাষ্ট্র এতটাই ভয় পেয়েছিল যে কারারুদ্ধ করতে হয়েছিল। একজন পার্কিনসন রোগী, যাঁকে রাষ্ট্র এতই ভয় পেয়েছিল যে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসার সুবিধাও তাঁকে দিতে অস্বীকার করেছিল, নাকচ করেছিল তার জল খাওয়ার জন্য একটা সিপারের দাবি। এই অন্ধকার সময়ও যখন আমরা সবাই নিজের নিজেরটা গুছিয়ে নিয়ে স্বচ্ছন্দে থাকতে শিখে গেছি, তিনি আর পাঁচটা ধর্ম যাজকের মত জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারলেও, শুধুমাত্র দর্শক হয়ে থাকতে অস্বীকার করেছিলেন। এক নিরলস স্বর, যিনি এমনকি কারাগারে থেকেও তাঁর সহবন্দীদের সম্পর্কে লিখেছিলেন। লিখেছিলেন তাঁর নিজের গ্রেপ্তার এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশমাত্র। তিনি কারাগারের ফটকের উভয় পাশে সংহতির বার্তা লিখেছিলেন। খাঁচাবন্দী পাখির গানের কথা বলেছিলেন। তিনি এমন এক কণ্ঠ যাকে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র এতটাই ভয় পেয়েছিল যে চিরকালের জন্য চুপ করিয়ে দিল। পাথালগাড়ি আন্দোলনের অংশ নিয়েছিলেন আদিবাসী মানুষের অধিকারের জন্য। ছোটনাগপুর টেন্যান্সি অ্যাক্টকে সংকুচিত করে সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে প্রাকৃতিক সম্পদ বিক্রি করার যে ছক করেছে রাষ্ট্র, তা তিনি উন্মোচিত করেছিলেন। তিনি সেই কমরেড যিনি অন্যায়ভাবে বন্দী মানুষের অধিকার সম্পর্কে অক্লান্ত ভাবে সরব ছিলেন। উন্মোচন করেছিলেন আমাদের দেশের বন্দীদের জাত, ধর্ম, সামাজিক অবস্থানের নকশা। নগ্ন করেছিলেন সরকারের সাথে কর্পোরেটদের আঁতাত।  তিনি বিশ্বাস করতেন নিপীড়িতের শক্তিই পারে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার অন্ত ঘটাতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, যে জনমানুষ তাদের রক্ত ​​ও ঘাম দিয়ে এই দেশ গড়ে তুলেছেন, তাঁদের হাতেই ক্ষমতা থাকা উচিত। তিনি ঠিক সেই কথাগুলোই বলতেন, যেগুলি ফ্যাসিবাদীরা ভয় পায়।

একদিকে যখন মিথ্যা মামলা দিয়ে স্ট্যান স্বামীকে বন্দী করার ষড়যন্ত্র করছে ভারত রাষ্ট্র, সেই সময়ে স্ট্যান লিখছেন উত্তর থেকে দক্ষিণে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতার কথা, সতীর্থদের কাছে প্রান্তিক এই সমস্ত মানুষের পাশে থাকার আবেদন জানাচ্ছেন তিনি। সেই লেখার পাশাপাশি, স্ট্যান স্বামীর তালোজা জেল থেকে লেখা কয়েকটি চিঠির বাংলা তর্জমা আমরা প্রকাশ করছি, হয়তো সবগুলো ঠিক চিঠিও নয়, চিরকুট মাত্র। অসম্পূর্ণ, অগোছালো, অনেক ক্ষেত্রেই হয়তো একই কথার পুনরাবৃত্তি। তবুও পর পর সময়ানুক্রমে পড়লে এই চিঠিগুলোই সাক্ষী হয়ে ওঠে। কারাবন্দী জীবনের। কারারুদ্ধদের অন্ধ কুঠুরির মধ্যে আলো হাতরাবার মরিয়া চেষ্টার আখ্যানের। রাষ্ট্র নিপীরনের নিদারুণ চিত্রের। রাষ্ট্রীয় হিংসার দৈনন্দিনতার। খাঁচা বন্দীদের প্রতিরোধের দৈনন্দিনতার। রাষ্ট্র যাদের প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত নিঃশেষ করে দেওয়ার নীল নকশা বানাচ্ছে, সেখানে এই বেঁচে থাকার অদম্য তাড়না, এই যৌথ যাপনের সমবেত গান-ই হয়ে ওঠে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, প্রতিশোধ। তাই স্ট্যান স্বামীকে ভারতীয় রাষ্ট্র খুন করলেও স্ট্যান স্বামীরা মরে না। জেলে জেলে গড়ে ওঠে ব্যারিকেড। তালোজা থেকে আলিপুর দিকে দিকে বন্দীরা প্রতিবাদে অনশন করেন। স্ট্যান স্বামীর কথাই ধ্বনিত হতে থাকে ভার্নন গঞ্জালভেস , অরুণ ফেরেরা, সোমা সেন, ঠাকুরমণি মুর্মু, কল্পনা মাইতিদের স্বরে। তাই রাষ্ট্র তাঁকে হত্যা করলেও, তাঁর লড়াই জারি থাকে – এই ব্রাহ্মণ্যবাদী ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামে, জল জঙ্গল জমির জান কবুল লড়াইয়ে, নির্যাতিত বন্দীদের মুক্তির দাবিতে।

(১)

ফেব্রুয়ারি, ২০২০

আমাকে তাড়া করার ছ’মাস হতে চলল, তবুও অপরাজিত

২০১৯ সালের দ্বিতীয় ভাগের (জুলাই – ডিসেম্বর) অভিজ্ঞতা আমার কাছে একইসাথে কষ্টকর আর প্রশান্তির। ঝাড়খণ্ড পুলিশ আমার পিছনে লেগেছিল, আর আমি পুলিশের! তফাৎ শুধু এই ছিল যে আমি আইনসম্মত ভাবে কাজ করছিলাম, আর পুলিশ বেআইনি ভাবে। ‘গ্রেপ্তারি পরোয়ানা’ জারি করা (জুন), আমাকে ‘পলাতক’ ঘোষণা করা (অগাস্ট), আমার বাড়ি আর কর্মস্থলের তল্লাশি চালিয়ে আমার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করা (অক্টোবর) – নিম্ন আদালতের এইসমস্ত অর্ডার আর ঝাড়খণ্ড পুলিসের এই সমস্ত কাজকেই ঝাড়খণ্ড হাইকোর্ট বেআইনি ঘোষণা করেছে (ডিসেম্বর)। 

এই ছ’মাসের টালমাটাল অবস্থার মধ্যে আমি কী করছিলাম? আমি দক্ষিণের তিনটে রাজ্যে ছিলাম – তামিলনাড়ু, কেরল আর কর্ণাটক। ওখানকার শহরে, শহরতলিতে কিছুতেই উত্তরের তরুণদের এড়ানো যায়না। ওরা চলাফেরা করে, কাজ করে, অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করে। ওরাও স্থানীয় মানুষের সাথে কথা বলে না, স্থানীয় মানুষও ওদের সাথে কথা বলায় কোনও আগ্রহ দেখায় না। কেমন যেন একে অপরের ধারেকাছে না আসার আবহাওয়া। আমি এখানকার বেশ কিছু সমাজসচেতন মানুষ/ দল/ সংগঠন/ আন্দোলনের সাথে দেখা করলাম। উত্তর ভারত থেকে দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে আসা পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা আকাশছোঁয়া। কেরলে ৩৬ লাখ, তামিলনাড়ুতে ১০ লাখ, কর্ণাটকে এখনো গণনা চলছে। 

মূলত তরুণ এই সমস্ত মানুষ মধ্যভারত, বিহার বা উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন আদিবাসী অঞ্চলের বাসিন্দা। এরা এইসব রাজ্যে আসছে রোজগারের আশায়, যাতে এদের পরিবারের জন্য সংস্থান করতে পারে। নিজেদের রাজ্যে এরা রোজগারের কোনও ব্যবস্থা করতে পারেনি। কিন্তু এদের থাকা, বা কাজ করার পরিবেশ শোচনীয়। সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোই এরা করছে – রাস্তা তৈরি, ইমারত নির্মাণ, ফ্লাইওভার বানানো, মেট্রোর লাইন তৈরি। এদের মধ্যে বেশিরভাগই অসাধু শ্রমিক-ঠিকাদারদের খপ্পরে রয়েছে। এই ঠিকাদাররা এদের সামান্য রোজগারেও থাবা বসায়। 

কেরলের উদাহরণ বাদ দিলে, বাকি কোনওরাজ্যের সরকারই এই পরিযায়ী শ্রমিকদের শোষণ আর শোচনীয় অবস্থাকে ধর্তব্যের মধ্যে আনে না। আমি আমার বন্ধুদের বহু অনুরোধ করলাম যাতে তারা এদের অস্তিত্ব অগ্রাহ্য না করে। যাতে তারা পাশ কাটিয়ে চলে না গিয়ে এদের বসতিতে, এদের কাজের জায়গায় এদের সাথে দেখা করে। জিজ্ঞাসা করে ওরা সরকার নির্দিষ্ট ন্যূনতম মজুরি পাচ্ছে কিনা, ওদের নিরাপত্তা আছে কিনা। কোনও অসুবিধায় পড়লে যাতে ওরা নির্ধারিত সরকারী দপ্তরে যেতে পারে, তাতে সহায়তা করে। কম কথায় বললে, আমি চেষ্টা করছিলাম যাতে আমার বন্ধুরা ওদের দিকে মানবতার হাত বাড়িয়ে দেয়। 

আমার অন্তরে কী হল? প্রথমদিকে মনে হচ্ছিল আমি যেন এক ঘন কালো মেঘের মধ্যে ঢুকে পড়ছি। কোথায় যাব … কার সঙ্গে দেখা করবো … ওরা কি আমায় স্থান দেবে … আর যদি দেয়, তার জন্য ওদের কী বিরূপ প্রতিক্রিয়া সহ্য করতে হবে … এভাবে আর কতদিন পালাব আমি … ইত্যাদি। আরেকটা উদ্বেগ ছিল, যেসব মামলা আমার জেস্যুইট সহকর্মীরা আর আইনজীবীরা নিম্ন আদালত আর হাইকোর্টে লড়ছিলেন সেসব নিয়ে … কারা আমার হয়ে মামলা লড়বে … কতদিন ধরে চলবে মামলার শুনানি … কোর্ট আর আইনজীবীদের খরচা … আর সবশেষে, আমি আর আমার সহ-অভিযুক্তরা কি ন্যায় পাব … ইত্যাদি। 

আমার মধ্যে একটা স্থায়ী যন্ত্রণা বাসা বেঁধেছে। আমার কত সুবিধা – আমি যেখানেই যাই আমার এতজন চেনা-জানা মানুষ আছেন, আমি সুরক্ষিত আছি, রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা লড়তে পারছি, আইনি নিরাপত্তা পাচ্ছি। অন্যদিকে অসংখ্য মানুষ আছেন যাঁদের অন্যায়ভাবে বন্দী করে রাখা হয়েছে, আর তাঁরা জেলের মধ্যেই ক্রমশ অবসন্ন হচ্ছেন। তাঁদের জামিন করানোর মতোও কেউ নেই। আর যখন আমি ভীমা-কোরেগাঁও মামলার কথা ভাবি – যে মামলায় আমিও একজন ‘সন্দেহভাজন অভিযুক্ত’, কত বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, কবি, অধিকার-রক্ষা কর্মীরা এখনও জেলের ভিতরে। 

আমার জীবনে দেখা শ্রেষ্ঠ মানুষদের মধ্যে ওঁরা রয়েছেন। গরীব আর প্রান্তিক মানুষদের জন্য ওঁরা ওঁদের জীবনের বেশিরভাগ আর শ্রেষ্ঠ সময়কে নিয়োজিত করেছেন। এক বছরের বেশি সময় চলে গেছে, এখনো ওঁরা জামিনটুকুও পাননি। আমার হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যায়। ঝাড়খণ্ডে হাজার হাজার বিচারাধীন বন্দীর সহায়তায় আমার উদ্যম দ্বিগুণ করার মাধ্যমে আমি সান্ত্বনা খুঁজি। ওদের হয়ে ঝাড়খণ্ড হাইকোর্টে আমি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছি। 

দরজার কড়া নাড়া:

বিভিন্ন গণ সংগঠন এবং আন্দোলনের সমাজকর্মীদের সাথে আমার যা পরিচিতি ছিল, সেগুলোকেই নতুন করে ঝালিয়ে নিয়ে আমি তাঁদের দরজার কড়া নাড়তে শুরু করলাম। ওঁরা যে আমাকে সাদরে গ্রহণ করলেন শুধু তা-ই নয়, ওনারা নিজেদের বৃত্তের বাইরে গিয়ে সমাজসচেতন বিভিন্ন মানুষজন/ দল/ সংগঠনের সঙ্গেও যোগাযোগ করলেন। আমরা সবাই দেখা করলাম, ওঁদের স্থানীয় অঞ্চল, রাজ্য এবং সারা দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কেই আমাদের মত আদানপ্রদান করলাম। ঠিক কী পরিস্থিতিতে একজন পরিযায়ী শ্রমিক তাঁর বাড়িঘরের স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে দক্ষিণের মতো জায়গা – যেখানে সবকিছুই তাঁদের অপরিচিত, সেখানে আসতে বাধ্য হয়, এটা ওঁরা বুঝতে আগ্রহী ছিলেন। ওঁরা আমাকে এ বিষয়েও আশ্বস্ত করেন যে ওঁরা এই শ্রমিকদের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন। 

জেস্যুইট সম্প্রদায়ের যেসব মানুষজনের দরজায় আমি কড়া নেড়েছিলাম, তাঁরা আমাকে অতিথি বা আগন্তুক নয়, বরং সম্প্রদায়ের একজন হিসেবেই গ্রহণ করলেন। তাঁদের যা ছিল, সবই আমার সাথে ভাগ করে নিলেন। আমি যেসব মামলা লড়ছি সেসব মামলার অগ্রগতি, আর মধ্যভারতের মূলনিবাসী মানুষজনের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে তাঁরা খুবই আগ্রহী ছিলেন। যতজন জেস্যুইটের সাথে আমার আলাপ হয়েছে, সবাই আমায় সমর্থন জানিয়েছেন, আর আমার পরিস্থিতি সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। 

ডিসেম্বরের শেষে ঝাড়খণ্ড থেকে আনন্দের খবর পাই আমি আর আমার সঙ্গে অভিযুক্ত সহকর্মীরা। সাম্প্রদায়িক পার্টি হেরে গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দলগুলির ক্ষমতায় আসার পথ প্রশস্ত করেছে। শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মন্ত্রীসভার সর্বপ্রথম নির্দেশ ছিল, পাথালগড়ী আন্দোলনের সমস্ত মামলা প্রত্যাহার করার জন্য। আমাদের সবাই এই রায়ে খুব বড় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী আর মূলনিবাসী মানুষজনের কর্মকাণ্ড সারা দেশে প্রশংসিত হয়। এই আন্দোলনের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতা আর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ফিরে পাওয়া যায়। মূলনিবাসী আদিবাসীরা তাঁদের নিজস্ব শান্ত, দৃঢ় প্রত্যয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সারা দেশের মানুষকে পথ দেখাবেন – এই আমার বিশ্বাস। 

“শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হবে।” আচ্ছা, কিন্তু কতদিন পরে? ঝাড়খণ্ডে আমার জেস্যুইট সহকর্মী আর আইনজীবীরা জেলা আদালত আর হাইকোর্টে মামলার সমস্ত ক্রমবিকাশ সম্পর্কে আমাকে জানাচ্ছিলেন। রাজ্যের প্রধান সরকারী উকিল সর্বসমক্ষে আদালতের কাছে আমার বিরুদ্ধে প্রথাগতভাবে যে ধরনের অভিযোগ দায়ের করেছেন, তাতে আমি খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম, বা এখনও পাচ্ছি। 

আমি নাকি একজন ‘ভয়াবহ দুষ্কৃতী’ … আমি পাথালগড়ী আন্দোলনের পিছনে থাকা ‘মাস্টারমাইন্ড’, যে সুপরিকল্পিতভাবে ‘গরীব অজ্ঞ আদিবাসীদের’ (অভিযোগের বয়ান থেকে উদ্ধৃত) রাষ্ট্রবিরোধী হিংসাত্মক পথ অবলম্বন করতে উস্কানি দিয়েছি। এই হিংসাত্মক উপায়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, ফলে আমি ‘দেশদ্রোহ’-এর অভিযোগে অভিযুক্ত। দুটো ঘটনাই মাওবাদী যোগসাজশের ফলেই হয়েছে, এই জাতীয় ইঙ্গিত দিয়ে তিনি পাথালগড়ী আন্দোলনের সাথে ভীমা-কোরেগাঁও মামলাকে যুক্ত করতে চান। আমার সামান্য সান্ত্বনা এটাই যে, আমার আইনজীবীরা এই সমস্ত অভিযোগের বিরুদ্ধেই যথাযথ প্রত্যুত্তর দেন। 

সুড়ঙ্গের শেষে যেন আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে! নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন – সিএএ, এনআরসি, এনপিআর-এঁর বিরুদ্ধে প্রতিরোধী আন্দোলনগুলিতে সারা দেশে এক নতুন গণ অভ্যুত্থান দেখতে পাচ্ছি আমরা। সমস্ত বয়স, ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী, অঞ্চল নির্বিশেষে মানুষের ঢল নামছে রাস্তাঘাটে। খুব স্পষ্ট স্বরে মানুষ জানান দিচ্ছেন তাঁরা আমাদের সংবিধান, ধর্মনিরপেক্ষতা আর গণতন্ত্রের পক্ষে থাকবেন।

রাষ্ট্রের বিবেকে যেন ঘা দেওয়া হয়েছে। আমরা যেন আশা রাখতে পারি যে, বিবেকের এই জেগে ওঠা  জীবনের বাকি পরিসরগুলোতেও ছড়িয়ে যাবে। যেন ক্ষমতাবান উচ্চপদস্থ ব্যক্তি, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী – কেউই তাঁদের বিবেকের আওয়াজ শুনতে পিছপা না হন। আমরা তো আশাতেই বাঁচি। 

ফাদার স্ট্যান স্বামী এসজে।

 

(২)

নভেম্বর, ২০২০

বন্ধুরা,

শান্তি! আমার কাছে যদিও সমস্ত খুঁটিনাটি তথ্য নেই, তবুও যতটুকু জানতে পেরেছি, পাশে থাকার জন্য আমি তোমাদের সবার কাছে কৃতজ্ঞ। ১৩ ফুট বাই ৮ ফুটের একটা কামরায় আমার জায়গা হয়েছে, আরো দুজন বন্দীর সাথে। এটায় একটা ছোট বাথরুম আছে, আছে একটা ইন্ডিয়ান কমোড। ভাগ্যক্রমে আমাকে একটা ওয়েস্টার্ন চেয়ার দেওয়া হয়েছে সেই কমোড ব্যবহারের জন্য।

ভারভারা রাও, ভার্নন গঞ্জালভেস আর অরুণ ফেরেরা আরেকটা কামরায় আছে। সকালবেলা কামরা আর ব্যারাকের দরজা খুলে দেওয়া হলে আমাদের দেখা হয়। বিকেল ৫.৩০ থেকে সকাল ৬টা, আর দুপুর ১২টা থেকে ৩টে আমি আমার জেলের কামরায় বাকি দুজনের সাথে বন্দী থাকি। অরুণ আমাকে সকালে ব্রেকফাস্ট আর দুপুরে লাঞ্চ খেতে সাহায্য করে। ভার্নন স্নান করতে সাহায্য করে। আমার কামরার বাকি দুজন সাথী রাতের খাবার খেতে সাহায্য করে, জামাকাপড় কাচতে সাহায্য করে, আমার হাঁটু মালিশ করতে সাহায্য করে। ওরা দুজন খুবই দরিদ্র পরিবারের। 

তোমাদের প্রার্থনায় বাকি বন্দীদের আর আমার সাথীদের মনে রেখো। 

সমস্ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, তালোজা জেলে মানবতা টগবগ করছে। 

ফাদার স্ট্যান স্বামী এসজে।

(৩)

নভেম্বর, ২০২০

বন্ধুরা, 

তোমরা এতজনে মিলে আমায় আর আমার সহ-অভিযুক্তকে সমর্থন জানিয়েছ – তোমাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। আমি তোমাদের কাছে খুবই কৃতজ্ঞ। 

জেল কর্তৃপক্ষ ব্রেকফাস্ট, চা, দুধ আর রাতের খাবার দেয়। এর বাইরের অন্যান্য খাবার মাসে দুবার জেলের ক্যান্টিন থেকে কিনতে হয়। খবরের কাগজ, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, খাতা-বই-পেন আর বাকি সমস্ত অত্যাবশ্যকীয় জিনিসপত্র জেল ক্যান্টিন থেকে কিনতে হয়। 

আমার প্রয়োজন খুবই সীমিত। আদিবাসীরা আর যীশুর সমাজ আমাকে সাধারণ জীবন যাপন করতে শিখিয়েছে। আমার জল আর চা খাওয়ার সুবিধার জন্য আমি একটা সিপার গ্লাস সঙ্গে এনেছিলাম। কিন্তু ৯ অক্টোবর জেলে ঢোকার সময় সেটাও বাজেয়াপ্ত করা হয়। 

এখন আমি জেল হাসপাতাল থেকে কেনা বাচ্চাদের একটা সিপার মগ ব্যবহার করছি। আমাদের আইনজীবীদের এটা আমি জানিয়েছি। এখনো একটা সিপার গ্লাসের অপেক্ষায় আছি আমি। 

ভারাভারা রাও খুবই অসুস্থ। ওঁর জন্য প্রার্থনা করো। তালোজার ভিতরে গরীব বন্দীদের জীবনের কথা শুনতে পাওয়াই আমার কাছে এখন আনন্দের। ওদের যন্ত্রণায় আর হাসিতে আমি ভগবানকে দেখতে পাই। 

ফাদার স্ট্যান স্বামী এসজে।

(৪)

জানুয়ারি, ২০২১

কারারুদ্ধ হওয়ার ১০০তম দিনে লেখা

প্রথমেই জানাই, গত ১০০ দিন ধরে গরাদের ওপার থেকে যে পরিমাণ ভালোবাসা, সমর্থন পেয়েছি তাতে আমি অভিভূত। জেলে যখন অনিশ্চয়তাই একমাত্র নিশ্চয়তা হয়ে ওঠে, এই সমস্ত সংহতির বার্তাই শক্তি ও সাহস যোগায়। এখানে জীবন ভীষণভাবেই প্রাত্যহিক। অন্যান্য বিচারাধীন বন্দীদের দুরবস্থাও শক্তি যোগায় লড়াই জারি রাখার। তারা বেশিরভাগই সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে থাকা সম্প্রদায়ের মানুষ। অনেকেই জানেন না তাদের বিরুদ্ধে ঠিক কিসের অভিযোগ। অনেকেই নিজেদের চার্জশিটও দেখেননি। শুধু বছরের পর বছর জেলে রয়েছেন আইনি সাহায্যের অভাবে। অবশ্য ধনী হোক বা গরীব, সমস্ত বিচারাধীন বন্দীরই অবস্থা শোচনীয়, কোনমতে টিঁকে আছে। তাই যতই অন্ধকারাচ্ছন্ন সময় হোক না কেন এক বন্ধুত্বের, ভাতৃত্বের গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। একে অপরের পাশে থাকার সম্পর্ক যা হয়তো সঙ্কটকালেই গড়ে ওঠে। এই যে আমরা ১৬জন সহঅভিযুক্ত বিভিন্ন জেলে বন্দী, বা হয়তো একই জেলের ভিন্ন বৃত্তে আটকা, একে অপরের সাথে দেখা হয়তো বা সম্ভব নয়, তবুও আমরা একসাথে গান গাই। তবুও আমরা সমবেত গান গেয়ে যাব। খাঁচায় পুরে দিলেও তো পাখি গাইতে পারে। 

ফাদার স্ট্যান স্বামী এসজে।

শেয়ার করুন

1 thought on ““খাঁচায় পুরে দিলেও তো পাখি গাইতে পারে”- ফাদার স্ট্যান স্বামী এসজে”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *