পোষ্য

রত্নদীপের সরু সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সুখময় পাল এক তীব্র আকর্ষণ বোধ করলেন তাঁর দেহের প্রতিটা অণুতে, পরমাণুতে। এই অপরূপ টান বোধ করা মাত্র সিঁড়ির দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেল তাঁর। কোনোক্রমে ঘাড় ঘুরিয়ে সিঁড়ির উপরের ধাপগুলোর দিকে তাকালেন। দেখলেন, খয়েরি প্যান্ট আর ঘিয়ে শার্ট পরে, সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছেন তরুন সাহা। তাঁর হাতের হলুদ প্লাস্টিকের কেজো ব্যাগও সাথে সাথে উঠে যাচ্ছে রত্নদীপের সিঁড়ি বেয়ে। বিবশ সুখময়ের শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হতে কিছু সময় নিল। ধীরে ধীরে পরাজিত সৈনিকের মতো সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে থাকলেন তিনি। প্রতি পদক্ষেপে মনে হল, তাঁর গা থেকে তিনি নিজেই ঝরে ঝরে পড়ছেন। 

বাড়ি ফিরে সুলেখাকে বাজারের ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে চুপ করে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা দিয়ে দিলেন সুখময়। মে মাসের ফ্যান সুখময়ের কপালের ঘাম চাটছে। চোখ থেকে চশমা খুলে রেখে অতি দ্রুত সুখময় বিছানায় ডানপাশ ফিরে শুলেন। তারপর নিজেকে নিজের দুই ঊরুর মাঝে পাকড়াও করলেন। 

একটা বিড়াল আসতো মাঝে মাঝে বাড়িতে। মা এঁটো কাঁটা খেতে দিত। নামকরণের সু্যোগ দেওয়ার আগেই, নির্বিবাদে খেয়ে লাফ দিয়ে পাঁচিলে উঠে যেত। সুখময় তখন মাত্র দশ। ছাদটা ন্যাড়া ছিল। রাস্তাঘাট ছিল অনেক চওড়া। দোকানপাট বড় রমরমা। রাস্তার ধারের গাছগুলোকে বেশি মহান বলে মনে হত। পুকুরগুলোকে অতিরিক্ত প্রাচীন। আকাশটা অনেকখানি দরাজ। দেওয়ালের কোথায় কেমন চিঁড় ধরেছে মুখস্থ ছিল। কোন ঘরের কোন দেরাজ খুললে কেমন গন্ধ পাওয়া যায় জানাশোনা ছিল। চারপাশে লুকোছাপা অনেক বেশি ছিল। বড়রা সবকথা তাঁর সামনে আলোচনা করতেন না। রাতের বেলা কারেন্ট চলে গেলে কতসব ছায়া ঘুলঘুলি, দরজার কোণা, খাটের তলা, আলমারির পিছন থেকে বেরিয়ে এসে মোমের আলোয় সিলিঙ জুড়ে নড়াচড়া করতেন। সেসব দিনে সুখময় মাঝে মাঝে বিড়ালটার পিছু নিতেন। পাঁচিলের আলপথ বেয়ে বিড়ালটা আশপাশের বাড়ির মধ্যে যাতায়াত করতো। মাঝে মাঝে কার্নিশে উঠে বীতস্পৃহ হয়ে রোদ পোহাত। সুখময় খেলতে খেলতে আড়চোখে দেখতে পেতেন- বিড়াল হাই তুলছে, গলা চুলকাচ্ছে, পেট চাটছে নিজের, অথবা হাত পা ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছে। বিড়ালটা ঘুম শেষে মাঝে মাঝে ডানদিকে পাশ ফিরে শুতো। সুখময়ের খেলা থেমে যেত তখন। বিড়ালটা এরপর পায়ে পা লাগিয়ে অল্প অল্প কেঁপে কেঁপে উঠত। সুখময় হাঁ করে তখন বিড়াল গিলতেন। নারকেল গাছের ডাল আর ডালের ছায়া হাওয়ায় নড়ে উঠত। কাদের বাড়ির রান্নাঘরে স্টিলের বাসন ঝন ঝন করে পড়ে যেত মেঝেতে। আর ঝগড়া বাঁধত কোথাও। বিড়ালটা তখন উঠে দাঁড়িয়ে উটের মতো পিঠ তৈরি করে গা ঝাড়ত আর লাফ দিয়ে সুখময়ের নজরের আড়ালে চলে যেত। বিড়াল চলে যেতে সুখময় টের পেতেন তাঁর পায়ে পা জড়িয়ে গেছে। তিনি অনড়।

চল্লিশ বছর পর নিজের বিছানায় ডানদিকে পাশ ফিরে শুয়ে সুখময় নিজেকে দুই ঊরুর মাঝে পাকড়াও করে কেঁপে কেঁপে কেঁপে কেঁপে উঠলেন। আর রত্নদীপের সিঁড়ির দেওয়ালে তাঁর পিঠ একদম ঠেকে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে তিনি কোনোক্রমে দেখতে পেলেন হলুদ রঙের কেজো প্লাস্টিক ব্যাগ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে।

সুলেখা এই সময় এক ফাঁকে এসে দরজায় টোকা মারলেন, “কী গো, শরীর খারাপ লাগছে?”

ঘরঘরে গলায় সুখময় জবাব দিলেন, “না”

“দুপুরে মাছ খাবে না ডিম?”

“ডিম”

দরজার নিচে চোখ রাখতে বুঝলেন উত্তর শুনে সুলেখা সরে গেছেন।

সুখময় উঠে বসলেন। মে মাসের ফ্যান তাঁর সারা শরীরের ঘাম চাটছে আবার। এখনো যেন তাঁর নাভি ধরে তাঁকে টেনে ধরে আছে কেউ। দরজা খুলে সুলেখার নজর বাঁচিয়ে চটজলদি লুঙ্গি, গামছা সমেত কলঘরে পালালেন সুখময়। জল ছেড়ে দিয়ে জামা প্যান্ট খুলে দাঁড়ালেন অন্ধকার কলঘরে। এখানে কোনো লুকোছাপা নেই। তাই অন্ধকারে জ্বলে উঠল তরুন সাহার রত্নদীপের রোগা সিঁড়ি বেয়ে ব্যবসায়ী গতিতে উপরে উঠে যাওয়া। অন্ধকারে এখন আরও স্পষ্ট তরুন সাহার হাতের কেজো প্লাস্টিক। হলুদ জামা। খয়েরি প্যান্ট। সুখময় পাল নিজের উদরে হাত রাখলেন। তাঁর পেটের ভিতর বিড়াল একটা পাক খেয়ে শুলো। পায়ে পা জড়িয়ে গেল আবার। সুখময় অনড় ত্রিভঙ্গমুরারি হয়ে রইলেন ক্ষণকাল। সুখময় বিড়ালকে জিইয়ে রেখে চান সারলেন। বিড়াল সমেত হাঁসের ডিমের ঝাল, ভাত দিয়ে মেখে মেখে খেলেন। বিড়াল সমেত শনিবার দুপুরের রেডিওর নাটক শুনে বিড়াল সমেত নিদ্রা গেলেন। 

ভর সন্ধ্যায় ঘুম ভেঙে উঠে হঠাৎ সবকিছু শূন্য মনে হল সুখময়ের। থিতু হতে ভাবলেন, বিড়াল কি এইফাঁকে একেবারে পালিয়ে গেছে? ভিতর হাতড়ে হাতড়ে সুখময় যখন বিড়ালের ছিটেফোঁটাও খুঁজে পেলেন না, তখন চোখ বুজে বলপূর্বক আবার ফিরে যেতে চাইলেন রত্নদীপের সিঁড়িতে, অনুভব করতে চাইলেন সেই টান, যা তাকে বিবশ করে দিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়। চোখ বুজে সুখময় আগের চেয়েও উজ্জ্বল দেখলেন হলদে প্লাস্টিক, দেখলেন হলদেটে জামা আর খয়েরি প্যান্ট পরে তরুনের উপরে উঠে যাওয়া। কিন্তু কোথাও কোনো টান নেই। বিবশতা নেই। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া নেই। বিড়ালও আর নেই। বিড়াল, নাম দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে, ফের পালিয়েছে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *