গ্রীষ্ম, ২০১০

গল্পটি কাশ্মীরি গল্প লেখক ও গবেষক ফিরোজ রাঠের-এর The Night of Broken Glass গল্প সংকলন থেকে নেওয়া। নিজের লেখা সম্পর্কে ফিরোজ বলেন, “Writing is remembrance. Writing is mourning. Writing is composing endless inventories of grief.” ফিরোজ বলেন, একজন কাশ্মীরি কাশ্মীর থেকে যত দূরেই থাকুক না কেন, স্বাধীনতার আকঙ্ক্ষার স্মৃতি থেকে যায়। যন্ত্রণা থেকে যায়। অন্ধকার থেকে যায়। ক্ষত থেকে যায় আর থেকে যায় সেই ভাঙা ধারালো কাচের টুকরোটা। ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্প সংকলন The Night of Broken Glass। ১৩টি আপাতবিচ্ছিন্ন ছোট গল্পের এই সংকলনের গল্পগুলো একে অন্যের সাথে একই সুতোয়ে গাঁথা। এক গল্পের চরিত্র ঢুকে পড়ে অন্য গল্পে। একটি গল্পের পার্শ্বচরিত্র হয়ে ওঠে অন্য গল্পের প্রোটাগনিস্ট। পাশাপাশিই গল্পগুলোর যোগসূত্র রক্তাক্ত প্রতিরোধী কাশ্মীর। দখলদার রাষ্ট্রের অত্যাচার, নিপীড়ন যে কাশ্মীরের রোজনামচা। ফিরোজ তাঁঁর গল্পে, কাশ্মীর সম্পর্কে ভারতের মূল ভূখণ্ডের তৈরি করা স্টিরিওটাইপ ভাঙতে চান, তুলে ধরতে চান রক্ত মাংসের কাশ্মীরি মানুষদের; লেখেন তাদের হাসি-কান্না, আদর-ভালবাসা, প্রেম-বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা আর প্রতিরোধের আখ্যান।   

সেদিন বিকেলবেলা, নাগিন গেছিল ওষুধ কিনতে। প্রথম গুলির শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে দোকানের কাঠের কাউন্টারের পিছনে গুঁড়ি মেরে মাটিতে বসে পড়ে সে। গুলির ঝড় আছড়ে পড়তে থাকে পিছনের দেওয়ালে, দোকানের তাকে সার দিয়ে রাখা গাঢ় রঙের সিরাপের বোতলগুলি চুরচুর হয়ে ভেঙে পড়ে মাটিতে; নাগিনের পিছনের দিকের দেওয়ালের ইঁট আর কাঠের তাক ভেদ করে ঢুকে আসে গুলি। মুহূর্তে অসাড় হয়ে যাওয়া নাগিন সেনার বুটের টহলের শব্দ শুনতে পায় আর শোনে স্থানীয়দের ভয়ার্ত হুড়োহুড়ি। তার অসুস্থ স্বামী তখন শুয়ে তাদের ছোট্ট, সাধারণ বাড়িতে। বাজার থেকে সরু কাঁচা রাস্তা গিয়ে পড়ে হাইওয়েতে, সেখান থেকে যেতে হয় পামপোর শহরের পূর্ব প্রান্তের সেই বাড়িতে। নাগিন মধ্যবয়স্কা, ধীরস্থির, শান্ত সুন্দর। একজন দায়িত্বশীল স্ত্রী। কিন্তু সেইদিন নিজেকে দুর্ভাগা মনে হয় নাগিনের, মনে হয় এই মারদাঙ্গার মধ্যে থেকে আজ আর সে বেঁচে ফিরবে না। ভয় হয় নাগিনের, প্রাণের ভয়। মনে হয়, যদি সে গুলি লেগে মরে যায়, রহমানকে কে দেখবে? 

রাস্তায় ছেলেদের পা ঠোকার শব্দ শোনা যায়, শোনা যায় তাদের স্লোগান ‘Go India go back, go India go back’, বন্দুকবাজ ট্রিগার-হ্যাপি সেনাদের সঙ্গে তাদের ধাক্কাধাক্কি ও সেনাদের দিকে তাদের পাথর ছোঁড়ার শব্দ কানে আসে। স্বাধীনতা, আজাদির এই কোলাহলের মধ্যেই, দোকানের কম্পাউন্ডার সাজেহ্-র সাহসী ছেলে ইনাম শাটার নামিয়ে খরিদ্দারের পাশেই মাটিতে বসে পড়ে। ইনাম তখন স্থির কিন্তু সতর্ক। ভয়ে নাগিনের দম বন্ধ হয়ে আসে। 

বিক্ষোভ ক্রমশ দূরে চলে গেলে কোলাহল থেমে আসে, ইনাম একটা দেশলাই জ্বালিয়ে ফিসফিস করে নাগিনকে বলে, দোকানের পিছনে একটা খিড়কির দরজা আছে, সেখান দিয়ে সে নাগিনকে বের করে দিতে পারে। নাগিনকে বলে মাথা নিচু রাখতে, কে জানে সেনারা হয়তো এখনও বাইরেই আছে, দেখা মাত্র গুলি করার অপেক্ষায়।

নাগিন আর ইনাম বেরিয়ে আসে, ইনাম তাকে কবরখানার মধ্যে দিয়ে রাস্তা দেখিয়ে মসজিদের সামনের লম্বা দালানে পৌঁছে দেয়। আর ঠিক তখনই, রাস্তার দিক থেকে চিৎকারের শব্দ ভেসে আসে, সেদিকে ছুট লাগায় ইনাম। 

নাগিন বাড়ি ফেরে, দেখে রহমান বারান্দায় দাঁড়িয়ে। ‘গুলির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল, ভয় পেয়ে গেছিলাম,’ কাঁপা কাঁপা গলায় বলে রহমান। মুখ ফ্যাকাশে, হাত কাঁপছে। ‘বাজারে কী হয়েছে?’

নাগিনের মন কু ডাকছিল, কিন্তু বিস্তারিত কিছু সে তখনও জানে না। 

‘হয়েছে কিছু একটা,’ হালকাভাবে বলে রহমানকে বৈঠকখানায় নিয়ে যায় নাগিন। কম্বলটা ঝেড়ে পরিপাটি করে ভাঁজ করে, তারপর রহমনকে শুইয়ে দেয় তোশকের ওপর। পকেট থেকে প্যারাসিটামলের স্ট্রিপটা বের করে দুটো ট্যাবলেট খাইয়ে রহমানকে বিশ্রাম নিতে বলে। 

বাকি দিনটা নাগিন রান্নাবান্নায় ব্যস্ত থাকে। অন্ধকার নামতে শুরু করলে রহমান ঘুমিয়ে পড়ে; নাগিন বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। একটা কুশনে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিয়ে ভাবে ইনাম গেল কোথায়! একই উঠোনের দুইদিকে তাদের বাড়ি। সাজেহ্-কে আজকের ঘটনার কথা বলেছে নাগিন, কিন্তু এখন খানিক দায়িত্বজ্ঞানহীনই মনে হয় নিজেকে; তার যদি ওরকম ভয় পেয়ে বোধবুদ্ধি লোপ না পেত তাহলে সে ঠিকই ইনামকে জোর করে তার সঙ্গে বাড়ি নিয়ে আসত। পশ্চিমে যেখানে রাস্তাটা বাঁক নিয়েছে সেইদিকে তাকায় নাগিন। লম্বা লম্বা বাড়ির ভিড়ে নেমে আসা আঁধারের মধ্যে বাড়ির চালগুলির কালো হয়ে আসা তেরছা ছায়ামূর্তি দেখা যায়।

কিছুক্ষণ পর ইনাম ফেরে। সাজেহ্ রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দালানে এসে দাঁড়ায়।

‘কোথায় ছিলি এতক্ষণ? ক’টা গুলি খেয়ে এসেছিস?’ ইনামকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মৃদু গলায় অনুযোগ করে সাজেহ্। ইনাম এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে, তখনই মায়ের কাছে ফিরে না আসায় নিজের দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় খানিক অনুতপ্ত মনে হয় তাকে।   

কিন্তু কথা বলতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই রাগে ফেটে পড়ে ইনাম। নাগিন শুনতে পায় সে বলছে, হাইওয়ের উল্টো পাড়ের বাড়ির চারটে ছেলে, ইনামের খুবই পরিচিত, একসঙ্গে তারা ক্রিকেটও খেলেছে কখনও সখনও গুলি খেয়েছে, মাথায়, কাঁধে। তিনজন সঙ্গে সঙ্গে মারা গেছে, আরেকজনকে শ্রীনগর নিয়ে গেছিল, খানিক আগে রেডিও কাশ্মীরের খবরে বলেছে, হাসপাতালে পৌঁছনোর পর সে মারা গেছে।    

—————————————————————–

১৯৯১ সালে ডিসেম্বর-এর এক শীতের রাতে, রহমানের বুকে মাথা রেখে বৈঠকখানায় শুয়ে ছিল নাগিন। ভোর হওয়ার আগেই রহমান উঠে রান্নাঘরে যায়। জানলার তাকে রাখা লন্ঠন জ্বালিয়ে এসে নাগিনের পাশে বিছানায় বসে।  

ঝুঁকে পড়ে নাগিনের কানে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘দোকানের যাওয়ার সময় হল তো।’

নাগিন পাশ ফেরে, চোখ বোজা। রহমান তাকে ছাড়াই দোকানে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে শুনতে পেয়ে হাত বাড়িয়ে রহমানকে বিছানায় টেনে নিয়ে তার মাথাটা নিজের বুকে গুঁজে দেয়। ‘আহ! দেরি হয়ে যাবে তো,’ রহমান  মৃদু প্রতিবাদ জানায়। নাগিন আপত্তিকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে রহমানের লোমে ভরা কাঁধে আঙুল বোলাতে থাকে। রহমান লম্বা চওড়া বলিষ্ঠ পুরুষ, তার পেশিবহুল কাঠুরের হাতের ছোঁয়ার অনুভূতি ভাল লাগে নাগিনের। রহমান তাকে চেপে ধরে কোমরে কাতুকুতু দেয়। নাগিনকে হাসিয়ে বিছানা ছাড়তে বাধ্য করে রহমান। 

ভোরের মৃদু কুয়াশায় ধুলো পথ ধরে হেঁটে যায় দুজন। রহমান এক কাঁধে মালবেরি গাছের গুঁড়ি, আর অন্য হাতে কুঠারটা দোলাতে দোলাতে ইচ্ছে করেই লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটে। নাগিন লন্ঠন ধরে থাকে। বাড়িঘরদোর আর দল বেঁধে গুটিশুটি মেরে ঘুমনো কুকুরদের পেরিয়ে হেঁটে যায় ওরা। দুটো বাড়ির মাঝের ফাঁক দিয়ে লন্ঠনের আলো গিয়ে পড়ে রাস্তার পাশের খোলা জায়গায়। জাফরান গাছগুলো ফুলে ভরে গেছে, হলুদ আলোয়ে ঝলমল করে ওঠে ফুলগুলো। 

বাজার চকে পৌঁছে জায়গাটা কেমন অদ্ভুত ফাঁকা লাগে, থমথমে চারদিক। হাইওয়ের পাশে সার সার শাটার নামানো দোকানের মধ্যে নিজেদের দোকানের সামনে গিয়ে মোটা লম্বা গাছের গুঁড়িটা নামিয়ে রাখে রহমান। কুঠারটা মাথার ওপর তুলে চারদিকে একবার চোখ চালিয়ে নেয়। ভোর রাত থেকেই সেনার কনভয় শুরু হয় এবং প্রায় ঘন্টাখানেক চলে। সেনারা সাধারণত দাঁড়ায় না, কিন্তু যখন ল্যান্ডমাইন খোঁজার জন্য কুকুরগুলোকে ছেড়ে দেয়, সেই সময়ে রাস্তায় লোকজনকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলে। কিন্তু সেদিন, তিনটে মাত্র সাদা জিপকে বাজারের মধ্যে দিয়ে ভয়ানক গতিতে সশব্দে ছুটে যেতে দেখে ওরা।

হাইওয়ে ফাঁকা থাকলেও, রহমানকে অন্যমনস্ক লাগে। কুঠারটা তুলে সজোরে বাড়ি মারে গুঁড়িটায়, গুঁড়িটা নড়বড় করে পড়ে যায়। নাগিন হাসে, গুঁড়িটা তুলতে সাহায্য করে রহমানকে, তারপর লণ্ঠনটা কাছে এনে ধরে। 

‘বিসমিল্লাহ্-র নাম করো… উল্টোবে না আর,’ সে বলে।  

কুঠারের হাতলটা চেপে ধরে হাসে রহমান। শক্ত নিয়ন্ত্রণে কুঠারের ধারটা এক কোপে একদম ঠিক খাঁজের মাঝখানে মারে। শব্দ করে দু টুকরো হয়ে যায় গুঁড়িটা। আলি মহম্মদ ফজরের নামাজের জন্য ডাক শুরু না করে দিলে হাততালিই দিয়ে উঠতো নাগিন। 

তেলকালিতে কালো হয়ে যাওয়া মাটির দেওয়ালের দোকান ঘরের এক কোণায়, তন্দুর উনুনের ধারে একটা চ্যাপ্টা কাঠের টেবিলের পাশে বসে নাগিন। টেবিলের ওপর একটা গোল অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে ময়দা মেখে রাখা। রহমান লন্ঠন থেকে কেরোসিন ছড়িয়ে দেয় কাঠের টুকরোগুলোতে, তন্দুরের ভেতর ছুঁড়ে দেয় একটা দেশলাই। আগুনের প্রথম শিখার সাথেই ধোঁয়ার কুণ্ডলী ওঠে। নাগিন ময়দার দলা থেকে ছোট ছোট গোল লেচি বানাতে শুরু করে। তারপর প্রতিটা লেচিতে বাটিতে রাখা শুকনো ময়দা মাখিয়ে নেয়। রহমান দ্রুত হাতে প্রথম চাপাটিটা তন্দুরের ভেতরের দেওয়ালে ছুঁড়ে দেয়, দপ্ করে বেগুনি আর নীল শিখা ওঠে। তৈরি হয় প্রথম লাওয়াস, গায়ে বুড়বুড়ি, পোড়া গমের গন্ধে ভরে যায় দোকান। দোকানের দরজা থেকে রহমান ও নাগিনের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে আলি মহম্মদ আর ডা. মুস্তাক, দরজা থেকে বেরনো কুণ্ডলী পাকনো ধোঁয়া এড়াতে চোখ কুঁচকে ঘাড় পিছনের দিকে হেলিয়ে রাখে দুুজনই।

দুজনেরি বয়স মধ্য-পঞ্চাশ। আলি মহম্মদের গোলাকার মুখে লম্বা সাদা দাড়ি আর উজ্জ্বল দুটো চোখ। তার ছয় মেয়ের মধ্যে তিনজনের বিয়ে হয়েছে। ঠিকাদারের কাজে খুব সফল হয়নি আলি মহম্মদ, বন্ধুদের কাছে ধারদেনাও হয়েছে কিছু। তবে তাঁর স্বচ্ছ কারবার আর  অবিচল ব্যক্তিত্বের জন্য বন্ধুরা টাকা শোধের জন্য চাপ দেয়নি। ‘আল্লাহ্ ওকে যথেষ্ট দিলে ঠিকই সব দেনা মিটিয়ে দেবে,’ বন্ধুরা বলে। ‘আমি কী করি বলেন তো, ডা. মুস্তাক?’ নিজের স্বভাবসিদ্ধ শান্ত মেজাজ হারায় আলি মহম্মদ।   

‘আপনাকে আপনার আইডেন্টিটি কার্ডটা একজন গেজেটেড অফিসারকে দিয়ে স্ট্যাম্প মারাতে হবে,’ ডা. মুস্তাক বলে। ‘আজ একবার পরের দিকে শ্রীনগরে আমার ক্লিনিকে আসুন, আমিই স্ট্যাম্প দিয়ে দেব’খন।’     

ডা. মুস্তাক কখনই আলি মহম্মদের মতো ফিরান পরে না। তার গায়ে একটা শাল আর হাঁটুঝুলের মোটা সোয়েটার। ডা. মুস্তাকের উজ্জ্বল গায়ের রঙ, টিকালো নাক। চকচকে টাক ঢাকা উলের কারাকুল  টুপিতে।  

‘আমার লাওয়াসটা মুচমুচে চাই কিন্তু,’ ডা. মুস্তাক রহমানকে বলে, ‘আর আজ আটটা না দশটা দেবে; অতিথি আছে আজ।’

‘আলি মহম্মদ, আপনাকে কটা দেব?’ রহমান জিগেস করে।

‘নাগিন, তোমার কোমর এখন কেমন?’ ডা. মুস্তাক প্রশ্ন করে।

‘আমাকে ছটা দেবে, তার বেশি না,’ আলি মহম্মদ উত্তর দেয়।

‘ব্যথা আর নেই, ডাক্তারবাবু,’ নাগিন বলে, ‘এখন অনেক ভাল আছি।’

‘আপনি ঠিক আছেন? আপনাকে কেমন বিচলিত দেখাচ্ছে,’ রহমান আলি মহম্মদকে বলে।

‘সিরাপটা খেতে থাকো। সব ঠিক হয়ে যাবে,’ শালটা কাঁধে ফেলে নাগিনকে বলে ডা. মুস্তাক। আলি মহম্মদের দিকে এক ঝলক তাকায়।

‘কী আর করার?’ বিরক্তি আর হতাশা মেশানো গলায় বলে আলি মহম্মদ। ‘এখন সময়টাই অন্যরকম। সবই এক… আমরা বাঁচি আর মরি কার কী?’

‘কী হয়েছে?’ রহমান জানতে চায়।

শিকটা পাশে সরিয়ে রাখে রহমান, তন্দুরের ভেতর লাওয়াস পুড়ছে সে খেয়াল তার নেই, ডাক্তার আর আলি মহম্মদের দিকে তাকায়। দরজার বাইরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দুজন। দিনের আলো ফুটেছে কিন্তু আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢাকা, আগুনের ঝলকানিতে তাদের মুখগুলো লালচে বেগুনি দেখায়।

‘সেদিন সেনারা আলি মহম্মদকে আটকেছিল,’ ডা.মুস্তাক বলে।

‘আইডেন্টিটি কার্ডে যে ছবি লাগিয়েছে তাতে স্ট্যাম্প নেই বলে চড় মেরেছে।’

সবাই চুপ। গোটা দোকানটা ভরে উঠেছে বিষণ্ণতা আর অপমানে। আলি মহম্মদের মুখটা জ্বলে ওঠে, নীচের ঠোঁটটা কাঁপে, দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে ঠোঁট। সে কিছু বলার আগেই নাগিন উঠে দাঁড়ায়, টেবিল থেকে গরম লাওয়াস তুলতে তুলতে বলে,  

‘আপনি ছটা বললেন তো?’ যদিও সে ভালই জানে আলি মহম্মদ ঠিক কটা চেয়েছে।

‘হ্যাঁ, আর আমার বিটির জন্য একটা নরম,’ আলি মহম্মদ উত্তর দেয়। বিটি তাঁর ছোট মেয়ে।

নাগিন আঙুলের ডগা দিয়ে চেপে চেপে একটা নরম দেখে লাওয়াস খুঁজে দেয় বিটির জন্য আর ডা. মুস্তাকের জন্য তোলে মুচমুচেগুলো।

দুজন চলে যেতেই নাগিন রহমানকে বলে, ‘আমি বাড়ি যাব রান্না করতে। তোমাকেও সেনারা ধরার আগেই আইডেন্টিটি কার্ডে স্ট্যাম্পটা লাগিয়ে নাও কিন্তু।’

—————————————————————–

নাগিন জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। এলম গাছের এলোমেলো ডালপালা ঘিরে রয়েছে জানলা। ন্যাড়া পাহাড়ের পিছন থেকে ওঠা সূর্যের আলো পুরু পাতার পর্দায় আড়াল হয়ে গেছে। আর এই প্রাকৃতিক পর্দা চিরে চকচকে স্টিলের সূঁচের মতো রান্নাঘরের অন্ধকারে ঢুকে এসেছে একটা মাত্র রশ্মি। মাটির দেওয়ালে ফুটো করে দেবে এই আলো, আমার গায়ে বিঁধবে, নাগিন মনে মনে ভাবে, আমি যদি ওই আলোটা পেরিয়ে যাই, আমার চোখ ফালাফালা করে দেবে, মাথায় গর্ত করে দেবে।  

তখনও বেশ ভোর, বাড়ির ভেতরটা শান্ত চুপচাপ। শুধুমাত্র আলোর রশ্মির হম্বি। নাগিন চোখ সরিয়ে নেয়, বৈঠকখানার দিকে বেঁটে কাঠের দেওয়ালের ওপরে ঝোলানো মশারির দিকে তাকায়। রহমান সেখানে মাটিতে তোশকের ওপর ঘুমোচ্ছে, গায়ে একটা হালকা মলিন কাঁথা। মুখটা বিবর্ণ, একগোছা চুল এসে পড়েছে চোখে। গত কয়েক ঘন্টা ধরে এই একইভাবে ঘুমোচ্ছে। সিলিংয়ের দিকে মুখ, ঠৌঁটটা শুকনো ফাটা-ফাটা, মুখটা অল্প খোলা। বুকটা অল্প ওঠা-নামা না করলে, নাগিনের তাকে মৃতই মনে হত। মৃত।    

বহু সপ্তাহ কেটে গেলেও, দোকানের সেইদিনের ঘটনা নাগিনের মাথা থেকে বেরোয়ে না। সময়টা কী লম্বা মনে হয়েছিল। মনে হচ্ছিল মৃত্যু আর তার মাঝের দূরত্ব এক চুল। গলা শুকিয়ে গেছিল, দমবন্ধ হয়ে আসছিল। সেই মুহূর্তটা ওর মাথায় গেঁথে গেছে। সেদিন থেকে খুব সামান্যতম শব্দেও নাগিনের মাথার ভেতরে ঝনঝন করে ওঠে: জানলার জালে আটকে পড়া মৌমাছির বিনবিন শব্দকে মনে হয় হাজার ডেসিবেল, পাখির ডাক কর্কশ আর যন্ত্রণাদায়ক। মেজাজও বদলে গেছে নাগিনের। আজ সকালেই গভীর বিষাদ ছেঁকে ধরেছিল। নাগিনের এই মেজাজ মিলে যায় বাইরের কার্ফিউ-এর সঙ্গে, যেখানে মৃত্যুর গাঢ় গন্ধ আর খবর ছড়িয়ে পড়তেই পামপোর-এর ৫০০০ বাসিন্দা ঠিক করে ছেলেদের সসম্মানে দাফন করবে, কর্তৃপক্ষও সঙ্গে সঙ্গে কার্ফিউ জারি করেছে। নাগিন ওই ছেলেদের চিনত না, কিন্তু ইনামকে সে চেনে। ইনাম – ঋজু, লম্বা, শক্তসমর্থ বাচ্চা, যে অপমান ছাড়া সব কিছু মেনে নেবে। তার বাবা নবির তার পড়াশোনা চালাতে না পারায়, ম্যাট্রিক পাশ করার সঙ্গে সঙ্গেই ডা. মুস্তাকের ফার্মেসিতে কাজ করতে শুরু করে ইনাম, সতেরো বছর বয়সে, দু’বছর আগে। ইনাম জানে কীভাবে ইঞ্জেকশন দিতে হয়, এত সহজে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাংসপেশী থেকে সূঁচ বের করে আনে কোনওরকম ব্যথাই লাগে না। ইনামের মোবাইল ফোনের শখ, আর মেয়েদের পিছনে ঘোরে খুব। ওর দুটো দামি কালো মোটোরোলার ফোন আছে, তাতে ইংরেজি গানের ডায়ালটোন বাজে। ক্রিকেটারদের ছবিও আছে ফোনে। রাত জেগে জেগে বিটির সঙ্গে মেসেজ আর ফোনে কথা বলে। সিগারেট খায়। নাগিনকে সেদিন দোকানের দিকে আসতে দেখে, সিগারেটটা তাড়াতাড়ি লুকিয়ে ফেলেছিল। নাগিন ওর মাকে জানিয়ে দেবে শুধু সেই ভয় না, নাগিনকে সম্মান করে বলেই। বাতাসে ছড়িয়ে যাওয়া ধোঁয়া সরাতে সরাতে কাশছিল ইনাম।

নাগিন ভাবে ওই ছেলেগুলো কেমন দেখতে ছিল? ওরা যখন বেঁচেছিল ওদের কী  ইনামের মতোই লাগত? চাপা নীল জিন্স-এর হাঁটুর কাছে ছেঁড়া, আর সাদা টি-শার্টে ব্লন্ড চুলের কোনও হলিউডি অভিনেতা যাকে নাগিন ঠিক চেনে না? ওরাও কি জেল দিয়ে চুলে স্পাইক করত, যাতে চোয়াড়ে মুখগুলো আরও চোয়াড়ে দেখায়? ওরাও কী এমনই ছোট ছিল- সরল নিষ্পাপ চিবুকের খাঁজে রঙিন ব্রণ? নাগিন হয়তো ওদের বাজার চত্বরে দেখেছেও কখনও বা। রহমান বোধহয় ছেলেগুলোর বাবাকে চেনে, গোটা পামপোরই তো ওর রুটির দোকানে আসে। রহমান নাগিনকে ঘটনার কথা জানায়নি। নাগিনের ভয় হয়, এই ঘটনা জানতে পারলে রহমানের কী অবস্থা হবে ভেবে। আচ্ছা ছেলেগুলোর মা এখন কী করছে! নাগিন ভাবে। এই যে ছেলেগুলোকে পৃথিবী থেকে মুছে দেওয়া হল, তাদের বয়স ছিল ষোলো, তেরো, আঠেরো। 

দাফনের আগের নামাজের দৃশ্যটা যেন চোখের সামনে দেখতে পায় নাগিন। কবরখানায় পুরুষরা সার দিয়ে দাঁড়িয়ে, মেয়েদের কান্নাভেজা মুখ ওড়নায় ঢাকা, তারা দাঁড়িয়ে একটু দূরে জাফরান খেতের পাশে। 

কিন্তু এই অন্ত্যেষ্টি বাতিল করতে হয়। ইমাম আলি মহম্মদকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় সেনা, মসজিদের মাইকে ঘোষণা করতে বাধ্য করে: তিনজনের বেশি লোককে একসঙ্গে হাঁটতে দেখলে তাদের গুলি করা হবে। ইনাম নাগিনকে বলেছিল, মৃতদেহগুলিতে পচন ধরার আগেই অন্য কোথাও নিয়ে গিয়ে কবর দিতে হবে। সেই দিন রাতেই লুকিয়ে-চুরিয়ে পাশের গ্রামে নিয়ে গিয়ে চুপচাপ কবর দেওয়া হয়।  

নাগিন রহমানের মাথার বালিশটা ছোঁয়, ঝুঁকে পড়ে মুখের কাছে। রহমানের কপালে চুমু খেতে চায় নাগিন, কিন্তু মনে হয় তার ঠোঁটের ছোঁয়ায় হয়তো রহমানের শান্তির ঘুম নষ্ট হবে। কপাল থেকে চুলের গোছা সরিয়ে দিতে দিতে রহমানের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনে নাগিন। বহু দূর থেকে আসা নিশ্চিন্তির শব্দ। যেন কোনও এক দূর ঘুমের দেশে তলিয়ে গেছে রহমান। 

নাগিন আলতো হেসে রান্নাঘরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ায়, তখনই নাকে গু’য়ের গন্ধ আসে। দালানের দিক থেকে আসছে গন্ধটা। বাইরে বেরিয়েই বুঝতে পারে কী হয়েছে, সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে সাজেহ্-র ছাগলটার ঘেঁটি ধরে নিয়ে এসে মুখে এক চড় মারে। ছাগলটা ডেকে ওঠে, নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে আপ্রাণ। 

‘উফফ্, এটাকে নিয়ে আর পারা গেল না,’ সাজেহ্ নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে চেঁচায়। ঝকঝকে রোদের আলোয়ে দুজন মিলে হক শাকের গাছগুলি দেখে, ওরা দুজনে মিলে যেগুলো পুঁতেছে, বড় করেছে। এখন শুধু নুইয়ে পড়া সবুজ পাতার জঞ্জাল। 

সাজেহ ছোটখাটো চেহারার উজ্জ্বল চোখের সাহসী মহিলা। 

‘এ শত্তুরটাকে কোথাও বেঁধে রাখো,’ নাগিন পরামর্শ দেয়। 

সাজেহ্ ছাগলটার কান ধরে টেনে আনে, হুমকি দেয়, ‘তোকে শেয়াল দিয়ে খাওয়াব।’

তারপর নাগিনকে নরম গলায় জিগেস করে, ‘রহমান এখন কেমন?’

‘জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে,’ নাগিন রেগে বলে। ‘ইনামের দেওয়া ওষুধগুলো কোনও কাজেই দিচ্ছে না।’

‘আল্লাহ্! কারও কু-নজর লেগেছে, আমি নিশ্চিত।’

‘আমি ওর এই দুর্দশার কারণই বুঝিনা।’

‘সবই আল্লাহ্-র ইচ্ছা। রহমান দোকানে যাওয়া বন্ধ করার পর থেকে ওর ওই জাফরান রুটি-শিরমলের গন্ধের জন্য আমি হাপিত্যেশ করি।’

নাগিনের মুখ নরম হয়ে আসে। ঘাড় নেড়ে মৃদু হেসে সাজেহ্-র দিকে তাকায়, গরম তন্দুরের পাশে রহমানের উজ্জ্বল গোলাপি হয়ে ওঠা মুখ মনে পড়ে নাগিনের। তারপরই রহমানের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া পাংশুটে মুখের ছবি ধেয়ে আসে, নাগিন বলে, ‘ডা. মুস্তাক অবধি রোগটা ধরতে পারছে না। বলেছে জ্বরে কেউ মরে না, রহমানও ঠিক সেরে উঠবে, কিন্তু আমার তো শান্তি হচ্ছে না। আমি শ্রীনগরে মুখদিন শেহবুনে গিয়ে দরগায় সুতো বাঁধব। কিন্তু এই ছাতার কার্ফিউ! মাত্র কয়েক মাইল দূর কিন্তু যেতে পারছি না। রাস্তায় এত সেনা যে একটা মাছিও পাখা ঝাপটানোর সাহস করবে না।’ 

ছাগলটা আবার ডেকে উঠে সাজেহ্-র হাত থেকে মুক্তি পেতে ছটফট করে। সাজেহ্ তার কানে চাপড় মেরে মাথাটা ঘুরিয়ে নিজের দুই হাঁটুর মাঝে গুঁজে দেয়।

‘চুপ, নাহলে তোকে কুকুর দিয়ে খাওয়াব বলে রাখলাম,’ ছাগলকে ধমক দেয় সাজেহ্। ‘দেখছিস না দুজন মহিলা কথা বলছে?’  

‘আমরা আবার যেন ওর মরার কারণ না হই,’ নাগিন বলে আর দুজন হেসে গড়িয়ে পড়ে। 

একবার দুজন মহিলা গল্প করছিল। গল্প করতে করতে এতই বেলা গড়িয়ে গেছে যে একজন হাঁটুর ফাঁকে একটা বাছুরের মাথা আটকে রেখেছিল। সে গেছে মরে। এই গল্পের প্রসঙ্গ টেনেই হাসে দুজন।

‘আরে ওর কিস্যু হবে না,’ সাজেহ্ বলে। ‘শেষবার যখন মুখদিম শেহবুন গেলাম নবিরের সঙ্গে, সেখানে এক ফকিরের সাথে দেখা। কী আর বলব নাগিন সেই লোকটার কষ্ট! বয়স কম  করে নব্বই হবে, কিন্তু কী উজ্জ্বল শান্ত তার চোখ। একটা ছেঁড়াখোড়া ফিরান পরে। আমি দরগা থেকে বেরোতেই আমাকে সিঁড়িতে দাঁড় করালেন। বললেল উনি জানতেন আমি যাব, আমাকে বেটি বলে ডাকলেন। একটা মাটির ডেলা দিলেন আমার হাতে। বললেন, কোনও সমস্যায় পড়লে ওই মাটির ডেলা ভেঙে খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খেতে।’

‘কাজ দিয়েছিল?’ নাগিন কৌতুহলী হয়ে জিগেস করে।

‘মনে আছে, কয়েকদিন আগে ছেলেরা কার্ফুিউ ভেঙে হাইওয়ের দিকে সেনাদের পাথর ছুঁড়ছিল? সেনা তাড়া করলে ছেলেরা শহরে উধাও হয়ে যায়। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সেনারা নবিরকে মারে, হাইওয়ে থেকে দূরে মসজিদ চত্বরের ভিতর দোকান লাগিয়েছিল নবির। ঠেলা আর ফলের ঝুড়ি সব ফেলে পালায়। হাঁফাতে হাঁফাতে আসে। হাতের উপরের দিকে কেটে গেছিল অল্প। গলগল করে রক্ত পড়ছিল। হঠাৎ এত রেগে গেছিলাম, ছেলেগুলোকেই গাল পাড়লাম খানিক। এই পাজিগুলো! ঘরের ভিতর আটকে থাকতে থাকতে এতই ছটফট করতে শুরু করেছিল যে আর থাকতে না পেরে বেরিয়ে গেছে। আমি ইনামকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে ঘরে আটকে রেখেছিলাম।’  

‘আমার না ওকে নিয়ে চিন্তা হয়,’ নাগিন বলে। ‘সেদিন ও আমাকে দোকান থেকে বের করে মসজিদ চত্বরে ছেড়ে দিয়ে বলল বাড়ি চলে আসতে। আমি জিগেস করতে যাচ্ছিলাম ও কোথায় যাবে, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি চলে গেল…’  

‘আমি ওকে আমার মাথার দিব্যি দিয়ে বলেছি, “খবরদার হাইওয়ের দিকে যাবি না বা পাথরে হাতও দিবি না!” এই ছেলেপিলেগুলো, ওরা বোঝেও না সেনা যখন মারে, গুলি চালায় কাকে মারছে পরোয়া করে না। আমাদের মাংস ওদের কাছে কাঠের মতো ….কী যেন বলছিলাম? ও হ্যাঁ, নবিরের কথা। সন্ধেবেলা ও ঠেলাটা নিয়ে আসতে চাইছিল, আমি বেরোতে দিইনি। বলছিল অনেক লোকসান হয়ে যাবে, এক মাসের রোজগার লাগিয়ে চেরি আর খুবানি কিনেছে, সেগুলো তাড়াতাড়ি ঠেলা-র ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে এসেছে। কিন্তু আমি ওকে তাও কিছুতেই যেতে দিইনি। পরদিন সকালে গিয়ে দেখে শুধু কয়েকটা কাঠের টুকরো পড়ে আছে- একটাও ফলের বাক্স নেই, চেরি খুবানি কিচ্ছু নেই, সব গেছে। বাড়ি ফিরে এতই খিঁচড়ে ছিল আমার সঙ্গে ঝগড়া লাগায় আর কি।’

‘তুমি কী করলে?’

‘বললাম চিন্তা করার দরকার নেই। এই ছাগলের দুধ বিক্রি করে যে টাকা পেয়েছি সেটার কথা বললাম,’ হাঁটু দুটো অল্প ফাঁক ছাগলটার মাথায় আদর করতে করতে  সাজেহ্ বলে।  

 ‘এই তোহ্ বেঁচে,’ সাজেহ্-র কথা শুনে নাগিন হাসে। 

‘পুরো টাকাটাই দিয়ে দিলাম। যদিও খানিক স্বস্তি পেল, কিন্তু ওর চোখে একটা আশ্চর্য আতঙ্ক ছিল। সারা দিন সারা সন্ধে ওর চোখে ওই ভয় দেখেছি। মনে হচ্ছিল কবরখানা থেকে দুষ্ট আত্মা নিয়ে ফিরেছে ও। চুপচাপ। কোথায় যেন মন পড়ে আছে। সময়ে সময়ে রেগে উঠছিল, কেঁদে ফেলছিল। মনে হচ্ছিল ও ভয়ঙ্কর কিছু করে বসবে, হয় রসুইঘরের দেওয়ালে মাথা ঠুকবে নয়তো ছেলেদের দলে যোগ দিয়ে সেনার দিকে পাথর ছুঁড়বে। তাই আমি ওর খাবারের সাথে একটু মাটি মিশিয়ে দিয়েছিলাম। পরে সারা রাত শান্তিতে ঘুমিয়েছে।’ 

—————————————————————–

সেদিনই দুপুরে রহমান এক বান্ডিল টাকা আর এক থলে কমলালেবু নিয়ে ফিরেছিল। এক সাথে দুপুরের খাবার খেল- নাগিন ডাল ভাত রেঁধে রেখেছিল। রহমান কমলালেবু কেটে নাগিনকে দিল। নাগিন কোয়াগুলো ছাড়িয়ে, আঁশ ফেলে দিয়ে রহমানকে দিল। একটা একটা করে কোয়া খেল দুজন মিলে, বিঁচিগুলো থু-থু করে ফেলল দাস্তেরখোয়ান-এ। ব্যাপারটা বেশ মিষ্টি, নাগিনের মনে হল।

বাইরেটা আরও মেঘলা হয়ে আসছিল, গরম খাবার পেটে যাওয়ায় খানিক অলস লাগছিল নাগিনের। সকালে ছেড়ে যাওয়া তোশকে এসে শুল নাগিন, পিছে পিছে রহমানও। নাগিনকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল রহমান, ওম ছড়িয়ে পড়ল বিছানায়। ফিরানটা খুলে ফেলল নাগিন, আলতো হাতে তার স্তনদুটো চেপে ধরল রহমান। নাগিন রহমানের হাতের পেশিতে হাত ঘষতে লাগল, রহমানের শক্ত হয়ে ওঠা পুরুষাঙ্গ পিঠে ঠেকল। পিছনে ঘুরে সে রহমানের ঠোঁটে চুমু খেল। রহমানকে বলল সালওয়ারের দড়ির গিঁটটা খুলে দিতে, নামিয়ে দিল সালওয়ারটা। রহমানের পাজামার দড়িটা খুলে দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দিল ভেতরে।

সঙ্গম শেষে ফিরানটা গলিয়ে নাগিন রান্নাঘরে গেল জল খেতে। ঘড়া থেকে জল নিতে নিতে জানলার বাইরে তাকালো। বরফ পড়ছে। বাঁ কানের সোনার দুলটা আলগা হয়ে গেছে। দুলটা চেপে ঢুকিয়ে দিল কানের ফুটোয়ে। হেসে রহমানের দিকে তাকালো, বিছানায় শুয়ে আছে, শান্ত পরিতৃপ্ত দেখাচ্ছে। বরফের কণা ছড়িয়ে পড়ছে উপত্যকা জুড়ে। 

—————————————————————–

গরম বাড়ছে, আর বাড়ছে তাকে ঘিরে নিস্তব্ধতা। রহমানের জ্বর বেড়েছে, পুড়ে যাচ্ছে গা। দিন দিন শরীর আরও খারাপ হচ্ছে। খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। ওজন কমে এখন আরও দুবলা দেখায়। রাত্রিবেলা জামা বদলে দেওয়ার সময়ে পাঁজরের হাড় হাতে ঠেকে নাগিনের। ঠাণ্ডায় কাঁপে রহমান, দরদর করে ঘামে। ভোরের আগে ঘুমের মধ্যে ছটফট করে, বিড়বিড় করে, ভুল বকে। ন্যায় অন্যায়ের ব্যাপারটা মাথায় না থাকলে তো নাগিন রান্নাঘর থেকে ঝাঁটা এনে দিত দু’ঘা, বরের ঘাড়ে চাপা জিনটাকে তাড়িয়ে ছাড়ত।

মধ্য-জুলাইয়ের লম্বা দিনের শেষে, গরমে ঘেমে নেয়ে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে বসে নাগিন। পশ্চিমে তাকায়, যেখানে রাস্তাটা মোড় নিয়েছে সেটা ছাড়িয়ে চোখ চলে যায় বাড়িগুলোর উঁচু চালে। অদ্ভুত অস্থিরতা গ্রাস করে তাকে, যেন এই গোধূলির আলো তার ওপর পাহাড়ের ওজন চাপিয়ে দিয়েছে, ভিতরে ফুলে ফেঁপে উঠছে দত্যিটা। ঠিক সেই সময়েই আলি মহম্মদ আজান শুরু করে। তার গলা বরাবরই বড় মিঠে। কিন্তু ইদানিং, কার্ফিউ-এর মধ্যে গলাটা কাঁপে। সেই শান্ত কোমল সুর কোথায় যেন হারিয়ে গেছে, ভাঙা ভাঙা বেতালা লাগে তার গলা আজকাল। 

নাগিন শুনল রাস্তার বাঁকটা থেকে একটা জিপ এসে দাঁড়াল ওদের বাড়ির সামনে, দেখল কয়েকটা ছায়া মূর্তি আলো জ্বালতে জ্বালতে ওদের উঠোনের দিকে এগিয়ে আসছে। লোকগুলো দ্রুত এগিয়ে আসছিল, তাদের হাতে হাতকড়া ঝোলানোর শব্দ। একছুটে বৈঠকে চলে যায় নাগিন, পর্দার ফাঁক দিয়ে কাঁচের শার্সিতে চোখ রাখে। যদিও অন্ধকার আরও গাঢ় হয়েছে, কিন্তু নাগিন নিশ্চিত জানত এরা পুলিসের লোক। 

শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল আতঙ্ক উঠে আসে। গায়ে কাঁটা দিয়েছে বুঝতে পারে। মনে পড়ে সাজেহ্ বলছিল ইনাম একদিন হল ঘরে ফেরেনি। ছেলেরা আবার কার্ফিউ ভেঙেছে, হাইওয়েতে গিয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছ, পুলিস আর সেনাদের পাথর ছুঁড়েছে। ইনাম তার ঘরের পিছনে জানলা দিয়ে পালিয়ে ওদের সাথে জুটেছে। নাগিন বুঝেছিল কী ঘটতে চলেছে।

ছুটে গিয়ে রান্নাঘর থেকে লন্ঠনটা ধরিয়ে উঠোনে বেরিয়ে আসে নাগিন।  

‘যদি কাউকে মারতেই হয়, আমাকে মারো,’ ইনাম চিৎকার করে, ‘কিন্তু আমার বাবা-মায়ের সামনে না।’ পুলিসটা ইনামের মাথার ওপর এক জোর বাড়ি মারে। নবির কাঁদতে থাকে, ইনামের হাতে হাতকড়া পরায় পুলিস।

‘ওরা ইনামকে মারছে! এই কুত্তাগুলো আমার ছেলেকে মারছে!’ সাজেহ্ পাড়া-প্রতিবেশীকে জাগাতে চিৎকার করতে থাকে। ভাবে, লোকজন দল বেঁধে এসে পুলিসকে হঠিয়ে দেবে। 

‘মারবেন না, দয়া করুন,’ নবিরের কাতর গলা শোনা যায়।

নাগিন ওদের থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। পুলিসরা দ্রুত ইনামকে ঘিরে ফেলে দরজার দিকে নিয়ে যায়।

নাগিন দৌড়ে নবিরের কাছে যায়। মাথা চাপড়াতে চাপড়াতে নবির আর্তনাদ করে ওঠে, ‘ওরা ওকে নিয়ে গেল। নিয়ে গেল ওকে।’

‘কেঁদে কী হবে!’ সাজেহ্ চিৎকার করে, ‘কিছু করো, নবির! কিছু তো করো!’

‘কী করব? কী করব আমি?’ নবির প্রশ্ন করে।

‘কিচ্ছু না,’ সাজেহ্ বলে। ‘নাগিন, ওকে ভেতরে নিয়ে যাও তো। আমি আলি মহম্মদ আর ড.মুস্তাকের কাছে যাব, ওদের গিয়ে বলি আমার ছেলেকে নিয়ে গেছে।’

‘ওকে কী মারবে?’ নবির জিগেস করে।

‘চুপ করো, চুপ করো তুমি,’ সাজেহ্ বলে। ‘আমার একটা উপকার করো নাগিন, ওকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে একটু জল দাও।’

সাজেহ্ ফিরে বলল, ‘ডা. মুস্তাক আমাদের একটা দিন দেখতে বলেছেন। বলেছেন, চেনা একজন পুলিস অফিসারকে ফোন করতেন, কিন্তু মোবাইল তো চলছে না। কাল আমি ডা. মুস্তাক আর আলি মহম্মদকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে ওই পুলিস অফিসারকে খুঁজে বের করব।’ নবির দীর্ঘশ্বাস ফেলে, মুখে কিছু বলে না। 

নাগিন মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়ায়।

‘তুমি এবার যাও,’ সাজেহ্ বলে। ‘রহমান নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে।’

রহমান বৈঠকখানায় দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে ছিল। চোখগুলো কুঁচকে আছে, শুকনো জ্বরে পোড়া ঠোঁট কামড়াচ্ছে।

নাগিন রান্নাঘরে ঢুকে দ্রুত পায়ে হেঁটে পাঁচিলটা টপকে ভেতরে যায়। রহমানের পিঠে একটা বালিশ দিয়ে দেয়। রহমানের গা থেকে একটা জোরালো রুগী রুগী গন্ধ বেরোচ্ছে।  

সে নাগিনের দিকে তাকালেও চিনতে পারছে বলে মনে হয় না।

‘রহমান, আমি চলে এসেছি,’ আলতো গলায় বলে নাগিন।

ওড়নার খুঁট-টা দিয়ে রহমানের ঠোঁটের কোণাটা মুছিয়ে দিতে দিতে নাগিন বলে, ‘গত চব্বিশ ঘণ্টা তুমি কিচ্ছু খাওনি।’ রান্নাঘরে গিয়ে নুন-চা গরম করে তার মধ্যে একটা শেভর দিয়ে দেয়। সাজেহ্-র দেওয়া মাটিও মিশিয়ে দেয় এক চিমটে।

কয়েক চামচ খাইয়ে দেয়। রহমানের চোখ খোলা। কিন্তু তারপর সে মুখ বন্ধ করে নেয়। ‘আমার খিদে নেই। আমার বমি পায়, গা গুলোয়,’ সে বলে।

‘তোমার ঠিক কী হয়েছে আমাকে বলতে হবে,’ নিজের গলায় রাগের আভাস পেয়ে নিজেই অবাক হয়ে যায় নাগিন।

‘আমার শরীর দুর্বল লাগে, অসুস্থ লাগে।’

‘তোমার কিচ্ছু হয়নি, কোনও অসুখ নেই, জানো তো তুমি? ডা. মুস্তাক বলেছে তোমার কোনও অসুখ নেই।’

‘আমি দোকানে যেতে চাই।’

‘কার্ফিউ উঠে গেলেই তুমি দোকানে যাবে।’

‘পুলিস ইনামকে নিয়ে গেল, কেন ওরা ইনামকে ধরল?’

‘আল্লাহ্ ওকে রক্ষা করবে।’ নাগিন বলে। ‘মুখদিম সাইব ওকে রক্ষা করবে।’

‘ওকে যদি ওরা কিছু করে?’ নাগিন বাধা দিতে গেলে তাকে থামিয়ে রহমান জিগেস করে, ‘ওরা যদি জেলের মধ্যেই ওকে পিটিয়ে মেরে ফেলে?’

‘এসব অলুক্ষুণে কথা আর বোলো না। ইনাম বাড়ি ফিরবে আর তুমিও আবার দোকানে যাবে।’

‘এই অসুখেই আমি মরে যাব, নাগিন। ওই যে ছেলেগুলো সেনাকে পাথর ছোঁড়ে আর গুলি খেয়ে মরে যায়, আমিও ওদের মতো এই গরমেই মরে যাব।’

‘দয়া করো, এমন কথা আর বোলো না,’ কাতর গলায় অনুরোধ করে নাগিন।

‘ইনামকে আমি চিনি, আমি জানি ও কেমন ছেলে। ওকে ছেড়ে দিলে ও আবার ওর বন্ধুদের সঙ্গে রাস্তায় গিয়ে সেনাকে পাথর ছুঁড়বে। ও যদি এইসবের পর বেঁচে ফেরে আমি চাই ও আমাদের সঙ্গে এসে থাকুক। আমাকে কাঠ জ্বালাতে সাহায্য করবে, দুজন মিলে গনগনে তন্দুর বানাবো। আমরা ময়দা মাখব, শিরমল বানাব। কত কত শিরমল বানাব আমরা নাগিন; সবকটা শিরমলের ওপর পোস্তর দানা ছড়িয়ে দেব। সারা পামপোরের জন্য শিরমল বানাব আমরা,’ জলে ভরে ওঠে রহমানের চোখ, গলা বুজে আসে।

‘এখন শুয়ে পড়ো। এটা পরে খাবে।’ কাপটা তুলে ট্রে-তে রাখে নাগিন।

‘আমার ঘুমোতে ভয় করে, তুমি আমার কাছে একটু শোবে?’ রহমান বলে। ‘ঘুমোলে মনে হয় আমি অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছি।’

নাগিন মাথা নেড়ে কাঁথাটা একপাশে সরিয়ে রহমানের পাশে বসে।

‘মাঝরাতে হঠাৎ হঠাৎ আমার বুক ধড়ফড় করে,’ নাগিনের কোলে মাথা রেখে রহমান বলে, ‘তুমি তখন  আমার পাশে না থাকলে আমি তক্ষুণি মরে যাব।’

নাগিন মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, ‘কেন থাকব না আমি?’

‘মরার আগে একদম একা থাকা, আমার খুব ভয় করে নাগিন।’

‘এখন চুপ করো। আর কথা বোলো না।’

রহমানের ঘাড়ের নিচে হাত দিয়ে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে পাশে শুয়ে নাগিন বলে ‘হাতটা এদিকে দাও দেখি আমার মাথার নিচে।’

রহমান হাসে অল্প, বলে ‘যতদিন বেঁচে আছি, তোমার আর অন্য কোনও বালিশ লাগবে না।’

ছবি ঋণ স্বীকার: সান্না ইরশাদ মাট্টু

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *