কাটারা যেভাবে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ নাগরিকে পরিণত হল

১৫ বছর চাকরি করবার পর আমরা তাকিয়ে দেখলাম হাতে রয়েছে কলা। বউ বলল, মর্তমানও নয়। একেবারে দিশি। প্লাস কামড়ালে গাল ভরে যায় বিচিতে। এই কলা, আর যাই হোক, সমাজে বিক্রি হবে না। এদিকে মেয়েটিও বড়ো হচ্ছিল দ্রুত। এখন ক্লাস ওয়ান। কদিন পর টিউশনে পাঠাতে হবে। সুতরাং, হাতে নো-টাইম। – তালে করুম কী? বউ বলল, টুমরো নেভার ডাইস! অতএব, খুলে ফেললাম দোকান। সেই সূত্রে জানা হল বড়বাজার, শান্তিপুর, হ্যান্ডলুম, কোসা আর লকডাউন। দুনিয়া জুড়ে মানুষ কেলিয়ে যাচ্ছে, পটাপট পটল তুলছে, কোরোনা আসছে-যাচ্ছে, কমছে-বাড়ছে আর আমরা দুইজন বরবউ দুইজন ভাইবোনের মতো বিক্রি করে যাচ্ছি নাইটি, শাড়ি, প্যান্টি ও সালোয়ার পিস। একদিন পুলিস এলো। পটাপট সার্টার নামিয়ে দিলাম। পরের দিন আবার পুলিস এলো। আগে থেকে খবর পেয়ে গেলাম। রাত আটটার পর কোরোনার ঠাকুর জেগে ওঠেন, তাই, দোকান খোলা যাবে না – সরকারি নিয়ম। আমাদের শৃঙ্খল নেই, কিন্তু প্রভুভক্তি আছে। ফলে পুলিস এলেই চ্যাপলিন – পোঁদের কাপড় মাথায় তুলে দে-দৌড়।

এইভাবে চলছিল। নিয়মিত দৌড়নোর ফলে আমার ফুসফুস ক্রমশ সুস্থ হচ্ছিল। বউ-এর ভুঁড়ি ক্রমশ কমছিল। আমরা এমএলএ, এমপি, ডিএম – প্রত্যেককেই নমো করছিলাম। তারপর কেস গুবলেট হয়ে গেল।

বকরি ইদের ঠিক দুদিন আগে, বাজার যখন খানিক চাঙ্গা, বাজারে চলে এলো র‍্যাফ বাহিনী। শালা সেকি সিন। একদম লাস্ট সিন যেন। ক্যালাচ্ছে-পেটাচ্ছে-গাল দিচ্ছে – পুরো লে-হালুয়া। এক ছোবলেই ছবি। 

দুজন খরিদ্দার ছিল। তাদের বের করে সার্টার নামিয়েছি। বউ জানাল, চাবি রয়ে গেছে ভেতরে।

সার্টার তুলে, চাবি নিয়ে আবার সার্টার নামিয়ে তাকিয়ে দেখি র‍্যাফ। তাদের হাতে কলা নেই – রয়েছে প্লাস্টিকের কঞ্চি।

তালা লাগিয়েছি কী লাগাইনি বউ টান মারল। হুমড়ি খেয়ে পড়েছি কী পড়িনি – দে-দৌড় – হুসেইন বোল্ট – বিরাট কোহলি!

এবার দৃশ্যটা ভাবুন –

পেছনে র‍্যাফ আর আমরা ভাইবোন দৌড়চ্ছি।

আরেকবার ভাবুন।

পেছনে র‍্যাফ আর আমরা বরবউ দৌড়চ্ছি।

দু-বার না ভাবলে দৃশ্যটা দেখতে পাবেন না।

ঠিক দু-বার ভাববার পর, এবার নিশ্চয় আপনারা কাটাদের দৌড় দেখতে পাচ্ছেন। মিঠুনের নাচ দেখতে পাচ্ছেন। বাপ্পির মিউজিক শুনতে পাচ্ছেন। নাড্ডা-গাড্ডা-চাড্ডা-হাড্ডার ডিস্কোলাইটে ইয়াব্বড়ো ব্যারিকেড ভাঙার জৌলুস দেখতে পাচ্ছেন?

এসব না দেখতে পেলে আপনি গল্পটা এখানেই পড়া থামিয়ে দিন। বাকি অংশ বোঝা আপনার পক্ষে সম্ভব নয়।

যাঁরা এখনো টিকে রয়েছেন, তাঁরা উপরের অংশটাকে গুরুত্ব দেবেন না। ঐটা ভূমিকা মাত্র। আসলি খেল্‌ এইবার শুরু –

র‍্যাফ যখন আমাদের দৌড় করাচ্ছিল, তখন আমরা কুত্তার মতো দৌড়চ্ছিলাম বটে, তবে বিশ্বাস করুন, আমাদের মনে এতোটুকু রাগ-ঘৃণা জন্মায়নি। কাটাদের সবসময়ে মন পবিত্র রাখতে হয় – এই শিক্ষা আমরা ছোটবেলা থেকেই পেয়েছিলাম। ফলে দৌড়নোর সময় যাতে আমাদের মন কলুষিত না হয়ে পড়ে সেই কারণে আমরা ভালো ও মজার জিনিস কল্পনা করতে শুরু করে দিয়েছিলাম।

আমি যা-যা ভেবেছিলাম –

১) প্রথমে মনে এলো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘পুরুষের উক্তি’ কবিতাটি। আজকাল কবিগুরুর কবিতা কেউ পড়ে না। আপনারা যে পড়েন না, তা আপনাদের মুখ দেখলেই বোঝা যায়। কবিগুরুর কবিতা যাঁরা পড়েন, তাঁদের মুখে সবসময় বিকেলের কনে-দেখা আলো লেগে থাকে। যাইহোক, কবিতাটির প্রথম চার লাইন দিয়ে দিলাম –

যেদিন সে প্রথম দেখিনু

   সে তখন প্রথম যৌবন।

প্রথম জীবনপথে     বাহিরিয়া এ জগতে

কেমনে বাঁধিয়া গেল নয়নে নয়ন।

২) অনেকদিন আগে, তখন অফিস করতাম, সুপ্রিয়া একটা জোক পাঠিয়েছিল হোয়াটস-আপে। জোকটা আবার ইংরাজিতে –  

What did the left eye say to the right eye?

Between us, something smells!

৩) এটা ভেবেছিলাম কী না, মনে নেই। গুঁজে দিচ্ছি। অর্থাৎ, এখন ভাবছি যে এইটা তখন ভেবেছিলাম – 

আমাদের এটা কখনই বলা উচিত নয় যে, একটা মানুষের এক ঘন্টার মূল্য অন্য আরেকজন মানুষের এক ঘন্টার মূল্যের সমতুল্য। বরং আমাদের এটা বলা উচিত যে, ঐ এক ঘন্টা সময়ের মধ্যে একটা মানুষ ঠিক ততটাই দামী যতটা অন্য বাকি মানুষরাও – কার্ল মার্ক্স।

৪) আমি ডিসকভারি চ্যানেলের বিভিন্ন প্রোগ্রাম দেখতে ভালোবাসি। মন ভালো থাকলে, বউ-ও রাতের বেলা মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে চুপিচুপি আমার কাছে চলে আসে। তখন আমরা দুজনে মিলে পশুপাখিদের জগত লক্ষ করি। চিতা পৃথিবীর দ্রুততম পশু। সিংহ আসলে ভীষণ কুঁড়ে। এইসব। তবে আমার ভালো লাগে Man Vs Wild প্রোগ্রামটা। আগে টিভিতেই এইসব দেখতাম। নতুন ব্যবসা, তাই বাড়তি খরচ কমিয়ে দিয়েছি। কেবল-টিভি কাট্‌। কিন্তু যার কেউ নেই – তার মোবাইল আছে। এখন মোবাইলেই এইসব দেখি। তবে মানুষ ভাবে এক রকম, আর খোদাতালা করে আরেক রকম। ইউটিউবে  Man Vs Wild দেখা সবে শেষ হয়েছে, এইবার ব্রাশ করে ঘুমতে যাব – চোখ পড়ল পুরনো আমলের একটা ভিডিওতে। বউ বলল, নিশ্চয় ভালো কিছু হবে। কারণ আগে সবই ভালো ছিল। তার যুক্তি অকাট্য। আমরা ব্রাশ করে পুরনো আমলের সেই ভিডিওটা দেখতে শুরু করে দিলাম। কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু জানতে পারছিলাম আমাদের চোখের সামনে যুগান্তকারী কিছু ঘটে চলেছে। ভিডিওটা ছিল নোয়াম চমস্কি আর মিশেল ফুকোর কথপোকথনের। টাইটেল – অন্‌ হুইম্যান নেচার। আপনাদের আর কষ্ট করে ওটা খুঁজতে হবে না। কী খুঁজতে কী পেয়ে যাবেন – বালাই ষাট! নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে দেখে নিন। বারবার দেখুন। এইটা আমরা দুইজনাই প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুইবার দেখি – 

https://www.youtube.com/watch?v=3wfNl2L0Gf8

৫) কয়েকটা উদ্ধৃতি এলোমেলো মনে আসছিল –

জীবে প্রেম করে যুদ্ধ নয় যেইজন শান্তি চাই সেইজন একটি গাছ সেবিছে ঈশ্বর একটি প্রাণ।

(এই সময় র‍্যাফের থেকে আমাদের দূরত্ব অনেকটাই বেড়ে গেছিল, তাছাড়া একটা গলির ভেতর ঢুকে যেতে পেরেছিলাম, সামনেই ঘর – ফলে মনোসংযোগে বিঘ্ন ঘটেছিল)

বউ জানতে পেরে বলেছিল, তাহলে ঋষি অরবিন্দর কথা একবার ভাবো তো। লোকটা কোন লেভেলে কনসেন্ট্রেট করতে পারতো, উফ্‌। 

মনটা খারাপ হয়ে গেল!

  বাকিদের মতো কাটারাও রাতেরবেলা লাগায়। তার আগে ব্রাশ করে নেয়। ডিসকভারি চ্যানেল দেখে। তবে সেইদিন আমরা একটু বেশিই খুশি ছিলাম। অমন সফল দৌড়ের পর কে না খুশি হবে? বউ মাঝপথে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, আচ্ছা, দোকান বন্ধ করবার সময় দু-জন কাস্টমার তো ছিল।

– হ্যাঁ।

-ওরা তো নাইটি দেখছিল।

-হ্যাঁ।

-তাড়াহুড়োয় ওরা নাইটি নিয়ে পালিয়েছে। টাকা দেয়নি।

গোল গলা-অলা একখানা নাইটির দাম ১৫০টাকা। হাট থেকে আমরা কিনি ১২০টাকায়। এক পিস বিক্রি মানে ৩০টাকা নগদে লাভ।

আর ঘুম হল না দুজনের। মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকলাম। জেগে থাকলে বারবার পেচ্ছাপ লাগে। একবার ও পেচ্ছাপে গেল। একবার আমি গেলাম। দ্বিতীয়বারে ঠিক করলাম ছাদে যাব। 

ছাদে তখন চাঁদ। চাঁদের পাশে তারা। তারার নিচে কালো কালো গাছ। এইরকম সিন দেখলেই সুপ্রিয়ার কথা মনে পড়ে। তখন বিজেপি সবে এসেছে। যেখানেই কাটাদের দেখা পাচ্ছে, ধরাদ্দাম পেটাচ্ছে। আসিফাকে রেপ করে খুন করেছে কদিন আগে। খুন করে আবার খুনিদের সাপোর্টে মিছিলও করেছে। আখলাখও কেস খেয়ে গেছে। নাজিব গায়েব। এইসব ঘটনা বাইরে ঘটলে কলকাতা হেবি রেগে যায়। মিছিল হয়। সেইরকম কোনো এক মিছিলে সুপ্রিয়াও হেঁটেছিল। তা, যা বলছিলাম, সেদিন চাঁদ ছিল, তারারা ছিল, কালো কালো গাছে আবার হাওয়া দিচ্ছিল; সুপ্রিয়া ইদের নেমন্তন্ন খেতে এসে ছাদে উঠে এলো। তার পিছু পিছু আমি। আমাকে বলল, প্রেম কোনো ইমেজ নয় যে ফটোশপে নিয়ে গিয়ে কন্ট্রোল-শিফট-ইউ মারলেই সাদাকালো হয়ে যাবে।

   আমি বললুম, ফিল্টারে গিয়ে ব্লার মারলেও চেঞ্জ হবে না।

  অমনি দেখি সুপ্রিয়া চেঞ্জ। তাকিয়ে দেখি বউ এসে গেছে। তাকে দেখে সুপ্রিয়া বলল, তুমি আমাদের সঙ্গে মিছিলে হাঁটো না কেন? আসিফা যাতে জাস্টিস পায় সেজন্য আমরা শেষতক লড়ে যাব।

  বউ বলল, সেটা অবশ্যই করা উচিত। সেজন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

-ইস, প্লিজ, ধন্যবাদ দিও না। এটা আমাদের ডিউটি।

-নিশ্চয়।

-তাহলে এবার থেকে তোমাকে দেখা পাব তো?

   বউ মুচকি হেসে বলল, আখলাখের খবর জানার পর আমার কী মনে হয়েছিল জানেন?

-কী?

-আখলাখ আমার বাবার বয়সী। দুজনারই বয়েস ৫০। সেদিন আমাদের ফ্রিজে সত্যিই গরুর মাংস ছিল…  

আশ্চর্য, এসব কথা বউ আমাকে কোনোদিন বলেনি। কেন বলেনি? আমি জিজ্ঞেস করিনি বলে?

  বউ বলল, শুনবেন আমার কী মনে হয়েছিল?

-কী? সুপ্রিয়া বলল।

বউ বলল, When the real no longer is what it used to be, nostalgia assumes its full meaning. There is a proliferation of myths of origin and signs of reality: of secondhand truth, objectivity, and authenticity. There is an escalation of the true, of lived experience, a resurrection of the figurative where the object and substance have disappeared. And there is a panic-stricken production of the real and the referential, above and parallel to the panic of material production…

  এইসব কী বলছে ও? পাতি আর্টস গ্রাজুয়েট। তাও বাংলা মিডিয়াম। এতোটা ইংলিশ একনাগাড়ে বলল কীভাবে? কখন মুখস্থ করল? কে ভর করেছে ওর উপর? ও কি যোগিনী, পেত্নী, শাঁকচুন্নী?

  সুপ্রিয়া আমার দিকে তাকাল। চাঁদের আলোয় দেখি ভয়ে সে কাঁপছে। বলল, আজ তালে যাই?

   বউ বলল, স্পষ্ট শুনতে পেলাম, হ্যাঁ যাঁন আঁবাঁর আঁসঁবেন এঁইবাঁর মিঁছিঁল হঁলে আঁমাঁকেঁও আঁগেঁ থেঁকেঁ এঁকঁটু জাঁনাঁবেঁন

   সুপ্রিয়া পালাতে পারে। কিন্তু আমি আর পালাব কোথায়? সেই থেকে ছাদে গেলে পেচ্ছাপ আটকে যায়। 

হাওয়াটা বেশ রোমান্টিক। নিজেকে অতিলৌকিক মনে হচ্ছিল। বউ বলল, ৩০ টাকা গচ্চা গেল।

আমি বললাম, হুঁ

বউ বলল, র‍্যাফ যখন তাড়া করছিল, আমার কী কী মনে হচ্ছিল জানো?

-কী?

বউ বলতে শুরু করল –

) প্রথমেই মনে এসেছিল কবিগুরুর একটা কবিতা। সেই মানসীকাব্যগ্রন্থের নারীর উক্তিকবিতাটা। এখন মনে হচ্ছে, ভাগ্যিস র‍্যাফ আমাদের পিছু নিয়েছিল। কতদিন পর কবিগুরুর কোনো কবিতা আবার মনে পড়ল। কবিতাটা শোনো

মিছে তর্ক – থাক তবে থাক।

    কেন কাঁদি বুঝিতে পার না?

তর্কেতে বুঝিবে তা কি?       এই মুছিলাম আঁখি

এ শুধু চোখের জল, এ নহে ভর্ৎসনা

(আমি চমকে উঠলাম। তবে কি আমরা সত্যিই ভাইবোন? যেন শুনতে পেলাম ও বলছে কীঁ বঁলঁলে?)

কাকের সাইন্টিফিক নাম Corvus Linnaeus 

৩)  √ 2 -র কাছাকাছি মান হল – 

1.41421356237309504880168872420969807856967187537694807317667973799 

) মদন মিত্রের ফেসবুক লাইভ। এই সময় দৌড়ুতে গিয়ে আমার চটি ছিঁড়ে গেছিল। ফলে নিজেই হেসে উঠেছিলাম। লিঙ্কটা নিচে দেওয়া হল

https://www.facebook.com/MadanMitraofficial/videos/1173004803213130

(অবশ্যই ইয়ারফোন ব্যবহার করবেন)

ভোর হয়ে এসেছিল। নাইটির দুঃখ খানিক কমে এসেছিল আমাদের। হঠাৎ শুনি ফজরের আজান দিচ্ছে।

বউকে বললাম, চা খাবে? করে আনবো?

তখনি দেখি মোস্তাক চাচা টুপি পরে বেরিয়েছে। হাতে একখানা গাছ। ইদের দুদিন আগে নামাজ পড়তে গিয়ে হাতে গাছ কেন? চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী চাচা যাও কোথা?

চাচা এমনভাবে ছাদের দিকে তাকাল যেন আমরা আকাট মূর্খ। বলল, দুনিয়ার কী হাল জানো না?

-কী হয়েছে গো?

-কিছুই খবর রাখো না দেখি!

তার পেছনে ১২ বছরের ডেঁপো নাতিটাও রয়েছে। সে বলল, এখনি সাবধান হও দাদা। নইলে বড়ো বিপদ আমাদের।

এবার বউ জিজ্ঞেস করল, আরে হয়েছেটা কী?

 মোস্তাক চাচা বলল, দুনিয়ার বড়ো বিপদ গো। উন্নত দেশের মানুষেরা আমাদের পরিবেশ নষ্ট করে দিয়েছে। আসমান ফুটো করে দিয়েছে ওরা। সূর্যের কী তেজ দেখছ না? প্রতিদিন একটু একটু করে তাপমাত্রা বাড়ছে। বরফ গলে যাচ্ছে। এখুনি সাবধান না হলে এই দুনিয়া থেকে মানুষ জাতটাই লোপ পেয়ে যাবে। তাই আমরা ঠিক করেছি রোজ ভোরবেলা ৩৬৫টা করে গাছ পুঁতবো আমাদের চারপাশে। এতে করে পরিবেশটা রক্ষা করা যাবে। এ এক অসম যুদ্ধ। তবে এই যুদ্ধে আমাদের জিততেই হবে।

-কিন্তু তোমরা দুইজনে মিলে ৩৬৫টা গাছ রুইবে কীভাবে?

 কথাটা শেষ হল না। অমনি দেখি মোস্তাক চাচার পেছনে রুস্তম, তাঁর  পেছনে হাবিব, হাবিবের পেছনে জুম্মান। প্রত্যেকের হাতেই গাছের চারা। অর্জুন গাছ, নিম গাছ, পেয়ারা গাছ, তুলসী গাছআরো কতো কী।

পৃথিবী যখন ঘুমিয়ে রয়েছে, তখন আমাদের মহল্লা পৃথিবীকে বাঁচাতে ঘুম থেকে জেগে উঠছে।

বউকে বললাম, আমার না নেহেরুর কী একটা কথা মনে পড়ছে। কী যেনপুরোটা মনে করতে পারছি নাকী বলতো?

বউ আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ঐ দেখো।

দেখি, আনিসুজ্জামান, তার ফুফু আর ফুফুর ছেলে পাটের থলে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। তারা গাছ পুঁতবে না। কিন্তু এলাকা থেকে যাবতীয় প্লাস্টিক সরিয়ে এলাকাটাকে বাঁচাবে।

বউ চেঁচিয়ে উঠল, কিন্তু আমাদের তো গাছ নেই।

ওরা বলল, চলে এসো। আমাদের কাছে অনেক গাছের চারা আছে।

আমরা আর দেরি করলাম না। মেয়েকে ঘুম থেকে তুলে গাছ লাগাতে বেরিয়ে পড়লাম।

আমরা গাছ পুঁতছিলাম আর গান গাইছিলাম – সারে জাহাঁসে আচ্ছা

আকাশে তখন লাল সূর্য উঠেছিল।

 

  

শেয়ার করুন

8 thoughts on “কাটারা যেভাবে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ নাগরিকে পরিণত হল”

  1. Pingback: প্রথম বর্ষ, সংখ্যা ৬, আগস্ট, ২০২১ -

  2. অলোকপর্ণা

    কী বলবো বুঝে পাচ্ছি না, এই লেখাটা এইসময়েই লেখা সম্ভব।। এরকম একটা সময়েই।।

  3. Safiqul Alam

    ভিশন রকম সুন্দর। পড়া শুরু করলে শেষ না করে থামা যায় না। একদম খাসা। কেমনে লিখেন এত সুন্দর?

  4. Sarbajit Sarkar

    বুকে জড়িয়ে ধরে বলছি, এমন একটা লেখা লিখতে যে ধক লাগে সেটা সাদিকের আছে। চাবুক!!

  5. একরামূল হক শেখ

    এটুকুই বলি ভালো লাগল। মনে হচ্ছিল নাটকের সংলাপ।

  6. রেজানুল করিম

    দারুন লিখেছেন সাহেব। টুকরো টুকরো কথায় বাস্তব ফুটিয়ে তুলেছেন। যেমন আছে হিউমর তেমনি হিউমারের আলোর আড়ালে সার্কাস সারকাজম। হ্যাটস অফ।

  7. দীপাঞ্জনা

    এ তো চুপ করিয়ে দেওয়ার লেখা, পরবর্তী কোনও সংহত চিৎকারের জন্য

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *