রাজবন্দী

কাল্পনিক কথোপকথন 

– শুনেছ ও দেশে কী হয়েছে?

– কোন দেশে?

– আরে ওই দেশে।

– ওহ আচ্ছা, ওই দেশে? তাই বল। কিন্তু ওখানে আবার কী হল?

– কেন তুমি শুনতে পাওনি?

– আরে বলবে তো কী হয়েছে? তখন থেকে গৌরচন্দ্রিকা করে চলেছ।

– ছেলেটিকে ধরে নিয়ে গেছে তো।

– কোন ছেলেটিকে? ওদেশে তো অনেক ছেলেকেই ধরে নিয়ে যায়।

– আরে ওই ছেলেটি।

– ও বুঝেছি। ওই ছেলেটি! ঠিক। তা এবারে কী হবে?

– কী আবার হবে? চাবুকের ঘা খাবে। সব নিয়ে গেছে। আজ অব্দি যা কাজ করেছিল সব। বলে ও নাকি দেশদ্রোহী। দেশের নাম খারাপ করছে…বুঝেছ তো?

– দেশদ্রোহী মানে মোটেই দেশের নাম খারাপ করা নয়। যা মনে আসে তাই বলার আগে একটু ভাবতেও তো পারো।

– ওই একই ব্যাপার…

– আচ্ছা, একটা কথা বলতো…দেশদ্রোহী যদি দেশেই থাকে তাহলে তাকে ধরে নিয়ে যাবার কী আছে?

– কী যা তা বলছ তুমি? ও ছেলে দেশের নাম খারাপ করেছে। সারা বিশ্বের লোক জানতে পেরে যেত, তাই ধরে নিয়ে গেছে। বলছে, না ধরলে ঘুরে ঘুরে আরও এসব কাজ করে বেড়াতো।

– ভুল কী বললাম! দেশদ্রোহী দেশে থাকলেও শাস্তি পায়। ওকে শাস্তি দিলে বাকিরা ভয়ে থাকবে, সেটা বোঝো না? দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি! যাতে আর কেউ ওর মত দুঃসাহস না করে।

– তাই হবে হয়ত। কিন্তু এ যে বড় অন্যায়। ছেলেটি তো কিছুই করেনি। তবে কী জানো তো, ধর্মের নামে যে দেশ চলে, সেখানেই এসব সম্ভব। আমাদের দেশে এগুলো হবে না কখনও। জনসম্মুখে চাবুক মারা, ফাঁসি দেওয়া, ঢিল ছুড়ে হত্যা করা, এসবই বর্বরতার উদাহরণ। মধ্যযুগে পড়ে আছে ওরা। ও দেশের কোন উন্নতি হবে না। দেখতে পাচ্ছ না, সব ভালো মানুষগুলো ও দেশ ছেড়ে বিদেশ চলে যায়। তবে সেখানে গিয়েও কি শান্তি পাবে? এই একই ধর্মের লোকগুলো আবার সে দেশেও বোমা মারল। সব ভাল লোকের পীঠস্থান যে দেশ সেই দেশেই কিনা তোরা আক্রমণ করলি? তোদের ধর্মের জোর এত? নিজেদের লোকেদের আর কত নাম ডোবাবে এরা?

– চিন্তা কোরো না। পৃথিবীর সব দেশ মিলে কড়া পদক্ষেপ নেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্বর যুগের এই মানুষগুলোকে পৃথিবী থেকে মুছে দেবে। তবে আমরা কিনা সভ্য তাই অন্য দেশে সৈন্য পাঠাব না, কিন্তু পাশে থাকব এবং কূটপরামর্শ দেব কীভাবে এদের শায়েস্তা করা যায়।

– সেই ভাল। দিক ব্যাটাদের সোজা করে।

– তোমার মনে আছে আমাদের দেশেও দু’টি ছেলে যে ধরা পড়েছিল?

– কোন দু’টি ছেলের কথা বলছ?

– আরে ওই দুটি ছেলে! মনে নেই?

– ও হ্যাঁ। মনে পড়েছে। একটা তো ওরকমই এক ছেলে, আর অন্যটি আমাদের। কিন্তু ওই অন্যজন আবার নিজেকে এই দেশের বলে বিশ্বাস করে না। বলে এটা নাকি ওর দেশ নয়। আচ্ছা তুমিই বলো…এটা কোনো কথা হল? তাহলে তো যে কেউই বলতে পারে এটা আমার বাপ নয় আর তাই আমি ওকে গুলি করে মেরে ফেলব।

– হ্যাঁ পারেই তো। এ ঘটনাও আগে ঘটেছে। ছেলে বাপকে মেরেছে। ভাই ভাইকে মেরেছে। এমন কী হয় না ভেবেছ? খুব হয়। তবে ওই দু’টি ছেলের উচিৎ শিক্ষে হয়েছে। দুটোই দেশদ্রোহী। কিন্তু একটা ছোট খিঁচ থেকে যায়।

– কী?

– ঠিক করে ভেবে দেখো…ওরা দুজনেই যদি এই দেশের না হয়…মানে একজন তো আইনিভাবে নয়ই আর আরেকজন এটিকে তার নিজের দেশ বলে মনেই করে না…তাহলে ওদের কি আদপেও দেশদ্রোহী বলা উচিৎ? দু’জনেই তো তাদের মতো করে এক অন্য দেশে আক্রমণ করেছে। এই অবস্থায় দেশদ্রোহিতার অভিযোগটা হয়ত ঠিক ধোপে টেকে না। তার থেকে বলা যেতে পারে ওরা দেশপ্রেমী। নিজেদের মাথার ভেতরে যে স্বদেশের ভাবনা নির্মাণ করে ওরা এতটা অমানবিক কাজ করতে পারল, সেই দেশের প্রতি যে ওদের একনিষ্ঠ শ্রদ্ধা আছে সেটা কিন্তু মানতেই হবে। তা হোক না সেই দেশ আমার দেশের অপর। তাই আমার মনে হয়, ওদের বলা যেতে পারে অপ-দেশপ্রেমী আর সেই অর্থে সম-দেশদ্রোহী। ভেবে দেখো, ওরা কিন্তু সেই অপর দেশেও শান্তিতে থাকবে না। যে দেশ তারা চেয়েছে তা পুরোটাই অলীক। ওদের মাথার ভেতর তৈরি হওয়া একটা দেশ নামক ধারণা শুধু। এই ধারণা যদি কোনদিন আক্ষরিক আকার নেয় তখন সেই দেশও কিন্তু ওদের আপন করবে না। তোমায় আমি আজ একটি কথা বলি। ওরা দু’জন আসলে একই ভাবনার সন্তান। ওদের শরীর আছে ঠিকই কিন্তু ওরা মানুষ নয়। ওরা ভগবানকে ক্ষুণ্ণ করেছে জন্মলগ্নেই কিন্তু শয়তানকেও ওরা তুষ্ট করতে পারেনি। রক্তবীজের মত ওরা বেড়েই চলেছে, ওদিকে সৃষ্টির আদি রহস্যও ওদের জানা নেই। সংখ্যায় বাড়লেও ওদের অস্তিত্ব কীটপতঙ্গেরই সমান। তাই আমরা ওদের শাস্তি দিয়েছি বটে কিন্তু সেই শাস্তি অন্য মানুষের মত নয়। চাবুকের ঘা পড়বে যে শরীরে সে শরীর অন্যায় করলেও দেশ তাকে মাটির অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে না। কিন্তু যার কোন দেশ নেই, ধর্ম নেই, তার শরীর চিরতরে ভিনদেশে আবদ্ধ হয়ে থাকার জন্যই পূর্ব-নির্ধারিত ছিল। ভগবান ও শয়তানের মাঝখানে যে কারাগারের শুন্যতা, ওদের স্থান সেইখানেই।

কালকুঠুরি

অন্ধকার ঘরটায় চোখ খুলতেই ঠাণ্ডা লাগে প্রথমে। প্রাথমিক হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে উঠতেই অন্ধকারও চোখ সওয়া হয়ে যায়। আবছা কিছু অবয়ব যেন স্পষ্ট হয়। আন্দাজে যা মনে হয়, ঘরটি খুবই ছোট এবং আসবাবও প্রায় কিছু নেই বললেই চলে। যে খাটটিতে আমি শুয়ে আছি তাতে প্রায় পাশ ফেরা যায় না। খাটের সাথেই লাগোয়া, মাথার কাছে, একটা ছোট্ট টেবিল আর একটা চেয়ার। আমার পায়ের কাছে, অর্থাৎ খাটের অপর প্রান্তে দেয়ালের সাথে সাঁটা একটা বইয়ের তাক মতন, আর তার পাশেই দরজা। মস্ত বড় দরজা। খুব সম্ভবত লোহার কিন্তু এত কম আলোতে খুব যে কিছু বুঝতে পারছি তা নয়। এই দরজার উপরে, প্রায় সিলিং ঘেষা একটা ঘড়ি আর এই নিস্তব্ধ ঘরে সেই ঘড়ির টিকটিক আওয়াজই আমার একমাত্র শব্দ-সঙ্গী। আমার মাথার কাছের দেয়ালটির অনেক উঁচুতে একটা ছোট্ট লোহার শিক দেয়া জানালা। সেখান থেকেই চাঁদের আলো এসে ঘরে পড়ছে। অন্ধকারের কালো কাটিয়ে এক স্নিগ্ধ নীল আভায় ঘরের প্রায় সবকিছুই সুস্পষ্ট রূপ নিচ্ছে ধীরে ধীরে।

হঠাৎ একটা কনকনে দমকা হাওয়া এসে গায়ে লাগে। অভ্যেসবশত বিছানায় পা ছড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করছি গায়ে দেবার মত কোন চাদর আছে কিনা। সব বিছানায় চাদর বা কম্বল পায়ের কাছেই থাকে বলে আমার বিশ্বাস। অন্তত এখানে তো তার ব্যতিক্রম কিছু হলো না। তফাত শুধু এইটুকুই যে চাদর, কাঁথা বা তুলতুলে কম্বলের জায়গায় যা পাওয়া গেল তাকে চলতি বাংলায় চটের ছাল বলা যায়। জেলখানার ঘরে এর থেকে বেশি আর কী বা আশা করা যেতে পারে?

কিছু প্রশ্নের সহজ উত্তর

আমার নাম কল্পনা পণ্ডিত। আমার বয়েস ৩০ বছর, অর্থনীতি নিয়ে গবেষণারত এবং পেশায় অধ্যাপনা করি। অন্তত কাল অব্দি এটাই আমার একমাত্র পরিচয় ছিল। কিন্তু আজ আমি একজন রাজবন্দী। কাল বিকেলে যখন পুলিশ আসে তখন আমার বাবা দরজা খুলে দেন। বাড়ির সবাই জানত যে এই ঘটনাটা খুব শীঘ্রই ঘটতে চলেছে। তবে এতটা তাড়াতাড়ি যে হবে সেটা হয়ত ভাবেনি কেউ। অ্যারেস্টের সময় আমি নিজেও বিশেষ প্রতিরোধ করার চেষ্টা করিনি। আমার কোন যুক্তিই যে ধোপে টিকবে না তা আমি জানতাম। আমি বরাবর বিশ্বাস করে এসেছি যে রাজনৈতিক কারণে পুলিশকে ব্যবহার করা আর রাজনৈতিক পুলিশ, এই দুই কখনওই এক হতে পারে না। পুলিশ যদি রাষ্ট্রের তাঁবেদারি না করে তাহলে তাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে হয়। ‘পুলিশ’ শব্দটির মধ্যেই যে সার্ভিলেন্সের ধারণা নিহিত আছে তা আদর্শ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের পক্ষেই যাওয়া উচিত। কিন্তু যেহেতু আদর্শ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই একটি ভ্রান্ত ধারণা সেহেতু রাজনৈতিক পুলিশ-ও অবাস্তব। যে কোন দেশেই পুলিশ থেকে গেছে শুধুই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করবার জন্য। এর বেশি তাদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব হয়নি কখনও। তবে নীতিগত এবং রাজনৈতিক ভাবে আমি কোন প্রকারের চলতি নিয়ম মেনে নিতে পারি না, আমি সার্ভিলেন্সে বিশ্বাস করি না। যে কোন সিস্টেম, ক্ষমতা বা কোন প্রকার টপ-ডাউন চাপিয়ে দেওয়া নিদানেরই আমি বিরোধী। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাস করে, তার সমস্ত সুবিধে নিয়েও এই কথা বলার অধিকার আমার আছে বলে আমি বিশ্বাস করে এসেছি সবসময়।

পুলিশ একেবারে আটঘাট বেঁধেই এসেছিল। ওয়ারেন্ট এবং মহিলা পুলিশ নিয়ে প্রায় জনা সাতেক এসেছিলেন। আমি কিছুই জানতে চাইনি। জানতে চাওয়া বৃথা। আমি জানি আমার বিরুদ্ধে অনেক চার্জ। রাষ্ট্রকে অস্বীকার করা, ছাত্রদের প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডে উস্কানি দেয়া এবং সরকারি চাকরি করেও সরকারের বিরোধিতা করায় আমায় দেশদ্রোহী ভাবা হচ্ছে।

যখন প্রথম জানতে পারি যে আমার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার চার্জ আসতে চলেছে, সত্যি বলতে কী বড্ড মন খারাপ হয়েছিল। এই জন্য নয় যে আমায় ওরা হাজতে পুরবে। আসলে দেশদ্রোহী এমন এক দোষারোপ যা দিয়ে অন্তত আমার অবস্থান বিচার করা যায় না বলে আমি মনে করি। আমি আমার দেশকে ভালবাসি। আমার দেশের মাটি, জল, পশুপাখি, মানুষ এদের সবার প্রতি এক নাড়ীর টান অনুভব করি। তাই আমায় দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া হয়ত ঠিক নয়। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচরণ আর দেশকে অস্বীকার করার মধ্যে একটা তফাৎ আছে। দেশকে ভালবাসলে রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যারা আছে তাদের বিরোধিতা করা আমার কর্তব্য বলে জেনে এসেছি। কারণ রাষ্ট্র তার ক্ষমতার জোরে আমার বশ্যতা দাবী করে আর দেশ তার সবকিছু দিয়ে আমায় ধারণ করে রাখে।

এ তো গেল আমার কথা। কিন্তু যেদিন পুলিশ এল, আমি কিন্তু আমার কোন কথাই বলে উঠতে পারিনি। সম্ভব হয়নি। যারা আমায় ধরতে এল, তাদের কারো মুখেই দেশপ্রেমের ছিঁটেফোঁটাও দেখতে পাইনি। শুধু দেখলাম কিছু যন্ত্রচালিত মানুষ, ক্ষমতার বশ্যতায় আমার অস্তিত্বকে প্রশ্ন করল মাত্র। আমি জানি আমার লড়াই দীর্ঘ। আমি জানি আইনি লড়াইয়ে আমার জিত হবেই। কিন্তু আমি এও জানি, যে এ এক দীর্ঘ লড়াই। রাষ্ট্র আমায় অত সহজে জিততে দেবে না।

প্রথম দিন

কারাগারের নাম শুনলেই যে ঘৃণ্য যাপনের কথা আমাদের মাথায় আসে, আমার সাথে কিন্তু তা ঘটল না। গত সন্ধ্যেয় আমায় যখন এখানে নিয়ে আসা হয় তখন থানার বড়বাবু নিজে এসে আমার সাথে দেখা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই বলে আমায় বেশ খাতির করলেন বলা চলে। তার আদেশে আমায় যে ঘরে রাখা হল তাও আমাদের চেনা জেল ঘরের চাইতে বেশ আলাদা। আর প্রথম রাতে ঘুমের অসুবিধে হবে বলে আমায় একটা ঘুমের বড়িও দিয়ে দিলেন।

এই ঘরটি অনেকটা আমাদের বাড়ির চিলেকোঠার ঘরটির মত। আসবাবপত্রের বিশেষ বালাই না থাকলেও একটা ছোট টেবিল চেয়ার আছে, তার ওপরে রাখা আছে একটা জলের জগ এবং একটি গ্লাস। খাটের অপর প্রান্তে একটা ছোট্ট বইয়ের তাক আর সেখানে রাখা আছে কিছু ম্যাগাজিন আর ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে সাতটা দৈনিক খবরের কাগজ। বড়বাবু প্রথম সাক্ষাতেই আশ্বাস দিয়েছেন যে, আমি যা পড়তে চাই সেই সব বই আনিয়ে দেবার ব্যবস্থাও করা সম্ভব। কারাগারে এই জামাই আদর পেয়ে বেশ মজাই পেয়েছিলাম এক রকম।

সকালে ঘুম থেকে উঠতেই দেখি টেবিলে খাবার চলে এসেছে। একটা সাদা মেলামাইনের প্লেটে দুটো টোস্ট, একটা কলা আর একটা সেদ্ধ ডিম, সাথে এক কাপ চা। আমার ঘরের দরজাটা লোহার। তবে সেটা সিনেমায় দেখা লম্বা লম্বা লোহার রড দিয়ে তৈরি জেলের ঘরের মত নয়। জেমস বন্ডের ভিলেনরা কিডন্যাপ করে যেরকম ঘরে রাখে, অনেকটা সেরকম। এ ঘরে প্রাইভেসি আছে। বিছানায় শুয়েই আমি ঘরের এদিক ওদিক খুঁটিয়ে দেখলাম। কোথাও কোন ক্যামেরা চোখে পড়ল না। মনে মনে হেসেই ফেললাম এই ভেবে যে, এ কী ধরণের হাজতবাস? রাজবন্দী হলে যদি রাষ্ট্রের এই আদর পাওয়া যায় তাহলে নিজে থেকেই ধরা দিলে পারতাম। এতদিনে নির্বিঘ্নে পিএইচডিটা শেষ হয়ে যেত।

দরজার ওপরের দেওয়াল ঘড়িটা বলছে সকাল সাতটা বাজে। ঘরের এক কোণে যে কমোডটা রয়েছে সেখানেই প্রাতঃকৃত্য সারতে হবে। এ ঘরে প্রাইভেসি আছে তাই বিনা দ্বিধায় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া যায়। তবে সমস্যা হল ভেন্টিলেশনের। প্রাতঃকৃত্য সারার পর প্রায় আধ ঘণ্টা বসে রইলাম দুর্গন্ধ দূর হবার অপেক্ষায়। এই ঘরে একটা পাখা আছে বটে কিন্তু জানালা ওই একটাই। খুবই ছোট এবং অনেক উপরে হওয়ায় দুর্গন্ধ দূর হতে খানিক সময় লাগল। সময় কাটাতে দেয়ালের বইয়ের তাকে খবরের কাগজগুলোর দিকে এগিয়ে বুঝলাম যে সকালে খাবার দিতে এসে পুরনো খবরের কাগজের বদলে আজকের কাগজ রেখে দিয়ে গেছে কেউ। সাতটি কাগজের প্রত্যেকটিতেই আজ আমার গ্রেফতারের খবর। তিনটি কাগজ তো আবার আমার ছবিও ছেপেছে। যতক্ষণ ঘরের বাতাস শুদ্ধ হবার অপেক্ষা করছি ততক্ষণে পাঁচটি কাগজে চোখ বুলিয়ে নিলাম চট করে।

সাড়ে সাতটার সময়, যখন ঘরের দুর্গন্ধ দূর হল বা আমিই অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম, তখন সকালের খাবার খেয়ে নেবার অভিপ্রায়ে চেয়ারে গিয়ে বসলাম। আমি কিছুতেই ভেবে উঠতে পারছি না এরা আমার কাছ থেকে কী চায়। এভাবেই যদি রাখতে হত তাহলে তো আমায় গৃহবন্দী করে রাখলেই পারত। এ তো প্রায় নিজের বাড়ির চেয়েও আরামে থাকা। বড়বাবুর কথা যদি ঠিক হয় এবং আমায় যদি আমার পড়ার সমস্ত বই এনে দেওয়া হয় আর তার সাথে এভাবেই হাতে হাতে খাবার জোগান দিয়ে যাওয়া হয় তাহলে তো এখানে থাকাই শ্রেয়।

এরকম সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে আমি খাওয়া শেষ করলাম। আর সাড়ে আটটার মধ্যে সব কটা খবরের কাগজ শুরু থেকে শেষ পড়ে নিয়ে বিছানায় গিয়ে গা এলিয়ে দিলাম। অনেক কিছু ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখ লেগে এল জানি না তবে ঘুম ভাঙল দরজা বন্ধ হবার আওয়াজে। চোখ খুলতেই দেখলাম প্রায় একটা বেজে গেছে আর কেউ একজন এসে আমার এঁটো বাসন তুলে তার যায়গায় দুপুরের খাবার রেখে গেছে। আমি সচরাচর দিনের বেলায় এত ঘুমোই না। হয়ত কাল সন্ধ্যের এত উত্তেজনা, নতুন জায়গা আর তার সাথে গত রাতের ঘুমের ওষুধের জন্যই এতক্ষণ ঘুমিয়েছি। সিলিং ফ্যানটা বেশ আস্তে ঘুরছে। গরম লাগছে, তাই স্নান না করে খেতে মন চাইল না।

এ ঘরে টয়লেটের ব্যবস্থা আছে কিন্তু স্নান করার কোন জায়গা নেই। কীভাবে কাউকে ডাকব সেটাও বুঝে উঠতে পারলাম না। দরজায় দুবার ধাক্কা দিয়েও কারো সাড়াশব্দ না পেয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নেওয়াই স্থির করলাম। আশা করি এত ঘুমের পরে এবেলা জেগেই থাকব আর মনে মনে ঠিক করলাম, যখন থালা নিতে আসবে তখনই স্নানের ব্যাপারটা জিগ্যেস করে নেব।

দুপুরের খাবারও বেশ ভাল। ছিমছাম আর স্বাস্থ্যকর। প্রায় বাড়ির খাবারের মতই। জেলের খাবারের যে দুর্নাম আছে তার আশেপাশেও নয় এ খাবার। এক বাটি ভাত, ডাল, আলুসেদ্ধ, শুক্তো, আমের চাটনি আর দুটো পাঁপড়। নিরামিষে আমার অরুচি নেই। বরং প্রথম দিন একটু হালকা খেলেই ভাল। নতুন জায়গা, সেখানে মানিয়ে নেবারও তো একটা ব্যাপার আছে। তবে ওবেলা ভাতের যায়গায় রুটি হলে মন্দ হয় না।

রাত আটটার সময়ে যখন চোখ খুলল তখন ঘরে একটা টিমটিমে হলুদ আলো জলছে। এ আলোতে চারদিক একটু স্পষ্ট হয় মাত্র। সারা গায়ে এখনও ক্লান্তির ছাপ। এ যেন কুম্ভকর্ণের ঘুমে পেয়েছে আমার।

প্রতিদিন

আজ দ্বিতীয় দিনেও সেই এক অবস্থা। চোখ খুলে দেখি কেউ একজন খাবার আর আজকের খবরের কাগজ দিয়ে গেছে। আমিও কালকের মতই প্রাতঃকৃত্য সেরে আধ ঘণ্টা ঘরের দুর্গন্ধ কাটাবার অপেক্ষা করে খাবার খেয়েছি সাড়ে সাতটা নাগাদ। আর সমস্ত খবরের কাগজ পড়া হয়ে গেলে আকাশকুসুম ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছি আবার। দুপুরে যখন ঘুম ভাঙল সেই দেরি হয়ে গেছে। কেউ এসে সকালের বাসন নিয়ে গেছে আর রেখে গেছে দুপুরের খাবার। স্নান হল না, পোশাক বদলানো হল না। পাল্টাল শুধু খাবারের মেনু। আজ দুপুরে মাছ আর রাতে ডিম দিয়েছে। খাওয়া বাদে আমিও বাকি সময় অঘোর ঘুমে কাটিয়েছি।

এভাবে প্রায় মাস ঘুরতে যায়। খবরের কাগজও আমায় ভুলে গিয়েছে আজ দিন দশেক হল। শুরুতে বেশ খবর পাচ্ছিলাম যে আমার বন্ধুরা আমায় নিয়ে আন্দোলন করছে, বিদ্বজ্জনেরা আমার হয়ে রাষ্ট্রের সাথে তর্ক চালাচ্ছেন কিন্তু এখন সেসবের আর কোন উল্লেখ নেই কাগজে। আমার আর দিনের হিসাব নেই। টেবিলে আমার কয়েকটা পড়ার বইও এসে গেছে কিন্তু আমি পড়তে পারছি না। সকালের ওই ঘন্টাখানেক ছাড়া সারাদিন প্রায় চোখ খোলাই রাখতে পারছি না। স্নান করতে না পেরে গায়ে গন্ধ হয়ে গেছে, চুলে জট পড়ে যাচ্ছে। ঘরের টয়লেটেও একটা বোঁটকা গন্ধ যা এখন প্রায় নাকে সয়ে গেছে বলা যায়। প্রতিদিনের খাবার ছাড়া এই ঘরে আর কিচ্ছুটি বদলায়নি। বিছানার চাদর, আমার জামা, অন্তর্বাস কিচ্ছুটি না। অপরিষ্কার কমোড হলুদ হয়ে আছে আজ প্রায় বেশ কয়েকদিন। খুব বুঝতে পারছি আর দিন খানের মধ্যেই আমার মাসিক শুরু হবে। এভাবে ঘুমোতে থাকলে স্যানিটারি ন্যাপকিন চাইবার সুযোগটুকুও পাওয়া যাবে না। আমি বুঝতে পারছি আমার সাথে কী ঘটছে। কিন্তু তার সাথে এও জানি, শত চিৎকারেও এখানে কেউ সাড়া দেবে না।

শাস্তি শুরুর দিন

আজ সকালে ঘুম ভাঙল আরও একটু পরে। রোজ নিয়ম করে আমার সাতটায় ঘুম ভাঙে আর আজ সেই ঘুম ভাঙতে হয়ে গেল প্রায় আটটা। ঘুম থেকে উঠেই তলপেটে একটা অসম্ভব যন্ত্রণা অনুভব করছি। বুঝতে দেরী হল না যে আমার মাসিক শুরু হয়ে গেছে। উঠে বসে দেখি বিছানার অনেকটাই রক্তে ভিজে গেছে। প্রথমদিন এখানে আসার পর আমাকে যে জামাটা পরতে দেওয়া হয়েছিল সেই আধোয়া জামার নিচটা আর আমার এক মাস পুরনো অন্তর্বাস প্রায় পরে থাকার অযোগ্য হয়ে গেছে। সকালে প্রাকৃতিক কাজ সারতে যখন অন্তর্বাস খুলতে হল তখন ঘেন্নায় গা গুলিয়ে উঠল আমার। এ কাপড় আর নিজের গায়ে তুলতে সাহস হল না। কিন্তু আর কিছুই পরার মত নেই বলে অধিক ঘেন্নাতেও রক্তে ভেজা অন্তর্বাসটি পরে নিলাম। খাবার খেতে আর ইচ্ছে করছে না আজ।

কিন্তু শরীরের সাথে সাথে আজ এই কারাগারের নিয়মেরও একধরণের বদল ঘটল। আমার আর আগের দিনগুলির মত অত ঘুম পাচ্ছে না। সকাল প্রায় সাড়ে নটা নাগাদ আমার ঘরের বাইরে কয়েকজনের পায়ের আওয়াজ পেয়ে আমি সোজা হয়ে বসলাম। মন বলছে ওরা আমার কাছেই এসেছে। আর মনের কথা সত্যি প্রমাণ করে, এই লোহার দরজার অপর প্রান্ত থেকে এক চেনা কণ্ঠ ভেসে এল। ‘মিস পণ্ডিত, আপনি কি ঘুমোচ্ছেন?’ আমি তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলাম – ‘না’।

আমি ভেবেছিলাম সকালে খাবার দিতে এসে নিশ্চয়ই ওরা বুঝেছে যে আমায় আজ অন্য দিনের মত ঘুমোতে দিলে চলবে না। আমার স্নানের প্রয়োজন, ধোয়া কাপড় আর ন্যাপকিনের প্রয়োজন। এই এক মাসে আমার ওপর যে পরোক্ষ অত্যাচার চলছে তা নিশ্চয়ই আমার ভ্রম। ওরা হয়ত এতদিন চেষ্টা করেছে আমায় জাগিয়ে স্নান করিয়ে পরিষ্কার করে দিতে। আমিই হয়ত এত ঘুমিয়েছি যে শত ডাকাডাকিতেও আমার চোখ খোলেনি। হয়ত ওরা আমায় বিরক্ত করতে চায়নি। আমি তো আর বাকিদের মত দাগী আসামি নই। আমি হলাম একজন রাজবন্দী। তাই আমায় ওরা বাকিদের মত ধমকে, অপমান করে, গায়ে হাত দিয়ে জাগাতে চায়নি হবে। খুব সাময়িক হলেও আমার মনে একধরনের আশার সঞ্চার হয়েছিল। আমার উত্তরে আশ্বস্ত হয়ে লোহার দরজা খুলে, সাথে একজন পুরুষ কনস্টেবল এবং একটি হুইলচেয়ার নিয়ে বড়বাবু হাজির হলেন। দুজন অচেনা পুরুষের সামনে রক্তে ভেজা কাপড় গায়ে নিজেকে কেমন যেন নগ্ন মনে হল আমার। তাও মনে সাহস এনে, লজ্জা ত্যাগ করে, আমি বলে উঠলাম – ‘আমায় স্নান করতে হবে। আমায় কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসও এনে দিতে হবে। এ’কদিন আমার কারো সাথে দেখা হয়নি তাই বলতে পারিনি। আর কেউ যদি এই কমোডটাও একটু পরিষ্কার করে দিতে পারে তাহলে বেশ ভালো হয়’।

বড়বাবু আমার কথায় কান দিলেন না। তার সাথে থাকা কনস্টেবলটি আমাকে এক প্রকার বলপূর্বক হুইলচেয়ারে বসিয়ে ঘর থেকে বার করে নিয়ে এল। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি এতটাই চমকে গেলাম যে আমার মুখ দিয়ে একটি কথাও বেরোলনা আর।

আমায় নিয়ে এসে যে ঘরে বসান হল সেটি একটি অ্যান্টিচেম্বার গোছের। এও সিনেমায় দেখা। আমার সামনের দেয়ালে কাচ লাগানো আর তা দিয়ে অন্য আরেকটি ঘর দেখা যাচ্ছে। আমি সিনেমায় দেখেছি এই ধরনের অ্যান্টিচেম্বার থেকে বড় পুলিশ আসামীদের জেরা দেখে। ওই ঘরে যারা থাকে তারা এই ঘর দেখতে পায় না। তাদের কাছে এই কাচের দেয়ালটি শুধু একটি আয়নার মত। তবে সিনেমার ভয়ংকর দুঁদে ভিলেন সে জানে আয়নাটা আসলে কাচ। ওদিকে বড়বাবু আমার পাশে একটি চেয়ারে বসলেন।

প্রায় পাঁচ মিনিট আমরা এভাবে বিনা বাক্যে বসে রইলাম। কেউ কারুর সাথে কথা বললাম না আর আমি তো প্রায় ভুলেই গেলাম যে আমার মাসিক চলছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই কাচের দেওয়ালের ওইপারে একজন পুরুষ এক তের-চোদ্দ বছরের মেয়েকে নিয়ে প্রবেশ করল। আমার ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। আমি হতবাক হয়ে বড়বাবুর দিকে চাইলাম কিন্তু তিনি একদৃষ্টে সামনের দিকে চেয়ে আছেন। এ ঘরে চারদিকে স্পিকার লাগানো।

আমরা শুনতে পেলাম অপর প্রান্তের সেই পুরুষটি মেয়েটিকে জিজ্ঞেসা করছে, ‘তোর বাবা মা এখন কোথায় আছে’? মেয়েটি কোন উত্তর দেয় না। পুরুষটি আবার প্রশ্ন করল, এবারে তার গলার স্বর আরো কঠিন, ‘তুই চুপ করে আছিস মানেই তুই জানিস। আমাদের বলে দে তাহলে ছেড়ে দেব নাহলে কিন্তু তোর নিস্তার নেই’। মেয়েটির দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। খুবই মৃদু স্বরে সে বলল ‘আমি জানি না স্যার। আজ প্রায় তিন মাস হল আমার বাবা মায়ের খোঁজ নেই। আমি বাড়িতে দিদার কাছেই থাকি’।

– তুই মিথ্যে বলছিস। আমাদের কাছে খবর আছে তোর বাবা মা এই তিন দিন আগেও তোদের এলাকায় এসেছিল। তুই কী বলতে চাস ওরা তোর সাথে দেখা করেনি?

– না স্যার। সত্যি বলছি আমি। ওরা বাড়ি আসেনি।

– তোর বয়েস কত?

– তেরো।

– প্রেম করিস?

মেয়েটি চুপ করে মাথা নিচু করে থাকে।

– ব্যাটাছেলের মেশিন দেখেছিস কখনো?

লোকটির কথায় মেয়েটি চমকে উঠল। আমি দেখতে পেলাম তার চোখে ভয় আর ঘেন্না মেশানো চাউনি। খুব বুঝতে পারছি সে জানে। ওইটুকু মেয়েটি জানে ওর সামনে কী বিপদ উপস্থিত। কিন্তু ওর কিছু করার নেই। এই পিশাচের হাত থেকে ওর মুক্তি নেই। কারণ মুক্তিপণ বাবদ তার থেকে যা চাওয়া হচ্ছে সেই খবর তার কাছে নেই। সে মাথা নিচু করল আবার।

আমার এবং বড়বাবুর চোখের সামনে সেই লোকটি একে একে মেয়েটির গায়ের সমস্ত কাপড় খুলে দেয় প্রথমে। বছর তেরোর ওই মেয়ে, যার শরীরে বড় হয়ে ওঠার ছাপ স্পষ্ট হচ্ছে আস্তে আস্তে, দু’হাতে আগলে রেখেছে নিজেকে। তার কম্পনরত শরীর জানান দিচ্ছে এক ভাষাহীন দুর্বলতা। আমার পাশে বড়বাবু তার বাঁ পা-টা ডান পায়ের ওপরে রেখে একটু নড়ে চড়ে বসলেন। আর আমি স্থির হয়ে দেখে গেলাম সেই দৃশ্য। আর আমার কানে তার প্রত্যেকটি চিৎকার এসে বিঁধল নরকযন্ত্রণার মত।

সেদিনের সেশন চলেছিল প্রায় ঘণ্টা দুয়েক। দু ঘণ্টা পর, যখন সবকিছু থামল সেই কনস্টেবল এসে উপস্থিত হল আমাদের ঘরে। বড়বাবু তাকে নির্দেশ দিলেন আমাকে বাথরুমে নিয়ে যাবার জন্য। খুবই নরম গলায় তিনি বুঝিয়ে বললেন –

‘ওঁকে সাবধানে নিয়ে যাবে। ওঁর স্নানের প্রয়োজন। আমি প্রমিতাকে বলে রেখেছি, ওঁর প্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিস এনে রেখেছে। যত্নে যেন কোন খামতি না থাকে। নতুন জামাও এনে রাখতে বলা আছে। দেখো ওঁর যেন কোন অসুবিধে না হয়। ইনি কিন্তু আমাদের বাকি আসামিদের মত নন। ইনি একজন রাজবন্দী। আজ থেকে প্রতিদিন আমার সঙ্গে এই ঘরে দু’ঘণ্টা করে কাটাবেন। ওঁর দেখভালের দায়িত্ব আজ থেকে তোমার, যতদিন না কোর্টের ডেট পড়ছে।’

গল্পটি ২০০১৭ সালে লেখা এবং লেখিকার ব্লগে এর প্রথম ড্রাফট প্রকাশিত হয়েছিল। 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *