গল্প বলেন সুখলতা

হযবরল আর আবোল তাবোলের নাম হয়ত তোমরা শুনেছ সবাই। নিশ্চয়ই জানো লেখক সুকুমার রায়ের নাম। আজ যাঁর কথা বলব, তিনি সুকুমারের দিদি, ভাল নাম সুখলতা। রবীন্দ্রনাথের রাজর্ষি উপন্যাসের দুই শিশু হাসি-তাতার নাম অনুসরণেই সুকুমারের নাম হয় তাতা, সুখলতার নাম হাসি।

কিন্তু, সুকুমার রায়ের দিদি, এটুকুই কি তাঁর পরিচয়? না। বাংলায় রূপকথা লেখা, নাটক লেখা, কমিক্স আঁকা, ছোটদের লেখাপড়া শেখার নতুন পদ্ধতি খোঁজা, ওড়িয়া সাহিত্যের অনুবাদ, অনেক কিছু করেছেন সুখলতা। তাঁর পরিচয় তাঁর নিজের কাজেই।

বাবা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সন্দেশ পত্রিকা বের করতেন। ছোটদের জন্যে পত্রিকা, ছোটরাই তো লিখবে সেখানে। তাই সেই পত্রিকায় হাতমকশো করতেন তাঁর ছেলেমেয়েরা। সুখলতা সবার বড়। তাঁর লেখা গল্প, ছড়া, তাঁর আঁকা ছবি সবই গোড়ার থেকে বেরিয়েছে সন্দেশে।

ছোটদের জন্যে লেখা কেমন হবে? আমরা অনেকেই বোধহয় বুঝি যে, ছোটদের জন্যে লেখা ছোটরা ততটা পড়ে না, যতটা তা নিয়ে ভাবে বড়রা। তাদের ‘উপযোগী’ বলে কিছু একটা বড়রা নিজেরাই বানিয়ে দিয়েছে, আর তৃপ্তভাবে মনে করেছে যে ছোটরা ভারি খুশি হচ্ছে এই বানানো দুনিয়ায়। সেই হিসেবে শিশু-কিশোরসাহিত্যের নৈতিক অবস্থান বা পথনির্দেশ নিয়ে অনেক ভাবনা দানা বেঁধেছে নানা সময়। ছোটদের জন্যে লেখায় কল্পনাকে কতটা প্রশ্রয় দেওয়া হবে? কতটা জ্ঞান-বিজ্ঞানের ডোজ দেওয়া হবে লেখার ভেতর?—এইসব প্রশ্ন নিরন্তর চলেছে। “শিশুসাহিত্যে সুরুচি” বলে সুখলতার একটি বহুচর্চিত প্রবন্ধ আছে। তাতে তিনি বলতে চেয়েছিলেন, এদেশি বাচ্চাদের জন্যে লেখা সাহিত্যে যেন রোমান্স-টোমান্স ছড়ানো না থাকে, বরং স্নেহ-প্রীতি-শ্রদ্ধা এইসব ভাল-ভাল মূল্যবোধের জায়গান গাওয়া হয় তাতে। বালক-বালিকার মনে বিবাহ-ব্যাপারের বীজ ঢুকে গেলে খুব মুশকিল, এমনই মনে করেছিলেন তিনি। একালের সাপেক্ষে এই অবস্থান একটু সেকেলে লাগলেও বুঝতে হবে, যে সময়ে বাল্যবিবাহ আইনের ফাঁক গলেও দিব্যি গেড়ে বসে আছে মানুষের মনে, তখন ছোটদের মন থেকে একরকম জোর করেই অকালপ্রেমের ভাব সরানোর চেষ্টা করাই কিন্তু আধুনিকতার লক্ষণ। একই লেখায় তিনি বলেছিলেন, পুরনো আমলের রূপকথা কী বিচ্ছিরি নিষ্ঠুরতা, নৃশংসতা, হিংসুটেপনা, মানুষে মানুষে বিভেদ আর ঘরের রাজনীতি দিয়ে ঘুলিয়ে আছে, নতুন করে লিখতে হবে ছোটদের জন্যে গল্পকথা। পুরনো দিনের পুরনো কথাকে তুড়ি মেরে অস্বীকার করতে চাইলেন না তাঁরা, কতদিনের কত জীবনের সুর যে বেজে চলেছে সেসব গল্পে, কত মানুষের মুখের ভাষা মাটি দিয়েছে সেই গল্পের চারায়; কিন্তু তার একটা সংশোধিত, একেলে সংস্করণ হওয়া দরকার। সেই উদ্দেশ্য মাথায় রেখেই লিখেছিলেন আলিভূলির দেশে, নূতনতর গল্প। বিজ্ঞান, ইতিহাস বা ভূগোলের কথা নয়, মানে, নিছক তথ্য জুড়ে তথ্যের শেকল বানানো নয়, ছোটদের কল্পনার রঙিন গ্রহনক্ষত্রও জ্বলজ্বলে করে রাখতে চেয়েছিলেন সুখলতা। সেই ঝলমলে আকাশে দেবতা-অসুরের যুদ্ধ চলে, কুবের যায় পরশপাথর খুঁজতে, বরফরঙের পরীরা ডানা ঝাপটায়। আবার একই সঙ্গে ইছাপুর, বালতি এসব গপ্পে চারপাশের চেনা মানুষজন আর তাদের রাগ-দুষ্টুমি-পাকামিও আছে। রূপকাহিনির ছুঁতে না পারা আকাশ আর বাস্তবের ধরতে পারা জলমাটিপাথরকে একই মলাটের ভেতর বসিয়ে নেওয়া আসলে কল্পনা আর বাস্তবের সেই অবাধ মেলামেশারই ছবি। চাই তো দুটিকেই, বাস্তবকে নইলে কল্পনার, স্বপ্নকে নইলে রোজকার জীবনের চলে কীকরে? রবীন্দ্রনাথের সে, অবনীন্দ্রনাথের ক্ষীরের পুতুল, গগনেন্দ্রনাথের ভোঁদড় বাহাদুর, উপেন্দ্রকিশোরের ‘ছেলেদের রামায়ণ-মহাভারত’, পরে সত্যজিতের সুজন হরবোলা, পুরনো লোকগল্পকে নতুন সুরে বলার প্রবণতা তৈরি করেছিল। সেই অভ্যেস বজায় রেখেছিলেন সুখলতা। সেজন্যেই নতুন দিনের ছেলেমেয়েদের জন্যে ঈশপের গল্প বা হিতোপদেশের গল্পও নতুন ভাষায় লেখেন, অবশ্য সাধুরীতি প্রয়োগ করেন, হয়ত ঈশপের গল্পের প্রাচীনত্বের স্বাদটা যাতে একেবারে হারিয়ে না যায়, সেজন্যেই। গাধা আর শুয়োরের গল্পে লেখেন- “বরাহ কাছাকাছি আসিতে, গর্দভ হঠাৎ বিষম জোরে ধাঁই করিয়া এক লাথি বসাইয়া দিল তাহার মাথায়! লাথির চোটে বরাহ মাথা ঘুরিয়া হড়কাইয়া পিছাইয়া গেল কত দূর! তাজ্জব ব্যাপার! এমনটা যে হইবে, তাহা বরাহের কল্পনাতেও আসে নাই!”

১৯৫৭ সালে প্রাথমিক শিক্ষার উপযোগী চমৎকার বই-ভাবনার জন্যে সুখলতার লেখা ‘নিজে পড়’ জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল। এই বইতে নানারকম নকশা করে বর্ণপরিচয় করানোর ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। ক্রমানুসারে নয়, চেহারার মিল দেখে (যেমন ক-এর সঙ্গে ধ, বা ড-এর সঙ্গে জ) অক্ষরকে চেনানোর কথা বলেছিলেন তিনি। এখন প্রাথমিক শিক্ষায় বেশিরভাগ জায়গাতেই এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, এই নতুন ধরণের অক্ষরজ্ঞানের কথা অনেক আগেই ভেবেছিলেন তিনি, সম্ভবত ১৯১৭ সালে প্রকাশিত পড়াশুনা নামে ছোটদের পড়ার বইতে। শুধু ইস্কুলে পড়ার বই নয়, ঘরের ভেতর অসুখ যাতে বাসা না করে, তার জন্যে সাধারণ স্বাস্থ্য বিষয়ে নিয়ে ছোট ছোট ধারণা দিয়েছেন অনেক লেখায়,- দাঁত মাজা, হাত ধোওয়া, স্নান, পরিচ্ছন্নতা, পরিশুদ্ধ জল খাওয়া এইসব নিয়ে গল্পের ঢঙে কথা বলেছেন। বুঝতে পারা যায়, শুধু রূপকথার দুনিয়ায় নয়, ছোটদের সামগ্রিক বেড়ে ওঠা নিয়েই তাঁর একটা অভিভাবকের মত চিন্তা ছিল;- উদ্বেগ নয়, সক্রিয় একটা চিন্তা। সাহিত্য লেখার জন্যে নয়, সামাজিক জোরালো তাগিদটাই এতে বেশি কাজ করেছে। রুডইয়ার্ড কিপলিঙের লেখার অংশ অনুবাদ করেছেন চিতাবাঘের গায়ের ছাপ, আর সেই ঘরানায় নিজেও লিখেছেন হাতির বাচ্চা বা জেলিফিশ। চিতাবাঘের গায়ে কেমন করে গোলগোল চিহ্ন এল, হাতির শুঁড়ই বা কেমন করে অত লম্বা হল, কেন অমন চ্যাপ্টা বিদঘুটে চেহারা জেলিফিশের, এই নিয়ে গালগল্প। বিজ্ঞান নয়, বিবর্তনের সত্যিকার ইতিহাস নয়, একদমই কল্পনাকথা। 

রূপকথার গল্প বলতে বলতেও মাঝেমাঝে সুখলতা বলে দেন ইতিহাসের কথা। প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ, আদিম যুগের প্রাণী, এদের জীবন সম্পর্কে বিজ্ঞান যে হদিশ দেয় আমাদের, তাকে গল্পের আদলে বলেন। যেমন ধরুন, পাথরে লেখা ইতিহাস-এ বলা হচ্ছে- “…নদী মাটি বয়ে এনে সমুদ্রে ফেলছে, আর সমুদ্রের তলাটা ক্রমে উঁচু হচ্ছে। এর মধ্যে একটা হাতি নদীতে জল খেতে এসেছে। হাতিটার একটা দাঁত কেমন করে ভেঙে, নদীর স্রোতে ভেসে গেল। জলের সঙ্গে, মাটির সঙ্গে সে দাঁতও গিয়ে পড়ল সমুদ্রের নীচে। আর একদিন একটা মরা পাখি জলে ভেসে এসে সমুদ্রের নীচে পড়ল। তখনও কিন্তু কাদা-মাটি ক্রমাগতই ধুয়ে এসে সমুদ্রের জলে পড়ছে, তার আর বিরাম নেই।”…আদৌ বোঝা যাচ্ছে কি যে এখানে আসলে বলা হচ্ছে ভূতত্ত্বের কঠিন কঠিন সব কথা?

১৩২৮-এর পৌষ সংখ্যায়, সম্ভবত ইংরেজি ১৯২২ সালে সন্দেশ-এ বেরিয়েছিল সুখলতার আঁকা একটি ছবিগল্প। কমিক্সে চরিত্ররা কথা বলে কেমন করে? স্পিচবেলুন। ছবির পাশে তিরচিহ্ন দিয়ে বেলুনের মত ফোলাটে একটা ফাঁকা জায়গায় তার সংলাপ লেখা থাকে। আর কথাটা মুখে না বলে মনে মনে ভাবলে বেলুন আর বেলুনের সুতোর বদলে থাকে বড় বুদ্‌বুদ্‌ আর অনেক ছোট ছোট বুদ্‌বুদের সারি। এই পদ্ধতি সুখলতা ব্যবহার করেছিলেন বাংলায়। ছবি আঁকতে ছোটবেলায় শেখেননি, কিন্তু ছবি আঁকার প্রতি এক স্বাভাবিক আগ্রহ ও দক্ষতা তাঁর ছিল। মনসামঙ্গল-এর বেহুলা-লখিন্দরের আখ্যানকে চিত্ররূপ দিয়েছিলেন তিনি; ইদানীংকালের গ্রাফিক আখ্যানের ধরণটিই ছিল সেই কাজে।

গল্পের সঙ্গে ছবি বা ছবির মাধ্যমে গল্প, এ তো ছিলই; কখনো কখনো গল্প বলার ধরনটিও যেন ছবি এঁকে দেয় মনের মধ্যে। রায়বাড়ি আর ঠাকুরবাড়ির মানুষজন বাংলা ভাষাকে কত মাধুর্য ঢেলে দিয়েছেন, কত নতুনতর শব্দ গড়েপিটে নিয়েছেন! হিতোপদেশের পিঠের গল্প লিখতে গিয়ে সুখলতা পিঠের ছড়া বলেন, “আমি গোল পিঠে,/ লাল লাল, মিঠে/ ময়দায় ঠাসা/ ঘিয়ে ভাজা, খাসা/ রেখে দিল ওরা তাকে/ পালিয়েছি সেই ফাঁকে।” আরেক গল্পে পাড়াগাঁ থেকে আসা ছোট্ট ছেলে নিতাই তার মামাবাবুর অফিসঘরে নীল খড়ি দিয়ে একটা মস্ত পাখি আঁকে। কীরকম পাখি? এঁকাচোরা। সুখলতার লেখায় এঁকাব্যাঁকা বা ব্যাঁকাচোরা নেই, আছে এঁকাচোরা। আছে ইকথিওসরাসের বাংলা ‘মাছ-টিকটিকি’। আর আছে পুচকু একটা শুঁড়হীন কৌতূহলী হাতির ছানা, সে পথে খাবার জন্যে অনেক কলা আর তরমুজ নিয়ে, বাড়ির সকলকে নমস্কার করে বেরোয় লিম্পোপো নদীর ধারে। কুমির কী খায়, জানতে হবে না? আহা রে, হাতির ছানার যদি একজন হাসিদিদি থাকত! সব বুঝিয়ে দিত কেমন গপ্প করে!

চিত্রঋণ আনন্দবাজার পত্রিকা। শিল্পী – কুনাল বর্মণ। 

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.