সুলেখা সান্যাল স্মরণে

সাহিত্যিক ও রাজনীতিক সুলেখা সান্যালের (১৯২৮-১৯৬২) নাম আজ বিস্মৃত। অথচ তাঁকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম মৌলিক নারীবাদী সাহিত্যিক বলা চলে৷ 

ফরিদপুর জেলার বর্ধিষ্ণু এক গ্রাম কোড়কদীতে এক ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবারে জন্ম। সাত বছর বয়সে চট্টগ্রামে লেখাপড়া শুরু করলেও ১৯৪২ সালে চট্টগ্রামে বোমা বিস্ফোরণের পর নিজের গ্রামে ফিরে আসেন এবং ১৯৪৪-এ প্রাইভেট-এ পরীক্ষা দিয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৪৬ সালে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে আইএ পাস করে কলকাতায় গিয়ে ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউট-এ ভর্তি হন বিএ পড়ার জন্য। বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে গ্রেফতার হওয়ার কারণে যথাসময়ে বিএ পরীক্ষা দিতে পারেননি। জেল থেকে পরীক্ষা দিয়ে তিনি পরে বিএ পাস করেন। কৈশোরকালেই তিনি প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে কলকাতাতে চলে যাওয়ার পরও তাঁর সেই চর্চা বজায় থাকে। বিয়ে করেন রাজনৈতিক সহকর্মীকে। ১৯৫৭ সালে লিউকেমিয়া ধরা পরলে চিকিৎসার জন্য মস্কো গিয়েছিলেন। ১৯৬২ সালের ৪ ডিসেম্বর চৌত্রিশ বছর বয়সে সুলেখা সান্যাল মারা যান।

তাঁর উপন্যাস ‘নবাঙ্কুর’ (১৩৬২ বঙ্গাব্দ)-এ তৎকালীন বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ ও তাতে বেড়ে ওঠা এক মেয়ের কাহিনী বর্ণিত, যাকে এক নারীবাদী বিল্ডুংসরোমান বলা যায় (bildungsroman = যে উপন্যাসে প্রধান চরিত্রের শৈশব থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত বেড়ে ওঠা ও বিকাশের কথা থাকে)। আত্মজৈবনিক ‘নবাঙ্কুর’ ছাড়াও ১৯৬৪ সালে মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দেওয়াল পদ্ম’। পুস্তকাকারে অপ্রকাশিত তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘নবাঙ্কুর’ (২য় খণ্ড), ‘হৃদয়ের রং’ এবং ‘মুকুরের মুখ’। 

‘নবাঙ্কুর’ সুলেখা সান্যালের ছাব্বিশ বছর বয়সে লেখা হলেও পরিণত সাহিত্য। ২০০১ সালে উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ Nabankur : The Seedling’s Tale প্রকাশিত হয়। কেন্দ্রীয় চরিত্র ছবি। ছবির কৈশোরের প্রারম্ভিক সময় থেকে যৌবনের দ্বারে পৌঁছনোর সময়কাল উপন্যাসটিতে বিবৃত। ছবির পূর্বপুরুষ নীলকুঠির মালিক আর বর্তমান পুরুষ সেই লুপ্ত ঐতিহ্যের ধারক নিম্নধ্যবিত্ত একটি পরিবার। স্বদেশী আন্দোলনের কালে যখন ছবি আট-নয় বছরের, তখনই তার বিদ্রোহী চেতনার প্রকাশ। তার আর পাঁচটা মেয়ের চেয়ে আলাদা লক্ষ্য আছে। ছোটবেলা থেকে সে ক্রমশ বোঝে সমাজে নারীর অবস্থান – কালো বিন্তিপিসির বিয়ে না হওয়ার যন্ত্রণা, রায়বাড়ির বাঁধা পুরোহিত ভট্টাচার্য্যি ঠাকুরের ভাগ্নি পিতা-মাতাহীন মায়াদির কষ্ট, অধীরকাকার বোন শ্বশুরবাড়ি ফেরত লতু পিসিমার অসহায়তা, সব কিছু মিলেমিশে ছবিকে এই পিতৃতান্ত্রিক ঘেরাটোপ থেকে বেরোনোর অনুপ্রেরণা দেয়। ছবির লৈঙ্গিক বিদ্রোহ আরও তীব্র হয়েছে রাজনৈতিক বোধ দ্বারা। স্বদেশী আন্দোলনের সময় থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর থেকে তেভাগা আন্দোলনের মতো ঘটনাসমূহ নবাঙ্কুর এ উঁকি দিয়ে যায়। ছবির বয়সের বিভিন্ন পর্বে ক্রমাগত তার দেখার চোখ পাল্টায়। 

মাত্র দুটি উপন্যাস লিখেছিলেন অকাল প্রয়াত এই লেখিকা। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দেওয়াল পদ্ম’।  দুজন বিপরীত চরিত্রের মানুষের কাছে আসার ও দূরে যাওয়ার আখ্যান৷ দুটি উপন্যসেই তাঁর সাহিত্যিক মুন্সিয়ানা সুস্পষ্ট।  রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততার কারণেই সুলেখা সান্যালের কথাসাহিত্য গভীর জীবনবোধের পরিচায়ক হতে পেরেছে। 

উপন্যাসের মত ছোটগল্পের ক্ষেত্রেও সুলেখা সান্যাল সমান মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন। ১৩৬৩ বঙ্গাব্দে তাঁর একমাত্র ছোটগল্প সংকলন ‘সিঁদুরে মেঘ’ প্রকাশিত হয়। এ সংকলনটিতে অন্তর্ভুক্ত গল্পগুলোর মধ্যে শিরোনামের গল্পটি ছাড়াও রয়েছে ‘জীবনায়ন’, ‘জন্মাষ্টমী’, ‘ফল্লু’, ‘গাজন সন্ন্যাসী’, ‘ছোটমাসি’, ‘খেলনা’। এগুলো ব্যতিরেকেও তাঁর আরও তেইশটি গল্পের সন্ধান পাওয়া যায়। ১৪০৭ বঙ্গাব্দে তাঁর ছোটবোন সুজাতা সান্যাল (চট্টোপাধ্যায়) সুলেখা রচিত ১৮টি গল্পের একটি সংকলন ‘সুলেখা সান্যালের গল্পসংগ্রহ’ নামে প্রকাশ করেন। এখানে আছে ‘অন্তরায়’, ‘কীট’, ‘সংঘাত’, ‘বিবর্তন’, ‘ছেলেটা’, ‘একটি মামুলি গল্প’, ‘উলুখড়’, ‘কিশোরী’, ‘পরস্পর’, ‘খোলাচিঠি’, ‘শকথেরাপী’ ইত্যাদি গল্প। এছাড়া পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে থাকা তাঁর অন্যান্য গল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে: ‘পঙ্কতিলক’, ‘মামণি’, ‘পাষণ্ড’, ‘প্রতীক’, ‘যে গল্পের শেষ নেই’, ‘শেষ সন্ধ্যা’, ‘ঘেন্না’, ‘লজ্জাহর’,‘ফাটল’, ‘রূপ’, ‘ভাঙাঘরের কাব্য’ ইত্যাদি।  চল্লিশ-পঞ্চাশের ঝঞ্চাক্ষুব্ধ সময় সুলেখার গল্পাবলীতে মূর্ত। ‘ফল্গু’, ‘জন্মাষ্টমী’, ‘গাজন-সন্ন্যাসী’ গল্পগুলো দেশভাগ নিয়ে রচিত। ‘অন্তরায়’ ও ‘বিবর্তন’-এর বিষয়বস্তুও একই – নির্মম দেশভাগ ও উদ্বাস্তু জীবন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিধ্বস্ত কলকাতার চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে ‘সিঁদুরে মেঘ’ গল্পে৷ দুঃসহ অর্থনীতির এই সামাজিক প্রেক্ষাপটে সুলেখার অন্যান্য গল্পগুলো হল ‘জীবনায়ন’, ‘খেলনা’, ‘বিবর্তন’ প্রভৃতি।

জীবনের কাছ থেকে পাওয়া তিক্ততা বিশ্বাসহীনতা, নিঃসঙ্গতা তাঁকে ঠেলে দিয়েছে এক শূন্যতাবোধের দিকে। তাঁর লেখার কেন্দ্রীয় চরিত্র প্রধানত পারিবারিক-সামাজিক ঘাত-প্রতিঘাত-বিষণ্ণ নারী। তারা নিকটজনদের বিশ্বাসহীনতায় হতাশ ও ক্লান্ত। তবু জীবনকে যতটা সম্ভব নৈর্ব্যক্তিক চোখে, তৃতীয় ব্যক্তির দৃষ্টিতে সবসময় দেখতে চেয়েছেন তাদের রচয়িতা। নির্মোহভাবে ঘটনা ও চরিত্র চিত্রণ করে গিয়েছেন শুধু।

‘নবাঙ্কুর’ উপন্যাস থেকে নির্বাচিত কিছু অংশ

রান্নাঘর থেকে ঠাকুমার কথা শোনা যাচ্ছে, মার গলা পাওয়া যাচ্ছে।  এখনও রান্নাঘর থেকে বেরুতেই পারছে না কেউ। এখনও থালা-ভরা কোটা মাছ রয়েছে, দুটো উনুন জ্বলছে দাউ দাউ করে। কাকিমা মাঝে মাঝে বাইরে এসে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে যাচ্ছে, মুখখানা আগুনের আঁচে লাল, ধোঁয়া লেগে চোখদুটো লাল। 

কে কাঁদছে রে? মুখের গ্রাসটাকে তাড়াতাড়ি গিলে ফেলে ছবি উৎকর্ণ হয়ে থাকে৷ বিয়েবাড়ির দুপুরবেলার সমস্ত গোলমাল ছাপিয়ে হঠাৎ কার হাঁউমাউ কান্না একবার কেবল সারা বাড়িটায় ছড়িয়ে পড়েই মিলিয়ে গেছে৷ যেন কেউ হঠাৎ গলা টিপে চুপ করিয়ে দিয়েছে মানুষটাকে। 

ঠাকুমা ছুটে এসেছে। এসেছে মা কাকিমা সবাই, কে কাঁদল রে অমন করে? শুভ কাজ বাড়িতে, অমঙ্গুলে কান্না কার? কান্নাটা শোনা গিয়েছিল হরিনন্দনের ঘরের ওদিক থেকে, কিন্তু তা থেমে গেছে।

হাঁফাতে হাঁফাতে প্রদীপ এসে দাঁড়ায় দরজার কাছে, মা অধীরকাকার পাঁচ বছরের জেল হয়ে গেছে। চিঠি পেয়ে নতুন দিদিমা কাঁদছে।

খাওয়া রইল মাথায়, এঁটো হাতেই ছবি ছোটে। মমতা বলেন পেছন থেকে, ভাত ফেলে উঠে যাচ্ছ বড়ো, মারব কিন্তু ছবু।

ততক্ষণে সে একেবারে হরিনন্দনের বারান্দায়। সেখানে বড়ো দালানে নতুন দিদিমা মুখের মধ্যে শক্ত করে কাপড় গুঁজে উপুড় হয়ে পড়ে আছেন মাটিতে। কিন্তু শরীরটা থেকে থেকে কেঁপে উঠছে আর অস্ফুটে একটা গোঙানির মতো শব্দ বেরিয়ে আসছে কাপড়ের ফাঁক দিয়ে।

হরিদাদু অস্থির হয়ে পায়চারী করতে করতে কাঁপা কাঁপা গলায় বলছেন, হ্যাঁ, ওই ওমনি করেই কাঁদবে। ওদের বাড়িতে বিয়ে। ওর বলবে ইচ্ছে করে অকল্যাণ ডাকছো! খবরদার।

অনেকদিনের বিস্মৃতির পর আবার সেই কাটা ক্ষতে ছুরির খোঁচা-খাওয়া ব্যথায় ছবি চমকে ওঠে আজ। এর মধ্যে কত নতুন নতুন ঘটনা ঘটে গেছে। আনন্দে, উত্তেজনায় কাকার কথাটা সে প্রায় ভুলে গিয়েছিল। আজ আবার মনে পড়েছে।

তার হাত ধোওয়া হয়নি, মুখ ধোওয়া হয়নি, ভাত খাওয়া শেষ না করেই উঠে এসেছে, কিন্তু কান্না আটকানো গেল না। সেও কাঁদতে থাকে নিঃশব্দে এককোণে, চুপি চুপি চোরের মতো দাঁড়িয়ে৷ সেসব না-জানা দুঃখ চোখের জলের ফোঁটা হয়ে গাল বেয়ে নামতে থাকে৷ এক অনুচ্চারিত ভাষায় তার ঠোঁট কাঁপতে থাকে থরথর করে। 

মা কাকিমা এসে জোর করে নতুন দিদিমা আর লতু পিসিমাকে খেতে না নিয়ে গেলে কতক্ষণ সে কাঁদত কে জানে৷ তাকেও নিয়ে গেল৷ মার মেখে দেওয়া দলা খেতে হল বকুনি শুনতে শুনতে৷ 

ওদিকে বেলা পড়ে আসে। বাইরে থেকে ছেলেরা বাড়ির মধ্যে আসছে, হুড়োহুড়ি করে। খেয়ে উঠে মা কাকিমা আবার ঢুকছে রান্নাঘরে।

…..

জামা পরে নীচেও নামতে পারেনি, এর মধ্যেই সারা বাড়িটার সবাই হুলুস্থূল করে চেঁচিয়ে ওঠে- বর এসেছে, বর এসেছে। পাড়ার মেয়েবউরা শাঁখ বাজায়, উলু পড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে আর তার সঙ্গে ধ্বজাধারীর ঢোল, ইফতিকারের সানাই বেজে চলেছে একটানা। 

বিকেল থেকে পিসির জ্বর৷ এখন আর মাথা সোজা করে বসতে পারছে না- পিঠের নীচে একটা বালিশ দেওয়া৷ কী করে যে বিয়ে হবে? ছবি ভেবে কূল পায় না৷ 

কিন্তু বিয়ে হয়ে যায়। 

ছাদনাতলায় বর এসে বসলে খানিকক্ষণ পরে মেয়ের খোঁজ পড়ে৷ ঠাকুরদা আজ সারাদিন উপোস করে আছেন, এখন একখানা গরদের কাপড় পরে বসে আছেন বরের সামনে আসনে। 

বড়কা, বাবা, নকাকা আর রায়দের ছোটছেলে এসেছে পিসিকে পিঁড়িতে বসিয়ে তুলে নিয়ে যেতে।

ওঠ্ বিন্তি, বড়ো পিসিমা আস্তে আস্তে বলে, শক্ত করে বড়দার হাত ধরে থাকিস, তাহলে আর মাথা ঘুরবে না৷ 

বিন্তি পিসির ছলছলে চোখে কেমন অসহায়তার ছাপ। সে করুণ চোখে তাকায় ঠাকুমার মুখের দিকে, মমতার মুখের দিকে, তারপর কাজললতা-ধরা হাতখানা দিয়ে মেঝেটা যেন আঁকড়ে ধরে বসে থাকে৷ হঠাৎ বুকের ভেতরটা কেমন করতে থাকে ছবির, যেমন করতে থাকে পুজোয় বলি দেওয়ার জন্য অনিচ্ছুক পাঁঠাটাকে যখন সবাই মিলে দড়ি ধরে টেনে নিয়ে যায়- কিছুতেই যেতে চায় না জন্তুটা, যত দড়ি ধরে টানাটানি করে, তত সে করুণ চোখে তাকায়, কেঁদে কেঁদে ডাকে।

শেষ পর্যন্ত পিসি ওঠে৷ তাকে সাতপাক ঘোরানো হয়৷ বরের দিকে তাকায় দুই লাল লাল চোখ তুলে৷ ছেলেমেয়েরা অনেকে খুশিতে হাততালি দিয়ে হাসে। মেয়েরা ঝুঁকে পড়ে সেদিকে। পিসি কিন্তু একবারও চোখদুটো সরায় না। 

বর্ষিয়সী কে যেন ভিড়ের মধ্যে ফিশফিশ করেন, আজকাল আর মেয়েদের লজ্জা-টজ্জা নেই দিদি। দিব্যি প্যাটপ্যাট করে দেখে নিল।

কথাটা শুনে ছবিও ভাবে- কী দেখল পিসি অমন করে? দেখতে তো বিচ্ছিরি (বলতে নেই) পিসেমশাই। কালো, মোটা, মাথার চুলগুলো সোজা সোজা। 

সুকুমারী পেছন থেকে মেয়েকে দু-হাতে জাপটে ধরে বসে আছে, সেফুকে বলে ফিশফিশ করে, শিগ্গির তোর জেঠিমাকে ডাক সেফু, একখানা পাখা আন।

জোরে জোরে মাথায় হাওয়া করে সেফু। পিসির মাথাটা ঝুলে পড়েছে সুকুমারী পিসিমার কাঁধের ওপর। সরে যাওয়া ঘোমটার ফাঁক দিয়ে চন্দন জেবড়ে যাওয়া কালো শুকনো মুখ আর বোজা চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। 

মমতার আঁচল টেনে ধরে ভিড়ের বাইরে এনে ছবি বলে, পিসি মরে যাচ্ছে, তবু বিয়ে দেবে?

এদিক-ওদিক তাকিয়ে মমতা হাসার চেষ্টা করেন, বোকা নাকি তুই? জ্বর হয়েছে, সারাদিন উপোস। তাই ঝিমিয়ে পড়েছে অমন। কিছু হয়নি।

দূর! ভালো না, একটুও ভালো না বিয়ে। বিচ্ছিরি। দেখতে চাইনে আমি…। ছবি ছুটে চলে যায় কাকিমার ঘরে৷ পাড়ার বউ-মেয়েদের গোটা দুই-তিন ঘুমন্ত ছেলেমেয়েদের পাশে সেও মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ে কাকিমার বিছানায়।

ঢোল বাজে, সানাই বাজে, হারান ঠাকুরের উচ্চকণ্ঠে মন্ত্র পড়া কানে যায়। কেমন কান্না পায় তার।

…..

আজও মমতার চোখ ভরে ভরে আসছে কিন্তু ছোটবেলার মতো করে ছবিকে বুকে জড়িয়ে কাঁদা চলে না- সে এখন বড়ো হয়েছে৷ এ বংশের সব কিছুকে অগ্রাহ্য করার মতো বড়ো। পৃথিবীতে বেরিয়ে পড়ার মতো বড়ো। 

তাই তিনি কান্না গোপন করেন৷ ছবির মুখের দিকে তাকান, ইচ্ছে করে চুলে হাত বুলিয়ে দেন, তাঁর ঠোঁট কাঁপে থরথর করে, মণি ছেলে, তাকে ছেড়ে দিতে ভয় হয় না…কিন্তু তোমাকে একেবাতে একা ছেড়ে দিলাম, ছবু। 

ছবি বোঝে মা কী জানতে চান, কীসের প্রতিশ্রুতি চান তার কাছ থেকে মমতা। মমতার ঝরে-পড়া চোখের জল সে নিজের হাতে মুছিয়ে দেয়, বলে, যা ন্যায়, যা সত্যি আর মহৎ আমি সেই পথেই থাকব মা। যদি জীবনের বদলেও হয় তা। 

মমতা ছবির মাথাটা এবার বুকের মধ্যে চেপে ধরে উচ্ছ্বসিত হয়ে কেঁদে ওঠেন, ও-কথা অমন করে বারবার বলতে নেই, ছবু!

অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে দিতে যায় সবাই তাকে- মা, ঠাকুমা, কাকিমা। সে বারে বারে পেছন ফিরে তাকায়। তার চোখ ভরে কেবলই জল আসে। 

সবাই চলে গেলে মমতা তখনও দাঁড়িয়ে থাকেন৷ বাতাসে তাঁর চুল ওড়ে, মাথার ঘোমটা পড়ে যায়- তাঁর দৃষ্টি মেয়েকে অনুসরণ করতে করতে হারিয়ে যায় অন্যমনস্কতায়। তিনি যেন ছবির পথের দিকে তাকিয়ে নেই- একটা সফল না হওয়া অতীতের দিকে তাকিয়ে আছেন ঝাপসা চোখে। 

বোসপুকুরের পশ্চিম পাড়ের ছাতিম গাছটা এ গ্রামের সীমানা- তারপর থেকে স্টেশনের পথ। ছোটবেলায় মাঝে মাঝে ছবি এসে দাঁড়িয়ে থাকত এখানটায় আর অনিমেষ দৃষ্টিতে দেখত স্টেশনের রাস্তাটা। একটা দিগন্তবিস্তৃত জগৎ তাকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকত- তখন ভেবে পেত না ওই পথ ধরে গেলে কোথায় যাওয়া যায়, কতদূর যাওয়া যায়।

আজ সেই পথের ধারে দাঁড়িয়ে আছে ফুলমণি, বাতাসীরা। তারা জানতে চায়, শহরে যায় আমাগারে ভোলবানা তো? গেরামরে ভোলবানা তো?

তা কি ভোলা যায়! ছবি যে তার গ্রামের ঘাসের গন্ধ- তার প্রতিটি ঋতুবদলের গন্ধ পায়- এ গ্রাম তার সব কিছুর সঙ্গে জড়ানো- এ গ্রামে তার তমালের প্রতিজ্ঞা, অধীরকাকার উৎসাহ! কেমন করে ভুলবে ছবি! 

কলকাতার চাকরি-করা সুখদার বন্ধু উমাপতি ছবিকে কলকাতা পর্যন্ত পৌঁছে দেবার ভার নিয়েছেন। প্রদীপ জেল থেকে মুক্তি পেয়েছে…সে আসবে স্টেশনে। সুখদা এসেছিলেন তুলে দিতে। 

কুলদার সঙ্গে আসবার কথা ছিল না, কিন্তু তিনিও স্টেশনে চলে এসেছেন। কি একটা কথা তিনি ছবিকে বলতে চান। অনেকবার ছটফটিয়ে বেড়ালেন আশেপাশে, কিন্তু বলেননি। 

গার্ডের বাঁশি বাজলে হঠাৎ কুলদা কাছে আসেন, ইতস্তত করেন একটু, তারপর বলেন, বলিস…প্রদীপকে বলিস যেন বাড়ি আসে। রাগ করে গেছে…আমি না ডাকলে নাকি আসবে না। …বলিস… আমি ডেকেছি।

তারপর এক তাড়া নোট বার করে ছবির হাতে গুঁজে দেন হঠাৎ, নে, ওকে দিস, তুই নিস। যখন যা দরকার লিখবি আমাকে…৷ 

ক্রমে ঝাপসা হয়ে আসে সবায়ের চেহারা। যতদূর দেখা যায় ছবি তাকিয়ে থাকে, তারপর স্টেশনটা পার হয়ে গেলে হঠাৎ তার চোখ ছাপিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। জানলার বাইরেই ছবি তা মুছে ফেলে স্থির হয়ে বসে।

তখন অন্য এক ভাবনায় যে অস্থির হয়ে ওঠে, ওখানে না গেলে পৃথিবীটাকে ধরতে পারবে না তুমি,- কে যেন বলেছিল কথাটা!

কোন্ পৃথিবী! সেখানে জায়গা হবে তো ছবির! সেই স্বার্থপর জগতের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে টিকে থাকতে পারবে তো সে? যে নতুন ভাবনাটা তাকে চঞ্চল করে তুলেছে সেটা আনন্দের না দুঃখের- নাকি আশঙ্কার! কীসের সঙ্গে তার মিল?

বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ একসময় মিলটাকে সে খুঁজে পায় গাড়ির গতির সঙ্গে- চলার তালে।

চলাটাই আসল- চলতে হবে।

ততক্ষণে নতুন আর এক প্রতীক্ষায় উদগ্রীব হয়ে উঠেছে তার মন আর সমস্ত চেতনা।  

পৃষ্ঠা – ৭৪, ৭৬-৭৭, ২৭১-২৭২

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *