অন্দর থেকে প্রদর্শনীর বিশ্বে প্রথম ভারতীয় নারী

সুনয়নী দেবীর ছবি বহুলচর্চিত নয় কিন্তু তাঁকেই বলা যায় আধুনিক ভারতের প্রথম পেশাদার মহিলা চিত্রশিল্পী1 তিনি ছিলেন ঠাকুরবাড়ির মেয়ে, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহোদরা। সুনয়নী দেবীকে নিয়ে লেখা এক অর্থে মহিলা শিল্পীদের ইতিহাসের পুনরাবিষ্কার।

১৮৭৫-এ জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে তাঁর জন্ম। মাত্র বারো বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় রজনীমোহন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত শিল্পী। চিত্রা দেব  তাঁর বই “ঠাকুর বাড়ির অন্দরমহল”-এ বর্ণনা করেছেন কি রকম উৎগ্রীব ভাবে সুনয়নী দেবী তাঁর ভাইদের ছবি আঁকা দেখতেন। তিরিশ বছর বয়সে পেশাদার শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন সুনয়না দেবী।  সক্রিয় ছিলেন পনের বছর। স্বামী মারা যাবার পর ছবি আঁকার উৎসাহ হারান। সুনয়নী দেবীর কাজ উনিশ শতকের বিশের দশক থেকে প্রকাশ্যে আসে। ১৯২২ সালে তাঁর ছবি সোসাইটি ওফ ওরিয়েন্টাল আর্টের প্রদর্শনীতে স্থান পায়, যেখানে পল ক্লি ও ক্যানদিনসকির মত শিল্পীদের ছবি দেখা যায়। ১৯২৭-এ তাঁর ছবি লন্ডনে ওম্যান ইন্টারন্যাশানাল আর্ট ক্লাবের প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে। ১৯৩৫-এ তাঁর নিজের বাড়িতে একটা প্রদর্শনী হয়। এটাই তাঁর শেষ প্রদর্শনী।

চিত্রশিল্পে তাঁর প্রশিক্ষণের অভাবই ছিল তাঁর ছবির শক্তি। সুনয়নী দেবীর আঁকার মধ্যে আমরা যেটা লক্ষ্য করি তিনি মূলত ওয়াশ পদ্ধতিতেই কাজ করতেন। ওয়াশ পদ্ধতির ক্ষেত্রে অবনীন্দ্রনাথের প্রভাব দেখা গেলেও রেখা অঙ্কনে তাঁর নিজস্বতা ধরা পড়ে। সরল রৈখিক গতির মধ্যে এক ধরনের কাব্যিক অনুসঙ্গ দেখা যায়।  একই বর্ণের ছায়া (monochrome) তাঁর ছবির বৈশিষ্ট্য। ওয়াশ পদ্ধতির ফলে রঙগুলো ছড়িয়ে পড়ত এবং অবয়বের অঙ্কন রেখাগুলো অস্পষ্ট হয়ে উঠত। পেলব ও অস্পষ্ট রঙের আভাস ছবির মেজাজ ফুটিয়ে তুলত। ছবির মধ্যে নাটকীয়তার পরিবর্তে ‘ভাব’-এর প্রকাশ দেখা যায়। অলংকার নয় অভিব্যক্তিই তাঁর ছবির গুণ। ছবিতে কোমলতা ও সহানুভূতিশীলতার মত অনুভূতিগুলো এমন ভাবে ফুটে উঠত যেন নারীর দৃষ্টিভঙ্গী  থেকে দেখা একটা জগৎ।

সুনয়নী দেবীর জীবন অভিজাত গৃহের অন্দরমহলেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং তাঁর ছবিতেও এর প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। দৈনন্দিন জীবনের তুচ্ছতার বাইরে এক ধরনের অন্তর্মুখী স্বর তাঁর ছবিতে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি মূলত হিন্দু দেবদেবী ও পৌরাণিক চরিত্র আঁকতেন। এই ছবিগুলোর সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গতা লক্ষণীয়। এই ছবিগুলো থেকে তাঁর ব্যাক্তিগত জীবন ও মানসিক অবস্থানের ধারণা পাওয়া যায়। সুনয়নী দেবীর ছবির মেজাজ আধ্যাত্মিক ভাবকেই ব্যাক্ত করে। দেবাদ্রিতা সাহার লেখা থেকে জানা যায় বাড়ির দেওয়ালে টাঙ্গানো রবি বর্মার ছবি থেকেই প্রাথমিক ভাবে তিনি অনুপ্রাণিত হন। যখন ছবি আঁকা শুরু করেন তখন পৌরাণিক চরিত্র তাঁর বিষয় হলেও তিনি পাশ্চাত্য একাডেমিক শৈলীকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। সুনয়নী দেবী তাঁর ভাইদের অনুপ্রেরণায় এবং নিজের প্রতিভার জোরে একটা নিজস্ব শৈলী আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন যা বেঙ্গল স্কুলের অন্তর্গত হলেও স্বকীয়তার ছাপ রেখেছে।

তাঁর ছবির বিষয় সীমাবদ্ধ। তিনি পৌরাণিক চরিত্র ও তাঁর মেয়েলি জগতের বাইরে কিছুই আঁকেননি। প্রশিক্ষণের অভাব ও বিষয়বস্তুর বৈচিত্রহীনতা সত্ত্বেও তাঁর ছবিতে এক ধরনের অতীন্দ্রিয়তা অনুভব করা যায়। সুনয়নী দেবীর ছবিতে পৌরাণিক চরিত্র প্রাধান্য পেলেও তাতে দেবত্ব আরোপিত হয়নি বরঞ্চ বর্ণনামূলক উপস্থাপনাই গুরুত্ব পেয়েছে। পৌরাণিক চরিত্রের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ মনস্তাত্ত্বিক। শিল্পী দাস তাঁর লেখায় বলছেন বেশীর ভাগ ছবিই সুনয়নী দেবী প্রথমে স্বপ্নে দেখেছেন। এই ছবিগুলো তাঁকে মুক্তির স্বাদ এনে দিত। তাঁর ছবিতে গৃহস্থালিতে আবদ্ধ ভারতীয় মহিলাদের নিঃসঙ্গতা ও বিষন্নতা ধরা পড়েছে। “রাধা”,”গ্রামীণ পরিচালিকা”,”মা” ইত্যাদি ছবিতে এই মেজাজ স্পষ্ট। তাঁর ছবির মৌলিকত্ব হল এর সাদাসিধা ভঙ্গিমা ও অনুভূতির গভীরত্ব। অনিয়ন্ত্রিত ও অভগ্ন রেখার ছন্দ তাঁর ছবির স্বকীয়তা। সপ্রতিভ রেখা ও উষ্ণ রঙের ব্যবহার তাঁর ছবিকে জোরালো অথচ নমনীয় করে তোলে। ফলত তাঁর ছবি শুধুমাত্র দৃষ্টিনন্দনই নয় বরঞ্চ এক ধরনের প্রশান্তি আনে।

গৃহবন্দী হলেও সমসাময়িক সাম্রাজ্যবিরোধী স্বদেশী ভাবধারা সুনয়নী দেবীকে প্রভাবিত করেছিল। লোকশিল্পের প্রতি তাঁর অনুরাগের কারণও ছিল এই স্বদেশীয়ানা। তবে তাঁকে লোকশিল্পী কোন ভাবেই বলা চলেনা। পার্থ মিটারের মতে “rather than describing her as a folk painter, we should view her as a genuine naïve painter who used folk motif with immense charm and feeling.” তাঁর কাজের চর্চা গ্রামীণ লোকশিল্পকে সমকালীন ভারতের প্রকৃত প্রতিনিধি করে তুলেছিল। ভারতীয় মিনিয়েচার থেকে গ্রামীণ লোকশিল্পে তাঁর অবাধ যাতায়াত। ভারতীয় শৈলীর শিল্পচর্চা পশ্চিমী তেল রঙ এবং বস্তুবাদের বিরোধিতা করলেও নিদৃষ্ট কোন শাস্ত্রে বাঁধা ছিল না। এই নতুন ধারার শিল্পচর্চায় প্রাচ্যর বিভিন্ন ধরনের শিল্পকলা থেকে অনুপ্রাণিত হবার পরিসর ছিল। স্টেলা কামরিশ জার্মান প্রকাশনী “Kunst”-এ উল্লেখ করেছেন, সুনয়নী দেবীর ছবির সঙ্গে অজন্তার দেওয়াল চিত্রের মিল রয়েছে।

শিল্পবিপ্লব উত্তর ইউরোপে একাডেমিক শৈলীর শিল্প চর্চার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদ শুরু হয়। শিল্পের ক্ষেত্রে প্রাক-রেনেশাঁস ধর্মী অভিব্যক্তিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা দেখা যায়। ভারতে প্রিমিটিভিসমের চর্চা শুরু হয় আধুনিকতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে। এই সময়ের প্রাচ্যকে পাশ্চাত্যের প্রাক-আধুনিক অবস্থান হিসেবেও দেখা হয়। সাম্রাজ্যবাদ ভারতীয় শিল্প ধারার ক্ষেত্রে একটা ছেদ নিয়ে আসে। ফলত নতুন করে ভারতীয় ঐতিহ্যকে বোঝার প্রচেষ্টা শুরু হয়। শিল্প ক্ষেত্রে অবনীন্দ্রনাথ এই খোঁজের নেতৃত্ব দেন। অবনীন্দ্রনাথ জাপানী শিল্পীদের সঙ্গে একযোগে প্রাচ্যের নিজস্ব নন্দনতত্ত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। সুনয়নী দেবী যে ওয়াশ পদ্ধতি ব্যবহার করতেন তা মূলত অবনীন্দ্রনাথের ছবিরই বৈশিষ্ট‍্য । এটাও জাপানী ছবির প্রভাবে অবনীন্দ্রনাথ আয়ত্ত করেন। 

ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা পশ্চিমী মূল্যবোধের বিরোধিতায় শিল্পক্ষেত্রে ভারতীয় নির্যাসের সন্ধান শুরু করেন। তাই গোড়ার দিককার আধুনিক চিত্রশিল্পীদের মধ্যে প্রিমিটিভসমের প্রভাব যথেষ্ঠ। সুনয়নী দেবীও এর ব্যতিক্রম নন। তিনি সচেতন ভাবে জাতীয়তাবাদী শিল্পধারার প্রবক্তা না হলেও তিনি সমসাময়িক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ভাবধারার বাইরে ছিলেন না। সুনয়নী দেবীর ছবিতে প্রিমিটিভ সারল্য এক ধরনের ভারতীয় সংস্কৃতির প্রামাণ্যতা বহন করে যা জাতীয়তাবাদী শিল্পের বৈশিষ্ট্য। তবে আধুনিকতার বয়ানের ভিতরই তাঁর প্রিমিটিভসমের চর্চা। তাই তাঁর কাজ একই সঙ্গে প্রিমিটিভ, জাতীয়তাবাদী ও আধুনিক।

ভারতের প্রথম আধুনিক মহিলা চিত্রশিল্পী হিসেবে সুনয়নী দেবীর মূল্যায়ন অবশ্যই নারীবাদী প্রকল্প। যতটা প্রচারের তিনি যোগ্য তা তিনি পাননি। দু-তিনটে প্রদর্শনী ছাড়া তাঁর জীবন মোটের উপর অন্তঃপুরেই কেটেছে। যদিও তাঁর ছবিতে পেশাদারিত্বের ছাপ রয়েছে কিন্তু তাঁর কাছে ছবি আঁকা ছিল অপ্রধান বৃত্তি। গৃহকাজ ও পেশাদার শিল্পীর দাবীর মধ্যে সামঞ্জস্য আনা ছিল শক্ত। তৎকালীন পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মহিলাদের স্বাধীন পেশা গ্রহণ সহজ ছিলনা।

তবে এই প্রবন্ধে আমি কেবলমাত্র সুনয়নী দেবীর কাজের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরতে চাইনি। বরঞ্চ দেখাতে চাই তাঁর কাজ এক ধরনের নারীসুলভ শৈল্পিক ঐতিহ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর ভিতর নিজের পরিসর অর্জন করাই এখানে একমাত্র বিষয় নয়। নারীসুলভ শিল্প-বিষয় ও শৈলীর বহিঃপ্রকাশই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন হলো কিভাবে এই ছবিগুলো নারীবাদী হিসেবে পড়ব? এই ছবিগুলো পাঠ করতে গিয়ে কি নারীসুলভ সৃজনশীলতার কোন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়? সুনয়নী দেবীর ছবির বৈশিষ্ট্য একটা প্রশ্নের সম্মুখীন করে তোলে, নারীসুলভ শিল্পের কি কোন বিশেষ ধারা রয়েছে? প্রশ্নটা আরেকটু সরল করে বললে, মহিলা শিল্পীরা কি অন্যভাবে আঁকেন? ছবির ভাষা কি লিঙ্গ ভেদে ভিন্ন ভাবে প্রকাশিত হয়? ছবির ভাষার ক্ষেত্রে লিঙ্গপরিচয় কি গুরুত্বপূর্ণ? মেয়েদের লেখার আলোচনায়ে মেয়েলি লেখন ভঙ্গিমা আলাদা গুরুত্ব পেয়ে থাকে। ব্যক্তি ভাষার দ্বারা নির্মিত এবং ভাষা শিশ্নকেন্দ্রিক। নারীত্ব তাই অবদমিত। অর্থাৎ নারীত্ব এক ধরনের প্রান্তিক অবস্থান এবং পিতৃতান্ত্রিক নামকরণ ও শ্রেণীবিন্যাসের পদ্ধতি এর মধ্যে দিয়েই কাজ করে। এখানে ভাষাকে যদি ছবির ভাষা ভাবি, তাহালে কি প্রান্তিক অবস্থানের ছবির ভাষাই নারীসুলভ ছবির ভাষা? কিভাবে ভাষা ও লিঙ্গ পরিচয়ের প্রশ্নগুলো চাক্ষুস শিল্পের পরিসরে উঠে আসছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পের ইতিহাসকে লিঙ্গ সাম্যের প্রেক্ষিতে দেখা যেমন জরুরি তেমনই জরুরি ছবির গঠন ও বিষয়ের আলোচনা। তাই এই প্রবন্ধে শুধুমাত্র সুনয়নী দেবীর ছবির বৈশিষ্ট্য তুলে না ধরে আমি, দেখানোর চেষ্টা করেছি তাঁর ছবির ভাষা কীভাবে এক ধরনের নারীসুলভ দৃশ্যভাষের উপর প্রতিষ্ঠিত।

তথ্য সূত্রঃ 

Remembering Sunayani Devi: A forgotten artist from history -Shilpi Das

Sunayani Devi: A primitive of Bengal School- Amina Kar

Who was Sunayani Devi, A self-taught artist and the forgotten daughter of the Tagore household? -Debadrita Saha

Sunayani Devi- G Venkatachalam

The Triumph of Modernism: India’s Artists and the Avant-Garde,1922-1947- Partha Mitter

ঠাকুর বাড়ির অ্ন্দরমহল- চিত্রা দেব

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *