সুন্দরবন ও নারী জন্ম

ভারতী সর্দার (নাম পরিবর্তিত)। বয়স এক পা এক পা করে ৬০ এর দিকে এগোচ্ছে ক্রমশ। পেশাঃ জঙ্গলের ভিতরের খাঁড়িতে কাঁকড়া ধরে কলকাতা এনে বিক্রি করা। সে আবার যে সে জঙ্গল নয়। রহস্য এবং অলৌকিক গল্পগাথায় ভয়ংকরের নিদর্শন হিসাবে প্রচলিত এক নাম। ভূত প্রেত তো আছেই; এছাড়াও এই জঙ্গলে আছে ভূুতের থেকেও আরও ভয়ংকর কিছু। অন্য যে কোনো জঙ্গলের থেকে তাই রহস্য-রোমাঞ্চ রূপকথার গল্পগুলিতে বিশেষ ভাবে জায়গা পেয়েছে এই জঙ্গল। সুন্দরবন। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, কুমির, কামট, সাপ – এখানে বসবাসকারী মানুষের মনে ভূতের থেকেও বেশী ভয় ধরানো জীব বৈচিত্র্যর আঁতুরঘর৷সেই সুন্দরবনের আনাচে কানাচে আছে অনেক গুলি খাঁড়ি৷

অন্যান্য ভৌগোলিক জায়গা থেকে মানুষ এসে নদীর বাঁকে বাঁকে জঙ্গল কেটে দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে তুলেছে মনুষ্য বসতি৷  বাঘের আয়ত্তে থাকা ভূমি আর মানুষের আয়ত্তে থাকা বসতিতে সীমানা থাকলেও প্রায়ই তা লঙ্ঘন করে যাতায়াত অক্ষুণ্ণ থাকে দুই প্রজাতিরই৷বাঘ তো গল্প বুনতে পারে না, তাই মানুষই গল্প বোনে মুখে মুখে জঙ্গল নিয়ে। সে গল্পে বাস্তব আর কল্পনার নিটোল বুনন। শোনা যায় পূর্ণিমার আলোয় জঙ্গলে গভীর রাতে ঘুরে বেড়ায় প্রাচীন কালের ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা অশরীরীরা। ঘুরে বেড়ায় লৌকিক দেব-দেবীরাও বনের গভীরে তাদের ভাঙাচোরা মন্দিরের আঙিনায়, নিশাচর জীবিত সঙ্গীসাথীদের নিয়ে। আর রাত ফুরিয়ে কাক ডাকা ভোর হলে, আঁধো আলো আঁধো অন্ধকারে, খাঁড়ির ধারে ধারে দেখা মেলে কিছু কালো কালো মাথা। মানুষের মাথা। তেলোডিঙি করে ভাঁটায় কাঁকড়া ধরতে আসা মানুষ। কাঁকড়ার সন্ধানে মাথা নিচু করে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে স্থির হয়ে থাকে জোড়ায় জোড়ায় চোখ। আর কালো কালো মাথা লক্ষ্য করে শিকারী দৃষ্টিতে ওঁৎ পেতে থাকে আরও একজোড়া চোখ; স্থির, তীক্ষ্ণ।

এরকমই জীবন, লেখা শুরুর প্রথম লাইনের ভারতী সর্দারেরও। এক কাকভোরে তার জীবনেও মঞ্চস্থ হয়ে গেছে হাড় হিম করা ভয়ের গল্প। সুন্দরবনের জঙ্গলের পাহারাদার রয়াল বেঙ্গল টাইগার তার শিকার লক্ষ্য করে সেদিনও বসেছিল জঙ্গলে, একবার পা দিলে নিঁখুত ক্যালকুলেশনে চলে এই শিকারী আর তার শিকারের ভাগ্যপরীক্ষা। সেদিন শিকারীর গণনায় সামান্যতম ভুল হয়ে গিয়েছিল। ভারতী সর্দারের মাথার বদলে লম্বা চুলের খোঁপাকে পাখির চোখ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল হলদে ডোরার শরীর। আর এই ভুলের জন্যই ভারতী সর্দার দুটি অমূল্য পুরস্কার পায়- এক, প্রাণ; দুই, চিরস্মরণীয় বাস্তব গল্প।

সন্ধ্যে নামার আগের রক্তিম আকাশের নিচে, মন্দিরের স্যাঁতসেঁতে মাটির উঠোনে মাদুর পেতে বসে এই গা ছমছমে গল্পই শুনছিলাম জড়ো হওয়া গ্রামের লোকেদের থেকে। জড়ো হওয়ার কারণ অবশ্য গল্প শোনানো নয়। গ্রাম সভা। কীভাবে কাটছে সুন্দরবনবাসীর জীবন, কী তাদের চাহিদা এবং প্রয়োজন, দিনের পর দিন প্রকৃতি এবং রাজনৈতিক পলিসির নিদারুণ পরিহাস সয়ে কী সামাজিক মানসিক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন তাঁরা, আর সেখানে কী ধরনের সহযোগিতার প্রয়োজন তাঁদের একটু হলেও ঘুরে দাঁড়ানোর স্বউদ্যোগ নিতে – এইসব জানা বোঝাই ছিল গ্রাম সভার উদ্দেশ্য।

এইবার আসি এই লেখার আসল প্রসঙ্গে৷

সুন্দরবনঃ আম্পান, ইয়াস, মহামারীর নিউ নর্মাল

এক বছরে দু’ দুই খানা ঝড় বয়ে গেছে সুন্দরবনের উপর দিয়ে। এখনও এদিকের বেশিরভাগ বাড়ি মাটির। আম্পানে প্রায় প্রত্যেকটা বাড়িরই চাল ভেঙেছে। যশে বাঁধ ভেঙে বা বাঁধ উপচে জল ঢুকে ডুবে গেছে প্রচুর গ্রাম। যেখানে জল ঢুকেছে সেখানে সর্বস্বান্ত মানুষ। এর উপর গত দুবছর চলছে লকডাউন। দিন আনা দিন খাই মানুষের কর্মসংস্থান কেমন সে আর নতুন করে বলে দিতে হবে না। গত বছর কয়েকশো কিলোমিটার হেঁটে বা সাইকেলে বাড়ি ফিরেছিল যারা তাদের কিছুজনের ঠিকানা এই সুন্দরবনেও। ইয়াসের এক সপ্তাহ আগে থেকেই ঝড়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম সুন্দরবনে। ঝড়ের দিন থেকে পরের এক-দেড় মাস সাময়িক রিলিফের জন্য দৌড়ে বেড়িয়েছে আমাদের নানা টিম নানা প্রান্তে। আম্পান থেকে ইয়াস এই একবছরের অভিজ্ঞতায় ঝড় জল ছাড়াও চোখে পড়েছে সুন্দরবনের মানুষের দুর্ভোগ, সামাজিক অভিযোজন ও প্রগতির নানা দিক।

এই লেখাটি  সুন্দরবনের মেয়েদের জীবন এবং যাপন নিয়ে।

নারী পাচার ও বাল্যবিবাহের  জন্য বিখ্যাত এই এলাকায় মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বেড়েছে বিগত কয়েক বছরে। এমনও দেখা গেছে কোনো কোনো স্কুলে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের মধ্যে বেশিরভাগই মেয়ে। কলেজে যাওয়ার জেদ এবং আগ্রহও কম নয়। এই অবস্থায় দীর্ঘদিন লকডাউন ছবিটা আবার হতাশার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। দিনের পর দিন স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় বিয়ে হয়ে যাচ্ছে কত মেয়ের তার সঠিক হিসেব এখনও নেই। ঝড় ও লকডাউনের প্রকোপে মারাত্মক ভাবে বেড়েছে পরিবারের আর্থিক সংকট ও অনিশ্চয়তা। তারই মাশুল গুনতে হচ্ছে শিক্ষার্থী মেয়েদের। পরিবারের চরম সংকটের দিনে একটা মেয়ে সন্তান ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেলার ধুম লেগে গেছে। বহুদিন শিক্ষার আঙিনা থেকে বঞ্চিত থেকে পড়ুয়ারাও তলিয়ে যাচ্ছে বিয়ে-সংসার ইত্যাদির সমাজ নির্মিত মোহজালে। নিজেরাই বিয়ে করে নিচ্ছে আঠারো পেরোনোর আগেই। করবে নাইবা কেন! তাদের স্কুলের দিকে টেনে রাখত যারা, মানে শিক্ষক শিক্ষিকা, ক্লাসরুম, বন্ধু, কয়েকটা ঘন্টার জন্য হলেও “মেয়েদের কাজ” থেকে মুক্তি – সেসব তো আর ইন্টারনেট শিক্ষায় কিনতে পাওয়া যায় না। অন্যান্য সুস্থ বছর গুলিতেও দেখা যেত মাঠের বা ঘরের কাজ সামলে তবেই স্কুলে যাওয়া হয়ে উঠত মেয়েদের। এখন তো পুরোটাই সংসারের হেঁসেল। যান্ত্রিক ক্লাস কি আর এই অন্ধকার অঞ্চলে আশার আলো জ্বালতে পারে!

এছাড়াও ঘেঁটে যাচ্ছে পুরানো পরিবারের ছবি। লকডাউনের আগেও বহু পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে চলে যেত কলকাতা বা ভিনরাজ্যে কাজ করতে। কখনও পুরো পরিবার কখনো পরিবারের কয়েকজন। বাকিরা রয়ে যেত গ্রামেই বাচ্চাদের পড়াশোনা, গ্রামের বাড়ির এবং বয়স্কদের দেখভালে। টানা লকডাউন এবং দুখানা ঝড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়ার হিড়িক লেগে গেছে গ্রামে গ্রামে। এইবার দেখা যাচ্ছে প্রায় পুরো পরিবারই চলে যাচ্ছে গ্রাম ছেড়ে। এই অবস্থায় মেয়েদের পড়ানোর জন্য আলাদা করে ভাবা, এই সমাজের পক্ষে সম্ভব?

আর পড়ে হবেই বা কী? এইসব সর্বস্বান্ত পরিবারের মেয়েরা পড়ে গ্রামাঞ্চলে কী কর্মসংস্থান পাবে যা দিয়ে গতি পাবে তার জীবন সংগ্রাম?

গ্রাম্য রাজনীতি ও মেয়েরা

অন্য ছবিটাও কিন্তু ছিল বা বলা ভালো এখনও আছে। এখানকার মেয়েরা চিরকালই প্রবল কর্মঠ। রাত ভোর হওয়ার সাথেই শুরু হয় কাজ। বিনামূল্যের গৃহশ্রম তো আছেই। একইরকম ভাবে আছে মূল্য উৎপাদন করে এমন কাজও। নদীতে কাঁকড়া মাছ ধরা, চাষের কাজ, গবাদি পশুপালন, ভেড়ির কাজ ইত্যাদি নানাকিছু। কেউ কেউ প্রত্যহ কলকাতা আসে মাছ, কাঁকড়া, সবজি বিক্রির জন্য বা পরিচারিকার কাজের জন্যও। যদিও মূল্য  উৎপাদনে পুরোপুরি যুক্ত থেকেও সমাজ রাজনীতিতে জায়গা দখল করতে পারেনি বেশ কয়েক প্রজন্মের মেয়েরা। সেই অবস্থা বদলাচ্ছে ক্রমশ।

মাধ্যমিক ও পরবর্তী স্তরের শিক্ষার সাথে বেশি সংখ্যক মেয়েদের যোগাযোগ ঘটা, গ্রামের ছেলেরা অন্যত্র কাজ করতে যাওয়ায় সংসার থেকে গ্রাম নিজেরা সামলানো, নানা রকম স্বনির্ভর প্রকল্প ও আরও নানা সামাজিক ওঠানামার মধ্যে দিয়ে বদলাচ্ছে চিত্রটা। চিরকাল ঘোমটার আড়ালে থেকে যাওয়া মুখগুলো দিনের আলোয় চকচক করছে। সংসার চালানোর খুঁটিনাটি থেকে নানা সামাজিক ক্ষেত্রে মতামত জানানোর অভ্যাস গড়ে উঠছে মেয়েদের। শুধু সামাজিক নয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে মেয়েদের সক্রিয় যোগদান। এতটাই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে যে, মূলস্রোতের রাজনৈতিক দলগুলিও আলাদা করে মেয়েদের সভা, মেয়েদের কেন্দ্র করে উদ্যোগ নিতে বাধ্য হচ্ছে। এমনকি বিজেপির মতো দল, যারা দলীয় নীতিগতভাবে নারী স্বাধীনতার উল্টো মেরুতে অবস্থান করে, তারাও মেয়েদের সক্রিয় যোগদানকে স্বীকৃতি দিয়ে সামান্য হলেও মেয়েদের রাজনীতি করানো নিয়ে ভাবিত; সে হোক না নিজের পিছিয়ে পড়া মতাদর্শের স্বার্থেই। পুরুষদের সমান নেতৃত্বের জায়গায় চোখে পড়ার মতো উঠে আসতে না পারলেও অচিরেই তার যে প্রবল সম্ভাবনা আছে তা বোঝা যাচ্ছে।

তবে আশঙ্কার মেঘও জমছে। পরিস্থিতির চাপে যেভাবে বাড়ছে স্কুলছুটের সংখ্যা, কাজের জন্য অন্যত্র পাড়ি জমানোর সংখ্যা তাতে কীভাবে হবে মেয়েদের রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ এটা নতুন করে ভাবনার সময় এসেছে। রাষ্ট্র বা বিকল্পধারার পন্থাগুলি পুরানো হয়ে পড়ছে।

আরও একটি অভ্যাস বাধ সাধছে এই অঞ্চলের মেয়েদের চিন্তা এবং মননে সাবলম্বী হয়ে ওঠায়। সুন্দরবন দেশ বিদেশের NGO গুলির তীর্থক্ষেত্র। কিছু কিছু NGO বাল্য বিবাহ আটকানো, নারীপাচার রোধ ইত্যাদি কাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও বেশিরভাগই ক্ষতি করছে সুন্দরবনের। NGO-এর দানকর্ম থেকে মানুষের মতামত নির্মিত হয় না। পিছিয়ে পড়া রাজনীতির অংশ হিসাবেও যেটুকু সক্রীয়তা তৈরী হয় মানুষের NGO ততটাই নিস্ক্রিয় করে দেয় গৃহীত মানুষের মতামত। NGO দান করবে আর মানুষ নেবে। বিষয়টা বড্ড একতরফা। নতুন কিছু নির্মাণের কোনো অবকাশ নেই। বছরভর নানা কিছু দান করে যাওয়ার ফলে নির্ভরতা বাড়ছে। নিজ উদ্যোগ ব্যতিরেকেই যদি দানসামগ্রী পাওয়া যায়, সেদিকেই ঝোঁক থাকছে বেশি। নিজের অধিকার বুঝে নেওয়ার থেকে অনেক সহজ ছেঁড়া জামাকাপড় পরে দুঃখী দুঃখী মুখে হাত পেতে জিনিস নিতে যাওয়া। এই প্রবণতাও বাড়ছে। আর যেহেতু মেয়েদের যোগাযোগ এই NGO গুলোর সাথে অনেক বেশি থাকছে তাতে নতুন প্রজন্মের মেয়েদের মুক্তচিন্তার আঙিনায় প্রবেশের পথে বাঁধার লিস্টে NGO-এর প্রভাবও বাড়ছে।

পুঁজির কেন্দ্রে সুন্দরবনের মেয়েরা

প্রাকৃতিক বিপর্যয়, কৃষিক্ষেত্রে লাভজনক চাষ না হওয়া এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের বিপুল অভাব- এসব নানান কারণে সুন্দরবন থেকে দলে দলে মানুষ এসেছে পুঁজির কেন্দ্রস্থল শহর গুলিতে। বিগত কয়েক দশকে সংখ্যাটা নিরন্তর বেড়েই চলেছে৷

কলকাতা শহরের কিছু কিছু জায়গাকে পুনরায় নাম দেওয়া যায় দঃ ২৪ পরগনার নামেই। একটুকরো বাসন্তী, একটুকরো পাথরপ্রতিমা, একটুকরো গোসাবা, কী জয়নগর। শহরে এসে ঘরভাড়া করে থাকার অবস্থা প্রায় কারোরই থাকে না। তারা গিয়ে ওঠে বস্তিতে, দখলি জমিতে, স্টেশনে, ফুটপাতের ধারের ঝুপড়িতে। এদিক ওদিক নানা কারখানা, রিক্সা চালানো, নির্মাণ শ্রমিক, গৃহ পরিচারিকা ইত্যাদি নানা জায়গায় ঠিকা শ্রমিকের অস্থায়ী কাজই বেশিরভাগের জীবীকা। কেউ কেউ চুক্তিভিত্তিক গাড়ি, এম্বুলেন্স  চালায়। বেশিরভাগ শ্রমেরই শ্রমিক হিসাবে স্বীকৃতি নেই। শ্রম আইনে জায়গা নেই। শহরের ব্লু প্রিন্টে থাকা খাওয়ার জায়গা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। অথচ এদেরই শ্রমের উপর শহরগুলির টিকে থাকা- নিউ নর্মাল। 

এইসমস্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অস্বীকৃত শ্রমিক হয়ে টিকে থাকে গ্রামের মেয়েরাও। মুক্ত হাওয়া, খোলা মাঠ, সবুজ প্রান্তর, ভাঙাচোরা হলেও মোটামুটি স্বাস্থ্যকর ঘরবাড়ি ছেড়ে এসে ঘোমটা টানা “মেয়েছেলে” গুলো যখন হাইরাইজ শহরগুলিতে দাঁড়ায়, বদলে যায় জীবনের সব অভ্যাস। এখানে ঘোমটা নেই, শাশুড়ী, জা, ভাসুর, ননদ ইত্যাদি সম্পর্কের বাঁধনও নেই, তাই নেই নিয়মনীতিও। আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় ভালোই তো। কিন্তু যন্ত্রসভ্যতার ৮/১০ ফুটের প্রায় অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ঝুপড়িতে মদ্যপ স্বামী, এক গাদা বাচ্চা, আর গুন্ডা বদমায়েশ, বেআইনী ধান্দার লোক, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উচ্ছেদের হুমকি সামলে এই মেয়েদের সংসার নারী স্বাধীনতার কোন আলো দেখে আমার জানা নেই। তার উপর ভোর থেকে রাত অব্দি শরীরের সবটুকু শক্তি নিংড়ে দিয়ে সংসারের খরচ জোগাড় করার কাজ তো আছেই। সূর্যের আলো ফোটার আগে ঘুম থেকে উঠে দিন শুরু হত যে মেয়ের, মাঠে-নদীতে-জঙ্গলে এবং ঘরে কাজের শেষে পাড়া এবং পরিবারের অন্যান্য মেয়েদের সাথে সন্ধ্যের আড্ডা, উৎসবে দু এক দিন ক্লান্তি ভুলে গ্রামশুদ্ধ মেয়ে বৌদের একসাথে আনন্দ যাপন শহরে এসে বদলে যায় প্যাঁচপ্যাঁচে গরমে বস্তির টাইম কলে কে আগে জল নেবে সেই নিয়ে মারামারি গালাগালিতে। অথচ এই মেয়েরা হয়ত একই গ্রামের, এবং তাদের আন্তঃসম্পর্কও ছিল অন্য রকম। গ্রামজীবন খুব ভালো ছিলো, সব সমস্যা বঞ্চনার ঊর্দ্ধে ভীষণ স্বাধীন ছিলো; তা নয়। বরং সামাজিক রীতিনীতি, পরিবারের আঁটোসাঁটো বন্ধন, কুসংস্কার এসব ছিলই। আবার রাজনীতির ক্ষেত্রেও জমি দখল, গোলাগোলি, খুন দাঙ্গার রক্তাক্ত “পৌরুষখচিত”পথে মেয়েদের বিশেষ জায়গা ছিল না।তবু সামাজিক-অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা এবং পুঁথিগত শিক্ষার সুযোগের প্রশ্নে শহরের বস্তিতে যে নতুন চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার জীবন, তার থেকে তো উন্নত ছিলই৷

সদ্য বদলে যাওয়া গ্রাম্য সমাজের রাজনৈতিক সচেতন হয়ে ওঠা অংশের মেয়েরাও যখন শহরে এভাবে এসে পড়বে কাজের তাড়নায়, তারও ভবিষ্যৎ এই মেয়েদের থেকে আলাদা কিছু হবে কী? স্কুল শিক্ষায় যতই বাড়ুক মেয়েদের সংখ্যা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির চাপে বেশিরভাগই শহরের বস্তিতে উঠে এসে হারাচ্ছে শৈশব-কৈশর।

ছেঁড়াটেঁড়া যৎসামান্য যেটুকু সুযোগ সুবিধা আছে এই নতুন বসতিতে সেটুকু হানাহানি না করে পাওয়া যায় না- এতই সামান্য তা। এখানে জোঁট বাঁধার উপায় কী? কর্মক্ষেত্র গুলিতেও ইউনিয়ন করার মতো অবস্থা নেই। আজ যে কাজ করে কাল সে বাতিল। এই অবস্থায় কীভাবে গড়ে উঠবে শ্রমজীবী এই উদ্বাস্তু মানুষগুলোর রাজনীতি? আর সেখানে কীভাবেই বা গড়ে তোলা সম্ভব মেয়েদের উদ্যোগ?

এই রাস্তাটাই খুঁজতে হবে। ভারত তথা পৃথিবীর পরিবেশের এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের দিকে নজর দিলে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে ভবিষ্যতে গ্রাম ছেড়ে রিফিউজি হয়ে আরও বেশি বেশি সংখ্যায় মানুষ উঠে যাবে শহরে। ঠিকানাহীন, পরিবারের বাঁধনহীন ছিন্নমূল মানুষ। তাতে বাদ যাবে না মেয়েরাও। আলাদিনের প্রদীপ কারোর হাতেই নেই যে হঠাৎ একদিন গ্রাম থেকে শহরে উঠে আসার স্রোত থামিয়ে দেবে। পুঁজিকেন্দ্রিক অর্থনীতীর আমূল পরিবর্তন ছাড়া গ্রামেও কর্মসংস্থান সম্ভব নয়। আর সেই আমূল পরিবর্তন একদিনে হবে না। ততদিনে কীভাবে শহরে ও গ্রামের এই মেয়েদের অগ্রণী করে তোলা যাবে তা ভাবতে বসতে হবে নতুন করে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে উন্নত পরিবেশেও বড় সংখ্যায় মেয়েদের সমাজ-রাজনীতি সচেতন করে তোলা যথেষ্ট কষ্টকর। নরকের জীবন যাপনে সে কাজ যে আরও ভীষণ শ্রমসাধ্য হবে- এ বলবার অবকাশ রাখে না। এবং শুধু সচেতন নয়, নেতৃত্বপ্রদানকারী জায়গায় এই শ্রমজীবী নারীসমাজকে এনে ফেলতে না পারলে শ্রেণীসংগ্রামের রাস্তায় বেশিদূর হাঁটা যাবে না। শুধু অর্ধেক আকাশ টাকাশ গালভরা উপমার জন্য নয়; নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মেয়েদের শ্রম ভীষণ প্রয়োজনীয় ও নতুন ইনভেস্টমেন্টের সেক্টর হয়ে উঠেছে – আর তাই মেয়েরাও শ্রমিক হিসাবে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। বিপুল এই শ্রমিক ও সংরক্ষিত শ্রমিকের বাহিনীকে সংগঠিত করতে হবে যে কোনো উপায়েই- তার পুরাতন যাপনের বাসস্থানেও এবং তার নতুন যাপনের বাসস্থানেও।

আশার বিষয়, নিজ বাসস্থান এবং নতুন আস্তানা -এই দুই জায়গাতেই মেয়েরা সংগঠিত হচ্ছে৷ সংগঠিত হচ্ছে জীবীকার প্রয়োজনে, জীবীকা সংক্রান্ত বৈষম্য শোষণ ও অধিকারের বোধ নিয়ে৷ শ্রমপ্রশ্নের পাশাপাশি ”মেয়ে” হওয়ার দরুন যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের লাঞ্ছনা তার ছবিটা বদলানোরও সচেতন সংগ্রাম উঠে আসছে এই সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণীর মেয়েদের মধ্যে। লিঙ্গ রাজনীতি নিয়ে সচেতন যে কোনো ফোর্স বা মানুষের কাছে একটা বড় টাস্ক রয়ে যাচ্ছে, লিঙ্গ রাজনীতির সংজ্ঞায় কী করে এই সংখ্যাগরিষ্ঠ একদম নীচুতলার মেয়েদের রোজকার জীবনের প্রশ্ন, আইডেন্টিটির প্রশ্নগুলি রাজনৈতিক মর্যাদা পায় তা নিয়ে কাজ করা৷ শ্রেণীর রাজনৈতিক কর্মীদের কাছেও রয়ে যাচ্ছে এর পরিপূরক প্রশ্নটা- অর্থনৈতিক দাবীদাওয়ার অধিকারের লড়াইয়ে কী করে অংশিদার হয়ে উঠবে মেয়েদের জন্মসূত্রে প্রাপ্ত পরিচয়ের লড়াইটি৷ শ্রেণী রাজনীতিতে এ প্রশ্ন বারবার এসে পড়লেও নতুন করে সূত্রায়ণের প্রয়োজন পড়ছে৷ আর এই টাস্কটাও কিন্তু এই মেয়েরাই সমাজের মূলস্রোতে এবং রাজনৈতিক আঙিনায় তাদের বিপুল অংশগ্রহণ দিয়েই করে দিয়েছে৷

ফিরে যাই সুন্দরবনে৷ সুন্দরবনের আনাচে কানাচে অত্যন্ত সচেতনভাবে কান পাতলে একটা মৃদু গুঞ্জন শোনা যায় অন্দরমহল থেকে৷ একটা চাপা কলরব ওঠে দুপুর রোদের চাষের ক্ষেতের থেকে৷ সূর্য ওঠার আগে গুনগুন করে নারী কন্ঠরা৷ভোরের গাড়ি ধরে শহরে কাঁকড়া বেচতে যাওয়ার হুড়োহুড়ির শব্দের থেকে আলাদা সে গুনগুন৷ এই সমস্ত চাপা কলরব, কন্ঠস্বর বজ্রনিনাদ হয়ে ফেটে পড়ে সংগঠিত হওয়ার ডাক দিলে৷ ভিটে ছেড়ে উৎখাত হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা, পাথরের মতো রূক্ষ এবং পাখির মতো হালকা পরিযায়ী জীবন, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও সুন্দরবনের মতো জল জঙ্গলের জায়গায় এক ফোঁটা পানীয় জলের জন্য হাহাকার, প্রসবের যন্ত্রণা নিয়ে শতভঙ্গুর রাস্তায় ১০০ কিলোমিটার পাড়ি দেওয়ার জেদ ছাপিয়ে ওঠে ময়দান, সভাগৃহে৷ সুন্দরবনের অবস্থা বদলানোর কথা উঠলে সবার আগে যে মানুষের স্রোত দেখা যায় তারা সুন্দরবনের মেয়েরা৷ নিজেদের জন্য দিন বদলের স্বপ্নটা উনোনের আঁচে রোজ জিইয়ে রাখছে সুন্দরবন কন্যারা; তাতে প্রতিদিন জমছে গনগনে আগুনের তাপে ঝরে পড়া ঘামের বিন্দু৷এই পরিবর্তন, এই ঝোঁককে চেনার আছে৷ নতুন করে বোঝার আছে৷ সুন্দরবন তথা ভারতবর্ষের অসংখ্য অনামী বেনামী আনস্মার্ট সর্বহারা মেয়েরা নিজেদের আর্থ সামাজিক আঙ্গিক থেকে লিঙ্গ রাজনীতির লড়াইয়ের যে অধ্যায়ের সূচনা করছে তা মেইনস্ট্রিম করে তুলতে না পারলে সকল মেয়ের জন্য বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। আর সুন্দরবনে গিয়ে কাঁকড়ার অপূর্ব ঝোল খেয়ে ফিরে আসার আগে রান্নাঘরের ভঙ্গুর দেওয়ালে গরমে ঘেমে নেয়ে অস্থির হতে হতে কান পেতে ধৈর্য্য ধরে দাঁড়ানোর অভ্যাস তৈরী করতে হবে- ভারতী সর্দার বাঘের মুখ থেকে ফিরে এসে আগের ভারতীই রয়ে গেছে নাকি জীবন মৃত্যুর এমন লড়াইয়ে কিছুটা বদলে গেছে মানুষটা? সুন্দরবনের কোল জুড়ে থাকা ভারতীদের কাছেই নতুন করে শুনতে হবে কঠোর-স্নেহময়-রোমঞ্চকর রূপময় সুন্দরবনের রূপকথাগুলি।

চিত্রঋণ- দ্য বেটার ইন্ডিয়া

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *