তিনু ও ড্রাগন কাকুর গল্প

   দরজার ছিটকিনিতে হাত পৌঁছচ্ছে না। গোড়ালি উঁচু করে হাতের আঙুলগুলো দিয়ে কোনওমতে ছোঁয়া যাচ্ছে, কিন্তু ধরা যাচ্ছে না। পায়ের আঙুলের ওপর পুরো শরীরের বোঝা। নিঃশ্বাস চেপে আসছে। ভারসাম্য নড়বড় করছে। আঙুল ঘষে যাচ্ছে ছিটকিনির হাতলে। আর এক চিলতে পরিমাপে আটকে যাচ্ছে হাতের কবল থেকে। অনেকক্ষণের কসরতে হাঁফ ধরে গেল। মেঝেতে শুয়ে গড়িয়ে নিল। লাল মেঝেতে কালো শরীরটা একতাল মাটির মতো। ঘামে চ্যাটচ্যাটে চামড়া মোলায়েম মেঝেতে চেটে আছে। নড়লে চড়লে স্টিকারের মতো উঠে আসছে। তিনুর খালি গায়ে থাকতে ভালো লাগে না, লজ্জা করে। শরীরের মেদ লেগেছে। স্তনের চারপাশে মাখনের মতো চর্বির প্রলেপ। তিনু বুকের ওপর হাতের ছোট পাঞ্জাটা চেপে ধরে লজ্জা পায়। মা ঘুমোচ্ছে মশারির ভিতর। মা ঘুমোলে নাকের ভিতর থেকে একটা মিষ্টি শব্দ আসে। ছোট ছোট ঢেউয়ের মতো নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ। তিনু দরজার ছিটকিনি খুলতে বিশ্রান্ত হয়ে মশারির মধ্যে ঢোকে। 

   মশারির মধ্যে ঢুকতে তিনুর ভালো লাগে না, দমবন্ধ হয়ে আসে। খালি গায়ে থাকতেও ভালো লাগে না, লজ্জা করে। মা বলেছে মশারির মধ্যে থাকতে। মশা কামড়ালে ম্যালেরিয়া হবে। গরমকালে খালি গায়ে থাকতে হয়। সব ছেলেরা গরমকালে খালি গায়ে থাকে। বাবাও বাড়ি ফিরে খালি গায়ে থাকে। বাবার বুকে বগলে ম্যাগির মতো কোঁকড়ানো লোম। খালি গায়ে বাবা কোলে নিতে এলে ছুটে পালায় তিনু। মা-কে কানে কানে বলে, “বাবাকে বলো জামা পরে আসতে”। বাবা জোরে হেসে ওঠে, “অ্যাই ব্যাটা এদিকে আয়।” তিনু ছুটে খাটের তলায় ঢোকে। খাটের তলায় একবার ঢুকলে আর বেরোতে চায় না। খাটের চার পায়ার নীচে একজোড়া করে ইঁট দিয়ে উঁচু করা। কিছুদিন আগে পর্যন্ত তিনু নিজে নিজে খাটে উঠতে পারত না। কোনওমতে ছেঁচড়ে কায়দা করে খাট থেকে নামতে হত। খাটের তলায় বসে থাকলে ঘাড় নোয়াতে হত না। এখন তিনু লম্বা হয়েছে, নিজে নিজেই খাটে ওঠা নামায় পারঙ্গম। খাটের তলায় সিঁধোলে মাথা নুইয়ে বসতে হয়। খাটের তলায় অঢেল জিনিস পত্তর। এক কামরার বাড়িতে গেরস্থালির সরঞ্জাম সংকুলানের উপায় ইঁট দিয়ে খাট উঁচু করে খাটের তলায় জায়গা বাড়িয়ে নেওয়া। 

   তিনু খাটের তলায় চালের বস্তার পিছনে খুঁজে পেয়েছে পিতলের বাসন, একটা ল্যাদা পোকায় কাটা হলুদ ঝুরঝুরে পাতার বই; মলাটের ওপরে লেখা ‘কি মজার কলের গাড়ি, শ্রী মুন্সী আজিমদ্দীন প্রণীত, শ্রী কাজী সফিউদ্দীনের আদেশানুসারে।’ পরের পাতায় আবছা কালিতে লেখা, ‘শ্রীযুক্ত বিমল চন্দ্র দাসের শুভ পরিণয়ে মহম্মদ আবদুল কাদের,’ একটা লাল শালুতে মোড়া কয়েকটা মুদ্রা, বনস্পতির কৌটোর মধ্যে রাখা ওপরানো পেরেক, দরজার কব্জা, গজাল, আরও কিছু উদ্বৃত্ত লোহালক্কর। এসবের পিছনে সিমেন্টের ফাটলের আঁকাবাঁকা নদী, তার পিছনে ঘরের দেয়াল। দেয়ালে একটা গভীর ছোট্ট গর্ত। গর্তে চোখ রাখলে দেখা যায় একটা রঙীন আলো, একটা খয়েরী উঠোন, থোকা থোকা ফুলের ভারে নুইয়ে পড়া একটা গাছ। তিনুর একটা আঙুল ঢুকে যায় গর্তে। তিনু আঙুল দিয়ে চেষ্টা করে গর্তটাকে বড় করতে। তিনু হেঁইয়ো হো করে চেষ্টা করে। যেমন করে নলকুয়ো খোঁড়ার সময়ে ওরা গান গায়। তবু তিনুর মাথা গলে না গর্ত দিয়ে। তিনু জানে একবার মাথা গলে গেলে বাকি শরীরটাও গলে যাবে ঠিক। 

   বাইরে থেকে মা ডাকে, ‘তিনু বেরিয়ে আয়। তেঁতুল বিছে! তেঁতুল বিছেে !’ তিনু হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসে। একদিন সত্যি সত্যি তেঁতুল বিছে দেখেছে তিনু। তেঁতুলের মতো খাঁজ কাটা শরীর। দুইপাশ জুড়ে রোঁয়া রোঁয়া পা। কিলবিল কিলবিল করছে। তিনু খাটের তলায় ঢুকতে ভয় পায়। মা যেন কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে, ‘তেঁতুল বিছে! তেঁতুল বিছে!’ তারপর আবার দুপুরবেলায় মা ঘুমোলে খাটের তলায় ঢোকে। হামাগুড়ি দেয়। পুরনো বই, পিতলের থালা, লোহালক্কর, মুদ্রার পুঁটুলি সরিয়ে দেওয়ালের ফুটোতে চোখ দেয়। একটা উঠোন, কনে দেখা আলো, ফুলের গাছ আর একা রাস্তা। টিলার গায়ে ওঠানামা করতে করতে আলোর ভেতরে হারিয়ে যাবার রাস্তা। তিনু আঙুল ঢোকাতে চেষ্টা করে। এত ছোট গর্ত, আঙুলও ঢোকে না ঠিক মতো। তিনু জানে, আঙুল ঢুকলে হাত ঢুকবে একদিন। আর মাথা ঢুকে গেল শরীরটা গলে যাবে অনায়াসে। 

     তিনু খাটের তলা থেকে বেরিয়ে খাটে ওঠে। মশারির ভেতর ঢোকে। মা’র ঘুমের শব্দ। মা’কে এখন ডাকলে বকুনি জুটবে। তিনু তবু মা’কে ডাকে, “মা! অনেক বেজে গেছে। এবার বাইরে যাব।” মা ঘুম চটকানো খাপ্পা মেজাজে বকে দেয়, “নিজেও একটু ঘুমোবি না, আমায়ও ঘুমোতে দিবি না। কবে যে তোর গরমের ছুটি শেষ হবে। ইস্কুলে গেলে একটু রেহাই পাই।” বকা খেয়ে চুপ করে থাকে তিনু। নরম করে বলে, “আমায় একটা জামা দাও। আমার খালি গায়ে ভালো লাগে না মা।” তিনুর মা ঘুমিয়ে পড়েছে। মিষ্টি শব্দের ঘুম। তিনু বালিশের ওপরের বালিশের ঢাকা তোয়ালেটার একপ্রান্ত গলায় মালার মতো জড়িয়ে গর্দানের কাছে কোন দুটোয়ে গিঁঠ মারে। বুকের ওপর শরীরের সামনের দিকের আব্রু ঢেকে তোয়ালে ঝুলে থাকে। তিনু রান্নাঘরে যায়। রান্নাঘরের তেলাপোকার তেলচিটে গন্ধ। নর্দমায় জমে আছে দুপুরের ভাতের ফ্যান। গ্যাসের উনুন রাখা পাথরের পাটাতন কাপড়ে মোছা পরিপাটি নিকানো। তিনু নীচের তাক থেকে একটা অ্যালুমিনিয়ামের ছড়ানো পাত্র বের করে। বালতি থেকে আধমগ জল ঢালে তাতে। মশলার আলমারি খুলে এক চিমটে হলুদ মেশায়। এক চিমটে লাল লঙ্কার গুঁড়ো। তিনু মশলা জলে গুলে দেখে নেয় রঙটা। লালচে হলুদ মাংসের ঝোলের মতো রঙ। একটু নুন ছড়িয়ে দেয়। জানলার পাশে রাখা তিনটে নুড়ি পাথর ডুবিয়ে দেয় হলুদ গোলা জলে। তারপর মেঝেতে এককোনায় বসে একটা ঝাঁটার কাঠি দিয়ে অনেকক্ষণ নাড়াচাড়া করে পাথরগুলো। তিনুর অলীক আঁচে তার রান্না ফুটতে থাকে। সুবাস ছাড়ে ভুরভুর করে। রান্নাঘরের যাবতীয় গন্ধ ফিকে হয়, নুড়িগুলো টগবগে বুদ্বুদে ফুটতে ফুটতে উথলে ওঠে। তিনু সব বুঝতে পারে, উথলে ওঠা রান্নার উষ্ণতা, আঘ্রাণ আর ঝোলের হলুদ রঙের গাঢ়ত্ব। রান্না হয়ে এলে তিনু বুকে তোয়ালেটাকে শাড়ির আঁচলের মতো টেনে নিয়ে তোয়ালের খুঁট দিয়ে গরম বাটি নামায়। তিনটে ছোট থালা বের করে বাসনের তাক থেকে। ঝোল আর নুড়ি পরিবেশন করে। বড় নুড়িটা ডানদিকের থালায়, মেজটা মাঝখানে আর ছোটটা শেষ থালায় রেখে সেটাকে নিজের দিকে টেনে নেয়। মা যেমন বাবাকে বড় মাছটা দেয়, তিনুকে মেজটা আর নিজের জন্য সবচেয়ে ছোটটা। নিজের থালায় খাবার জুড়িয়ে যায়। তিনু অপলক অন্য থালা দুটোর দিকে তাকিয়ে থাকে। তরাসের ব্যাকুলতায় জিগেস করে “ভাল হয়েছে তো?” তিনুর মুখে হাসি ফোটে। এদের খাওয়া হয়ে গেলে তিনু খেতে বসবে। তারপর বাসন মাজা, রান্নাঘর পরিষ্কার করা। পাথরের পাটাতনটার মতো পরিষ্কার। ন্যাকড়ায় মোছা।

    মা-র ঘুম ভাঙলে এই বন্ধ ঘরটা থেকে মুক্তি পাবে তিনু। বাইরের বারান্দাটাকে টিনের আগল দিয়ে একটা ছোট ঘর বানানো হয়েছে। সেখানকার জানলাটা খুললে রাস্তার মোড়টা মুখ থুবড়ে ঘরের মধ্যে এসে পড়ে। বেলা সাড়ে চারটেয় রাস্তার টাইমকলে জল আসবে। পাড়ার মেয়ে ঝি-রা জল ধরতে আসবে। দোতলার অন্তু কাকা ডিউটি সেরে সাবান মেখে ভুত হয়ে স্নান করতে আসবে। তিনু জানলার গ্রিলে ফাঁকে মাথা রেখে গল্প করবে। অন্তুকাকুর স্নানের সময়ে সচরাচর কেউ ধারে কাছে থাকে না। লাল বর্গকাটা গামছাটাকে ল্যাঙোট করে পরে সারা গায়ে সাদা ফেনা মেখে ভুতের মত দাঁড়ায়। বগল রগড়ে, পা ঘষে, ল্যাঙটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে কচলে কচলে, ডলে ডলে সাবান মাখে অন্তুকাকু। তারপর হাপুস হুপুস করে জল ঢালে। তিনুও স্নানের সময়ে দূরে গিয়ে দাঁড়ায়। অমন জন্তুর মতো আধন্যাংটো পুরুষমানুষ দেখে মাথা নীচু করে সরে যাওয়াটাই সহবৎ। 

  অন্তুর গায়ের সাবান ধুয়ে চকচকে খয়েরী চামড়ায় মোড়া শরীরটা দেখা যায়। জলের ছোঁয়ায় গায়ে, হাতে পদ্মকাঁটার মতো রোমকূপগুলো স্পষ্ট হয়। অন্তু জল ঢেলেই যায়। শম্পার দিদা হাঁক পাড়ে, “ও অন্তু! তোর হল রে! জল চলে যাবে তো!” অন্তু চটপট অন্য একটা শুকনো গামছা দিয়ে অনেক কসরতে গা মুছে দু-কলি নতুন ছবির গান গাইতে গাইতে চলে যায়। শম্পার দিদা দুটো বালতি আর তিনটে প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে আসবে। করুণা বৌদি ম্যাক্সিটা তুলে কোমরের কাছে গিঁট বেঁধে কলের পাশে হাঁটু মুড়ে বসবে। চঞ্চলের বউ, পিয়া দিদি সবাই এসে দাঁড়াবে জটলা করে। সকলে যে জল নিতে আসবে এমনটা নয়। অনেকের নিজের বাথরুমে আলাদা জলের লাইন আছে। তবু বিকাল বেলা এই অবসরের সুযোগটা হাতছাড়া করা যায় না। ইলা কাকিমা আসেনি আজকে। তিনু জানলায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, “ও পিয়া দিদি, ইলা কাকিমা কই গো?”। পিয়া দিদি ফিক করে হেসে উত্তর দেয়, “না রে আজ ইলা বৌদির শরীর খারাপ।” তিনু গালে হাত দিয়ে বলে “ওমা! সে কী গো! এইতো সকালে দেখলাম বাজার করতে গেছে। কী হল গো?” পিয়া দিদি, শ্যামা দিদি মুখ টিপে পেট থেকে উঠে আসা হাসি চাপে। শম্পার দিদা বলে, “ওই পেট ব্যাথা হয়েছে রে তিনু। সেরে যাবে।” তিনু আবার বলে, “নিশ্চয়ই হরিদার ফুচকা খেয়েছে বেশি করে। ডাক্তার দেখাতে বলো গো পিয়া দিদি!” পিয়া দিদি আবার রহস্যের হাসি হেসে বলে, “না রে তিনু, বড়দের অমন পেট ব্যথা প্রতি মাসে মাসে হয়।” তিনু অবাক হওয়ার টানে বলে, “সত্যি! প্রতি মাসে পেট ব্যথা! বাবাগো কত বড় হলে হয়? আমার পেট ব্যথায় খুব কষ্ট হয় জানো!” তিনুর কথা শুনে পিয়া দিদি, শ্যামা দিদি, চঞ্চলের বউ হাসির ঢেউ-এ গড়াগড়ি খায়। পিয়া দিদি হাসতে হাসতে বলে, “না রে তিনু তোর ওসব হবে না।” শম্পার দিদা তেলে পাঁচ ফোড়ন দেওয়ার মতো ঝাঁঝিয়ে ওঠে, “বেহায়া মেয়েমান্ষের দল! কার সামনে কী কথা বলতে হয় জানিস না। বেটাছেলের সামনে নোংরা কথা বলিস।” পিয়া দিদি আবার চেপে রাখা জলের মতো বজবজ করে হেসে শ্যামাদিদিকে জড়িয়ে ধরে। “ও আবারা ব্যাটাছেলে কইগো দিদা। ওতো আমাদের তিনু।” 

     তিনু লজ্জা পায়। অজানা লজ্জা, অজানা ভয়, আর পেটের ভেতর গুড়গুড় করা অস্বস্তি। এরকম সময়ে তিনু বারবার ঢোঁক গেলে। পেটের নালী বেয়ে উঠে আসা উদ্বেগটাকে ঠেলে ঠেলে নীচের দিকে নামায়। শম্পার দিদা বোতলের ছিপি বন্ধ করতে করতে বলে, “হ্যাঁ রে শ্যামা! তোদের নতুন ভাড়াটে, কী যেন নাম…” চঞ্চলের বউ ধরিয়ে দেয়, “অঞ্জন”। শম্পার দিদা চোখ বুজে মনে করার চেষ্টা করে, “অঞ্জনের বউটা। অঞ্জন তো বাড়িতেই থাকে না।” চঞ্চলের বউ আবার ধরিয়ে দেয়, “ওই তো সোমা।” শম্পার দিদা চোখ খোলে, “হ্যাঁ সোমা। তো সে মাগী জল তোলে না? ওর ঘরে তো লাইন নেই।” চঞ্চলের বউ মুখ বেঁকায়, “জানি না গো কাকী, ওর চলন বলনে হেব্বি দেমাক। আমি বেশি কথা বলি না।” তিনুও চঞ্চলের বউ-এর স্বর অনুকরণ করে বলে, “হ্যাঁ গো দিদা! এঁয়ো স্ত্রী মানুষ। হাতে তো কই শাখা পলা দেখি না। কপালে সিঁদুরও নেই!” পিয়া দিদি ধমক দেয়, “এই তুই চুপ কর তো!” করুণা বউদি ঠাকুরের বাসন ধুতে ধুতে বলে, “ওরে চুপ করিয়ে আর কী করবি! এতটুকু ছেলের চোখেও পড়েছে এমন অনাচারের ব্যাপারখানা।” শম্পার দিদা বলে, “ও সব ছেলে ছোকড়াদের মাথা খাবে। ওই যে ছিল না? রিমা না কী যেন নাম! কেলেঙ্কারি করে পাড়া ছাড়া হল! এই মাগীরও সেই দশা হবে বলে দিলাম।” তিনুও শম্পার দিদা-র মতো চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, ও মা! সেদিন দেখলাম পিয়া দিদির দাদার সাথে পানের দোকানে কত কথা!বেপাড়ার কুকুর দেখলে কুকুর যেমন তেড়ে যায়, পিয়া দিদি তেমনি তেড়ে আসে তিনুর জানলার দিকে, “এই তোর এত মাগীপনা কথা কিসের রে? তোর মাকে বলব? যা ঘরে যা!” 

     তিনু এক ছুটে ঘরে যায়। খাটের তলায় ঢোকে। বুকে কাছে চেপে রাখা অপমান আর লজ্জার ঝাঁঝটা কোলার বোতলের ছিপি খোলার মতো গলা বেয়ে ওপরে উঠছে। সর্দির দলা, চোখের জল সঙ্গে করে ক্রমশ গলার কাছে আসছে। তিনু ঢোঁক গিলে গিলে আর নীচে নামাতে পারছে না। তিনু দেওয়ালের ফুটোয়ে চোখ রাখে। উঠোনের ফুল গাছটা হাওয়ার নড়ছে। ফুলগুলো ঝরে ঝরে গোলাপী হয়ে আছে গাছ তলা। ঢালু রাস্তাটায় সরসর করছে ঝোড়ো পাতা। আকাশটা খুব নীল। নীলের চেয়েও বেশি নীল। টপ করে গলে পড়ল জল হয়ে। তিনুর চোখেও জল নেমেছে। নোনতা জলের ধারা। 

   

গতকাল থেকে ইস্কুল খুলে গেছে। আজ থেকে ভেতরকার ছটফটানি শুরু হয়েছে তিনুর। অটো থেকে নেমে ইস্কুলের দরজা অবধি পথটুকু যেতে যেতে হাড় হিম করা ভয় নামে কানের লতি বেয়ে। ইস্কুলের লাল ফটকটা যেন একটা বিশাল দত্যির মুখ, আর কায়দা করা লোহার স্তম্ভগুলো যেন তার গজাল গজাল দাঁত। মা-র হাত ছেড়ে দত্যির পেটের মধ্যে ঢুকতে হবে। ভিতরে খুব যুদ্ধ হবে। যুদ্ধ থেকে ফেরার সময়ে কেউ বা কারও বন্ধু হবে, কেউ বা কারও শত্রু হবে। কত যে লোক জখম হবে! কত যে লোক মরেই যাবে! তিনু এসব ভেবে ভয় পায়। ছটফটানি, ধুকপুকুনি ঠান্ডা গাঢ় হয়। ভয়টা দিন দিন বাড়ছে। স্কুলের ভেতরের হাওয়াটার ওজন বাড়ছে দিন দিন। শ্বাস নিতে হলে টেনে টেনে বুকের হাঁপরে চাপ পরে। অথচ ক্লাসের আবহাওয়া এরকম ছিল না। তিনু কথা বলতেই, হাঁটতে, বসতে এমনকি চুপ করে বসে থাকলেও সেই ভারী হাওয়ারা ফিসফিস করে। তিনু ফিরে দেখে হয়তো কেউ কিছুই বলছে না। গাছের পাতা হয়তো একটুখানিকও নড়ছে না। তবু ফিসফিসানি, তবু খসখস শব্দ। 

    বিক্রমদের একটা দল আছে। বিক্রমের গায়ে হেব্বি জোর। নয়নকে মেরে দাঁত ফেলে দিয়েছিল। নয়ন অন্য দল বানাতে চেয়েছিল। সোহম সায়ক ওরা ভিড়েছিল নয়নের দলে। এখন নয়নরা একটু সময় নিচ্ছে। বাতাসটা থমথমে। একটা বড় যুদ্ধ হবে। বন্দুক আসবে, বারুদ আসবে, তিনু ভয় পায়। যুদ্ধের ভয়, দুঃখের ভয়। তিনু কোনও দলে নেই। সেটাই আরও কাল হয়েছে। দুই দলই বন্দুকের নল উঁচিয়ে ঘুরছে। যেতে আসতে গায়ে ঘষা লাগছে সেই নলে। 

   পার্থ একটা নতুন শব্দ এনেছে জোগাড় করে। এর আগে ‘বোকাচোদা’ শব্দটা পার্থই নিয়ে এসেছিল ক্লাসে। তারপর থেকে অবাধ্য মশার ভনভনে শব্দের মতো ক্লাসে ছড়িয়ে পড়ল। প্রথমে চাপা হাসিতে, তারপর অহেতুক উৎসাহে এবং ক্রমশ রাগে হিংসায় দ্বেষে ছড়িয়ে পড়ল শব্দটা। এবার পার্থর নতুন শব্দ আমদানি ‘লেডিস’। তিনু লেডিস শব্দের মানে জানে। শব্দটা কানে ছ্যাঁকা দিয়ে যায়। বোকাচোদায় তবু রাগ ছিল, লেডিস-এ শুধুই অপমান। খালি গায়ে থাকার মতো অস্বস্তি। বুকের কাপড় একটানে খুলে ফেলার মতো লজ্জা। নয়নের দল প্রথম শুরু করেছিল। এখন পথের ধারে পড়ে থাকা সাইকেল রিক্সার হর্নের মতো যে যখন যায় বাজিয়ে চলে যায়। হর্নের বিকট আওয়াজে হাসি পায় ওদের। তিনু বিক্রমদের দলে ঘোরাঘুরি করেছিল কয়েকদিন। দলে ঢুকে গেলে নয়নদের সাধ্যি নেই কিছু বলে। কিন্তু বিক্রমদের দলের ছেলেরা যখন তখন তিনুর জামার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দেয়। চার-পাঁচজন মিলে গায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দলের ভিতরে কেউ লেডিস ডাকে না। বিক্রমের দলের সোমনাথ প্রথমে তিনুকে বলেছিল, “ও আমার বউ!”। বাকিরা হামলে পড়েছিস, “কেন রে বোকাচোদা তোর বউ কেন হবে। আমার বউ!” বিক্রম বলে, “ও আমাদের সবার বউ। মহাভারতে যেমন ছিল, পাঁচজনের একটা বউ।” সোমনাথ তবু তর্ক করে, “আমি আগে বলেছি, আমার বউ।” বিক্রম বলে, “ও কি ফুল মেয়ে? হাফ মেয়ে হলে একার বউ হয় না। ও সোমনাথের বউ মানে আমার বৌদি। আবার আমার বউ মানে সোমনাথেরও বউদি।” তিনুকে দলে সবাই বৌদি ডাকে। বাইরে লেডিস বললে তিনু তাও দু-এক কথা শুনিয়ে দিত। কিন্তু দলের মধ্যে বৌদি বললে মাথা নীচু করে থাকা ছাড়া উপায় নেই। বিক্রমদের ভয়ে কেউ লেডিস ডাকে না। বৌদি বলা শুরু হয়েছে। যুদ্ধটা যত কাছে আসছে এইসব টোকা টিটকিরি বাড়ছে। জামার মধ্যের হাত ক্রমশ প্যান্টের মধ্যে নামছে। তিনু একদিন দল থেকে বেরিয়ে ছুট দেয়। ছুটতে ছুটতে স্কুলের পরিত্যক্ত গ্যারেজটার ভাঙা টিনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে। একটা হাড় বের করা দুমড়ানো মোচড়ানো বাস আছে। ভেতরটা খুব অন্ধকার। কোনও অ্যাক্সিডেন্টে বাসের সামনের দিকে মুখ থেঁতলে গেছে।

       তিনু বাসের ভেতর ঢুকে বসে। অ্যাক্সিডেন্ট হবার আগে শেষবারের মতো বাস চলেছিল। তারপর আর কেউ চড়েনি এই বাসে। এদিকে কেউ আসে না। সবাই জানে এই বাসে ভুত আছে। সেই অ্যাক্সিডেন্টে মরে যাওয়া তিনটে বাচ্চার ভুত। তিনু বাসে উঠে শুনতে পায় শেষবারের মতো তিনটে বাচ্চার আর্তনাদ। যুদ্ধ আসছে। একদিকে পান্ডব অন্যদিকে কুরুপক্ষ। এই যুদ্ধের বাজারে নিজের অক্ষপথ কিছুতেই ঠিক করে উঠতে পারে না তিনু। 

       দল থেকে পালিয়ে যাবার পর বিক্রম সবাইকে বলেছে, “নয়নরাই ঠিক বলেছে। ও লেডিস!” তারপর থেকে তিনু নড়লে চড়লেই শুনতে পায় ‘লেডিস’। হাতের নখ খুঁটলে কেউ এসে বলে যায় ‘বৌদি’। শৈবাল হিতৈষী হয়ে বলতে এসেছিল, “তুই এত মেয়েলী বলেই তো ওরা ওমনি বলে। তোর হাত নাড়া, কথা বলা এত মেয়েদের মতো কেন রে?” তিনু চেষ্টা করে দেখেছে শ্বাস নিলে বা চোখের পাতা পড়লেও ওরা বলে মেয়েদের মতো। ছেলেরা কিভাবে শ্বাস নেয় চোখের পাতা ফেলে বুঝতে পারে না তিনু। মাথা চুলকালে, হাই তুললে, জিভ কাটলে, হাঁচলে, কাশলে, হাসলে, কাঁদলে, হাঁটলে, বসলে, রাগলে, বকলে, হাগলে, পাদলে সব সময়ে সর্বত্র সবাই সব রকমভাবে বলে চলে বলেই চলে, ‘লেডিস’, ‘বৌদি’, ‘মগা’, ‘ফিফটি-ফিফটি’, ‘ছক্কা’, ‘হোমো’, ‘হিজড়ে’, ‘সখী’, ‘সার্কিটে গন্ডগোল’, ‘হরমোনের প্রবলেম’, ‘ডিফেক্টিভ মাল’, ‘অ্যাবনরমাল’, ‘জিনের দোষ’, ‘পাপের ফল’ যুদ্ধ যত কাছে আসছে তত নতুন নতুন শব্দ ঢুকছে বেনোজলের মতো। 

     তিনু এখন সবার সামনে আর হাসে না, কাঁদে না, চোখের পাতাও ফেলে না। একদিন ঠিক করল মরা কাঠের মতো বসে থাকবে। জড় পদার্থের তো ছেলে মেয়ে নেই। তিনু পড়েছে লিঙ্গ তিন রকমের, স্ত্রী লিঙ্গ, পুং লিঙ্গ, আর ক্লীব লিঙ্গ। তিনু ক্লীব লিঙ্গের মতো নিষ্প্রাণ পড়ে থাকে। শ্বাস চেপে রাখে। শরীর নীল হয়ে অবশ হয়ে আসে। হঠাৎ বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। মেয়েলি বুক, মেয়েলি কম্পন আর পুরুষালী উপহাস। 

       তিনু এখন রোজ টিফিনের সময়ে উধাও হয়ে যায়। টিফিনের সময়টাই খুব বিপজ্জনক। টিফিনের সময়টাই বড় হিংস্র। তিনু বন্ধ গ্যারাজে ভাঙা গাড়িটায় চড়ে বসে। টিফিন বাক্স খোলে। একটা রুটি আর তরকারি। কোনওদিন সঙ্গে একটা বিস্কুট। তিনুর খিদে পায়। সকালে বেরনোর আগে এক পেট ভাত ডাল আলুসেদ্ধ খেয়ে এসেছে। তবু খিদে পায় তিনুর। ভাঙা গাড়িটা ধুলোর পরতে ঢেকে গেছে। বাসের পাটাতনগুলো খসে গিয়ে লোহার অস্থিপিঞ্জর বেরিয়ে গেছে। লোহায় জং ধরেছে জায়গায় জায়গায়। তিনু সিঁড়ির লোহার রডে পা দিয়ে ওপরে ওঠে। পায়ের নীচের কাঠের তক্তাগুলো নড়বড়ে হয়ে ক্যাঁচকোঁচ শব্দ হয়। তক্তার ওপর চিতিয়ে থাকা পেরেকগুলো তক্কে তক্কে আছে। পা এদিক থেকে ওদিক পড়লেই জুতো ফুঁড়ে পা বিঁধিয়ে দেবে। জুতোর শুকতলায় ঘষা লেগে ধুলো ওড়ে। তিনু দু-তিনবার হেঁচে নেয়। 

    গ্যারাজ ঘরের টিনের একদিকটা জং পড়ে ভঙ্গুর হয়ে ঝরে পড়েছে। অন্ধকার গ্যারাজ ঘরটায় রোদের তরল আলো গলে নামছে সেই ভাঙা চালের থেকে। ওই আলোটুকু সম্বল করেই তিনু ভেতরে ঢোকে। বাসের জানলায় কাচ ভেঙে একটা গর্ত আছে। অ্যাক্সিডেন্ট-এর সময়ে একটা ধাতব পাত এসে গর্ত করে দিয়েছে। সেই গর্ত বেয়ে একফালি রোদ বাসের পিছনের সিট-এ এসে পড়েছে। অ্যাক্সিডেন্টে বাসের সামনেটা থেঁতলে গেলেও পিছনের দিকটা মোটামুটি অক্ষত। তিনু পিছনের সিটে বসলে ওর কোলের ওপর রোদের বলটা পশমের দলার মতো এসে পড়ে। তিনু টিফিন বাক্স খোলে। ঠান্ডা চামড়ার মতো রুটিতে একটু রোদ লাগে। প্রায় রোজ আলুর তরকারি থাকে। আজ সিমের চচ্চড়ি দেখে তিনুর মনটা ভালো হয়ে যায়। যত্ন করে রুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে সিমের চচ্চড়িতে মুড়ে মুখে পোরে। গোটা রুটিটা শেষ হবার আগেই ওইটুকু চচ্চড়ি শেষ হয়ে যাবে, এই ভয়ে তিনু যৎসামান্য চচ্চড়ি দিয়ে রুটির টুকরো মুখে দেয়। 

   তিনু জানে বাসের ভেতর আরও তিনটে বাচ্চা আছে। পাঁচ বছর আগে অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছিল। বাসের সামনের সিটে বসেছিল ওরা। ওরা তিনজন ফিসফাস করে। খিলখিল করে এর ওর গায়ে ঢলে পড়ে।  তিনুকে খোঁচা দেয়। গ্যারেজের টিনের চাল ফুটো করে গজিয়ে ওঠা জামগাছের ডাল দিয়ে খোঁচা দেয়। তিনুর কানে কানে ফ্যাসফ্যাসে চাপা গলায় বলে, “ওই যে টুয়েল্ভ-এ পড়ে দাদাটা ফুটবল খেলে এসে মাঠে শুয়েছিল। ওর নাম কী জানিস?” এই বলেই ওদের হাসি শুরু হয়। শুকনো জামপাতার ওপর পাকা জাম খসে পড়ে। জামপাতার মর্মর খচমচে, থেঁতলে যাওয়া জামের বেগুণী থকথকে রঙে ওদের হাসি মেখে যায়। তিনু ওদের কানে কানে বলে, “দিপীকা রণবীরের বিয়ে হয়ে গেল জানিস!”, “রণবীর কী সুন্দর!”, “দিপীকাও কী সুন্দর!”, “রণবীরের প্যান্টগুলো দেখেছিস কী টাইট!”, “দিপীকার জামাটাও!”, “আ মরণ দিপীকার জামা দিয়ে আমি কী করব!” তিনটে ভুতই তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে লাফাতে হেসে ওঠে। তিনু লাজে রাঙা হয়ে বলে, “তোরা না ভীষণ ভীষণ অসভ্য কথা বলিস”। ভুতেরা আবার হিসহিসিয়ে বলে, “তুইও বল না”, “বল না! বল না!”, “বল না! এত ভয় কিসের তোর!” তিনু চোখ পাকিয়ে বলে, “তোদের ভয় নেই?”। ভুতেরা আবার এক চক্কর লাফায়, “আমরা তো ভুত। আমাদের আবার ভয় কিসের!”, “আমাদের সবাই ভয় পায়”, “আমরা কাউকে ভয় পাই না।” তিনু প্রশ্ন করে, “তোদের ওরা লেডিস বলে না?” ভুতেরা আবার নাচে, “আমরা তো ভুত। ভুতেদের তো শরীর নেই,” “বুক নেই, পেট নেই, নুনু নেই, পাছা নেই।” “আমরা লেডিস নই, জেন্টস নই।” তিনু মুখ বেঁকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “আর মন, মন নেই তোমাদের?” ভুতেরা আর এক দান লম্ফ ঝম্ফ করে বলে, “আছে তো, যে আমার বন্ধু তার মনটাই আমার মন”, “মন মন মন মরণ!”, “তা তোর মনটা কোথায় দিলি? সেই টুয়েলভের দাদাটা? বুকে লোমগুলো কীরকম জামার উপরের বোতামের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারে, তাই না?” তিনু দুই হাতে মুখ চেপে মাথা নাড়িয়ে বলে,“ওরে তোরা চুপ কর! চুপ কর! কী নোংরা! কী নোংরা!” ভুতেরা গোল গোল ঘুরতে থাকে, “নোংরা ছ্যাঁচা হ্যাংলা কালো নর্দমার ওই জল, কলটা এবার খোল না তোরা হরহরিয়ে বল! বল বল বল বল বল।” তিনু মুখ নীচু করে ফিকিফিকি হেসে বলে, “ড্রাগন কাকু, ড্রাগন কাকু, ড্রাগন কাকু!”

   গলায় চারটে নখ বসিয়েছিল। কড়ে আঙুলের নখটা সমানভাবে চেপে বসেনি। তাই তিনটি নখের ক্ষতই গোলাপী চুমকির মতো চকচক করছে গলার কাছে। হাত পাত! হাত পাত! স্কেলের চপেটাঘাত হাতের তালুতে। চামড়ার বাদ্য যন্ত্রের চটচটে শব্দের মতন আওয়াজ। ক্ষণিকে প্রতিবর্তে হাত গুটিয়ে যায় যন্ত্রণায়। আবার হাত পাত, হাত পাত। প্রথমবারের হাত পাতায় শঙ্কা ছিল, ত্রস্ততা ছিল। দ্বিতীয়বার শুধুই বাধ্যতা, সমর্পণ আর যন্ত্রণা। তবু দ্বিতীয়বার হাত পাততে হয় নিশ্চিত আঘাতের অপেক্ষায়।

   ঘরে বন্ধ করে রেখে দিয়েছিল টানা দুইদিন। গালে কষিয়ে চড়। কাঁদতে পারবে না। কাঁদলে আরো চড়। আরও জোরে। দুই আঙুলের মধ্যে পেন্সিল ঢুকিয়ে চাপ ব্যথায় কঁকিয়ে না ওঠা পর্যন্ত। চুলের মুঠি ধরে মুন্ডু টেনে হাঁটুতে ঠেকায়। একবার নয়, বার বার। মর মর আপদ। না এভাবে হবে না, এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাক। এক ঘন্টা – দুই ঘন্টা – কয়েক প্রহর। অন্য পায়ের নীচে গরম চাটু। পা পড়লেই চামড়া গলে লেগে যাবে চাটুর গায়ে, খুঁটে না ওঠা স্টিকারের মতো। ঠাঁটিয়ে একটা চড়, চড়ের পর চড়। যতক্ষণ না হাত ক্লান্ত হচ্ছে, গাল দাঁতে ধাক্কা লেগে কেটে যাচ্ছে। হাত মুচড়ে পিঠে চেপে ধরে রেখে দেয়। আহ্, আহহ্…। লাগছে? লাগছে না? খুব লাগছে? আরো লাগুক, আরো, আরো… মাঠটা খালি পায়ে কুড়ি বার চক্কর কেটে আয় তো! সাত মিনিটে শেষ হয় যেন। ছুটতে পারিস না? কাঁধে ব্যাট নিয়ে ছোট। পড়ে গিয়ে পায়ের ছাল উঠেছে? দৌঁড়তে পারিস না, বলে লাথি মারতে পারিস না, কী খেলতে পারিস? রান্নাবাটি? উঠতে হবে না, লাথি মেরে ওঠাব তোকে। পিছন ফের, পিছন ফের নয়ত বান্টুতে মারব। পাছায় লাথি। গোটা জুতোর দাগ বসিয়ে লাথি। 

    জুলপি ধরে এমন টান যাতে চুল ছিঁড়ে যায়। নখের নীচের নরম মাংসে আলতো করে পিন ফুটিয়ে দিয়ে রক্ত ফোটার জন্য অপেক্ষা। দড়ি দিয়ে পিছমোড়া করে হাত বেঁধে রেখে দাও দুইদিন, তিনদিনের দিন সোজা হয়ে যাবে। দাঁত ইই কর, মুখ খোল। দাঁতে টোকা, ক্যারামের গুটিতে যেমন টোকা দেয়। মুখের ভেতরটা ঝিনঝিন করে অবশ হয়ে গেল তো? নিলডাউন হয়ে বস। এবার হাঁটু ঘষে ঘষে পুরো করিডরটা এদিক থেকে ওদিকে যা। হাঁটু ছুলে যাবে। মুখ থুবড়ে পড়লে চলবে না। খুন্তির ছ্যাঁকা পাছায়, গরম মাছের ঝোলের খুন্তি। জ্বলুক, জ্বলুক, একটু ফোস্কা পড়ুক। বেঞ্চের ওপর কান ধরে দাঁড়িয়ে থাক। বাকিরা দেখ, হাস, জোরে জোরে হাস। ওই যে চিত্র পরিচালক, ওই যে নেকুপুশু, কিভাবে হাঁটে, যেভাবে নকল করে ওই জনপ্রিয় বিদূষক, সেভাবে নকল কর। তারপর হাস, জোরে জোরে হাস, সশব্দে হাস। ওর বুকে একটা রুমাল গুঁজে দাও। বুকটা ফুলে আছে না? দুদু খাব, দুদু খাব। আবার হাস, জোরে জোরে হাস, সশব্দে হাস। অট্টহাস্যের আহ্লাদে টানটান হয়ে যাও। ‘এটাকে তো বলাও যাবে না পোঁদ মেরে দেব। হোমোটাতো পোঁদ খুলে দাঁড়িয়ে পড়বে।’ আবার হাস, সবাই মিলে জোরে জোরে অট্টহাস্যে হাসির শব্দে চিড়ে দাও ওর মাঝখান বরাবর।

    ‘এই তোকে গাঁট্টা মারব। তুই কী শুনলি গাঁড়টা মারব? খুব খুশি হলি না? এবার হাস, বিকট হাস। বাসি বাসনের নীচে জমে থাকা টক ডাল ছ্যাঁচার শব্দের মতো, নর্দমার ভুসভুসে ফেনার মতো, ডিমের খোলে জমে থাকা লার্ভার মতো হাসি ছড়িয়ে দাও। নিছক আনন্দে হাসবে না তো করবে কী? মারবে না তো করবে কী? মারো এবং হাসো, হাসো এবং মারো, পুনঃপুনঃ বারংবার।’ ‘এই প্যান্ট খোল, প্যান্ট খোল।’ 

   ‘লজ্জা! লজ্জা কিসের তোর?’ ‘লজ্জা থাকলে মাগী সেজে ছেনালী করতিস!’ ছোট লিঙ্গ-অন্ডকোষ হাতের মুঠোয়ে চেপে ধরে। টান দেয় যেন খুবলে নেবে। ‘এইটুকু তো নুংকু, একটানে উপরে নেব। সারাজীবন ছিবড়ি হয়ে ঘুরবি। উল্টে যা, উল্টে যা।’ নিতম্বে চটাস শব্দ। নরম মাংসের কাঁপুনিতে শব্দটা যেন প্রতিধ্বনিত হয়। তারপর ইচ্ছা মতো মনের সাধ মিটিয়ে আঘাত। প্রথমে খালি হাতে, তারপর কঞ্চি, কালো পাছায় রক্ত জমে বেগুনী না হওয়া অবধি। গুহ্যদ্বারে বার বার কেঁচোর গর্ত খোচানোর মতো। ‘আরাম লাগছে তাই না! শালা খুব শখ না!’ তারপর সিগারেট, ছ্যাঁকা। ‘নে এখানে নে। যেখানে তোর সবচেয়ে ভালো লাগে।’ হেডস্যারের ঘরে ডাক। টি.সি দিয়ে দেবে হয়তো। ‘তুমি এসব বিকৃতি ছেড়ে দাও। ছেলেদের মতো থাক। এসব স্বাভাবিক নয়। আর কিছুদিন পর জীব বিদ্যার বই পড়ে জানতে পারবে তোমাদের সিলেবাসে আছে কোলা ব্যাঙের প্রজনন তন্ত্র।’

   বিগত  চার-পাঁচ মাস যাবৎ এইসব ওলটপালট ঘটনা তথা দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে তিনুর জীবনে। জীবন যত বিচিত্র হয়, যত উঁচুনীচু ঘটনা ঘটে চলে তত মানুষের বয়ঃবৃদ্ধি হয়, শরীরের এবং মনের। পচা ডোবার মতো নিস্তরঙ্গ জীবনের কোনও নড়চড় হয় না। বয়স থমকে থাকে। তিনুর সঙ্গে তেমনটাই হল। এই চার পাঁচ মাসে ওর বয়স বেড়ে গিয়েছে বছর দশেক। তিনু এখন আর সেই দশ বছরের ঘরের দরজা আগলে মায়ের শাড়ী পরে, গামছা দিয়ে খোঁপা বেঁধে, আয়নার সামনে নিজেরে পরখ করে চলা নিষ্পাপ শিশুটি নেই। তিনুর শৈশব বেশিদিন টেঁকেনি। এখন তার সমস্তটা জুড়ে শুধুই যৌবন। সবাই মিলে তিনুর সংক্ষিপ্ত কমলা বেলা টুকুকে ছিন্নভিন্ন করে ওকে টেনে হিঁচড়ে যৌবনের তাতাপোড়া রোদে এনে ফেলেছে। তার এই অকাল যৌবনের বিড়ম্বনার দায়টাও তার ওপরই চাপানো হয়েছে।

       জবাফুলের পুংকেশর চক্র – গর্ভকেশর চক্র আর কোলাব্যাঙের প্রজননতন্ত্রের বোধগম্যতার কাছে তিনুর এই বেখাপ্পা চলন-বলন ধরন-ধারন প্রকটভাবে মেয়েলি হয়ে উঠছে। এই মেয়ে বিষয়বস্তুটাই সকলের কাছে বিপজ্জনকভাবে যৌন। তাই তিনুর আর কোনও গত্যন্তর নেই যৌন হয়ে ওঠা ছাড়া, তিনু যে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত এমনটাও নয়। সবাই মিলে তাকে যেন তার মেয়েবেলার প্রাপ্য এই যন্ত্রণাটুকু পাওনাগন্ডায় হিসেব মিলিয়ে দিচ্ছে। এমনটাই মানিয়ে নিতে শুরু করেছে। তার অসচেতন যৌনতার অযাচিত গ্লানিটুকু শরীরে লেপে মেয়ে হয়ে ওঠার একমাত্র পথটাকেই জীবন বলে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। তাড়া খেতে খেতে কুয়োর দেয়ালে বারবার লম্ফঝম্ফ করতে করতে সেই কোলাব্যাঙেরই দশা হয়েছে। শেষমেশ কুয়োপাড়ে বসে থাকা বর্ষার অপেক্ষায়, রাজপুত্রের চুম্বনের অপেক্ষায়।

   এলোমেলো পারম্পর্যহীন ওইসব আক্রমণগুলো শুরু হয়েছিল ইস্কুল থেকে। বিক্রম দেখে ফেলেছিল ভাঙা গ্যারেজ ঘরে তিনু জামা খুলে ওড়না গায়ে নাচছিল। বিক্রম নালিশ করেছিল উঁচু ক্লাসের দাদাদের। দাদারা নিজেদের নিয়মমাফিক মারধোর করতে গিয়ে একটু রক্তারক্তি করে ফেলেছিল। খবর যায় হেডস্যারের কাছে। হেডস্যার দাদাদের এক সপ্তাহের জন্য সাসপেন্ড করেন। তিনুকেও উপর্যুপরি শাস্তির হুকুম দেন এবং তিনুর গ্যারেজের ঘটনাটা সবিস্তারে আলোচনার জন্য বাপ-মাকে তলব করেন। বাড়িতে বারুদ মজুত ছিল। এর আগেও তিনু দু-তিনবার বাড়িতে মার শারি পরে ধরা খেয়েছিল। স্কুলের হিংস্র কুমির খাল কেটে ঘরে ঢুকে আসে। বাবা পুরোটা পারে না। বাবাদের তো কোথাও গিয়ে থামতে হয়। পাড়ায় বাবার বন্ধুরা সৌভ্রাতৃত্বের ডাকে সাড়া দিয়ে বাকিটুকু সম্পন্ন করে। এসব ঘাত-প্রতিঘাতে শক্ত তক্তার মতো হয়ে গেলে ফের স্কুলে যেতে হয়। আপাতত শেষটাও ইস্কুলে হল, ওই যে কোলাব্যাঙের উপদেশ, চুম্বকের মেরুর আকর্ষণ-বিকর্ষণের দ্বৈতবাদ।

         এসব আজগুবি ভন্ডামির মধ্যে তিনুর বেড়ে ওঠা থেমে থাকেনি যদিও। থেমে থাকেনি খাটের নীচে যাতায়াত। থেমে থাকেনি খাটের নীচের ওই গর্তটায় চোখ রাখা আর খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে গর্তটাকে ক্রমশ বড় করে চলার আপ্রাণ চেষ্টা। আর থেমে থাকেনি ড্রাগন কাকুর গল্পটাও। 

রোজ ছুটির সময়ে ইস্কুলের বড় দরজার সামনে অটোগুলো রেষারেষি করে, ঠেসাঠেসি করে ভিড় করে। তিনু আগের ক্লাস থেকেই নিজে নিজে বাড়ি ফেরে। আগে মা নিয়ে আসত। মা ছাড়তে চায়নি, বাবা বলেছিল, ছেলেকে শক্তপোক্ত হতে হবে, একা একা চলাফেরা শিখতে হবে। 

    ইস্কুল ছুটি হলে সকলে হুটোপুটি করে আগলছাড়া কলরবে আনন্দের স্রোতের মতো গেটের বাইরে ছুটে আসে। তিনুর কিছুদিন আগেও ইস্কুল থেকে ছুট দিতে আনন্দ হত। এখন ইস্কুলের বাইরে আর একটা ইস্কুল। ফটকের বাইরে আর একটা ফটক। ইস্কুলের বাইরে অটোওয়ালা কাকুরা তারস্বরে একে অপরকে টেক্কা দিয়ে চিৎকার করে। ‘কামালগাজি-রাজপুর-বারুইপুর’, সওয়ারি তোলার কড়াকড়িতে সরগরম হয়ে ওঠে ইস্কুল চত্বর। কচিকাঁচাদের চেঁচামেচি আর অভিভাবকদের তর্জন-গর্জনের মধ্যে ফাঁক ফোকড় গলে তিনু বাইরে আসে। ফুটপাথের তেকোণা চাতালে শিমুল গাছটার নীচে এসে দাঁড়ায়। সবাই ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ে। তিনুর দল নেই। সুমন ছিল কয়েকদিনের বন্ধু। সুমন তিন ক্লাস উঁচুতে পড়ে। সুমন বলেছিল এখন আর তাকে কেউ লেডিস বলে না, আগে বলত। সুমন বলেছিল কিভাবে নিজেকে বদলাতে হয়, বদলানোর ভান করতে হয়, বদলের খোলসে নিজের সবটুকু ঢেকে নিতে হয়, কিভাবে জলের ভেতর ডিগবাজি খেতে খেতে গলা ফুলিয়ে সুরে সুর মিলিয়ে ডেকে যেতে হয় মকমক-মকমক। ‘তোর যেটা স্বাভাবিক সেটাই অস্বাভাবিক, তোর যেটা অস্বাভাবিক সেটাই আসলে স্বাভাবিক’, বলেছিল সুমন। ‘হাঁটা-চলা, কথা বলা ওসব নিয়ে বেশি ভাবিস না। খুব খিস্তি করবি। মাগীদের বুক নিয়ে, গুদ নিয়ে খিল্লি করবি। পাশ দিয়ে মাগী হেঁটে গেলে ইচ্ছা করে বুকের দিকে তাকিয়ে বলবি, কী হেব্বি মাল! ঝগড়া করবি ইচ্ছে করে। বলবি তোর মা-কে, বোন-কে। দেখবি ওরাও বলছে। কিন্তু মারবে না। টিফিনের সময়ে খাবারের ভাগ দেবে,’ সুমন বলেছিল। 

   সুমন ঠিক বলেছিল কি না যাচাই করে দেখেনি তিনু। সুমনের গলায় গলা মেলালে নিজের গলাও অন্যরকম শোনায়। যেন মনে হয় ভর হয়েছে ওর ওপর। সে বড় ভয়ের ব্যাপার। যেন নিজের অন্তর্বাসের মধ্যে একটা জ্যান্ত গিরগিটি নিয়ে ঘোরাফেরা। ফুটপাথের বিকিকিনির সময়ে দরদাম না পোষালে আর ফিরে তাকাতে নেই। তিনু তেমনটাই বুঝেছিল। সুমনও কেটে পড়েছিল সব বুঝে। তিনু বেআব্রু মতিগতি গর্তে না ঢোকালে ওর সঙ্গে মেলমেশা যে তার পক্ষে সমীচিন হবে না। যে দাগ রঙের প্রলেপে ঢাকা পড়েছে, তিনুর ছোঁয়া লেগে সে রঙ উঠে যাওয়ার বিপদ সংকেত টের পেয়েছিল সে।

     সুমন কেটে পড়ার পর থেকে তিনু একাই বাড়ি ফেরে। যেদিন প্রথম ড্রাগনকাকুর অটোতে উঠেছিল সেদিন পিছনের সিটের মাঝখানে বসেছিল তিনু। দুইপাশে দুই উঁচু ক্লাসের দাদা। ওদের দুই দিকের অতি প্রসারিত জঙ্ঘার মাঝে চেপে গিয়ে কুঁকড়ে গেছিল তিনু। সামনের লোহার রড আঁকড়ে ধরতে গিয়ে অটোওয়ালা কাকুর পিছে আঙুলগুলো ঠেকছিল। ভিজে ঘেমো পুরুষমানুষের গায়ে হাত ঠেকতেই হাতটা সরিয়ে নিয়েছিল তিনু। চারপাশের পুরুষালি হাত, পা, উরু, পেশী মাংসের মধ্যে অস্বস্তি সইতে সইতে তিনুর চোখ গেছিল। চোখ পড়েছিল ড্রাগনের দিকে। কাঁধের কাছে হাঁ করা মুখ। সরসর করে নীল জীভ উঠে গেছে গর্দান বেয়ে কোঁকড়ানো চুলের ভিতরে। একটু কাঁধ ঝাঁকালেই যেন সেই জীভ চেটে নেবে কানের লতি। সামনের পা দুটো উঁচিয়ে আছে কাঁধের ওপর। লম্বা নখগুলি যেন ফুটিয়ে দিচ্ছে বাদামী চামড়ায়। যেন কাঁধের ওপর চড়ে খামচে ধরে আছে। নাছোড়বান্দা ইচ্ছের মতো হিংস্র। বাকি দেহ আর লেজটুকু ঝুলে আছে জামার নীচে। শিরদাঁড়া চুঁইয়ে পিঠের নীচে। গোপনীয়তার আড়ালে, ধারাবাহিকের অপ্রকাশিত পরবর্তী পর্বের মতো ঔৎসুক্য নিয়ে বাকিটুকু দৃষ্টিগোচরের বাইরে থেকে গেছে। এই বাকিটুকুর জন্যই যেন ড্রাগনের ছটফটানি এত তীব্র হয়ে সেঁটে রয়েছে অটোওয়ালার গায়ে। সবুজ-নীলের মেলায় মেশায় ড্রাগনের গায়ের আঁশ। লাল জিভটা যেন আগুনের মতো লেলিহান। 

     তিনুর মায়ের হাতেও উল্কি আছে, তাতে লেখা R+N। তিনুর বাবার নাম রতন আর মায়ের নাম নমিতার আদ্যক্ষর নিয়ে তৈরি। উল্কি করতে ব্যথা লাগে। তিনুর মা ওর বাবার নামটা শরীরে খোদাই করে রাখতে ব্যথা সয়ে নিয়েছিল। ড্রাগনকাকু কেন এত ব্যথা নিয়ে পিঠে ড্রাগন আঁকিয়েছে? কোন বেদনার জ্বালা বয়ে নিয়ে চলেছে কাঁধে করে? তিনু ভাবতে থাকে। বাড়ি ফিরে, খাটে শুয়ে ভাবতে থাকে। ভাতের পাতে, স্নানের ঘরে ভাবতে থাকে। পরদিন শোরগোল আর অন্য অটোদের ডাকাডাকি টপকে গিয়ে ড্রাগনকাকুকে খুঁজে নেয়। তারপর দিন, তারপর দিন, তারপর দিনও। একদিন অন্য লোক উঠে যাচ্ছিল তিনু জলের বোতলটা হাতে ধরে একছুটে আগে বসে পড়ে। একদিন উঠতে পারে না, বাড়ি ফিরে কান্না পায়। পিঠের চামড়া গোটানো মার খেয়েও এত কান্না পায়নি। চোখ উপচে, নাক উপচে কান্না, বালিশ ভেজানো, চুপচুপে ভেজা ন্যাতার মতো কান্না। 

    তারপর দিন তিনু আসতেই দেখল ড্রাগন কাকুর অটোতে একটা জায়গা ফাঁকা। প্রতিদিন একটা জায়গা ফাঁকা থাকে। যেদিন তিনুর সামনে তিনুদের ক্লাসের একটা ছেলেকে ড্রাগন কাকু বলেছিল, ‘ওই সিটে লোক আছে। অন্য অটোতে যাও’, সেদিন তিনু বাড়ির রাস্তায় না ঢুকে পাশের গলিতে ঢুকেছিল, বারো ভুতের মাঠ –  উদয়ন ক্লাব – বাজার ঘুরে উল্টো দিকের গলি, সেখান থেকে আবার মাঠে চক্কর খেয়ে পার্টি অফিসের পাশের রাস্তা দিয়ে পদ্মপুকুরের পাড় ঘেঁষে আরও পাঁচটা অলিগলি ঘুরে বাড়ি ফিরেছিল আধঘন্টা দেরিতে। ড্রাগন কাকুর কথা কেউ জানত না। তিনু শুধু জানত ড্রাগন কাকু এক অন্যতর অনুভূতি। শরীরের ভিতরে কেমনতর কাঁপুনি। সে বড় লজ্জার, সে বড় অন্যায়। লুকিয়ে মায়ের শাড়ি পরার থেকেও বড় লজ্জার, বড় অন্যায়। শরীরের বাইরের অন্যায়টুকুর প্রাশ্চিত্তির করতে করতেই গায়ে কালসিটে পড়েছে। ভিতরকার এই গুরুতর অন্যায়টার জন্য আরও চাবুক পড়বে ওর পিঠে। তবে শরীরের বাইরের আর ভিতরের একটা চলাচল আছে। সেটা কেটে ফেলা বেজায় কঠিন। তিনু কঠিন কাজ পারে না। কঠিন অঙ্ক, কঠিন ইংরেজি শব্দ বার বার ভুল করে। একদিন অঙ্ক ভুল করে মায়ের হাতে মার খেয়েছিল। ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান ইংরেজি সব কিছুতে ভুল করে সপাং সপাং বেতের বারি পিঠের ওপর। 

     তারপর অনেকদিন পর খাটের তলায় ঢুকেছিল। ড্রাগন কাকু ওর জন্য একটা জায়গা রেখে দেয়। তিনুর জন্যও একটা জায়গা রাখা আছে, এসব ভেবেই বুকের ভেতরটা কাঁপে। তিনু আরও কিছুটা বড় হয়েছে। খাটের তলায় ঢুকতে মাথায় গুঁতো লাগে। তিনু সরীসৃপের মতো কনুইয়ে ভর দিয়ে খাটের তলায় ঢোকে। পিছনের সেই সিমেন্ট চটা দেয়ালের নদীটায় হাত রাখে। নীচের গর্তটায় হাত ঢোকায়। এতদিনের চেষ্টায় গর্তটা বড় হয়েছে অনেকটা। তিনু চোখ রাখে গর্তটায়। ওপারের খয়েরি উঠোনে গাছ থেকে ফুল ঝরে পড়েছে। পড়েই চলেছে, বৃষ্টির জলের ফোঁটার মতো। ফুলের হালকা গন্ধ নাকে লাগছে তিনুর। গাছের পিছনের রাস্তাটা দূরে যেতে যেতে ঝাপসা হয়ে গেছে।

    তিনু গর্তে আঙুল ঢোকায় আর একটু চাপ দিলে কবজি অবধি গলে যায়। তিনু আরও জোরে ধাক্কা দেয়। ইঁট বালি সুড়কি ঝরে পড়ে। মাথাটা গলছে না কিছুতেই। মাথাটা গলাতে পারলেই গলে বেরিয়ে যাবে। তিনু হাত দিয়ে ঠেলতে থাকে, মাথা ঠোকে গর্তের গায়। কেটে গিয়ে রক্তের দাগ লাগে দেয়ালে। বাইরে থেকে মায়ের গলা শুনতে পায় তিনু, ‘বাইরে আয়, খাবার রাখা আছে। আমার টিপের পাতাটা পাচ্ছি না, তুই আবার টিপ পরেছিস! এবার বাবা এসে মারলে আমি কিন্তু কিছু জানি না।’ তিনু খাটের তলা থেকে সব শুনতে পায়। কোনও সাড়া দেয় না। কপালের লাল টিপটা খুলে দেয়ালে চিটিয়ে দেয়। আবার দেয়াল ধরে ধাক্কা দেয়, আরও একটা ধাক্কা, আরও একটা ধাক্কা দিয়ে যায় প্রাণপণ। শ্বাস গাঢ় হয়, শ্বাস ওঠানামা করে ঘোড়ার ক্ষুরের গতিতে। দেয়ালের চাঙর ধ্বসে পড়ে কিছুটা। তিনু মাথা গলায়। এবার শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে বের করে নেওয়া। তিনু শরীরকে গলানো যতটা সহজ ভেবেছিল ততটা সহজও নয়। মাথা গললেও শরীর বাগ মানে না। চর্বি অস্থি মজ্জা মোচড় দিয়ে ওঠে। যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠে। সারা শরীর জুড়ে ক্ষত। কোনওটা ত্বকের আস্তরণ খসেছে, কোনওটা বা গভীর খুনোখুনি কাণ্ড। গর্ত গলে ক্ষতবিক্ষত শরীরটা খয়েরী চাতালটায় এসে পড়ল, ফুলের ওপর। শরীর জুড়ে ফুল ঝরে পড়ছে তখন। ফুলের প্রলেপে ঢেকে যাচ্ছে তিনু। ক্ষতস্থানে পড়ে রক্তে ভিজে যাচ্ছে ফুলের দল। তিনু উঠে পড়ে। 

    গাছের পিছনের রাস্তা। ঢালু হয়ে নেমে গিয়ে আবার উঠেছে। তিনু ওই পথে যেতে থাকে। পথের ধারে ইতস্তত গাছ। কয়েকটা গাছে ফুল আছে। কয়েকটা ন্যাড়া। শিরা উপশিরাময় ডালপালা আকাশে উঁচিয়ে আছে। আকাশটা কমলা আলোয়া মাখা, কনে দেখা আলো। দিনের কোন সময় এটা? জিজ্ঞাসা করার জন্য দ্বিতীয় কোনও জনমানুষ্যি নেই। একটা খালের পাড় ধরে চলে গেছে রাস্তাটা। খালের জলে তিরতির গতি। হাঁটতে হাঁটতে পায়ের মোচায় ব্যথা করে তিনুর। একটা অটো, ড্রাগন কাকুর অটো। তিনু ছুটে যায়, অটোর পিছনে বসে পড়ে। ড্রাগন কাকু অটো চালাচ্ছে। তিনু ড্রাগন কাকুর কাঁধে ভর দেয়। পিঠের ড্রাগনটার জিভ তিনুর মুখে লাগছে। ড্রাগন কাকু অটোর স্পিড বাড়ায়। বাড়তে বাড়তে চারপাশটা কেমন সবুজ স্রোতের মতো দেখায়। অটোর চাকা কখন যে মাটি ছেড়ে উঠে গেছে! বাতাসের ঢেউয়ে উঁচু নীচু ধাক্কা খেতে খেতে অনেকটা উপরে। তিনু কাঁধটা শক্ত করে চেপে ধরে আছে। তিনুর পা দুটোও বাতাসে ভাসছে। ঢেউ-এর সঙ্গে সমান্তরাল। তিনু চোখ বুঝে নেয়। অনেক উত্তেজনায় মানুষ যে কেন চোখ বুজে ফেলে! হয়ত বা উত্তেজনাটা ভেতরকার। চোখ খুললে তার রেশ কেটে যায়। 

    এভাবে চলল ড্রাগন কাকু আর তিনুর অটো। তিনু চোখ খুলল যখন অটো তখন মাটি ছুঁইয়েছে। তিনুর পা আবার অটোর টিনের মেঝেতে। ড্রাগন কাকুর গলা পিছন থেকে দুহাতে জড়ানো। ড্রাগন কাকু বলল, “এসে গেছে এবার নামো।” রোজ যেমন বলে ইস্কুল থেকে ফেরার সময়ে। তিনু নামে। ড্রাগন কাকু বলে, “ভাড়াটা দিয়ে যাও।” রোজ যেমন বলে। তিনু আজ আর ভাড়া দেয় না, বলে, “কিসের ভাড়া?”। “এই যে অটোয়ে চড়লে।” তিনু জবাব দেয় “আর আমি যে তোমায় উড়তে শেখালাম।” তিনু দেখে যেখানে নেমেছে তার পাশেই সমুদ্র। হালুম হুলুম জলের শব্দ। তিনু সমুদ্রের পাশের বালিয়াড়ি ধরে হাঁটতে শুরু করে। ড্রাগন কাকু হাঁক দেয়, “এখানে থেকে যাও, এরপর নদী। নদী পেরোলে বাঞ্ছারামপুর। এর মধ্যে আর কিছু নেই।” তিনু অনেকটা এগিয়ে গেছিল, বালির মধ্যে পা ডুবে যাচ্ছে। ঝিনুকের খোলা শরীরে এসে ধাক্কা খাচ্ছে। তিনু ওখান থেকে গলা চড়িয়ে জবাব দেয়, “ওপার থেকে অন্য অটো ধরে নেব। আমি সমুদ্র দেখিনি এর আগে।”            

শেয়ার করুন

2 thoughts on “তিনু ও ড্রাগন কাকুর গল্প”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *