জনগণের শিল্পী হেলিন বুলেক-কে মনে রেখে

লাতিন আমেরিকার নওভা ক্যানসিওন (Nueva cancion) আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৮৫ সালে তুরস্কের মারমারা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীর উদ্যোগে গঠিত হয় জনগণের গানের দল গ্রুপ ইওরুম। তুর্কী ভাষার পাশাপাশি তুরস্কে নিষিদ্ধ কুর্দী ভাষায়ও গান তৈরি করে এই দল। পুঁজিবাদী সাংস্কৃতিকচর্চার বিপরীতে দাঁড়িয়ে শ্রমজীবী মানুষকে সংস্কৃতির আঙিনার অধিকার ফিরিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর গ্রুপ ইওরুম সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জন্য বিনামূল্যে কনসার্ট করার পাশাপাশি গড়ে তুলেছে একাধিক সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র, সঙ্গীত শিক্ষা পাঠক্রমসহ আরও নানা উদ্যোগ।

২০১৭ সালে, গ্রুপ ইওরুম-এর সব সদস্যদের গ্রেফতার করে তুরস্ক সরকার, সে বছরের শেষ দিকেই প্রকাশিত হয় তাদের শেষ অ্যালবাম ইল্লে কাভগা (struggle no matter what)। ২০১৮ সালে গ্রুপের ৬ সদস্যের মাথার দাম ধার্য করে সরকার। ২০১৯ সালের মে মাসে, পুলিসি অত্যাচারের প্রতিবাদে, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবিতে ও  বন্দী সদস্যদের মুক্তির দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেন গ্রুপের তিন সদস্য বাহার কার্ট, বারিস ইউকসেল ও আলি আরাচি। জুন মাসে অনশনে যোগ দেন গ্রুপ-এর সোলো ভোকালিস্ট হেলিন বুলেক। নভেম্বর মাসে জেল থেকে মুক্তির পরও অনশন চালিয়ে যান হেলিন।

২৮৮ দিন অনশনের পর এপ্রিল মাসের ৩ তারিখ মারা যান হেলিন। তখন তাঁর বয়স ২৮।  হেলিন-এর মৃত্যুর খবরে বিপুল সংখ্যক মানুষের শোক মিছিল হলে, মিছিলে নামে পুলিসি অত্যাচার, গ্রেফতার হন বহু। সাধারণ মানুষের থেকে লুকিয়ে হেলিনের মৃতদেহ দফন করে পুলিস।

জেলবন্দী থাকার সময়ে, আত্মপক্ষ সমর্থনে আদালতে নীচের এই বয়ানটি পেশ করেছিলন হেলিন। জুন মাসে হেলিন-এর জন্মদিনে তাঁকে মনে রেখে সেই বয়ানের বাংলা তর্জমা প্রকাশ করলাম আমরা।

মানুষ শিল্প তৈরি করে। শিল্প গড়ে ওঠে মানুষের সঙ্গে মানুষের  কথোপকথনে, ভাব বিনিময়ে। শিল্প এক নান্দনিক ভাষায়ে সামাজিক জীবন ও তার ঘটনাগুলোকে মানুষের কাছে তুলে ধরে। এই ভাষা কখনও হয়ে ওঠে ছবি, ভাস্কর্য, কখনও বা থিয়েটার, তবে এগুলো শুধুই আনুষ্ঠানিক  কিছু পার্থক্য।  যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হল, শিল্পের উদ্ভব মানুষকে বলার প্রয়োজনে, তারা জীবন, তাদের জীবনের লড়াই, তাদের আশা, যন্ত্রণা  ও  আকাঙ্ক্ষার কথা বলার জন্য শিল্পের জন্ম । তাই শিল্প একটা প্রয়োজনীয়তা, যেমন রুটি, যেমন জল…

মানুষ যন্ত্র নয়। আবেগ ও ভাবনার জগতের খোরাক তার প্রয়োজন। মানুষ তার অভিজ্ঞতার অর্থ খুঁজতে চায়, আর চায় উৎপাদন ও সৃষ্টির সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে। এই সামাজিক পরিস্থিতি থেকে উঠে আসে শিল্প ও শিল্পী।

সামাজিক বিকাশে শিল্পের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিল্প মানুষকে অবহিত করে, শিক্ষিত করে, তার মানসিকতার পরিবর্তন ঘটায় আর এই সবকিছুই হয় নান্দনিক আনন্দের মাধ্যমে। অন্যদিকে বুর্জোয়ারা, শিল্পকে এক বিষণ্ণ ও রহস্যময় রাজ্যের বস্তু হিসেবে উপস্থাপিত করে, এমন কিছু যা নাগালের বাইরে। বুর্জোয়াদের প্রতিক্রিয়াশীল শিল্প মানুষকে বিষিয়ে দেয়, মানুষকে ছোট করে, মানসিক বিকাশের কোনও জায়গাই সেখানে নেই। অন্যদিকে, আমাদের শিল্প সমাজকে এক উন্নততর স্তরে নিয়ে যেতে যায়, তৈরি করতে চায় এক নতুন সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ।

শিল্প ও সংস্কৃতির ময়দানকে সব সময়ই, শ্রেণির মানুষের আয়ত্বের বাইরে, বুর্জোয়া ও পেটি বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের চারণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়েছে, যেখানে শুধুই সুবিধাপ্রাপ্তদের বিচরণ। বুর্জোয়া ব্যবস্থায় মানুষ শিক্ষার সুযোগের যথেষ্ট সদ্ব্যবহার করতে পারে না, কারণ সমস্ত সুবিধা রয়েছে সম্পদশালী শ্রেণির হাতে।

যেমন আপনারা জানেন, পুঁজিবাদে সব কিছুই বিক্রয়যোগ্য, সব কিছুই ক্রয়যোগ্য। অনুভূতি ও ভাবনাও। এবং আর সব কিছুর মতোই শিল্প ও সংস্কৃতিও এখানে পণ্যে পরিণত হয়েছে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যা কেনা যায়, বিক্রি করা যায়। যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, যারা কোনও রকমে সামান্য উপার্জনে দিন গুজরান করেন, শিল্প -সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য খরচ করার মতো কোনও টাকা তাঁদের কাছে থাকে না। আমাদের দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ আছেন যারা জীবনে হল-এ গিয়ে একটা সিনেমা দেখেননি, জীবনে কোনও সিনেমা হল-ই দেখেননি, অথবা টিকিট কেটে কোনও কনসার্ট শোনেননি। সবথেকে বড় ভুল হল মানুষ “অজ্ঞ ” তাই এই আঁকা তারা বুঝবে না বলে মানুষের ওপর এই দায় চাপানো। এর জন্য দায়ী সেই সব লোকেরা যারা আমাদের গরীব করে রাখে, যাদের জন্য আমাদের না খেয়ে বাঁচতে হয়। যদি মানুষ অজ্ঞও হয়, দোষটা তাদের যারা তাদের অজ্ঞ করে রেখেছে। 

একটা কনসার্ট টিকিটের যা দাম তাতে একটা গোটা পরিবারের এক সপ্তাহের খাওয়া খরচ চলে। একটা বাদ্যযন্ত্রের গড় দাম একজন মানুষের মাস মাইনের অর্ধেক। শিক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচতো আমি ধরছিই না। এই সব মিলিয়েই বলা হয় শিল্প সাধারণ মানুষের “কম্ম ” নয়। শিল্প তো প্রতিভাবান মানুষের কাজ, “সাধারণ মানুষ ” শিল্পের বুঝবে টা কী?” তাই না ? একটি দৃষ্টিকোণ থেকে, মানুষ শিল্প বলতে জানে, মাচা খাটিয়ে অনুষ্ঠানে ১-২ জন শিল্পীর নাচ গান, জেলায় জেলায় মিউনিসিপ্যালিটির পক্ষ থেকে যেগুলো আয়োজন করা হয়, আর তারা জানে সন্ধেবেলায় টিভি সিরিজ দেখা। আর সবথেকে বড় কথা হল এই সংস্কৃতিকে এতটাই স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে যে মানুষের আর গান, থিয়েটার, সিনেমার প্রয়োজনই পড়ে না। এই আনন্দ ও সৌন্দর্যের অনুভূতি, যা মানুষের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অধিকারগুলোর মধ্যেই পড়ে, ক্রমাগত সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে তার থেকে। পুঁজিবাদের চুরি করা এই অধিকার আমরা মানুষকে ফিরিয়ে দিতে চাই। আমরা মনে করি, আমাদের দেশের মানুষ, আমাদের গরীব মানুষরা সর্বোত্তম সব কিছু পাওয়ার দাবিদার, এই সব কিছু তাদের প্রাপ্য। আর সেজন্যই আমরা তাদের জন্য বিনামূল্যে কনসার্ট-এর আয়োজন করি।  আমরা কিন্তু মাচা-র অনুষ্ঠান করি না। এই কনসার্ট-এর মঞ্চে উচ্চ মানের অনুষ্ঠান আমরা পরিবেশন করি, সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা, নাচের দল ও অন্যান্য বিভিন্ন মঞ্চানুষ্ঠান সেখানে থাকে।  

এখানে শিল্পকে বড়লোকি জায়গা থেকে বের করে আনা হয়, সাধারণ মানুষের সমস্যার কথা থাকে এই শিল্পে, এবং তা ব্যাখ্যা করা হয় সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায়, মানুষ তার পুরস্কার দেয়। আমাদের ৩২ বছরের অস্তিত্ব দাঁড়িয়ে রয়েছে এর ওপর।

আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে আমাদের কনসার্ট থেকে ওঠা টাকা থেকে আমরা সংগঠনের খরচে টাকা দিই। এই দাবির অযৌক্তিকতা বুঝে ওঠার আগে আমাদের কনসার্ট-এর বিষয়ে কিছু তথ্য জানানো প্রয়োজন।

আমি বলেছি আমরা বিনামূল্যে অনুষ্ঠান করি। আমাদের কনসার্টগুলো বিরাট, বৃহৎ এবং খরচ সাপেক্ষ। বিষটা বোঝার জন্য কিছু তথ্য দিই, কনসার্ট-এ যে সাউন্ড সিস্টেম লাগানো হয় শুধুমাত্র তার খরচই ২০০ হাজার টার্কিস লিরা। অন্যান্য যন্ত্রপাতি আর খরচের কথা বাদই দিলাম। আমরা দরিদ্র পাড়ায়, এলাকায়, স্কোয়্যার-এ যে বিনামূল্যের যে কনসার্টগুলো করেছি তার মধ্যে সবথেকে বড় ছিল ইনডিপেনডেন্ট টার্কি কনসার্ট। 

২০১১ – ৩৫০ হাজার

২০১২ – ৫৫০ হাজার

২০১৩ – ৭৫০ হাজার

২০১৪ – ১০ লক্ষের বেশি

২০১৫ – নিষিদ্ধ

২০১৬ – নিষিদ্ধ

কথা হল কনসার্ট নিষিদ্ধ হওয়ায় আমাদের পরিস্থিতি কিন্তু বদলায়নি। এরপরও আমরা শেষদিন পর্যন্ত আমাদের প্রস্তুতি, মহড়া ও কাজ চালিয়ে যাই। সাউন্ড সিস্টেম সেট আপ করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ভাড়া করি, ভাড়া করি মঞ্চ। আমরা আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই, সব সময়ই নিষেধাজ্ঞা ভাঙার জেদ আমাদের ছিল।

এই কনসার্ট-এর প্রস্তুতির শুরু থেকে শেষ অবধি সাধারণ মানুষ সরাসরিভাবে যুক্ত থাকেন, কনসার্ট-এর জন্য প্রয়োজনীয় সমস্তকিছুর যোগানে তাদের অংশগ্রহণ থাকে। ইয়োরাম-এর অনুষ্ঠানে বস্তুত তারা নিজেদের শ্রমের ওপরই দাবি প্রতিষ্ঠা করেন। বদলে কিছু পাওয়ার আশা না রেখেই কনসার্ট-এ নিজেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কঠোর পরিশ্রম করেন সকলে। যদি আমাদের প্রয়োজন হয় এই ভেবে কেউ কেউ তাদের গাড়ির চাবি নিয়ে আসেন, কোনও দোকানী ফলের ক্রেট, স্ন্যাকস আর জল পাঠান যাতে সেগুলো বিক্রি করা যায়। কেউ কিছু জিনিস ছাপিয়ে দেন, কেউ  আমাদের কনসার্ট-এর পোশাক সেলাই করে দেন। আমাদের কনসার্ট এভাবেই হয়, সকলের সহযোগিতায় ও অংশগ্রহণে।

অবশ্যই আর্থিকভাবে দেখতে গেলে এগুলো যথেষ্ট নয়। ধার শোধ করতে কনসার্ট-এর পর সারা বছর আমরা ট্যুর ও অর্থের বিনিময়ে অনুষ্ঠান করে টাকা তোলার চেষ্টা করি। কাজটা সহজ নয় কারণ কনসার্ট-এর বাইরেও আমাদের খরচ রয়েছে। আমাদের কালচারাল সেন্টার রয়েছে, রয়েছে FOSEM (photography and cinema workers), IHT (İdil People’s Theatre)-এর মতো ইউনিটগুলি। এছাড়াও আছে আমাদের শিল্প ও সংস্কৃতির ওপর মাসিক পত্রিকা “তনভির”। তনভির প্রকাশনার একগুচ্ছ বই এখনও প্রকাশের অপেক্ষায়। এই খরচগুলোর কথাও মাথায় রাখা হোক।  এছাড়াও বলি, আমরা ১৩ জনের একটি দল। প্রয়োজনের নিরিখে আমাদের নিজেদের খরচও রয়েছে। আমাদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে প্রতিটি পুলিসি হানায় আমাদের প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়েছে, আমাদের বাদ্যযন্ত্র গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মানসিক দিক বাদ দিলেও, আর্থিকভাবেও কতটা ক্ষতি এতে হতে পারে আপনি জানেন? অবশ্যই আপনার জানা নেই, যদি জানতেন,তাহলে একথাও বুঝতেন যে এই অভিযোগনামার দাবি কতটা ভিত্তিহীন ও হাস্যকর, আর এই অভিযোগের ভিত্তিতে আমাদের দোষী করতেন না।

আমরা বড়লোক নই। আমাদের বড় বড় স্পনসর নেই। স্পনশরশিপ-কে শুধুমাত্র অর্থনৈতিকভাবেই দেখা হয়েছে, কিন্তু গোটা স্পনশরশিপ-এর গল্পটাই একটা রাজনৈতিক মেকানিজম। যে সমস্ত শিল্পী পৃথিবীর মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তাদের স্বরকে ভাষা দেয়, সেই শিল্পীদের সব ধরনের চাপ ও নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হতে হয়, আর অন্যদিকে ,এই বুর্জোয়া ব্যবস্থায় থেকে যে সব শিল্পীরা সস্তার রঙ্গ রসিকতা করে, যারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিপত্যের ওপর নির্ভর করে বাঁচে, যারা মানুষ ও শ্রমের থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকে, সেই শিল্পীরা  এই ব্যবস্থার থেকে সব ধরনের সহযোগীতা ও সুযোগসুবিধা পায়। 

আমরা জনগণের শিল্পী, আমাদের শিল্প জনগণের শিল্প, বুর্জোয়াদের না। তাই আমরা কোচ পরিবার, সাবান্চি পরিবার  বা জোরলু পরিবারের (এরা সব তুরস্কের ধনী পরিবার) থেকে সাহায্য পাই না। 

তাহলে আমরা কী করে পুরোটা করি? আমাদের শ্রোতাদের সঙ্গে একটা বড় পরিবার তৈরি করে।

আমাদের কয়্যার-এ আমরা নিশ্চত করি মানুষ সেখানে শুধু ক্রেতাই না, তারা শিল্পের স্রষ্টাও বটে। সমবেতভাবে আমরা কাজ করি যেখানে মানুষ শিল্প ও সংস্কৃতির সৃষ্টিতে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। আমরা চাই জনগণের সন্তান জনগণের শিল্পী হয়ে উঠুক। আমরা জানি, শুধু সম্পদশালীরাই নয়, দরিদ্র ঘরের সন্তানও সুযোগ পেলে শিল্পী হয়ে উঠতে পারে। সৃষ্টি শুধু গুটিকয় এলিট-এর কাজ নয়, যে কেউ শিল্পের স্রষ্টা হতে পারে। আমরা এই পরিস্থিতি দূর করে সকলের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে চাই। লোকগীতি কয়্যার তৈরি করে সঙ্গীত শিক্ষার মাধ্যমে আমরা সেটা করে থাকি। 

ইস্তানবুল ছাড়াও, আরও ৮টা প্রভিন্স-এ আমরা এই কাজ শুরু করেছি। হাতায়, আদানা, দেরসিম, আঙ্কারা, অনতালায়া, বুরসা, এসকিসেহির ও ইজমির-এ আমাদের বহু ছাত্রছাত্রী রয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে সঙ্গীত নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, আর বাকিরা জীবনে প্রথমবার কোনও ভীড় জায়গায় গাইবেন। কেউ কেউ ৫০-৬০ বছরের কাকু, কেউ বা সবে স্কুলে যেতে শুরু করা ছোট্ট মেয়ে। কেউ গৃহবধূ, কেউ ডাক্তার। 

একজন ভাল গায় কি না, একজন শিক্ষিত কিনা এগুলো আমাদের কাছে ধর্তব্যের বিষয় নয়। আমরা বিশ্বাস করি প্রতিভা নিয়ে কেউ জন্মায় না, পরিশ্রম করে নিজেকে তৈরি করতে হয়। আমরা বারবার এ বিষয়ে সফল হয়েছি, প্রচুর উদাহরণ রয়েছে। আমরা লোককে গাইতে দিয়ে তারপর তাকে নিয়ে হাসাহাসি করি না, টিভি শো-গুলোতে যেমন করা হয়। আমরা তাদের বিদ্রুপ করি না। শিল্প শিক্ষায় প্রতিযোগিতার কোনও প্রশ্নই উঠতে পারে না। প্রতিযোগিতা ও অন্যকে হারানোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমরা যৌথতা ও সংহতিকে প্রতিষ্ঠা করেছি। স্বার্থপরতার বদলে আমরা হয়ে উঠতে চেষ্টা করেছি। আমরা দেখিয়েছি, শ্রমের মাধ্যমে সবকিছু শেখা ও শেখানো যায়। জনতার শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব জনগণের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যকে রক্ষা করা, এর বিকাশ ঘটানো, এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং সব মানুষের মধ্যে তা ছড়িয়ে দেওয়া। 

কয়্যার তৈরির সময়ে আমরা এই দায়িত্ববোধ থেকেই কাজ করি। নতুন মানুষ তৈরির পথে আমাদের কয়্যার হল অন্যতম সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আমরা এমন একটা পৃথিবী গড়তে চাই যেখানে মানুষ তার পাশের মানুষকে ভালবাসে, তার দেশকে ভালবাসে, এবং যেখানে মানুষ সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বাস করে। এটা আমাদের অপরাধ?

যেসব ছাত্রছাত্রীরা আমাদের কয়্যার-এ যোগ দেয়, তাদের স্কুল ও চাকরি থেকে বরখাস্ত করার হুমকি দেওয়া হয়, তাদের গ্রেফতার ও জেলের ভয় দেখানো হয়। একইভাবে  তাদের পরিবারের সদস্যদেরও সমানে ভয় দেখানো হয়, হেনস্থা করা হয়। ‘সংগঠনে সদস্য সংগ্রহ করার ’ অভিযোগ এনে আমাদের আতঙ্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা ন্যায্য এবং বৈধ। আমরা এখনও অবধি এমন কিছু করিনি যে ক্ষেত্রে আমরা নিজেদের কাজের পক্ষে দাঁড়াতে পারব না। আমরা এমন কোনও পরিস্থিতি অভিজ্ঞতা করিনি যা আমরা ব্যাখ্যা করতে পারব না। আমাদের ন্যায্যতা ও বৈধতার ওপর সরাসরি আক্রমণ আনা হচ্ছে। আমরা চাই না আমাদের ছাত্রছাত্রীরা সেই সমস্ত শিল্পী ও ছদ্ম নায়কদের মতো হোক যারা পাঁকের মধ্যে ঘুরপাক খায়। আমরা চাই তারা সত্যিকারের লোকসঙ্গীতের বিশিষ্টদের উদাহরণ দেখুক ও কোরোগলু, কারাকাওগ্লান ও দাদালোগলু-দের আদর্শ হিসেবে বেছে নিক। আমাদের ৩২ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতি দুই ক্ষেত্রেই, এবং আমরা আমাদের কয়্যার ও কোর্স-এর মাধ্যমে সেই জ্ঞানকেই মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিই। তাই আমরা জনগণের শিল্পী হয়ে ওঠার সব শর্ত পূরণ করি। আমাদের সাথে কী ঘটছে, তার জন্য কী মূল্য আমাদের চোকাতে হচ্ছে, তার কোনও কিছুই আমাদের কাজে বাধা হতে পারে না, তারপরও আমরা ‘ঠিক সেভাবেই কাজ করব যেভাবে করার কথা ’। জেলে গিয়েও আমরা সেই কাজই চালিয়ে গেছি, বন্দী হওয়ার আগে আমরা যা করতাম। মুক্তি পেলে আমরা ঠিক সেখান থেকেই কাজ শুরু করব, যেখানে আমরা ছেড়ে গেছিলাম। আমরা তুরস্কের জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা পূরণ করছি, বস্তুত আমাদের এই দায়বদ্ধতা সারা বিশ্বের মানুষের প্রতি । 

— হেলিন বুলেক।

ইংরেজি ভাষায় বয়ানটি পড়া যাবে এখানে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *