বেআইনি আইন: থাংজম মনোরমা মামলা

এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধটি থাংজম মনোরমার চূড়ান্ত রায়কে ফিরে দেখা। Col. Jagmohan Singh And Ors. vs The State Of Manipur And Ors1 কেসটি থাংজম মনোরমা মামলা নামেই বেশি পরিচিত। মামলাটি ইতিমধ্যেই সুপরিচিত হওয়ায় আমি এখানে আর নতুন করে বিস্তারিত বর্ণনা করছি না। মনোরমার মৃতদেহের ভয়াবহতা সেই অত্যাচারের সাক্ষ্য বহন করে, যে ঘটনা ২০০৪ সালের কাংলা ফোর্ট-এর সামনে মণিপুরের মায়েদের নগ্ন প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছিল। সেই থেকে এই প্রতিবাদ বহু আন্দোলনকারীর ভাবনাকে আবিষ্ট করেছে এবং দেশ ও দেশের বাইরের মানুষের কাছে পৌঁছেছে। এই প্রতিবাদের জেরে মণিপুর সরকার যে তদন্ত কমিশন গঠন করে, সেই কমিশনকে চ্যালেঞ্জ করে, ২০০৪ সালের ১২ই জুলাই অসম রাইফেলস-এর সপ্তদশ ব্যাটেলিয়নের পক্ষ থেকে একটি পিটিশন দাখিল করা হয়। সেনা আদালতের এক্তিয়ারে থাকা তদন্তের বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের তদন্ত কমিশন নিযুক্ত করার জন্য এই পিটিশন রাজ্য সরকারের পারদর্শিতাকেই প্রশ্ন করে। 

এই নিবন্ধ উক্ত মামলাটিকে নারীদের ওপর ঘটে চলা হিংসার দৃষ্টিকোণ থেকে পড়তে চেষ্টা করবে। যেখানে রাষ্ট্র নিজেই মহিলাদের (বিশেষত প্রান্তিক) ওপর যৌন হিংসা নামিয়ে আনার জন্য দায়ী, সেই অত্যাচার প্রতিহত করার ও ন্যায় বিচার পাওয়ার সম্ভাব্য পথগুলি কী হতে পারে? এই কারণগুলোর জন্য নারীদের ওপর ঘটা হিংসা সংক্রান্ত আলোচনার পরিসরে এই মামলাটির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পিটিশনটি মণিপুর রাজ্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে দাখিল করা হয়, যে রাজ্য থাংজম মনোরমার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় আঘাতপ্রাপ্ত সমষ্টিগত বিবেকের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। অভিযুক্তরা ছিল আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য, তারা মণিপুরে লাগু আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট (এরপর থেকে আফস্পা) নামক আইনের সাহায্য নেয়। সেনাবাহিনীর নিজের কৃতকর্মের পর্যালোচনার বিষয়ে এমনিতেই এক সার্বিক অনীহা দেখা যায়, এই অনীহা আরও প্রকট হয় উপদ্রুত বলে চিহ্নিত এলাকাগুলির ক্ষেত্রে যেখানে সেনাবাহিনী এই আইনের বলে সমস্তরকম আইনি ব্যবস্থার উর্ধ্বে অধিষ্ঠান করে। এই অনীহার কথা বিবেচনা করলে বোঝা যায় পিটিশনটি আদৌ আশ্চর্যজনক নয়। এই রিট পিটিশনটি যে বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশনকে চ্যালেঞ্জ করে সেই কমিশন উপেন্দ্র কমিশন বা মনোরমা মৃত্যু তদন্ত কমিশন নামে পরিচিত। এই মামলার বিশদ বিবরণ জনমানসে প্রভূত আগ্রহ তৈরি করে। এই ঘটনার প্রকৃতি এবং ঘটনা পরবর্তী প্রতিবাদ দুইই এই আগ্রহ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল। মনোরমার ক্ষতবিক্ষত শরীর এক গণ প্রতিবাদের জন্ম দেয় যার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ২০০৪ সালের ১৫ই জুলাই, ইম্ফলের কাংলায় অসম রাইফেলস-এর হেড কোয়ার্টারের সামনে ১২ জন এমা (মা)-র পোষাক খুলে নগ্ন প্রতিবাদে করেন। তাদের সঙ্গের ব্যানারে লেখা ছিল ‘Indian Army Rape Us’ (ভারতীয় সেনা আমাদের ধর্ষণ কর)। অপ্রতিরোধ্য ক্ষোভের মুখে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত বিক্ষোভকারীদের অন্যতম দাবীর সামনে নতি স্বীকার করে অসম রাইফেলস কাংলা দূর্গ ছাড়তে বাধ্য হয় । কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি মূল দাবি বিক্ষোভকারীদের ছিল,  আফস্পা প্রত্যাহার, সে দাবি আজও পূরণ হয়নি।    

সন্ত্রাসবাদী, জাতিগত অপর ও নারী শরীর

‘উপদ্রুত এলাকা’ বলে চিহ্নিত ভারতের কিছু সীমান্তবর্তী রাজ্যে আফস্পা আইন বলবৎ রয়েছে। এই আইন প্রয়োগের প্রকৃতি, ভারতের ‘মূল ভূ-খণ্ড’ এবং এই আইনগুলো যেসব রাজ্যে লাগু আছে তাদের মধ্যেকার সম্পর্কের জাতিগত ভেদাভেদের চরিত্রটিকে সামনে নিয়ে আসে। ২০১৭ সালে, ছত্তিসগড়ে আফস্পা লাগু করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় একদিকে যেমন ছিল এই আইন লাগুর দাবি, অন্যদিকে ছিল একই তীব্রতায় তার প্রতিবাদ। মণিপুরে অনেকেই গভীর মনযোগের সঙ্গে এই আলোচনাগুলির দিকে লক্ষ্য রাখছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেখা গেল বহুদিনের ধারণাকে আরও একবার সত্যি করে, আরও জোরালো ভাবে প্রতিষ্ঠিত হল যে, মণিপুর ভারতবর্ষের ধারণা ও রাজনৈতিক কল্পনায় প্রকৃত অর্থেই প্রান্তিক। যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ স্বর বলে, কেন্দ্রীয় ভারতে দেশের নিজের জনগণের বিরুদ্ধে সেনাকে ব্যবহার করা অনুচিত সেই স্বরই প্রান্তে এসে অন্যভাবে ধ্বনিত হয়, আর এখানেই মণিপুরের নাগরিক-বিষয়ের ভাবনার প্রশ্নটি উঠে আসে। সুরক্ষাবাহিনীর আধিকারিকদের পক্ষ থেকে বলা হয় থাংজম মনোরমা দেবী ছিলেন পিপলস্ লিবারেশন আর্মির একজন বিপজ্জনক প্রকাশ্য কর্মী এবং তিনি একাধিক বোমা বিস্ফোরণের জন্য দায়ী। কিন্তু, দ্রুত ঘটে যাওয়া বিচার বহির্ভূত হত্যার ক্ষেত্রে কখনও কখনও সত্যি গুজবের আকারে প্রচারিত হয়, আর মিথ্যে জায়গা পায় সরকারি বিবৃতিতে। মনোরমার বিরুদ্ধে কখনও কোনও পুলিশী অভিযোগ দায়ের হয়নি; সুতরাং, জীবদ্দশায় মনোরমা কোনওদিন আদালতে দোষী বা নির্দোষ সাব্যস্ত হওয়ার সুযোগ পায়নি। মৃত্যু নিজের সাক্ষ্য দিতে অক্ষম। ইয়াইরিপক মেরিং গ্রামে তাঁর গুলিবিদ্ধ দেহ মেলে। গ্রেফতারের সময়ে পরিবারের সদস্যরা (অসম রাইফেলস-এর দাবি অনুযায়ী) ‘No Claims Certificate’ স্বাক্ষর করেন –  

অসম রাইফেলস বাহিনী, ২০০৪ সালের ১১ই জুলাই রাত ৩.৩০-এ থাংজম মনোরমা দেবীকে তাঁর বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে এবং পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে বাড়িতে তল্লাশি চালায়। বাহিনীর বিরুদ্ধে আমাদের কোনও দাবি নেই এবং আরও বলার যে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা মহিলাদের সঙ্গে কোনওরকম অসদাচরণ করেনি  অথবা কোনও সম্পত্তির ক্ষতি করেনি (বোল্ড হরফের ব্যবহার আমার)।2  

প্রশ্ন থেকে যায় এই ধরনের সার্টিফিকেটকে কি প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যায় বা ১০ ও ১১ই জুলাইয়ের মধ্যবর্তী রাতের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে কি এই সার্টিফিকেটের বিশ্বাসযোগ্যতায় আস্থা রাখা যায়? পরিবার ও স্থানীয়দের একটি যৌথ প্রতিনিধিদল ১২ই জুলাই, ২০০৪-এ অভিযোগ করে, তাদের মাথায় বন্দুক ধরে উপরে উল্লিখিত ‘No Claims Certificate’-টি সই করানো হয়েছে। সার্টিফিকেটটির বয়ানের অন্তর্নিহিত অর্থ পড়লে দেখা যায় বাহিনী, মহিলাদের (বহুবচন) সঙ্গে অসদাচরণ করেনি এই উল্লেখই বুঝিয়ে দেয় এই ধরনের ঘটনার সম্ভাবনা রয়েছে এবং সেটা শুধু এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে নয় বরং এমন ঘটনা ঘটেই থাকে, এবং সেই সমস্ত অভিযোগ আফস্পার আওতায় সহজেই প্রত্যাহারও হয়ে যায়। হেফাজতে মহিলাদের ওপর যৌন নিপীড়নের এত এত উদাহরণ যেখানে রয়েছে সেখানে এ এক অসাধারণ দাবি বটে। এবার এই নিপীড়কদের যদি আইনি ছাড় থাকে, তাহলে পুরুষ এবং মহিলা উভয়কেই আরও কতটা বেশি অত্যাচার সহ্য করতে হবে সেটা আর শুধু অনুমানের পর্যায় থাকে না। ২৭ জুন, ২০২০-র খবর বলছে, ২০১৯ সালে ভারতে হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা ১,৭৩১3 । আমরা যে ঘটনার কথা বলছি সেটা পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু নয়, সেনার হেফাজতে মৃত্যু, এবং এক্ষেত্রে যে সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি সেটা ধরে নেওয়াই যায়, কারণ ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে এক জনস্বার্থ মামলায় মণিপুরে আফস্পায় নিহত ১,৫২৮ জনের একটি তালিকা পেশ করা হয়। এই মৃত্যুগুলো হয় হেফাজতে মৃত্যু, নয়তো ভুয়ো সংঘর্ষে হত্যা, যেমন থাংজম মনোরমার ঘটনা।     

ভারতীয় প্রেক্ষিতে বর্ণ বিভাজিত, অপরায়িত, প্রান্তিক ও এক্সটিক রূপে দেখা নারী শরীর সবসময়ই উপলব্ধ থেকেছে একটি নির্মাণের ওপর যার ভিত্তি ‘অভাব’ — ব্যক্তি হিসেবে নারীর মর্যাদার অভাব থেকে উদ্ভূত যৌন হিংসার জন্য তার সহজলভ্য হয়ে পড়ার ধারণা। প্রথমতঃ, প্রান্তিকায়িতরা যে যৌন হিংসার শিকার হয় সেটাকে সাধারণতঃ হিংসা বলেই ধরা হয় না কারণ, যৌন হিংসা সংক্রান্ত আলোচনার ক্ষেত্রে মর্যাদা ও সম্মানের প্রশ্নকেই এত বড় করে দেখা হয় যে শারীরিক ক্ষতি সেখানে ধর্তব্যের মধ্যে আনা হয় না। অসদাচরণ তাহলে কী? মনোরমার ভাইয়ের দায়ের করা রিপোর্ট অনুযায়ী, মনোরমার মুখে কাপড় দিয়ে চুপ করিয়ে রাখা হয়, মুখের ওপর জল ঢালা হয়, বিবস্ত্র করা হয় (সে হাত দিয়ে তার ফানেক4 চেপে ধরেছিল), তার মুখ ফুলে ছিল, সেনার লোকেদের সামনে তাকে কাপড় বদলাতে বাধ্য করা হয় এবং ২-৩ জন সেনা কর্মীর সামনে শৌচাগার ব্যবহার করতে হয়। এই কাজগুলোকে অসদাচরণ মনে করা হয় না, বিশেষ করে এমন একজন মহিলার ক্ষেত্রে যাকে একজন বিপজ্জনক সন্ত্রাসবাদী বলে নির্মাণ করা হয়েছে। মনোরমার তথাকথিত পরিচয়ের সঙ্গে এই মামলার কোনও সম্পর্ক থাকার কথা না, কিন্তু তার মৃত্যুর পর এই গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হল, এই ইস্যুর ওপর তৈরি বেশিরভাগ লেখায়, (সংবাদপত্র, অ্যাকাডেমিক প্রবন্ধ ইত্যাদিতে) জায়গা করে নিল এই তথ্য। মনোরমার প্রতি মানুষের মনোভাব বদলাতে এই তথ্যের ভূমিকা ছিল। অন্ততপক্ষে মূলধারার সংবাদমাধ্যমে মনোরমা এমন একজন জঙ্গি মহিলার প্রতিভূ হয়ে উঠল যাকে (ওরা আশা করে) মুছে ফেলতে হবে, যেকোনও উপায়ে।  নিরাপত্তা আধিকারিকরা এই বক্তব্যেই দৃঢ় থাকে, বক্তব্যের সমর্থনে কোনও প্রমাণ না দেখিয়েই। শুধুমাত্র বলা হয়, ‘অসম রাইফেলস-এর বক্তব্য অনুযায়ী, “একটি সিঙ্গাপুরে বানানো বেতের রেডিও সেট ও একটি চিনে বানানো ফ্র্যাগমেনটেশন ধরনের হাত গ্রেনেড” পাওয়া গেছিল মনোরমার বাড়িতে। যদিও, মনোরমার ভাই দোলেন্দ্র সিং বলে সে সেরকম কিছু উদ্ধার হতে দেখেনি। মৃত্যুর পর প্রমাণ প্রতিস্থাপন করা সামগ্রিকভাবেই একটি প্রচলিত অনুশীলন।

প্রক্রিয়াগত খামতি ও একজন তথাকথিত UG5  -র গ্রেফতারী

আফস্পার সমস্যাটা শুধুমাত্র আইনের ভাষায় পড়া ঠিক নয়। আফস্পার অভিঘাতের প্রসার আরও অনেক বেশি। এই আইনে শুধু যে সেনাবাহিনীই তাদের কৃতকর্মে জন্য ছাড় পায় তাইই নয়, পুলিশ যাদের সঙ্গে সেনা প্রায়ই ‘যৌথবাহিনী’ হিসেবে জোট বাঁধে, তারাও এই আইনের সুবিধা উপভোগ করে; শাস্তি থেকে এই অব্যহতি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করে যেখানে প্রক্রিয়াগত খামতি প্রক্রিয়ারই অংশ হয়ে ওঠে। এই মামলায় গুয়াহাটি হাইকোর্ট-এর বিচারপতি ডি. বিশ্বাস তাঁর চূড়ান্ত রায়ে বলেন: 

একথা স্পষ্ট যে কোনও মহিলা কনস্টেবল-এর উপস্থিতি ছাড়াই তল্লাশি চালানো হয়েছিল; যদিও বাড়িটি ঘিরে ফেলা হয়েছিল কিন্তু মহিলা কনস্টেবলকে আনার জন্য সুপারিনটেন্ডেন্ট-কে যোগাযোগ করার কোনও চেষ্টাই করা হয়নি; গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিকে নিকটবর্তী থানায় হস্তান্তর করা হয়নি; গ্রেফতারের পর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং অন্য আরেক মহিলা ক্যাডারের খোঁজে তাঁকে একের পর এক জায়গায় ঘোরানো হয়, আরও বলা হয় গ্রেফতারের সময়ে কুমারী থাংজম মনোরমার বিরুদ্ধে কোনও অমীমাংসিত FIR [ফার্স্ট ইনফর্মেশন রিপোর্ট] ছিল না6

গ্রেফতারকারীদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী হেফাজতে থাকার সময়ে মনোরমার হাত বাঁধা ছিল, এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা জানায় গ্রেফতার হওয়ার সময়ে মনোরমা ফানেক পরে ছিল। এই দুই তথ্য সেনার বয়ানকে (অসম রাইফেলস-এর আইনি পিটিশনে দেওয়া) প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় যেখানে তারা দাবি করেছিল মনোরমাকে গুলি করা হয় কারণ সে পালাচ্ছিল। তার শরীরের ভিসেরা নমুনা বলে — তার শরীরে যৌনাঙ্গ সহ মোট ছটি জায়গায় গুলির ক্ষতচিহ্ন থাকলেও যেখানে দেহ পাওয়া যায় সেখানে কোনও রক্ত ছিল না, তার শরীরে অত্যাচারের চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায় আর তার ফানেক-এ পাওয়া যায় বীর্যের দাগ7। এর থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় এই আইনের মূল কেন্দ্রে রয়েছে প্রক্রিয়াগত খামতি, কারণ এই আইন অপরাধীকে অব্যহতি দেয়, ধরেই নেওয়া হয় উপদ্রুত এলাকার সকল নাগরিকই সম্ভাব্য জঙ্গি যদি না উল্টোটা প্রমাণ করা যায়। প্রমাণ হাজির করা হয় শুধুমাত্র মৃত্যুর পরই। প্রক্রিয়াগত খামতিকে তাই পড়তে হবে এই আইনের প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে –

সেনার সূত্র তহেলকা-কে জানিয়েছে, মণিপুরে মোতায়েন অসম রাইফেলস-এর ব্যাটেলিয়নগুলোর কম্যান্ডিং অফিসারদের ওপর উচ্চতর আধিকারিকরা ক্রমাগত চাপ দিতে থাকে চটজলদি ফলাফল দেখানোর জন্য। এবং আরও বেশি সংখ্যক ‘হত্যা’ করার জন্য। ফলে, একটি এলাকা থেকে নিরীহদের তুলে নিয়ে গিয়ে অন্য এলাকায় তাকে সন্দেহভাজন জঙ্গী হিসেবে পেশ করাটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে8।    

উপরের অনুচ্ছেদটি আরও কিছু প্রশ্ন তুলে দেয় — চটজলদি ফলাফলের মানে কী? বেশি সংখ্যক ‘হত্যা’-ই কি চটজলদি ফলাফলের প্রমাণ? অত্যাচারের চিহ্নই কি বিদ্রোহের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থানের প্রমাণ? ‘উপদ্রুত এলাকা’-এ বসবাসকারী নাগরিক-বিষয়ের নির্মাণে এর ভূমিকা কী? সব মণিপুরীই কী জঙ্গি, যদি না তার ক্ষেত্রে উল্টোটা প্রমাণ করা যায়? উপরের পয়েন্টগুলো দেখায়, আইনটি একটি সুপরিকল্পিত বিস্তৃত কর্মসূচির অংশ যার প্রকাশ শুধুমাত্র আফস্পা-র ধারাগুলিতেই (যেখানে নিরাপত্তাবাহিনী কোনও পূর্ববর্তী পরোয়ানা ছাড়াই যে কোনও জায়গায় তল্লাশি চালাতে পারে, শুধুমাত্র সন্দেহের বশে যে কোনও ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পারে, পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার করতে পারে এবং নিজেদের প্রাপ্য শাস্তির ভয় ছাড়াই হত্যা করতে পারে) আবদ্ধ নয়, পাশাপাশি এই আইনটি সমস্যাজনক, সন্দেহভাজন লোকেদের সম্পর্কে একটি সাধারণ স্টিরিওটাইপ তৈরি করে, যা এমন এক ধারণার জন্ম দেয় যে, এই ধরনের ব্যক্তিদের মোকাবিলা করতে এরকম আইন আবশ্যক। এমনকি গ্রেফতার মেমোর উদ্ভাবনও হয় এ বিষয় প্রচারাভিযান চালানোর পরই। এই মামলার ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াগত হস্তক্ষেপের ফলে খুব বেশি লাভ অবশ্য হয়নি, শুধুমাত্র এইটুকু স্বীকৃতি পাওয়া গেছে যে মনোরমার বাতিল মৃতদেহর সঙ্গে আধাসামরিকবাহিনীর ক্রিয়াকলাপের সংযোগ রয়েছে। শর্তহীন ক্ষমতা ও শাস্তি থেকে অব্যাহতির সামনে প্রক্রিয়াগত হস্তক্ষেপ শুধুই আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়।     

রায়ের পুনর্লিখন ও বিচারের পথে বাধা

এই ঘটনার একটা অদ্ভুত বিষয় হল, ন্যায় বিচারের জন্য সেই রাষ্ট্রের কাছেই আবেদন করা হচ্ছে যেখানে রাষ্ট্রই অপরাধী। আধিকারিকরা কমিশনের সামনে হাজিরা না দেওয়ায়, তদন্ত কমিশন (মণিপুর রাজ্যের তরফে গঠিত) ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ (ডিজিপি)-কে আধিকারিকদের নামে পরোয়ানা কার্যকর  করার নির্দেশ দেয়। এর উত্তরে অসম রাইফেলস-এর পক্ষ থেকে পিটিশন দায়ের করে বলা হয় যেহেতু তারা আফস্পার আওতায় কাজ করে এবং এই আইনের ৬ ধারায় ইতিমধ্যেই বলা আছে যে “এই আইন যে ক্ষমতা দেয় তার অধীনে থেকে করা কাজের জন্য কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ব অনুমতি ছাড়া কোনওরকম মামলা, মোকদ্দমা বা অন্য কোনওরকম আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে না।”9 এই ধারার ভিত্তিতে অসম রাইফেলস দাবি করে কমিশনের আদেশ অকার্যকর। অসম রাইফেলস-এর পক্ষের আইনজীবী একদিকে দাবি করেন যেহেতু সেনা আদালত বিষয়টি দেখছে তাই তদন্ত কমিশনের কোনও প্রয়োজনীয়তাই এখানে নেই, অন্যদিকে মণিপুর রাজ্যের পক্ষে আইনজীবী জানান, ‘গণ শৃঙ্খলা’ রক্ষার বিষয়টি রাজ্যের এক্রিয়ারভুক্ত ফলে তদন্ত কমিশন গঠন করা রাজ্যের আইনি অধিকারের মধ্যেই পড়ে। রাজ্য সরকার যেহেতু আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ভিত্তিতে তাদের সওয়াল রাখে, তাই এই ঘটনার পর হওয়া বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচির কথা মনে পড়ে, এর মধ্যে যেমন রয়েছে মায়েদের ‘নগ্ন প্রতিবাদ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠা কর্মসূচি, তেমনই রয়েছে তরুণ ছাত্র পেবলাম চিত্তরঞ্জনের আত্মাহুতি। এর পাশাপাশিই উঠে আসে আরও একটা প্রশ্ন, যদি জনগণ প্রতিবাদে ফেটে না পড়ত তাহলে কী এই ঘটনা ব্যতিক্রমী বলে বিবেচিত হত না? যেখানে মনোরমার শরীর অত্যাচারের সাক্ষ্য বহন করছে, এবং সেই অত্যাচারের চিহ্ন এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠছে যে কমিশনের সামনে সাক্ষ্য দেওয়ার সময়ে, তার দেহের অটোপসি করা চিকিৎসকরা বলছেন ক্ষতচিহ্নের ব্যাপকতার কারণে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল না হয়নি, যে ঘটনা মণিপুরের মায়েদের জনসমক্ষে বিবস্ত্র হয়ে ‘ভারতীয় সেনা আমাদের ধর্ষণ কর’ ব্যানার নিয়ে দাঁড় করায়। যদি ধারাবাহিক প্রতিবাদের একটিও না হত, যদি না সমষ্টিগত ক্ষোভ আছড়ে পড়ত, তাহলে, রাজ্য সরকার ক্ষমতা অনুশীলনের জন্য অন্যতম প্রাথমিক যে যুক্তি দেখিয়েছিল সেই ‘জন শৃঙ্খলা’ বজায় রাখার আইনি ক্ষমতার যুক্তিটি ধোপে টিকত না। তবে যাই হোক, আদালতের রায়ে রাজ্যের অধিকারকে খারিজ করা হয় ও কেন্দ্র সরকারের একচেটিয়া ক্ষমতাকেই মান্যতা দেওয়া হয়, বিশেষত সপ্তদশ অসম রাইফেলস-এর বিরুদ্ধে আসা বাড়াবাড়ি করার অভিযোগের ক্ষেত্রে। বস্তুত, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার দ্বারস্থ হতে হলে সব জায়গায়ই মহিলাদের ‘আমলাতান্ত্রিক সময়’-এর চক্করে পড়তে হয়। আইনি প্রক্রিয়ার গভীরে থাকা প্রথামাফিক বিলম্ব এবং যৌন হিংসা ও আক্রমণের ঘটনাকে স্বীকৃতি দেওয়ার ও মামলা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা, সুবিচারের সব আশাকেই ভোঁতা করে দেয়। আইনি বৃত্তে মহিলাদের নির্দিষ্ট অবদমন গভীর ও অগাধ। এই আইন প্রত্যাহার করার আশু রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা গোটা জাতিরাষ্ট্রের নারীবাদী বৃত্তে ততটা সাড়া ফেলে না, আর এই সাড়া না ফেলা দেখিয়ে দেয় রাজনৈতিক ভাবনা ও কল্পনার বিস্তার আসলে কীভাবে ভৌগোলিক-রাজনৈতিক সীমার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে। এবং পাশাপাশি জাতিরাষ্ট্রের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বলে তৈরি হওয়া আইন জনমানসের অধিকাংশের থেকেই মৌন সম্মতি পেয়ে থাকে। রায়টির পাঠ দেখায়, এই আইন বিচার পাওয়ার সম্ভাবনার পথে বাধা স্বরূপ; উপদ্রুত এলাকার মানুষের কাছে এই আইনটি যে দোষীদের ছাড় পাওয়ার সঙ্গে  সমার্থক তা অকারণ নয়। অধিকার রক্ষার পরিভাষা এমন হওয়া উচিত না যে শুধুমাত্র উপদ্রুত এলাকার বাসিন্দা হওয়রার কারণেই একজনকে সন্দেহভাজন নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে বা জাতিগত অপর হলেই তাকে নিষিদ্ধ সংগঠনের অভিযুক্ত সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হবে রাজ্য সরকার, কেন্দ্র সরকার ও বিচার বিভাগের দড়ি টানাটানির একমাত্র বলি নাগরিকদের অধিকার। একথা বলাই যায়, এই আইন প্রদত্ত ক্ষমতা দেশের ‘নিকৃষ্টতর’ নাগরিকদের বেঁচে থাকার সাংবিধানির অধিকারকেই অস্বীকার করে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *