মেহেন্দোর সাথে সাক্ষাতে – ‘উরগেনের ঘোড়া’ উপন্যাসের পাঠক প্রতিক্রিয়া

নেপালি জনযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুগপাঠকের রচিত উপন্যাস উর্গেনের ঘোড়া৷ কে এই উর্গেন, কী’ই বা তার ঘোড়ার তাৎপর্য তা আবিষ্কার করতে হবে বইয়ের পাতায় পাতায় অনুসন্ধান চালিয়ে৷ উর্গেন আর তার ঘোড়াকে আবর্ত করে লেখা হয়েছে অনেকগুলো চরিত্র৷ প্রতিটা অধ্যায়ে আসা চরিত্রগুলি এক একটা বিষ্ময়৷ একটা একটা নতুন গল্প বলে৷ তারপর মেহেন্দোর জীবনের পথ বেয়ে ছুঁয়ে ফেলে  উর্গেনের ঘোড়াকে। মেহেন্দো এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় নারীচরিত্র।  যোদ্ধা মেয়ে চরিত্রকে প্রধান চরিত্রে রেখে বিশেষ রাজনৈতিক সময়কাল নিয়ে লেখা উপন্যাস আমার এই প্রথম পড়া৷ 

নেপালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে  অসাধারণ সাহিত্যে প্রকাশ করেছেন লেখক। সবটাই গল্প ভেবেই পড়ে ফেলা যায় বইটি৷ আশ্চর্য কিছু সময়কাল তার ঐতিহাসিক ঘটনা পরম্পরা নিয়ে ধরা দিয়েছে বইটিতে৷ 

বইটি নিয়ে বেশি কিছু বলতে চাইনা৷ পাঠক একবার বইটি হাতে নিয়ে ২০ পাতা পড়ুক৷ তারপর নিজেই বেরিয়ে পড়বেন এক আশ্চর্য অনুসন্ধানের পথে৷ বইটি পড়তে গিয়ে বরং আমার কী অনুভূতি হয়েছে সেইটাই তুলে দিচ্ছি এখানে।

“স্নায়ুর ভিতর দিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে একটা সাদা ঘোড়া৷ ঘোড়ার খুরে খুরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে উঁচু পাহাড়চূড়াকে সর্পিণীর মতো পেঁচিয়ে উঠতে থাকা একটি গল্প৷ প্রত্যেকটি শিরা উপশিরা দিয়ে ঝড় তুলে ছুটে চলা সাদা ঘোড়া রহস্যের জাল বুনছে৷ ফেনা তুলে দেওয়া ঘোলাটে রক্তের স্রোতে একটা মাথার আদল ফুটে উঠছে। ঘোড়সওয়ারির মাথার সাদা ফেস্টুন মাঝে মাঝেই বদলে যাচ্ছে ছোট্টো একটা লাল তারা আঁকা জলপাই টুপিতে। 

ফ্ল্যাটের ভিতর নিকষ অন্ধকার আচ্ছন্ন করে রেখেছে৷ মদহীন মাদকতা৷ তুষারপাহাড়ের শুভ্র কুয়াশা, বৃষ্টিস্নাত স্যাঁতসেঁতে রাত্রের আলো নেভানো চার দেওয়ালে এসে ঢুকে পড়েছে৷ কালো অন্ধকারকে সাদা কুয়াশা বলে ভুল হচ্ছে৷ মাথার ভিতর বিদ্যুৎ বেগে ছুটেই যাচ্ছে সাদা ঘোড়াটা৷ ঘোরের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে চেতনা৷ 

এক একটা শব্দের ঝড় বইছে।  এক একটা ঝড় তোলপাড় করে দিচ্ছে৷ শূন্য থেকে তুলে এনে, চক্রব্যূহ রচনা করে, নিস্তেজ হয়ে আসা স্নায়বিক কম্পনকে আবার আছড়ে ফেলছে শূন্যতায়৷ আবার পারদ চড়ছে উত্তেজনার৷ বুনো ফুলের বুকি লেগে যাচ্ছে সমগ্র চেতনা জুড়ে৷ অলস ভাবে লেজ নেড়ে ঘাস খেতে খেতে চড়ে বেড়ানো ঘোড়াটা হঠাৎ ভীষণ বেগে ধেয়ে এসে ঢুকে পড়ছে চোখে। চোখ থেকে মাথায়৷

ক্লান্ত বিশ্রাম এবং পরক্ষণেই দুর্দান্ত গতির সাথে নেচে উঠার আবর্তে রচনা হয়ে চলেছে মাথার টুপিতে লাল তারা আঁকা মেয়ের গল্প। যুদ্ধের মাদকতা নিয়ে দুনিয়া বদলের স্বপ্নে মেতে ওঠা এক তরুণী  মায়ের গল্প৷ বটগাছের মতো শেকড় ছড়ানো এক দুরন্ত ক্ষীপ্র যোদ্ধা কমান্ডারের গল্প৷  স্বপ্নের লাল সুতো বেয়ে বটগাছ জড়িয়ে আলিঙ্গন করা এক অতিসাধারণ ছক ভাঙা মেয়ের গল্পও বটে৷ বিভীষিকাময় যুদ্ধ ক্ষেত্রে একাধারে উদ্ধত তরোয়াল এবং একই সাথে কমান্ডারের যুদ্ধ বিধ্বস্ত শরীরের প্রতিটি আঘাতে জড়িবুটি লেপে দেওয়ার নিষ্ঠা৷ শ্বেতশুভ্র হিমালয়ের তুষারঝড়ের ধ্বংস ও নির্মাণ যজ্ঞে পাদদেশের সবুজ ধানক্ষেতের সুগন্ধ লেপে দেওয়া মেয়েটি। সাদা ঘোড়ায় চেপে আসা এক ঝড়ের পাশে, দ্রোহকালকে রক্তের সমস্ত উষ্ণতা দিয়ে আগলে রাখা এক যোগ্য সঙ্গিনী। 

তুষারঝড় আছড়ে পড়ে ফ্ল্যাটে৷ অন্য ভূখন্ডের, অন্য জাতির, ইতিহাস বিচ্ছিন্ন জেদী উত্তরসূরিদের ইতিহাস খুঁজে বের করার প্রবল তেষ্টা বুকের মধ্যে জেগে ওঠে৷ পূর্বজদের ভূতে পাওয়া সেইসব উত্তরসূরীদের সাথে দুর্গম পথে ইতিহাস খুঁজতে বেরিয়ে পড়তে হয়৷ আর প্রচন্ড তেষ্টা, চাপ চাপ বেদনা হঠাৎ গলে পড়ে, যে মূহুর্তে বিস্মৃতির জাল ছিঁড়ে সামান্যতম বহিঃপ্রকাশ হয় সদ্য পূনঃনির্মিত ইতিহাসের৷ এই তেষ্টা এবং চেষ্টার প্রবল উন্মাদনায় সম্পূর্ণ অচেনা এবং ভিন্ন জাতের একটি মেয়ে বন্ধু হয়ে ওঠে৷ জাতিসত্বার আত্মনিয়ন্ত্রণের তত্ত্ব গর্বের সাথে আপন হয়ে ওঠে। তখনই ফিরে আসে সাদা ঘোড়াটা, পিছনে ধাবমান অজস্র সাদা ঘোড়ার বাহিনী৷ কানে তালা লেগে যায়৷ বুকির নেশা ছুটে গিয়ে স্নায়বিক চাপ হঠাৎ নিস্তেজ হয়ে এলে আবার নতুন করে নেশাগ্রস্ত হতে থাকে চেতনা৷ 

হুড়মুড়িয়ে ঝড় তুলে ঢুকে পড়ে “থাহা”। প্রত্যেকটি উচ্চারিত বাক্য ভীষণ শব্দ করে আছড়ে পড়ে কানের গভীরে৷ মাথার ভিতরে৷ আবার ঝড় বয়ে যায় অনেকগুলি জীবনে৷ ঝড় বয়ে যায় সূদুর শহরের অন্ধকার ফ্ল্যাটেও৷ 

অধ্যায়ের সূচনা হয় একটা একটা নতুন চমক নিয়ে৷ চমকগুলি এক ধাক্কায় ভেঙ্গে ফেলতে সক্ষম খানিকক্ষণ আগেই মননে বুনতে থাকা ঘটনাগুলির ভবিষ্যতবাণীকে। ঝটাপট গুলিয়ে যায় অতীত আর বর্তমানও। গুলিয়ে যায় দৃশ্য, অবস্থান। অধ্যায়ের সূচনাগুলি হয়ে ওঠে এক একটা অসমাপ্ত উপন্যাস। 

বেশ কয়েকবার ” উল্গেনেল ঘোলা” আওড়ানোর পর বইটি বন্ধ করে রেখে দিলেও ঘোর লেগে থাকা মন বাস্তবে ফেরেনা কিছুতেই৷ মস্তিষ্ক সহজ হয়না, দুদিনের প্রবল উত্তেজনা এবং বিপুল নির্লিপ্ততার বিপরীতমুখী গতির চাপ থেকে৷ “

বইটি শেষ করার পর মনের মধ্যে তোলপাড় হওয়া অর্ধচেতন অবস্থা বর্ণনা করার মতো ভাষা আমার জানা নেই৷ তাই অনেক চেষ্টা করেও সম্পূর্ণ লিখে উঠতে পারলাম না৷ তবে আমার এই অন্ধকার ফ্ল্যাটে সাদা ঘোড়া যে অনেকক্ষণ দৌড়াদৌড়ি করছিলো- এ অনুভূতি খাঁটি। উপন্যাসের বিপ্লবী যে মিথ নয়, বাস্তবেও তারা ভীষণ রকম সত্যি এবং এমন ভাবেই সত্যি- এই মিলিয়ে দেওয়ার প্রয়াস ভীষণ নাড়া দেয়৷ 

লেখকের লেখায় যত না জাদু আছে, তার চেয়েও বেশি আছে হৃদয় নিংড়ে উঠে আসা বাস্তব অভিজ্ঞতা৷ এ লেখা লিখে ফেলা যে কোনো সাহিত্যিকের পক্ষে অসম্ভব৷ নিজের অস্তিত্বকে, নিজের জীবনকে বাজি রেখে পেতে হয় এই সাহিত্য নির্মাণের দক্ষতা৷ আর তেমনই ঝরঝরে অনুবাদকের লেখন শৈলী। 

লাল তারা আঁকা টুপি পরা মেয়েটি; যে ঝড় তুলে দিয়েছিলো আকাশে বাতাসে সে কিংবদন্তী হয়েই থাক। পৃথিবীর সমস্ত মেয়ের নিস্পৃহ হৃদয়ে একটি ক্ষীপ্র সাদা ঘোড়ায় চেপে এসে বিপ্লবের তুফান তুলুক সে৷ তার কমান্ডার হয়ে ওঠার গল্পের মধ্যে দিয়ে নির্মাণ করে যাক যুদ্ধ ময়দানে অনাগত আরোহীদের৷ মানুষের সহজাত প্রাকৃতিক প্রবৃত্তি এবং দিন বদলের স্পৃহার মধ্যেকার দ্বন্দ্বকে, নবজাত শিশুর প্রতি দায়িত্ববোধ দিয়ে নিরসন করে দিয়েছে তামাং কন্যা মেহেন্দো৷ আদর্শের জন্য যুদ্ধের উন্মাদনা এবং বিচ্ছেদের বেদনায় অশ্রুপাতের আক্রোশ মিশিয়ে গ্রেণেড হানুক শতবৈষম্যে ভরা ক্ষমতার অলিন্দে৷ আর স্নেহবৎসল হৃদয় নিয়েই,  অপার বিষ্ময়ে ভরা দুটি চোখ মেলে সদা জাগ্রত থাক পল্লবী; বিপ্লবের স্বপ্ন বুনে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া যে কোনো সাধারণগোছের মেয়ের শক্তি হতে৷ 

কোনো একদিন কোনো মেয়ে যদি যুদ্ধ ক্ষেত্রে হঠাৎ করেই নিজেকে আবিষ্কার করে ফেলে তার আইকন হয়ে থাক জনসেনার কমান্ডার মেহেন্দো।

এবার থেকে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্রদের কাছে বিপ্লবের আগুন ধার চাইতে যেতে হবেনা জেনে, ভীষণ তৃপ্তি লাগছে৷ লেখকের কাছে চিরঋণি রইলাম এ অনবদ্য উপহারের জন্য। 

বাংলার পাঠকসমাজে ছড়িয়ে যাক “উর্গেনের ঘোড়া”৷ জাদুবাস্তবতার জাল বুনে মাথার ভেতর সংক্রমিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে এই উপন্যাস৷”  

শমীক দাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ভাষার দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়ে এই অদ্ভুত সুন্দর উপন্যাসটি পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য৷ 

বাংলা উপন্যাস ভালোবাসে এরকম যে কোনো পাঠকের জন্যই ” উর্গেনের ঘোড়া” এক অনন্য সম্পদ।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.