উঠোন – দুই

সেই অলীক গ্রামের উঠোনগুলো একদিন হারিয়ে গেল, যা বাস্তবে ছিল। আজকাল আমাদের বাস্তব কখন অলীক হয়ে যায়, আর কখন যে সব কিছুই ডিষ্টপিয়া (dystopia) সেকথা বোঝা ভার।

উঠোনের সীমানা নির্ধারণ করা পাঁচিলগুলোতে ফার্ন গাছের সবুজ রঙ বর্ষাকালে দগদগ করে। ফার্ন গাছের স্মৃতি প্রখর, তারা জানে এই সব পাঁচিলের গড়ে ওঠার ইতিহাসে এক টুকরো জমির দখলদারি নিয়ে বিবাদ ও সেখান থেকে পড়শীর মাথা ফাটানো, শরীরে ক্ষত, সদর শহরের আদালতে ওঠা মামলার কথা। এই সব উঠোনে ছড়ানো থাকে কখনো হিংসার চাপ চাপ আঁশটে গন্ধ।

যেবার ইউনুসের মাথায় লাঠি পড়ল, ফরিদা সেবার থেকে সদর শহরের আদালত চিনল। ফরিদা দেখল পড়শীর টিভিতে যেমন আদালত, তেমন ঠিক দেখতে না। আর কেস করতে গেলে অপরাধের শাস্তি দিতে গেলেও যা খরচা তা ফরিদাদের দিন আনা দিন খাওয়ার পরিবারে টানা সম্ভব নয়। ফরিদা ভেবেছিল আদালতে যাওয়া সেই তার শেষ। যদিও অনেকবছর পর ফরিদা আর পড়শী যাদের সাথে ঝামেলা হয়েছিলো, তাদের পরিবারের মেয়েদের সাথে একসাথে মিলে আবার আদালতে যাওয়া নিয়ত হলো। ভোটার কার্ড, অধার কার্ড, রেশন কার্ডে নাম সংশোধন করতে জেলা আদালতে হত্যে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আবার তাদের মিল হয়ে যায়। ফরিদা বোঝে উঠোনের ভাগাভাগি নিয়ে মারমুখী ইউনুসের মাথা ফাটিয়ে শমসের যে হিংসা করেছিল তা দেখা যায় চোখের পাতা দিয়ে, কিন্তু এই সব বড় বড় আদালত, সরকারের হিংসা দেখা যায় না খালি চোখে। তাই সেবার আদালত থেকে ফিরে অনেককাল বাদে ফরিদার রান্নাঘরের বাটি ছুপিয়া শমসেরদের রান্নাঘরে পৌঁছেছিল পাঁচিল টপকে। তখন তাদের বিভক্ত  উঠোনে ফার্ন ধরা ঝামা ইটের ভঙ্গুর পাঁচিলের নিজেকে যে কী অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল তা সে মুহূর্তই জানে। 

সেই সব উঠোনের হাসি কান্না, বিকেলের লুকোচুরি খেলার মতো ছিল। সারা দুপুর কোনও উঠোন জুড়ে একদল কিশোরী খোলামকুঁচির দাগ কেটে কিতকিত খেলত, কখনও বিকেলে শিশুরা বা কিশোর কিশোরীরা কুমীরডাঙ্গা। মহিলাদের দলটা ছিল দিনের শেষে সংসারের কূটকচালি সেরে রুমাল চুরি বা উকুন বাছতে বাছতে কে কত টাকার সুতো কাটলো, সেই টাকা দিয়ে কী করবে তার গল্পগাছা। 

অনেক অনেক বছর আগে এই সব উঠোনের মহিলাদের একটা চুলো ছিল যা থেকে তারা আগুন সংগ্রহ করতো সকাল সন্ধ্যেবেলা। তখন  দেশলাই এত সস্তা ছিল না তাই কেনার ক্ষমতা ছিল না, পড়শীরা পড়শীদের আগুন ধার দিত। তারপর দেশলাই সস্তা হলো সাতজনের একটা না নেভা চুলো ইতিহাস হলো। সবার এখন নিজেদের চুলো, আর দেশলাই অফুরান। আগুন নেভায় ভয় নেই, যখন ইচ্ছে জ্বালিয়ে নেওয়া যায়। 

এইসব উঠোনের আরেকটা জিনিস ছিল সর্বজনীন, উঠোনের কিছু ঔষধি গাছপালা। এই মহল্লায় শান্তি মুখুর্জে আর দত্ত বাড়িতেই মিলত সর্দি কাশির মোক্ষম ওষুধ তুলসী, রাবেয়া সুলতানার উঠোনে মিলত বাসক, বিসহরি, কালমেঘ, ছড়িমদন, হলুদ গাঁদা, নিম, নিশিন্দে, অরহর এমন কত গাছ। রাবেয়া সুলতানার উঠোন আসলে গ্রামের প্রাথমিক দাওয়াইখানা। গ্রামের মানুষের অসুখবিসুখ হলে তারা আগে এই উঠোনে একবার ঘুরে ওষুধ সংগ্রহ করে যেত। এখান থেকেই অনেকের পেট ব্যথা, সর্দি জ্বর, চোখ ওঠা এমন খুচখাচ রোগ সেরে যেত। বাকি বাড়াবাড়ি হলে তখন কোনও ডাক্তারের সন্ধান। 

স্মৃতিতে ফিরে দেখি আমাদের উঠোনগুলো কংক্রিট হওয়ার আগে পর্যন্ত বৃষ্টি নামানোর মন্ত্র জানতো। প্রতি চৈত্র বৈশাখ মাসে একদঙ্গল কুঁচোকাঁচা মানুষ উঠোনের মাঝে কাদা মাটি খুঁড়ে জল বাঁধিয়ে “আল্লা মেঘ দে পানি দে ছায়া দে রে তুই” এর মন্ত্র সমবেত সুরে গেয়ে বৃষ্টি নামাতো। আর বাড়ির গৃহিণী তাদের জন্য চাল, ডাল, তেল দিত পরম যত্নে। সেই সব শুকনো উঠোনে বৃষ্টি নামতো, ফসলের স্বপ্ন নিয়ে।

তবে উঠোন গুলো সবই আজকাল সংকীর্ণ, বেশিরভাগটাই কংক্রিটে মোড়ানো। আমরা বৃষ্টি নামানোর মন্ত্র ভুলছি ক্রমাগত। নতুন ফসলের স্বপ্নও যেন কেমন ছন্নছাড়া আজকে।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *