উঠোন (তিন)

একেকটা উঠোনের নিজস্ব কিছু শব্দ আছে, নিবিড় হয়ে শুনলে সেই শব্দগুলোই একটা উঠোনের নিজস্ব গল্প লিখে চলে। যেমন একটা ধূসর উঠোনের শব্দ… কোনো এক স্মৃতিকুয়ো থেকে ভেসে এলো ফজরের আজানের শব্দের সাথে । 

ঝুপ করে নীলচে আঁধার কুয়োর অতলে একটা তামার ঘরা পড়ার শব্দ। সূর্য ওঠার ঠিক আগে রাবেয়া পাতাল থেকে আঁধার কালো পানি তুলতো প্রতি ভোররাতে। সেই যেন কবে, কত কত শতাব্দী ধরে রাবেয়া এ কাজ করে চলেছে। ঝপ্ ঝপ্ ঝপ্ অসংখ্যবার সেই কুয়োর পাতাল থেকে পানি তুলে আনে রাবেয়া। সূর্য ওঠার আগে প্রতিদিন নিয়ম করে। নীলচে আলোয় তার ছাইয়ে মাজা বিশালাকার তামার ঘরা দূর থেকে চকচক করে, মনে হয় যেন লালচে সোনা। সেই পাত্রের গলায় দড়ি বেঁধে বাঁধানো কুয়োর অতল কালো পানিতে ফেলে, রান্নাঘর, গোয়ালের নাদা, চানঘরের বালতি ভর্তি করে রাখে রাবেয়া। রাবেয়ার উঠোনের শব্দ শুরু হতো জলশব্দ দিয়ে, শেষ হতো উঠোনের এক কোণে চুলোর প্রায় নিভে যাওয়া কাঠের মৃদু  খুটখাট আঁচের শব্দে।

চুলোর আগুন নিভে গেলে উঠোনে জোনাকিরা ভিড় জমায়, রাত বাড়লে শুকতারা আরও স্পষ্ট হয়। জোনাকি আর তারাদের কোনো শব্দ হয়তো শোনা যায়না। তবুও রাবেয়ার উঠোনে গভীর রাতে কি এমন একটা চাপা শব্দ উড়ে ঘুরে গুমরে বেড়ায়। সেই শব্দে রাবেয়া হয়তো শুনতে পায় মনসুরের ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি। 

মনসুর মানে গ্রামের মনু মিঁঞা। প্রথম ব্যাচের দুর্ভাগা যাকে দেশ ছাড়তে হয়, আবার অন্য দিক দিয়ে দেখলে মনু প্রথম ব্যাচের সৌভাগ্যবান যাদের ভাগ্যে বিদেশ যাওয়া লেখা। মনসুর আগে মাঝি ছিলো , এখন তাদের গ্রামের পদ্মার শাখায় জল নেই, মাছ নেই, শুধু শূন্য বাতাসে কচকচে সাদা বালি উড়ে বেড়ায়। তাই মনসুর সদর শহরের ইমারত বানানোর জন্য মজদুর খাটতে যেত, ওখান থেকেই যোগাযোগ হয়ে সে তার গ্রামের আরও চার জনের সাথে কাতারে যায়। মনসুরদের গ্রাম থেকে এর পর আরও দুটো ব্যাচ গিয়েছিলো। শেষ দলের সাত জনের মধ্যে চার জনের লাশ বা বলা যায় গলা মাংস পিন্ড কফিনে করে ফিরেছিল, বাকি তিনজন এখনও নিখোঁজ। তাও মনসুরদের গ্রাম থেকে মানুষেরা বিদেশে যায়, যাবে, বেঁচে থাকবে বলে।

যদিও রাবেয়া জানে মনসুর বেঁচে  আছে। কারণ দুই মাস অন্তর টাকা আসে। নারায়ণ মন্ডল সেই টাকা ব্যাংক থেকে তুলে এনে দেয়; একশো টাকায় দশ টাকা করে কমিশন নেয় সে। আর কোনো যোগাযোগ মাধ্যম তাদের গত আট মাসে নেই, কারণ মনসুর চিঠি লিখতে পারে না, রাবেয়া চিঠি পড়তে পারে না। পিঠোপিঠি দুটো ছেলে, শ্বশুর, শাশুড়ী সবাইকে সামলে রাবেয়ার যখন ফুসরত মেলে তখন উঠোনে নিঃশব্দে  জোনাকি আর তারাদের ভিড়। রাবেয়া ভাবে নতুন মানুষের পৃথিবীতে আসার কথাটা মনসুরকে বলতে হবে, ভাবতে ভাবতে ফজরের আজান শুরু হয়। কুয়োর অতলে গলায় দড়ি বাঁধা কলসি ডুব দেয় ।

এমনি এক দিন কালচে নীল পাতাল থেকে পানি তুলতে তুলতে রাবেয়া শুকতারা দেখছিল; তার তল পেটে জল ভাঙলো, তারপর বেহুঁশ। 

সকালে যখন হুঁশ এলো পাশে ভোররাতের কালো মেশানো উজ্জ্বল চোখের সদ্যজাত কন্যা। সদ্যজাত মেয়ের গায়ের রঙ দেখে তার দাদা দাদিতে নাম দিলো কালোবুড়ি, আর রাবেয়া নিজের মেয়ের নাম দিল আসমানতারা । 

সেই উঠোনে অনেকটা অবহেলায় হামাগুড়ি দিয়ে একটু একটু করে বড় হয় কালোবুড়ি ওরফে আসমান তারা। এই বাড়িতে রাবেয়া শুধু মেয়েকে আসমা বলে ডাকে। বাকি ভাইয়েরা, দাদা দাদি, পাড়া গাঁয়ের লোকেরা তাকে কালোবুড়ি নামে ডাকে, চেনে। 

মেয়েকে রাবেয়া ভালোবাসে। তবু ভয় পায়, মনসুর এসে মেয়ের গায়ের রং নিয়ে যদি তার বাপ মায়ের সুরেই কথা বলে? মনসুরের পাঠানো টাকা থেকে কপচি কেটে টাকা সরিয়ে তাই সে পাড়ার মনোহরী দোকান থেকে ফেয়ার এন্ড লাভলি কিনে বাচ্চাটার মুখে গায়ে ঘষে চলে, কয়েক মাস এক টানা শিশুর ত্বক এই ফর্সার ক্রিম সহ্য করতে পারে না, চামড়া আলগা হয়ে উঠে আসে ঘা হয়ে যায় মুখে শরীরে। তাও রাবেয়া অবুঝের মতো আসমানতারাকে ফর্সা হওয়ার ক্রিম লাগায়। 

আসমানতারার যখন পাঁচ বছর বয়স মনসুর ফিরে এসেছিলো কাতার থেকে, দুই সপ্তাহের জন্য ছিলো সে। একটা কালো রোগা চামড়াওঠা মেয়েকে দেখে নিজের সন্তান মনে করতে তার অসুবিধা হয়েছিলো প্রথমে। মনসুর আসমাকে দেখে ভাবনায় পরে এই মেয়ের গতি কী হবে। মনসুর তাই আবার ফিরে যায় বিদেশ। তাকে অনেক টাকা জমাতে হবে তার একমাত্র কন্যা সন্তানের জন্য; টানা দশ বছর সে আর বাড়ি ফেরে না। মনসুরদের কালোবুড়ির গতি করতে টাকা জমায়। ৪০ বছর বয়সের ক্লান্ত শ্রমিক বিদেশে মজুরী বিক্রি করে মেয়ের গতি করবে বলে। 

এদিকে রাবেয়া মেয়ের বড় হওয়ার সাথে সাথে আরো চিরচিরে বিরক্ত হয়ে ওঠে, তার শরীর ভারী হয়, চোখ ঝাপসা, আর ঘোলাটে দ্বিধা ভরা মনে কালো বুড়িকে আসমানতারা করার জিদ চেপে যায়। বড় বাজারে হোমিওপ্যাথি, কবিরাজী, আর অ্যালোপ্যাথি সব জায়গা থেকে আসে চামড়ার রং বদলের ওষুধ। কিশোরী মেয়েকে জোর করে খাওয়াতে মাখাতে থাকে মা এই পরিবারে, সমাজে গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টায়। কিশোরী আসমার মুখে সাদা চাকলা গোল দাগ দেখে রাবেয়ার মনে হয় এই সাদা চাকলা গোল দাগটা আরও বাড়ুক, সারা শরীর ছড়িয়ে পড়ুক, এই গোল চাকলা সাদা দাগগুলো আসমার কলো রঙ ঢেকে দিলে হয়তো মনসুর তাড়াতাড়ি দেশে ফিরবে, মেয়ের গতি করতে কম টাকা লাগবে । 

বছরখানেক থেকে রাবেয়ার জায়গাতে আসমানতারা এখন নিঃশব্দ জোনাকি আর তারাদের সাথে গুমরে কথা বলে। তারপর ভোরের আজান থেকে সূর্য ওঠার আগে পর্যন্ত সেই চকচকে লালচে সোনার মত দেখতে তামার ঘরাটা একটানা কালো কুয়োর পাতালে ঝপ্ ঝপ্ শব্দে নামতে থাকে। আসমাও কোনও কোনও সময় সেই ঘরাটার মত গলায় দড়ি বেঁধে অতল অন্ধকারে হারিয়ে যেতে চায়। কুয়োয় ঝুঁকে টলটলে পানির দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে;  ঠিক তখনি সেই গভীর পাতালে সে ভোরের রাতে একটা তারার প্রতিচ্ছবি দেখে, নিঃসঙ্গ  শুকতারা। নিজেকে সামলে নিয়ে সে বোঝায়, আসমানের তারা সে, পাতালের পানিতে মিশবে কেমনে। তারপর ঝাপসা চোখে পানি তোলা শেষ হলে, সকালে সূর্য উঠলে সে তামার কলসিটার গলা থেকে দড়িটা খুলে আগের দিনের বাসি ছাই দিয়ে শরীরের সব শক্তি দিয়ে ঝামা ঘষে ঘষে আরও চকচকে করে তোলে। কখনও কখনও সেই ছাই সমেত ঝামা আসমানতারা নিজের শরীরেও ঘষে চলে। আমরা সেসব বীভৎস হিংস্রতা দেখতে পাই না। আসলে সূর্য  ওঠার পর রাতের তারারা অদৃশ্য হয়ে যায়, একই সাথে আসমানতারারাও কালোবুড়ি হয়ে যায়। 

এটা হয়তো একটা গল্প, কিন্তু আসমানতারা কোনো গল্প নয়, রাবেয়া, মনসুর সবাই আমাদের চেনা একটা উঠোনের মানুষ। যে উঠোনের একটা কুয়োর জলে শেষ রাতে, আসমানের তারা তার প্রতিবিম্ব রেখে যায়।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.