উঠোন

অনেক বছর আগে সত্তর দশকের দিকে এক গেরস্থ ঘরের কিশোরী ভাতের ফ্যান ঝরাতে গিয়ে প্রতিদিন ভুল করতো, অনেকটা করে ভাত ফ্যানের মধ্যে অজান্তে পরে যেত। কিছু মাস আগেই তার আশি উত্তীর্ণ মায়ের কাছে শোনা সে গল্প, তার বৃদ্ধা মা বলতো, ‘ইচ্ছে করেই বুড়িকে ফ্যান গালাতে দিতাম, যাতে ফ্যানে কিছুটা ভাত থাকে’। বুড়িরও এখন ষাট বছর, তার বয়ানে সে বলে ‘পড়শী মানুষরা অনেকেই ফ্যানটুকু খাওয়ার জন্যই উঠোনে বসে থাকতো তাদের শুধু ফ্যান দিতে কষ্ট হতো। ইচ্ছা করেই ফ্যানের মধ্যে ভাত ফেলতাম প্রতিদিন, মা ভাবতো আমার হাত নড়বড়ে’।

সেই মা মেয়ে আর উঠোন বা দাওয়ায় অপেক্ষারত পড়শীর গল্প গুলো শুনি। শুনতে শুনতে গল্প মিশে যায়, দুজনের দুই রকম বয়ান কখন একই হয়ে যায়। বুড়ি বলে আমাদের উঠোন গুলোতে তো প্রাচীর ছিলো না তখন, ‘আমাদেরও যখন ভাত জুটত না, খরায় ফসল পুড়ে যায় সেবার, সাবি দাদি কাঠা মেপে চাল দিয়ে যেত। বলত বাছাগুলোর  পেটে তিনদিন আটা গুলা ছাড়া কিছু পড়েনি, ওদের দুটো ভাত রেঁধে দিস’। 

আমি ওই মা মেয়ের কাছে তাদের উঠোনের গল্প শুনি, একটা অন্য সময়ের গল্প সেসব উঠোনে বিছিয়ে রয়েছে। তখন অনাহারে যেমন মানুষ উঠোনে নিঝুম হয়ে বসে থাকতো, আবার উঠোনে তারকাঁটা বা প্রাচীর না ওঠায় বেশিদিন অভুক্ত থাকা কঠিন ছিল। পড়শী মায়েরা মেয়েরা কখন ব্যবস্থা করে নিজেরা দুটো কম খেয়ে পড়শীর ঘরে কাঠা মেপে চাল দিয়ে আসতো চুপি চুপি। নেহাত সেটা সামর্থের বাইরে থাকলে তারা ফ্যানটুকুনি যত্ন করে রাখতো।

বাড়ির সীমানাতে লাগানো থাকতো সজনে নাজনে গাছ; যার ব্যক্তিগত মালিকানার কথা ভাবা সে সময়ে সম্ভব ছিল না। আর এক টালির পুঁই শাক বাড়তে বাড়তে পড়শীদের কাঁচা ছাদগুলো একে অপরের সাথে জড়িয়ে থাকতো। 

আমার নব্বই দশকে জন্ম, আমরা স্কুলে বার্লিন প্রাচীর নির্মাণ আর ভেঙে যাওয়া ইতিহাসের পাঠ নিতে নিতে কখন আমাদের উঠোনের প্রাচীরগুলো চুপিসারে উঠতে থাকলো সেটা খেয়াল করিনি। ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান তত্ত্ব পড়তে পড়তে কখন সজনে নজনে গাছগুলো নিজেদের নিজেদের অধিকারে চলে আসলো, বা সেগুলো কাটা গেল সেভাবে লক্ষ্য করা হয়নি। 

বুড়ি আর তার মায়ের উঠোনের গল্প শুনতে শুনতে নিজের শৈশবের সেই উঠোনের কথা মনে এলো। যেখান থেকে এসেছিলাম, সেখান থেকে একটা  স্বপ্ন এনেছিলাম ব্যাগে পুরে। তেমন কিছুই নয় হয়তো, একটা উঠোনেরই স্বপ্ন … প্রাচীরবিহীন সেই উঠোন; পড়শীর সীমানাতে ছিল কিছু নয়নতারা, দোপাটি আর সন্ধ্যামণির আগাছা  … 

সেই নিকনো উঠোনে, শান্ত দুপুরে হেলে সাপেরা রোদ পোহাতে পারতো নির্দ্বিধায়, আর সজনে গাছে পাখিরা সকাল বিকেল হুটোপুটি করতো, খুব ঝড় হলে জীবন গাছটা অন্য গাছগুলোকে অকারণ নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেলত … 

আর যে বোকা মানুষটা উঠোনের আগাছা কাটতে দিত না, নয়নতারা চারাগুলো বেড়া করবে বলে বাড়ির সামনে লাগিয়ে দিত, চারাগুলো বড় হয়ে ফুল সমেত বেড়া হত, সেই স্বপ্নে আমাদের  টালির চালের ঝাঁপের ঘর ছিল, তাই সূর্য আর চাঁদের আলো যখন ঘরে ঢুকত। আলোগুলো সব রুহানি নকশা হয়ে যেত …, একটা আলোর নকশা করা ঝাঁপের দেওয়াল বাড়িতে অমন নয়নতারা বেড়া যে কতই মানানসই, সে কথা কেবল আমার স্বপ্নের মধ্যে ঢুকলেই এখন অনুভবে আনা যায়। 

কিন্তু অনেক বছর ধরে নিজের স্বপ্নের মধ্যে নিজেই ঢুকতে পারিনা আর, আমার বর্তমানের বাড়ি এখন ইঁটের ইমারত, পড়শীদের সাথে চুলচেরা হিসেব কষে সীমানাতে দেওয়াল গাঁথা … আর দুপুরে নিশ্চিন্তে রোদ পোহানো হেলে সাপগুলো বৃদ্ধ হয়ে মারা গেছে কতকাল আগেই …

এবার যখন মড়ক লাগলো, বাড়ি ফিরে এলাম, প্রাচীর ঘেরা উঠোনে দেখি নাছোড় কিছু নয়নতারা গাছ এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছে দেওয়ালের ইঁটের মধ্যে থেকে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে দেওয়ালে ফাটল ধরানোর। মনে মনে চাই নয়নতারা গুলো সফল হোক;  কিন্তু তারপর? 

তারপর মড়কের পর হয়তো আবার আসবে দুর্ভিক্ষ। তখন কি আবার বাড়ির বুড়ি আর তার মা, সাবি, ধুনা, আনি, মানা দাদীরা ফিরে আসবে, না খেতে পাওয়া পড়শীর জন্য নিজেরা একটু কম খেয়ে এক পালি চাল ঢাকঢোল না পিটিয়ে নিজের পড়শীর রান্না ঘরে দিয়ে আসবে আঁচলের তলায় লুকিয়ে।

পড়শীরা কি নয়নতারার ভাঙ্গা পাঁচিলের ধ্বংসস্তুপ সরিয়ে আবার যৌথভাবে নিজেদের সীমানায় সজনে, নাজনে, কাঁঠাল, জাম গাছ লাগাবে? 

মসজিদ থেকে এখন প্রায় প্রতিদিনই “ইন্না ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন … ” ভেসে ওঠে, পড়শীরা প্রাচীর, ছোঁয়াচে রোগের পরোয়া না করে এখনও দেখি জানাজাতে যায় এই বিশ্বাসে যে মৃত পড়শীকে শেষ বিদায় না দিলে নয়। তখন মনে হয় জীবিত পড়শীর জন্যও পড়শীরা সব প্রাচীর ভেঙে আবার একদিন একটা যৌথ উঠোন যদি বানায়। সেই উঠোনে যে ঝামেলা থাকে না, হিংসা থাকেনা একথা কখনও বলবো না। তবুও এসবের থেকে বেশি থাকে দুর্ভিক্ষের সময় যৌথ উঠোনে মানুষের সবাই সবার হেঁসেলের খবর রাখা। যৌথ উঠোনে একা খাওয়া অসভ্যতা, একসাথে অল্প খাওয়ার উৎসব প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ।

ওপরে ব্যবহৃত ছবি লেখকের আঁকা।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *