প্যারি কমিউন – ইতিহাসের (অ)দৃশ্যমান মেয়েরা

কিংবদন্তী কম্যুনার্ড ল্যুইজি মিশেল

ল্যুইজি মিশেল

প্যারি কমিউন-এর যে নেত্রীকে নিয়ে পরবর্তীতে সবথেকে বেশি আলোচনা হয়েছে তিনি ল্যুইজি মিশেল। পল ফনটোলিউ তাঁর বইতে মিশেল-কে বর্ণনা করেছেন, কমিউনার্ডদের মধ্যে ‘সবচেয়ে বয়ে যাওয়া আর সব থেকে বেশি হিংস্র’।

পেশায় শিক্ষিকা মিশেল, ১৮৬৫ সালে প্যারিসে আসার পর মঁ মার্ত্র এলাকায় একটি স্কুল চালাতেন। পাশাপাশি, এই সময় থেকেই বামপন্থী রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন মিশেল। ১৮৬৬ সালে, নারীবাদী গোষ্ঠী ‘সোসাইটি ফর দ্য ডিমান্ড অফ সিভিল রাইটস্ ফর উইমেন’-এর সদস্য হন। সোসাইটির মূল দাবিগুলি ছিল মেয়েদের ধর্মনিরপেক্ষ প্রাথমিক শিক্ষা, কাজের সমানাধিকার ও বিবাহিত মহিলাদের সমান নাগরিক অধিকার।

প্যারি কমিউন গঠিত হওয়ার পর মঁ মার্ত্র উইমেন’স ভিজিলেন্স কমিটির প্রধান নির্বাচিত হন মিশেল। তিনি একই সাথে মঁ মার্ত্র উইমেন’স ভিজিলেন্স কমিটি ও মঁ মার্ত্র মেন’স ভিজিলেন্স কমিটির সদস্য ছিলেন। এছাড়াও যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক ক্লাবের সাথে। নিয়মিত লেখালেখি করতেন সংবাদপত্রে। ফ্রান্সের যৌনকর্মীদের কমিউন-এর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা ছিল তাঁর। 

সহযোদ্ধাদের মধ্যে মিশেল পরিচিত ছিলেন সুবক্তা, দৃঢ়চেতা ও অসীম সাহসী হিসেবে। পরবর্তীকালে ভিক্টর হুগো সহ বিভিন্ন লেখকের লেখায় উঠে আসে তাঁর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের কথা। 

তত্ত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো ও শৃঙ্খলার থেকে তীব্র আবেগ ও প্রাণোচ্ছলতাকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন মিশেল। তাঁর জীবনের সবটুকু তিনি বিপ্লব ও রাজনীতিতে উৎসর্গ করেছিলেন। বাম ও ডান উভয় মহলেই তিনি পরিচিত ছিলেন দ্য রেড ভার্জিন নামে।  ঐতিহাসিক ক্যারোলিন ইকনার বলেন, মিশেল ছিলেন অবিবাহিত, সন্তানহীন, সাধারণ চেহারার এবং বেপরোয়া সাহসী। যেসমস্ত বামপন্থী সমাজতন্ত্রী পুরুষরা মহিলাদের গণপরিসরে আসায় অসন্তুষ্ট ছিলেন সেই পিতৃতান্ত্রিক কল্পনায় রেড ভার্জিন-এর এই অযৌন ইমেজ ছিল অপেক্ষাকৃত নিরাপদ।1 

ঐতিহাসিকদের মতে, ইতিহাসে যে কিংবদন্তী মিশেলকে আমরা পাই তার খানিকটা একজন বাস্তব নারীর স্বেচ্ছায় গড়ে তোলা ইমেজ আর বাকিটা সমালোচক, অনুগামী ও পর্যবেক্ষকদের কল্পনা। 

কমিউন চলার সময়ে, রাজনীতির প্রসারে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেন মিশেল, তাঁর নিজের কথায়, “সেই সময়ে প্রায় ঘুমোতামই না; অন্য কিছু করার না থাকলে একটু ঝিমিয়ে নিতাম, আরও অনেকেই এইভাবেই দিন কাটাত। যারা মুক্তি চাইছিল তাঁরা এই কাজে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করেছিল।” 2

এপ্রিল মাসে কমিউন-এর পক্ষে সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দেন মিশেল। সামনের সারিতে থেকে ভার্সাই সেনার সাথে লড়াই করেন। এই সময়ে মিশেল তিয়েরস-কে হত্যার পরিকল্পনাও করেন। কিন্তু কমরেডদের পরামর্শে সেই পরিকল্পনা বাতিল করে ৬১তম মঁ মার্ত্র ব্যাটেলিয়নে যোগ দেন।    

১৭ মে ক্লাব সেন্ট-সালপিস এর মিটিং-এ মিশেল বলেন,

সেই বিশেষ দিনে আমরা পৌঁছে গেছি, সেই নির্ণায়ক দিন – হয় সর্বহারার মুক্তি নয় দাসত্ব। কিন্তু সহনাগরিকরা সাহস রাখুন, শক্তি রাখুন, প্যারিস আমাদের হবে, হ্যাঁ, আমি হলফ করে বলছি, হয় প্যারিস আমাদের হবে নাহলে প্যারিস আর থাকবেই না! মানুষের জন্য এটি জীবন মৃত্যুর প্রশ্ন। 3

 

প্যারি কমিউন-এর পতনের পর আরও অনেক সহযোদ্ধার সঙ্গে গ্রেফতার হন মিশেল। ভার্সাই মিলিটারি ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ আসে যার মধ্যে ছিল  ‘উনিওয়ন দে ফামা-এর বিখ্যাত কেন্দ্রীয় কমিটিকে সংগঠিত করা’, ‘ইন্টারন্যাশনাল-এর সঙ্গে যোগাযোগ’, ‘কমিউন নেতৃত্বের সঙ্গে গভীর যোগাযোগ রেখে সব পরিকল্পনা আগে থেকে জানা’। এই অভিযোগগুলির অনেকটাই ছিল ভিত্তিহীন, কিন্তু অন্য কমরেডদের আড়াল করতে, ট্রাইব্যুনাল-এর সব অভিযোগের দায় নেন তিনি। অগ্নি সংযোগের একটি অভিযোগের উত্তরে  তিনি বলেন, “হ্যাঁ আমি এই ঘটনায় অংশ নিয়েছি। আগুনের শিখার পাঁচিল তৈরি করে ভার্সাই-এর হানাদারদের রুখতে চেয়েছি। এই কাজে আমার কোনও সাথী আমাকে সাহায্য করেনি। আমি নিজেই করেছি।” 4

আন্দ্রে লিও- সাংবাদিক, লেখক ও সংগঠক 

আন্দ্রে লিও

আন্দ্রে লিও ছিলেন সমাজতন্ত্রী নারীবাদী সাংবাদিক ও লেখক, আসল নাম ভিক্টয়ের লিওডাইল বেরা। ১৮৫১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস, উনে ভিয়েলে ফিয়ে (Une Vieille Fille)। ফরাসী ভাষায় ভিয়েই ফিয়ে শব্দের অর্থ মাঝবয়সী অবিবাহিত কূট মহিলা। উপন্যাসটিতে লিঙ্গ রাজনীতি, ক্ষমতা, প্রেম ও পরিবারের বিষয়গুলি তুলে আনেন লিও। এর পরের উপন্যাস, উন ম্যারেজ স্কন্দালো (Un Mariage scandaleux)-এ বিবাহ প্রতিষ্ঠানের লিঙ্গ ও শ্রেণি সম্পর্কের সমালোচনা রাখেন। পরবর্তী দেড় দশকে লিও লিঙ্গ রাজনীতি, বিয়ে, নারী-পুরুষের সম্পর্কের উপর একাধিক প্রবন্ধ ও উপন্যাস প্রকাশ করেন। ব্যক্তিগত পরিসরের লিঙ্গ ও শ্রেণি ক্ষমতার ওপর জোর দেন তাঁর লেখায়, পরিবার ও বিয়েকে সমাজের ক্ষুদ্র একক রূপে তুলে ধরে সমালোচনায় বিদ্ধ করেন। ঔপন্যাসিক ও নারী অধিকারের প্রবক্তা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন ফ্রান্স-এর বুদ্ধিজীবী ও পাঠক মহলে। পাশাপাশি, ১৮৬০ এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে, প্যারিসের সমাজতন্ত্রী ও নারীবাদী সংগঠনগুলির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন লিও। এই সময় থেকে লিওর লেখনী হয়ে ওঠে আরও বিদ্রোহী, আরও ক্ষুরধার, উঠে আসে শিক্ষার অধিকার, গির্জার বিরোধিতা, নারী শ্রম ও নারী অধিকারের বিষয়গুলি। প্রুধো-র নারীবিদ্বেষী মতামতের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে নিবন্ধ প্রকাশ করেন, পরিচিতি বাড়ে আন্তর্জাতিক মহলে। 

১৮৬৮ সালের জুলাই মাসে, নারী অধিকারের দাবীতে একটি ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেন, প্যারিসের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয় সেই ম্যানিফেস্টো, আলোচিত হয় প্যারিসের বিভিন্ন সভা ও ক্লাবে। 

১৮৭১-এর ১৮ মার্চ গণঅভ্যুত্থানের সময়ে আন্দ্রে লিও ফ্রান্সের বিভিন্ন প্রদেশে ঘুরে গ্রামের কৃষকদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনার প্রসারের কাজ করছেন। ততদিনে তিনি যোগ দিয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল-এর ফ্রান্স শাখায়। কমিউন গঠনের এক সপ্তাহ পর তিনি প্যারিসে ফেরেন। প্রথম দিন থেকে কমিউনকে নিঃশর্ত সমর্থন জানানো লিও বিপ্লবকে চূড়ান্ত সমাধান মনে করতেন না, বরং তাঁর কাছে বিপ্লব ছিল সদর্থক পরিবর্তন আনার একটি সুযোগ। 

কমিউনের শত্রুর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের পক্ষে সওয়াল করেন লিও। পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রে মেয়েদের ভূমিকা পরিবর্তনের ডাক দেন। তিনি বলেন, এই বিপ্লবী গৃহযুদ্ধ যদি সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য হয় তাহলে কমিউনের ন্যাশনাল আর্মিতে মেয়েদের যুক্ত করতেই হবে। 

চিত্র ঋণ- ওয়ার্কার্স লিবার্টি

কমিউন সরকার ও পুরুষ কমিউনার্ড-দের অনেকের কাছেই যখন এই যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল শ্রেণি বৈষম্যের অবসান, লিও ও অন্যান্য মহিলা বিপ্লবীরা এটিকে শ্রেণি ও লিঙ্গ শক্তি কাঠামোর পরিবর্তনের একটি উপায় হিসেবে দেখছিলেন। 

কমিউনের বিপ্লবী নীতি ও কাজকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে প্যারিসে ফিরেই লা সোশিয়েল নামে একটি সংবাদপত্র প্রকাশ করতে শুরু করেন লিও। ১২ এপ্রিল অল উইমেন উইথ অল মেন” শীর্ষক সম্পাদকীয়তে লিও যুদ্ধক্ষেত্রে মহিলাদের পূর্ণ অংশগ্রহণের গুরুত্বের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক সক্ষম প্যারিসবাসীকে অস্ত্র তুলে নিতে হবে। 

তবে লিও সহ এই সময়ের কোনও নারীবাদী নেত্রীই কমিউনের সরকারে মেয়েদের প্রতিনিধিত্বের দাবি জানাননি। কারণ তাঁরা মনে করেছিলেন কমিউন সরকার একটি অস্থায়ী প্রশাসন। 

লা সোশিয়েল -এ “দ্য রেভোলিউশন উইদাউট উইমেন” শীর্ষক একটি নিবন্ধে নারী প্রশ্নে বিপ্লবী বামের ঐতিহাসিক ঔদাসীন্যকে সমালোচনায় বিদ্ধ করেন লিও। তিনি এটিকে আন্দোলনের আশি বছরের ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন কমিউনও এই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করছে, বলেন, মহিলাদের যদি বিপ্লবী প্রতিরক্ষা ও রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা না হয় তাহলে তারা ক্যাথলিক গির্জার মতো প্রচলিত প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অবস্থান নেবে ও প্রতিবিপ্লবী শিবিরে যোগ দেবে।  

প্যারি কমিউন প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই প্রতিরক্ষায় মহিলাদের অংশগ্রহণের অধিকারের পক্ষে লাগাতার সওয়াল করে গেছেন তিনি। মহিলাদের ‘সুরক্ষা’র জন্য তাদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে রাখার তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। 

১ মে, কমিউন-এর কমিটি অফ পাবলিক সেফটি মহিলাদের যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া নিষিদ্ধ করে। চারঘন্টার মধ্যে মহিলাদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তীব্র প্রতিবাদ করেন লিও, বলেন, ন্যাশনাল আর্মির শ্রমজীবী পুরুষেরা যখন বিপ্লবের সাম্যের স্পিরিট-এর পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন, কমিউনার্ডদের বিরুদ্ধে শ্রেণিভিত্তিক লিঙ্গ বৈষম্যমূলক আচরণ করছে সামরিক বিভাগের অভিজাত পুরুষরা। 

লিও মনে করতেন, বিপ্লবে মেয়েদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নারীমুক্তি ছাড়া সমাজতন্ত্র ব্যর্থ হতে বাধ্য। যুদ্ধক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণের প্রশ্নে লিও-র পাশে দাঁড়ায় উনিওয়ন দে ফামা। ইউনিয়ন-এর ম্যানিফেস্টোতে এলিজাবেথ দিমিত্রিফ লেখেন, এই চরম বিপদের সময়ে রক্ত ঝরানো ও প্রাণ দেওয়া মেয়েদের অধিকার। 

এই প্রশ্নে, একদিকে দিমিত্রিফ যখন মহিলাদের সংগঠিত করেন, লিও তত্ত্ব ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাঁদের প্রস্তুত করেন যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য।

ভার্সাই সেনা কমিউন আক্রমণ করলে সামনের কাতারে থেকে যুদ্ধ করেন মেয়েরা। শ্রমজীবী আবাসনগুলিতে লড়াই হয় সবথেকে তীব্র। শ্রমিক জনতা রাস্তা থেকে পাথর খুলে নিয়ে আসে; আসবাব, ঘোড়ার ঠেলা, ফাঁকা ব্যারেল, বই আর বালির বস্তা দিয়ে ব্যারিকেড করে নিজেদের এলাকা সুরক্ষিত করার চেষ্টা করে। প্যারিসকে রক্ষা করতে  পুরুষ ও মহিলারা একসাথে লড়াই করেন। কমিউনেরর বুলেটিন-এ ঘোষণা করা হয়,

মহিলারা তাঁদের ভাইদের সঙ্গে যোগ দিক, যোগ দিক তাঁদের বাবা ও স্বামীদের সঙ্গে! যাদের কাছে অস্ত্র নেই… তারা রাস্তা থেকে পাথর খুলে নিজেদের ঘরে রাখুক আর আক্রণকারীরা এলে তাদের মাথায় ফেলে পিষে মারুক। 5

 

প্যলে মিঙ্ক ও ক্লাব রাজনীতি

প্যলে মিঙ্ক

১৮৩০ সালের রাশিয়ার বিরুদ্ধে পোলিশ অভ্যুত্থানে যোগ দেন প্যলে মিঙ্ক-এর মা ও বাবা। অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর ফ্রান্স-এর ক্লেরমন্ট-ফেরান্ড-এ নির্বাসনে পাঠানো হয় গোটা পরিবারকে। সেখানেই জন্ম আদেল প্যলিনা মেকাস্কা বা প্যলে মিঙ্ক-এর। 

ছোট বয়সেই বিপ্লবী রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় মিঙ্ক ও তাঁর দুই ভাই লুইস আর জুলস্-এর। জুলস্ পরবর্তীতে মিঙ্ক-এর সঙ্গেই প্যারি কমিউনে যোগ দেন। ১৮৩৯ সালে সতেরো বছর বয়সে ক্লেরমন্ট-এর রাস্তায় গির্জার পুরোহিতদের একটি শোভাযাত্রায় বিক্ষোভ দেখান মিঙ্ক। এটিই ছিল তাঁর প্রথম প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ। এর জন্য এক সপ্তাহের জন্য জেলে যেতে হয় মিঙ্ক-কে। এর পরের বছর নিষিদ্ধ শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশন লা কোটিও-এ যোগ দেন। এর কয়েক বছরের মধ্যেই প্যরিসে চলে আসেন এবং যোগ দেন সেখানকার বিপ্লবী রাজনৈতিক গোষ্ঠীতে। শুরু করেন শ্রমজীবী নারীদের মিউচুয়াল এইড সোসাইটি। ১৮৬৬ সালে আন্দ্রে লিও, ল্যুইজি মিশেল ও বুর্জোয়া নারীবাদী মারিয়া দেরাইসমেস-এর সঙ্গে গড়ে তোলেন লা সোসিয়েতে দ্রঁয়ো দে ফামা। সংগঠনের মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষা, কাজ ও বিবাহ প্রতিষ্ঠানের সংস্কার। 

কিছুদিনের মধ্যেই সমজতন্ত্রী ও নারীবাদী হিসেবে পরিচিতি বাড়ে মিঙ্ক-এর। বিভিন্ন রাজনৈতিক মিটিং, জনসভা ইত্যাদিতে তিনি নিয়মিত বক্তব্য রাখতে শুরু করেন, লেখা শুরু করেন স্থানীয় পত্রিকায়। তাঁর প্রাণবন্ত স্বভাব, শক্তিশালী বক্তব্য রাখার দক্ষতা ও রসবোধ নজর কাড়ে মানুষের। দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন প্যারিসের রাডিক্যাল মহলে।  

এই সময়ে তিনি ছিলেন অ্যানার্কিস্ট নন-কালেক্টিভিস্ট সোশ্যালিজম-এর সমর্থক। গোটা ১৮৬০ এর দশক জুড়ে মিঙ্ক নারীবাদ প্রশ্নে সাম্য ও মুক্তির মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে চর্চা করে গেছেন, দাবি তুলেছেন সমান কাজের জন্য সমান বেতনের। সোচ্চার হয়েছেন বিয়ে, পুঁজিবাদ ও গির্জার বিরুদ্ধে। 

কমিউন শুরুর আগে মিঙ্ক দ্বর্থ্যহীনভাবে মেয়েদের সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও আইনি অধিকারের সমর্থনে দাঁড়ান। কমিউন গঠনের পর বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আরও অধিকাংশ কমিউনার্ড-এর মতোই তিনিও সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্নের ওপর জোর দিতে শুরু করেন। 

কমিউন গঠিত হওয়ার পর, অধিকারভিত্তিক দাবিদাওয়ার আন্দোলন ছিল মূলতঃ বুর্জোয়া ও রিপাব্লিকান নারীবাদের আওতাভুক্ত। অন্যদিকে, কমিউনে অংশগ্রহণকারী নারীবাদীরা মনে করতেন একটি নতুন সমাজব্যবস্থার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে নাগরিক ও ব্যক্তিগত অধিকারের দাবী গুরুত্ব হারিয়েছে। লিঙ্গ, শ্রেণি ও ধর্মীয় ক্ষমতাবিন্যাস ধ্বংস করে সামাজিক-অর্থনৈতিক সম্পর্কেের পুনর্বিন্যাসের ভিত্তিতে এক নতুন সমাজ গড়ে তোলা ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য, যেখানে অধিকারভিত্তিক দাবিগুলি অপ্রাসঙ্গিক। 

কমিউন চলাকালীন চারটে রাজনৈতিক ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত থাকেন মিঙ্ক। ক্লাবগুলি ছিল শ্রমজীবী মানুষদের আলাপ আলোচনা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি। বিশেষত শ্রমজীবী মহিলাদের রাজনৈতিক স্বর তুলে ধরার ক্ষেত্রে ক্লাবগুলি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাজকতন্ত্রের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই ক্লাবগুলি, পাশাপাশি সোচ্চার হয় শ্রেণি ও লিঙ্গ অসাম্যের বিষয়ে। শহরের বিভিন্ন গির্জায় ক্লাবের সভা বসত। বেশিরভাগই অনিয়মিত। সাধারণত কোনও সুবিন্যস্ত সাংগঠনিক কাঠামো ছিল না। ক্লাবগুলির মঞ্চ সকলের জন্য খোলা থাকত। কোনও কোনও ক্লাব তাদের সান্ধ্য বৈঠকে নির্দিষ্ট বক্তা বা আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু ঘোষণা করত, অন্যান্য ক্লাবে পুরো আলোচনাই হত স্বতঃস্ফুর্ত। 

এই ক্লাবগুলিতে মহিলারা গির্জা ও সামগ্রিকভাবে পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁদের ক্ষোভ উগরে দিত। বিয়ে ও পরিবারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলিকে পিতৃতন্ত্রের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে সনাক্ত করে একদিকে যেমন বিবাহবিচ্ছেদের অধিকারের পক্ষে তাঁরা সওয়াল করেন তেমনই কেউ কেউ ছিলেন বিবাহপ্রথা তুলে দেওয়ার সমর্থক।

সেন্ট এউসটাস-এর এক মিটিং-এ উপস্থিত এক সদস্য বলেন – “বিয়ে, আমার সহ নাগরিকরা, প্রাচীন মানবতার সবথেকে বড় ভুল। বিয়ে করার অর্থ দাসে পরিণত হওয়া… বিয়ে….একটা মুক্ত শহরে আর সহ্য করা সম্ভব নয়।”6

ক্লাবের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি, সেন্ট পিয়ের দে মঁ মার্ত্র গির্জায় মেয়েদের জন্য অবৈতনিক স্কুল শুরু করেন মিঙ্ক, যুক্ত থাকেন অ্যাম্বুলেন্স কর্পস-এর সংগঠনের কাজে। বিভিন্ন প্রভিন্স-এ ঘুরে ঘুরে বিপ্লবের স্বপক্ষে জনমত সংগঠিত করেন।

অন্যান্য কমিউনার্ডদের মতোই মিঙ্ক-ও শ্রমিক ঐক্যের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন শ্রমিক সংহতিই পারে মালিক পক্ষের দমন ও উৎপীড়ন থেকে শ্রমিক শ্রেণিকে রক্ষা করতে। বলেন, শ্রমিক শ্রেণির জীবনের মান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন শ্রেণি চেতনা। 

কমিউন চলাকালীন ক্লাব ডে লা ডেলিভারেন্স-এর একটি মহিলা মিটিং-এ বছর ৩০ এর এক মহিলা বক্তার উল্লেখ পাওয়া যায়, ঐতিহাসিকরা আন্দাজ করেন এই বক্তা মিঙ্ক। এই মিটিং-এ  মিঙ্ক বলেন,

বর্তমান সমাজের আরও একটি ক্ষতিকর বিষয় হল বড়লোকরা, যারা শুধু মদ্যপান করে ও নিজেদের মনোরঞ্জন করে, কখনই নিজেরা কোনও কাজ করে না। পাদ্রী ও নানদের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের এদেরও বিতাড়িত করতে হবে। আমরা একমাত্র তখনই আনন্দে থাকতে পারব যখন কোনও বস থাকবে না, কোনও ধনী থাকবে না, কোনও পাদ্রী থাকবে না।7 

কমিউন পরবর্তী মিলিটারি ট্রাইব্যুনালে মিঙ্ক-এর যে ডসিয়ার ছিল, ১৮৭৮ সালে তা উধাও হয়ে যায়, ফলে অভ্যুত্থান চলাকালীন মিঙ্ক-এর ভূমিকা সম্পর্কে অনেক তথ্যই আর পাওয়া যায় না। পাশাপাশি কমিউনের সংবাদপত্রে উনিওয়ন দে ফামাএর মিটিং সম্পর্কে যত তথ্য পাওয়া যায়, ক্লাবগুলির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য সেই তুলনায় অনেকটাই কম। তার একটা বড় কারণ, কমিউন সরকার, কমিশন অফ লেবার অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ-এর মাধ্যমে উনিওয়ন দে ফামা-কে যে স্বীকৃতি দেয়, অসংগঠিত ক্লাবগুলির সেরকম কোনও সরাসরি স্বীকৃতি ছিল না।

তৃণমূলস্তরের এই ক্লাবগুলির কোনও লিখিত পরিকল্পনা, সদস্য তালিকা, মিটিং-এর মিনিটস্ কিছুই বিস্তারিত পাওয়া যায়না। ক্লাবে অংশগ্রহণকারীরা প্রায় সকলেই ছিলেন শ্রমজীবী মানুষ, ফলে তাঁদের স্মৃতিকথাও অমিল। মিঙ্ক নিজে কমিউন শুরুর আগে থেকে কমিউন পরবর্তী সময়ে সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িত থাকলেও তাঁর লেখাপত্র তেমন পাওয়া যায়না। মিঙ্ক সম্পর্কে যতটুকু তথ্য পাওয়া যায় তার অধিকাংশই বিপরীত রাজনৈতিক অবস্থানে থাকা পর্যবেক্ষকদের দলিল। ফলে পরবর্তীকালে ঐতিহাসিকদের লেখায় স্বাভাবিকভাবেই মিঙ্ক খানিক উপেক্ষিতই থাকেন। পাশাপাশি, পিতৃতান্ত্রিক চিন্তনে মিশেল যেভাবে আদর্শ বিপ্লবী হয়ে উঠেছিলেন, মিঙ্ক তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও পছন্দের কারণে সেই খ্যাতি অর্জন করতে পারেননি। জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই সিঙ্গল মাদার হিসেবে কাটানো মিঙ্ক-কে রাজনৈতিক কাজের পাশাপাশি উপার্জন, বাচ্চার দেখাশোনা ইত্যাদি কাজেও সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হয়েছে। মিঙ্ক-এর জীবনে বিয়ে, বিবাহ বিচ্ছেদ, সন্তানধারণ ইত্যাদি নানা ঘটনার ঘাত প্রতিঘাত থেকেছে। ফলে কমিউন চলকালীন ও পরবর্তী সময়ে মিশেল-এর মতোই সক্রিয় ও জোরালোভাবে রাজনৈতিক ময়দানে উপস্থিত থাকলেও পিতৃতান্ত্রিক সমাজ মিঙ্ক-কে বিপ্লবী আইকন হিসবে গ্রাহ্য করেনি।  

মঁ মার্ত্র ভিজিল্যান্স কমিটি

রু লে দা রোকে, প্যালেস দি বাস্তিল-এর প্রবেশ পথে ব্যারিকেড

মঁ মার্ত্র ভিজিল্যান্স কমিটিতে একটি পুরুষদের ও একটি মহিলাদের কমিটি ছিল। দুটি কমিটির সভা পর পর একই স্থানে বসত, এবং মিচেল সহ অনেক মহিলা দুটি কমিটিরই সদস্য ছিলেন। 

মঁ মার্ত্র উইমেনস্ ভিজিল্যান্স কমিটির অন্যতম নেতৃত্বস্থানীয় সদস্য ছিলেন কমিউনার্ড সোফি পোরিয়ের, অ্যানা কোরভাইন ক্রুকোভস্কায়া জ্যাকলার্ড ও বিত্রিক্স এক্সকোফন। এদের মধ্যে সোফি দর্জির কাজ করতেন। তিনি ভিজিল্যান্স কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। সোফি ছিলেন ক্লাব দে লা বোল নোয়া-র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। প্রুশিয়ান অবরোধের সময়ে তিনি একটি সমবায় পোশাক কারখানা গড়ে তুলেছিলেন।

ক্লাব দে লা বোল নোয়া-র সহ সভাপতি বিত্রেক্স এক্সকোফন-এর নিজের পেশার কোনও উল্লেখ পাওয়া যায়না, তাঁর বাবা ছিলেন ঘড়ি নির্মাতা ও বর ছিলেন ছাপাখানার কম্পোজিটর। বিত্রেক্স পরিচিত ছিলেন ক্লাব মিটিং-এ পাদ্রী ও নান-দের বিরুদ্ধে তাঁর অবিরাম বিষোদ্গারের জন্য।  

ভিজিল্যান্স কমিটির অন্য নেত্রী অ্যানা জ্যাকলার্ড ছিলেন রাশিয়ার সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে ও দিমিত্রিফ-এর বাল্যবন্ধু। অ্যানা জেনেভা-তে ইন্টারন্যাশনাল-এ যোগ দেন ও পরবর্তীতে প্যারিসে টাইপসেটার-এর কাজ করেন। কমিউন চলাকালীন তিনি লিও-র সঙ্গে লা সোশিয়েল – সম্পাদনার কাজ্ যুক্ত হন। 

 রক্তাক্ত সপ্তাহ ও পেত্রোলিউজ

লিওন সাবটিয়ার ও অ্যালবার্ট অ্যাডামের তৈরি লিথোগ্রাফ

কমিউনের শেষ দিনগুলিতে একদিকে যখন ভার্সাই সেনার আক্রমণ চরমে পৌঁছয়, সেই সময়ে তুলেরিজ প্যালেস সহ প্যারিস জুড়ে একধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সমসাময়িক বুর্জোয়া সংবাদপত্র ও প্রশাসন এই কাজের জন্য দায়ী করে শহরের শ্রমজীবী মহিলাদের। তাঁদের চিহ্নিত করা হয় পেত্রোলিউজ নামে। বলা হয়, পেট্রলের ক্যানিস্টার নিয়ে একের পর এক সরকারি বাড়িতে আগুন লাগিয়ে বেড়ান এই পেত্রোলিউজরা সেই সময়ে প্যারিসে কর্মরত, এডউইন চাইল্ড তাঁর বলেন,

মহিলারা বাঘিনীরা মতো দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল, সর্বত্র পেট্রোলিয়াম ছড়াচ্ছিল তারা, যে হিংস্র ক্রোধ নিয়ে তারা এই লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করে, সেই ক্রোধই তাদের আলাদা করে চিনিয়ে দিত। 8

কমিউনের রক্তাক্ত সপ্তাহে পেত্রোলিউজ সন্দেহে শয়ে শয়ে শ্রমজীবী মহিলাকে হত্যা করে ভার্সাই সেনা, পিটিয়ে মারা হয় বহু মহিলাকে। পেত্রোলিউজ দের সাহায্য করার অভিযোগে খুন করা হয় শিশুদেরও।

পরবর্তীকালের ঐতিহাসিকদের মধ্যে অবশ্য পেত্রোলিউজ-দের অস্তিত্ব নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, শ্রমজীবী মহিলাদের অভিযুক্ত করার জন্যই এই রটনার জন্ম দেয় প্যারিসের তৎকালীন বুর্জোয়ারা যা পরবর্তীতে কিংবদন্তী হয়ে ওঠে।  

মে মাসের শেষ সপ্তাহে, প্যারিস যখন জ্বলছে, একের পর এক কমিউনার্ডকে হত্যা করছে ভার্সাই সেনা; দিমিত্রিফ, লিও ও মিঙ্ক গ্রেফতার এবং হত্যা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হন। মিশেল প্রাথমিকভাবে আত্মরক্ষা করতে পারলেও, ভার্সাই সেনা তাঁর মাকে গ্রেফতার করলে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন মিশেল। ২০ মাস জেলে থাকার পর আরও বহু কমিউনার্ডের সঙ্গে নিউ ক্যালোডোনিয়াতে নির্বাসনে পাঠানো হয় তাঁকে। তাঁর সঙ্গেই নির্বাসনে যান কমিউনার্ডের আরেক নেত্রী নাথালি লেমেল।

অন্যদিকে লিও ও ব্যারিকেডের লড়াইয়ে আহত দিমিত্রিফ প্রাথমিকভাবে প্যারিস শহরেই আত্মগোপন করেন এবং পরে প্রশাসনের চোখে ফাঁকি দিয়ে ফ্রান্স ছাড়েন।

মিঙ্ক কমিউনের পতনের সময়ই কোনওভাবে সুইজারল্যান্ডগামী ট্রেনে উঠে লুকিয়ে থাকেন। ট্রেন যখন ফ্রান্সের সীমানা পেরোচ্ছে, বেরিয়ে আসেন মিঙ্ক, ফরাসী সীমা সুরক্ষাবাহিনীর দিকে চিৎকার করে বলেন, ভিভা লা কমিউন, ভিভা লা রেভোলিউশন।

কমিউনের এই নেত্রীরা প্রত্যেকে সমাজতন্ত্র ও নারীবাদ বিষয়ে নিজস্ব ভাবনা নিয়ে কমিউনে অংশগ্রহণ করেন, চ্যালেঞ্জ করেন শ্রেণি ও লিঙ্গ ক্ষমতার অসাম্যকে। প্রশ্নের মুখে দাঁড় করান সমাজতান্ত্রিক মহলের অভ্যন্তরীণ পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গীকে। শ্রেণি সাম্যের পাশাপাশি লিঙ্গ সাম্যের গুরুত্বেমর ওপর জোর দেন বারবার, জন্ম দেন এমন এক নারীবাদের যা সমাজতন্ত্রের অভ্যন্তরের বহুস্বরকে প্রতিফলিত করে। অন্যদিকে, এই অভিজ্ঞতা প্যারিসের শ্রমজীবী নারীদের মধ্যে এক নতুন চেতনার জন্ম দেয়, যার উত্তরাধিকার বহন করে পরবর্তী প্রজন্ম। 

কমিউন পরবর্তী জীবনে এই নেত্রীরা নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড জারি রাখেন, নির্বাসনে ও দ্বীপান্তরে থেকেও স্বাধীনতা ও ন্যায়ের পক্ষে সওয়াল করে চলেন। ১৮৮০ সালে প্যারি কমিউনের অংশগ্রহণকারীদের অ্যামনেস্টি ঘোষণা হলে দিমিত্রিফ ছাড়া সকলেই ফ্রান্স ফেরেন। রাজনৈতিক প্রচার ও সংগঠনে সবচেয়ে সক্রিয় থাকেন মিশেল ও মিঙ্ক। লিও মূলতঃ লেখালেখি ও তাত্ত্বিক কাজে মনোনিবেশ করেন, বিতর্ক চালিয়ে যান ইন্টারন্যাশনাল-এর ভিতর। অন্যদিকে, প্রাথমিকভাবে আবার বিপ্লবী রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক জীবন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যান দিমিত্রিফ। 

শেয়ার করুন

1 thought on “প্যারি কমিউন – ইতিহাসের (অ)দৃশ্যমান মেয়েরা”

  1. মৌমিতা আলম

    লেখাটার জন্য অনেক ধন্যবাদ। খুব তথ্য সমৃদ্ধ। অনেক শুভেচ্ছা রইল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *