নারীমুক্তি এবং কমিউনিজম: প্রসঙ্গ ক্লারা জেটকিন

আমরা প্রায়ই শুনি যারা শ্রেণীমুক্তির কথা বলেন, শ্রেণীশোষণ এর বিলুপ্তির প্রতি যাদের অঙ্গীকার, তাঁরা নারীমুক্তির প্রশ্নে নীরব। তাঁদের কাছে প্রাথমিক অক্ষ হল শ্রেণী। নারীবাদ অনেক সময়েই তাঁদের ভাবনার বিপরীতে থাকা একটি মতবাদ মাত্র। ইতিহাস সাক্ষী, নারীবাদ এবং শ্রেণীভাবনা মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে প্রায়ই। এও সত্যি যে শ্রেণীচেতনার নিরিখে যে মুক্তির আয়োজন, লিঙ্গসাম্যের প্রশ্ন কখনই ব্রাত্য ছিল না তাতে। মেয়েদের মুক্তির প্রশ্ন কখনই বাতিল করা হয়নি, বরং সময়ে তা অভিযোজিত হয়েছে শ্রেণীমুক্তির সাথে। শাণিত হয়েছে রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ভাবনায়।

সময় বয়েছে, তার নিজস্ব গতিপথে অনেক চেনা কথা, প্রচলিত ভাবনা নস্যাৎ হয়েছে । আর্থসামাজিক প্রেক্ষিতে মেয়েরা এখন পেছনের সারিতে, এমনটা ঠিক বলা যাবে না। মেয়েরা রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত হবেন, আপামর নিপীড়িত জনতার পক্ষে দাঁড়াবেন, শাসকের চোখে চোখ রেখে নিজের দাবি দাওয়ার কথা রাখবেন, লিঙ্গসমতার কথা বলবেন, আজকের সময়ে এটাই চেনা ছবি। অতীত ঘেঁটে দেখলে, মেয়েদের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অবদান অনস্বীকার্য। যতবার অর্থনৈতিক মূল কাঠামোর মালিকানার হাতবদল হয়েছে, মেয়েরা তাঁদের নিজেদের সামাজিক অবস্থান থেকে তার অংশীদার হয়েছেন। লিঙ্গ ভিত্তিক শ্রম বিভাজনের মধ্যে অদৃশ্য থেকেই ইতিহাসের ধারা বদলে তাঁদের অংশগ্রহণ থেকেছে। 

আমরা জানি পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় গ্রামীণ গৃহকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক একক বদলে এলো নাগরিক বড় কারখানা। গ্রাম গঞ্জ উজাড় করে সামন্ত ব্যবস্থার কয়েদে থাকা বিপুল সংখ্যায় মানুষের ঢল নামলো শহরগুলিতে। এই সব মানুষরা এখন তাঁদের নিজেদের শ্রমের মালিক। শ্রম শক্তি বিকিকিনির বাজার উন্মুক্ত হল। মেয়েরাও ঘর থেকে ছিটকে এই বাজারের বেচাকেনায় শরিক হলেন। যে বিপুল শ্রমিকশ্রেণীর রক্ত ও ঘামের ওপর পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উঠে দাঁড়ালো, তার অংশ মেয়েরাও। এদিকে পুঁজিবাদ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থানের অনুঘটক ছিল। এই শ্রেণীই প্রথম বুর্জোয়া গণতন্ত্রের কথা বলে। এরাই একদিকে যেমন উত্তর আমেরিকার দাসব্যবস্থার উচ্ছেদের পক্ষে সওয়াল করেছে, তেমনি প্যারী কমিউনের ফলে উঠে আসা সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ কিছুটা হলেও ধারণ করেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রশ্নে বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে সামনে রেখে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে আসা মধ্যবিত্ত শ্রেণী মেয়েদের সমানাধিকারের কথা বলতে থাকে। ১৭৯২ সালে মেরি উলস্টোঙ্ক্রাফট তাঁর লেখা “The Claims of Woman” বইতে প্রথম মেয়েদের লিঙ্গসমতার কথা তোলেন। ১৮৬৬ সালে জন স্টুয়ার্ট মিল ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে মেয়েদের ভোটাধিকারের দাবি সামনে রাখেন। পরিবার যেহেতু আর অর্থনৈতিক একক রইল না, মহিলাদের শ্রম বাজারে অন্তর্ভুক্তি সামাজিক ও পারিবারিক চিরাচরিত সংগঠনেও চিড় ধরাল। মেয়েরা যতদিন গৃহবন্দী ছিলেন, রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে অচ্ছুত ছিলেন। অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের ফলে তাঁদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ গতি পেতে থাকে। যদিও মেয়েদের সর্বজনীন ভোটাধিকারের কথা বলা হয়নি প্রথমে। কেবল মাত্র সম্পত্তিবান এবং নির্দিষ্ট সামাজিক অবস্থানে থাকা মেয়েদের অধিকার হিসেবেই তার দাবি উঠেছিল। 

ক্লারা জেটকিন ও রোজা লুক্সেমবার্গ

নতুন ব্যবস্থায় শ্রমজীবী মেয়েদের শ্রমিক শ্রেণীর অংশ হিসেবে শ্রেণীশোষণের ভাগ পেতে হয়েছিল যেমন, তেমনি তাঁর লিঙ্গপরিচিতি তাঁকে আরেক দফা শোষণের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। উনবিংশ শতকের হিসেব যদি দেখা যায়, দেখব বিরাট সংখ্যক মহিলা শ্রমিক কলে কারখানায় কাজ করছেন। তাঁদের শ্রম, তাঁদের শ্রমিক হিসেবে ন্যায্য পাওনা বুঝে নেওয়ার জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। তাঁর আত্মপরিচিতি আর পরিবার, সমাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না। তাঁরা নিজেকে নিজেদের জায়গা খুঁজে দিতে পেরেছিলেন তাঁদের দুই হাত আর মাথা দিয়েই। ফলে ভোটাধিকার যদি সর্বজনীন না হয়, যদি রাজনৈতিক ক্ষমতায় তাঁদের যোগদান না থাকে, তাঁরা তা ছিনিয়ে নিতে প্রস্তুত ছিলেন। এই কাজে যিনি প্রথম সলতে পাকান তাঁর নাম ছিল ক্লারা জেটকিন। 

ক্লারা জেটকিন জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্য ছিলেন। এমন একটা সময়ে তিনি রাজনীতি করছেন, যখন সোশ্যালিজম নিষিদ্ধ ছিল বিসমার্কের জার্মানিতে। উপরন্তু মেয়েদের রাজনৈতিক কার্যাবলীর ওপরেও নিষেধ ছিল। ক্লারা শ্রমিকদের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। এর সাথে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতৃত্বে তিনি মহিলা শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠিত করেন। মেয়েদের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নে ক্লারা ছিলেন শ্রান্তিহীন যোদ্ধা। ১৮৮৯ সালে দ্বিতীয় ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেসে প্রথম তিনিই খেটে খাওয়া মেয়েদের সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা বিস্তারিত করেন। জার্মানিতে দ্রুত শিল্পায়ানের ফলে মহিলা শ্রমিকদের সংখ্যা ছিল বিপুল। কাজের জায়গায় এই সমষ্টিকে রাজনৈতিক ভাবে ধারণ করার প্রয়োজন ছিল।

ক্লারার সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ জাগরূক ছিল লিঙ্গচেতনায়। মেয়েদের সমানাধিকার এবং তার দাবিতে সংগঠন শুধুমাত্র মানবিকতার খাতিরে প্রয়োজন, একথা তিনি মানতেন না। তিনি জানতেন নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে এবং অর্থনৈতিক পটভূমিকায় মেয়েদের মুক্তি-আন্দোলন মাত্রা পেয়েছে। ফলে সম্পত্তিবান, মধ্যবিত্ত মেয়েদের মুক্তি আর খেটে খাওয়া মহিলা শ্রমিকদের মুক্তির মাঝে রয়েছে যোজন খানেক দুরত্ব। যে মহিলারা খেটে খান, তাঁদের স্বাধীনতা এবং পরিচিতি কোন ব্যক্তি বিশেষের দাক্ষিণ্য নয়, তাঁরা শ্রেণীশোষণ বিরোধী আন্দোলনে অন্য লিঙ্গের শ্রমিকের লড়াইয়ের শরিক। এই সংগ্রামের এগিয়ে থাকা সৈনিক। যে মধ্যবিত্ত শ্রেণী বুর্জোয়া গণতন্ত্রের কথা বলে গলা ফাটাচ্ছে, তাঁরা আসলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সমর্থক। মেয়েদের লড়াইয়ের শেষ গন্তব্য পুরুষদের সাথে মুক্ত প্রতিযোগিতা নয়, খেটে খাওয়া সমস্ত মানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রাপ্তিই তাঁদের উদ্দেশ্য। ক্লারার মতে কেবলমাত্র সর্বজনীন ভোটাধিকার নয়, মেয়েদের শিক্ষার অধিকার, সমকাজে সমবেতনের সুযোগ, কাজের দাবি, মাতৃত্বকালীন সুযোগ সুবিধার দাবি তোলা আশু কর্তব্য। ক্লারা জানতেন মেয়েরা সমাজতান্ত্রিক বোধে জারিত হলে শ্রেণীমুক্তির লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করলে আসলেই মুক্তিভাবনা বাস্তবায়িত হবে। শুধুই ক্ষমতাবান শ্রেণীর পুরুষের হাতে তৈরি নিয়মনীতির কারণে কয়েক হাজার বছর ধরে মেয়েদের শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকতে হয়েছে এমনটা নয়, বরং অর্থনীতির প্রয়োজনে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভবের ফলেই যে মেয়েদের কাঠামোগত অধীনতা – ক্লারা সেটা তাঁর রাজনৈতিক ভাবনার মাধ্যমেই উপলব্ধি করেছিলেন। 

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মেয়েরা যেমন সস্তা শ্রমিক তেমনি শ্রমের পুনরুৎপাদনের কাজটি তাঁদেরকেই করতে হয়। কোনও চলতি ব্যবস্থাতেই মেয়েদের লিঙ্গভিত্তিক শ্রম বিলুপ্ত হয়নি। কারখানা থেকে পরিবার, মেয়েদের শ্রম তাঁদের লিঙ্গ দিয়েই নির্দিষ্ট হয়েছে। ফলে প্রচলিত সিস্টেম মেয়েদের পরিবারের দ্বারা পরোক্ষ ভাবে, কাজের জায়গায় প্রত্যক্ষ ভাবে নিপীড়ন করে আসছে। লিঙ্গ পরিচিতি সেখানে উপলক্ষ মাত্র। ফলতঃ মেয়েদের সাম্য ভাবনা প্রকৃতপক্ষে নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামী ভাবনার সাথে সামিল। শাসক শ্রেণীকে তার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রাধান্যের জায়গা থেকে উৎখাত করে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল লড়াই পাখির চোখ হওয়া প্রয়োজন, ক্লারার মতে এটাই ছিল মুক্তির পথ নির্দেশ। 

ক্লারার নেতৃত্বে জার্মানিতে মেয়েদের আন্দোলনে কথা বলতে গেলে অপরিহার্য হয়ে পড়ে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বাইরে থাকা মেয়েদের সংগঠনের কথা। এদের প্রাসঙ্গিকতা গড়ে উঠেছিল প্রধানতঃ শিক্ষক এবং সম্পন্ন শ্রমিকদের মধ্যে। মুলতঃ আইনি সমানিধিকার ছিল লড়াইয়ের জায়গা। বিবাহে নারী ও পুরুষের সমান আইনি অধিকার, সহজ বিবাহবিচ্ছেদ এবং গর্ভপাতের বৈধতার দাবিতে এরা একজোট হন। ক্লারা রাজনৈতিক জীবনে এই পেটি বুর্জোয়া র‍্যাডিকাল নারীবাদের বিপক্ষে এবং সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যে থাকা বুর্জোয়া নারীবাদের বিরুদ্ধে ক্লান্তিহীন সংগ্রাম চালিয়েছেন তাঁর সম্পাদিত শ্রমজীবী মেয়েদের মুখপত্র Gleichheit (সাম্য)-এ। তাঁর কাছে আলাদা করে মেয়েদের ট্রেড ইউনিয়ন বা সংগঠনের গুরুত্ব ছিল না। তাঁর কাছে মেয়েদের লড়াই মানে যুযুধান দুই লিঙ্গের লড়াই এমনটাও ছিল না। যেহেতু পুরুষ প্রাধান্যকারী রাজনৈতিক সংগঠনে মেয়েদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ ছিল, তাই আলাদা করে মহিলা শ্রমিকদের একত্র করার একটা প্রয়োজনীয়তা ছিল। যদিও আলাদা করে মেয়েদের ট্রেড ইউনিয়নের স্থায়িত্ব ছিল খুব বেশি হলে কয়েক মাস মাত্র। যত বেশি করে সামগ্রিক ভাবে শ্রমিক আন্দোলন জঙ্গি হয়েছে, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন বেড়েছে, মহিলাদের লড়াইয়ে যুক্ত হবার প্রবণতাও বেড়েছে কয়েক গুণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে জার্মানির সিন্ডিক্যালিস্ট আন্দোলন এর বড় উদাহরণ। 

Gleichheit (সাম্য) পত্রিকা

আন্তর্জাতিক মঞ্চে মেয়েদের লড়াইকে সামনে নিয়ে আসার কাজ ক্লারা অবিরাম করে গেছেন। মূলতঃ তাঁর উদ্যোগেই ১৯০৭ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক মহিলাদের সম্মেলন হয় জার্মানিতে। ১৫ টি দেশের ৫৯ জন সমাজতান্ত্রিক মহিলা এই সম্মেলনে একত্র হন। বুর্জোয়া নারীবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রশ্নে এবং সর্বজনীন ভোটাধিকারের প্রসঙ্গে ক্লারার মতের সাথে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করলেও ক্লারা নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন। তাঁকে সমর্থন করেন আরেক সমাজতন্ত্রী আলেকজান্দ্রা কলোন্তাই। অবশেষে ক্লারার মত গৃহীত হয় এবং Gleichheit আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সংগঠনের মুখপত্র ঠিক হয়। ১৯১০ সালে দ্বিতীয় সম্মেলনে ক্লারা ৮ই মার্চ দিনটিকে আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব রাখেন। 

১৯১৪ সালে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে ক্লারা, রোজা লুক্সেমবার্গের সাথে একজোট হয়ে প্রবল যুদ্ধ বিরোধিতায় সামিল হন। তাঁর মত ছিল, এই যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে বড় পুঁজি আর সম্পত্তি মালিকদের লোভের কারণে হতে চলেছে। তিনি শ্রমজীবী মহিলাদের যুদ্ধের বিপক্ষে একজোট হওয়ার আহ্বান জানান। Gleichheit পত্রিকা আন্তর্জাতিক ভাবে যুদ্ধ বিরোধী শ্রমজীবী মহিলাদের মুখপত্র হবার স্বীকৃতি পায়। কিন্তু কার্যত ক্লারা এবং রোজা জার্মানিতে একা হয়ে পড়েছিলেন। যুদ্ধকালীন জার্মানিতে শ্রমজীবী মেয়েদের সংগঠন বুর্জোয়া নারীবাদীদের পাশে দাঁড়ায়। ক্লারার হাত থেকে সংগঠনের রাশ চলে যায়। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি জার্মানির যুদ্ধপ্রচেষ্টা কে সমর্থন জানায়। যুদ্ধের সময়ে বিপুল সংখ্যায় শ্রমিকদের প্রয়োজন ছিল। ফলে মহিলা শ্রমিকদের সংখ্যাও বাড়ে। কিন্তু যুদ্ধ শেষে এই মহিলারা কর্মহীন হয়ে পড়েন। জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি তার মহিলা কমরেডদের সমাজ কল্যাণ এবং ত্রাণের কাজে নিয়োজিত হতে বলে। যে বৈপ্লবিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল যুদ্ধের আগে, অচিরেই তা ধুলোয় মিশে যায়। ক্লারা তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ায় পাড়ি দেন। 

ক্লারার রাজনৈতিক জীবনের বিবরণ সংগ্রাম আর হতাশার মিশেল। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি নিজের বৈপ্লবিক কার্যকলাপ কেবলমাত্র ট্রেড ইউনিয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিল। রাজনৈতিক বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা অর্থনৈতিক সংগ্রামের যান্ত্রিক নিত্য কাজের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল। ফলে পার্টির নেতৃত্বে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন কখনই শাসক শ্রেণীকে আশঙ্কিত করেনি, বরং এক সুবিধাজনক মিথোজীবিতায় রূপান্তরিত হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমর্থন এর প্রমাণ। একটা সময়ের বিশ্বের সর্ববৃহৎ শ্রমজীবী মানুষের পার্টির রাজনীতি শাসক দলের দালালিতে পর্যবসিত হয়। 

ক্লারা তাঁর সাধ্য মতন ভুল রাজনীতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন আজীবন। নিজের কর্মশক্তির সবটাই খেটে খাওয়া মেয়েদের সংগঠিত করার কাজে লাগিয়েছেন। কিন্তু মেয়েদের রাজনৈতিক ভাবে একত্রিত করার কাজটি সহজ ছিল না। রান্নাঘর এবং গৃহশ্রম প্রায়শই মেয়েদের চেতনার বিকাশের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। বাইরের কাজের পাশাপাশি গৃহশ্রমের বোঝা তাঁদের শ্রেণী সংগ্রামের খুঁটিনাটিতে যেতে বাধা দেয়। এর ওপর আছে সন্তান পালন এবং মাতৃত্বের দায়িত্ব। বাইরের দুনিয়ার বিশালত্বকে ছাপিয়ে যায় অন্দর মহলের একঘেয়ে কাজের বোঝা। মেয়েরা রাজনীতি সচেতন নয় এর জন্য তাঁদের ওপর চাপানো আর্থসামাজিক বৈষম্য দায়ী এটি স্বীকার করা জরুরি। এছাড়া রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করার জন্য পুঁজিবাদের অভ্যন্তরে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন এবং পুঁজিবাদের রাজনৈতিক শাসন কাঠামোর বাইরে বিপ্লবী কার্যকলাপের মধ্যে দিয়ে লড়াই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার ছিল। এক জন পুরুষ কমরেড যেহেতু গৃহ শ্রমের শরিক নয়, তাঁর পক্ষে বাইরের এই বিপুল কর্মকাণ্ডে যোগ দেওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল। এমনটা নয় যে এসব কিছু ক্লারার অজানা ছিল। তিনি তৃতীয় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালে প্রস্তাবিত থিসিসে কমিউনিস্ট পার্টি কিভাবে একজন শ্রমজীবী মহিলাকে পার্টি কর্মী হিসেবে রূপান্তরিত করবে তার এক সুস্পষ্ট রূপরেখা দেন। মেয়েদের পিছিয়ে থাকা রাজনৈতিক বোধ এবং অন্দরমহলের শ্রমের জোয়াল থেকে মুক্তি দরকার, এমনটাই অনুভূত হয়ে ছিল তাঁর। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে মেয়েদের শিক্ষিত এবং সংগঠিত করার কথা উনি বারবার বলছেন। বারবার উনি জোর দিয়েছেন পার্টির অভ্যন্তরে বিভিন্ন কমিটিতে মেয়েদের ক্ষমতায়নের কথায়, তাঁদের রাজনীতিতে নির্ধারক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব যে পার্টিরই তা স্পষ্ট করছেন। 

ক্লারার জন্মবার্ষিকী এই বছর জুলাইতে চলে গেল। আমরা বহু মতে দীর্ণ। বহু ভাগে জীর্ণ। আমরা যারা দুনিয়াকে বদলাতে চেয়েছি, হেরে যেতে যেতে, বিভক্ত হতে হতে আমাদের সবার ক্লারার কথা মনে রাখা প্রয়োজন। 

“Communism will be achieved not by “united efforts of all women of different classes”, but by the united struggle of all the exploited.” (সাম্যবাদ শ্রেণী-নির্বিশেষে সমস্ত মহিলার একজোট হওয়ার মাধ্যমে আসবে না। সাম্যবাদ আসবে সমস্ত নিপীড়িত মানুষের একজোট হওয়ার ফলে।)

এর চেয়ে বেশি আর কি বলার থাকতে পারে?

চিত্রঋণঃ সোশ্যালিস্ট সিএ, জ্যাকবিন, দ্য ফরওয়ার্ড

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *